29/09/2026
বাংলা থিয়েটারের ইতিহাসে উৎপল দত্ত শুধু একজন অভিনেতা বা নাট্যকার নন—তিনি ছিলেন এমন এক শিল্পী, যাঁর কাছে মঞ্চ ছিল সমাজ ও রাজনীতির প্রশ্ন তোলারও একটি শক্তিশালী মাধ্যম।
নকশাল আন্দোলন তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। ১৯৬৭ সালে তাঁর লেখা ‘তীর’ নাটকে সেই সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতার ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নাটকটির পর তাঁর উপর সরকারি নজরদারি বাড়ে এবং তাঁর নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়।
১৯৬৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর মুম্বইয়ের তাজ হোটেলে ‘গুরু’ ছবির শুটিং চলাকালীন উৎপল দত্ত গ্রেফতার হন। নিজের লেখায় তিনি দাবি করেছিলেন, ছবির শুটিংয়ের পাশাপাশি বিপ্লবের জন্য অস্ত্র সংগ্রহের উদ্দেশ্যেও তিনি মুম্বইয়ে গিয়েছিলেন। পরে তাঁকে কলকাতায় নিয়ে আসা হয়। ছবির শুটিং শেষ করার স্বার্থে প্রযোজনা সংস্থার হস্তক্ষেপে তিনি জামিনে মুক্তি পান।
তবে এই ঘটনা তাঁর রাজনৈতিক নাট্যচর্চাকে থামিয়ে দিতে পারেনি।
নকশাল রাজনীতি থেকে পরে নিজেকে সরিয়ে নিলেও সেই সময় উৎপল দত্ত রাজনৈতিকভাবে কঠিন এক সংকটের মধ্যে পড়েন। তাঁর দল লিটল থিয়েটার গ্রুপ (LTG)-এর সঙ্গেও বিচ্ছেদ ঘটে। এরপর তিনি গড়ে তোলেন বিবেক নাট্যসমাজ, যা পরে People’s Little Theatre (PLT) নামে পরিচিত হয়।
১৯৭১ সালের ১২ অক্টোবর রবীন্দ্র সদনে মঞ্চস্থ হয় PLT-এর অন্যতম স্মরণীয় নাটক ‘টিনের তলোয়ার’। উনিশ শতকের বাংলা থিয়েটারের ইতিহাসকে নাটকের মধ্যে তুলে ধরেছিল এই সৃষ্টি। পরবর্তীকালে তাঁর রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক নাটকের তালিকায় একে একে আসে ‘সূর্যশিকার’, ‘ব্যারিকেড’, ‘টোটা’, ‘দুঃস্বপ্নের নগরী’, ‘তিতুমীর’, ‘লালদুর্গ’, ‘জনতার আফিম’-সহ আরও বহু নাটক।
উৎপল দত্তের নাট্যজীবন বারবার দেখিয়েছে—শিল্পীর মঞ্চ কখনও শুধু বিনোদনের জায়গা নয়; সময়, সমাজ, ইতিহাস এবং মানুষের অধিকারের প্রশ্নও সেখানে উঠে আসতে পারে।
রাজনৈতিক মতপার্থক্য, দলীয় বিরোধ, সরকারি চাপ কিংবা নিষেধাজ্ঞা—কোনও কিছুই তাঁকে তাঁর নাট্যচর্চা থেকে পুরোপুরি সরিয়ে দিতে পারেনি।
বাংলা মঞ্চে তাই উৎপল দত্ত আজও এক অনন্য নাম—অভিনেতা, নাট্যকার, পরিচালক এবং রাজনৈতিক থিয়েটারের এক গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতা।
#উৎপলদত্ত #বাংলাথিয়েটার #বাংলানাটক #পিপলসলিটলথিয়েটার #টিনেরতলোয়ার #রাজনৈতিকনাটক #থিয়েটার #বাংলারসংস্কৃতি #নাট্যইতিহাস #ইতিহাস