12/06/2026
আজকের আবহাওয়াটা একদম অন্যরকম। সন্ধের পর থেকেই ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে, আর চারপাশটা ঘন কুয়াশায় ঢেকে গেছে। টেবলের দোকানের টিমটিমে হ্যারিকেনের আলোয় আড্ডাটা বসেছে। আজ কোনো হাসি-ঠাট্টা নেই, পরিবেশটা বেশ থমথমে আর রহস্যময়।
দ্বিগুণ দা আজ একটা কুচকুচে কালো চাদর মুড়ি দিয়ে বসে আছে। চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করতে করতে সে হ্যারিকেনের শিখাটা একটু বাড়িয়ে দিল। আলোর নাচনে ওর ছায়াটা পেছনের দেওয়ালে মস্ত এক অসুরের মতো দেখাচ্ছে। পটল আর হাবলু ভয়ে ভয়ে ওর গা ঘেঁষে বসল।
**হাবলু:** (গলাটা একটু নামিয়ে) "দ্বিগুণ দা, কাল তুমি চিলির খনির সোনার ঘটির কথা বলতে চেয়েছিলে। কিন্তু আজ চারপাশটা কেমন যেন থমথমে লাগছে। আজ কোনো হাসির গল্প নয়, তোমার জীবনের আসল কোনো রহস্য-রোমাঞ্চকর ঘটনা বলো না, যেটা শুনলে গায়ের লোম খাড়া হয়ে যাবে!"
দ্বিগুণ দা বিড়িতে একটা লম্বা টান দিল। আগুনের ফুলকিটা অন্ধকারে একবার জ্বলে উঠেই দপ করে নিভে গেল। সে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে পটলের দিকে তাকাল। ওর চোখ দুটো চশমার আড়াল থেকে কেমন যেন চকচক করছে।
**দ্বিগুণ দা:** "রহস্য? রোমাঞ্চ? তোরা যেগুলোকে রহস্য বলিস—ওই ভূত-প্রেত আর গোয়েন্দা গল্প—ওগুলো তো স্রেফ বাচ্চাদের রূপকথা রে! তোরা কি জানিস, বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল (Bermuda Triangle)-এর নাম শুনেছিস? যেখানে জাহাজ আর প্লেন গেলে চিরকালের জন্য ভ্যানিশ হয়ে যায়?"
**পটল:** "হ্যাঁ হ্যাঁ! ওটা তো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রহস্য! ওখানকার খবর তো বিজ্ঞানী বা নাসার লোকেরাও বলতে পারে না!"
**দ্বিগুণ দা:** (এক ঝটকায় মাথার লম্বা চুলগুলো চাদরের বাইরে বের করে গম্ভীর গলায় বলল) "**চুপ কর পটল!** বেশি আইনস্টাইন সাজিস না! নাসা তো সেদিনও আমার কাছে ইমেইল পাঠিয়েছিল ডবল ক্লু খোঁজার জন্য। আজ থেকে ঠিক তেরো বছর আগের কথা। আমি তখন স্পেশাল নেভাল ফোর্সের আন্ডারওয়াটার ইনভেস্টিগেটর। বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের ঠিক মাঝখানে একটা আমেরিকান সাবমেরিন নিখোঁজ হয়ে যায়। ইউএস প্রেসিডেন্ট নিজে আমায় ফোন করে বললেন, 'দ্বিগুণ দা, আপনি ছাড়া এই মহাশূন্য আর পাতালের রহস্য কেউ ভেদ করতে পারবে না। প্লিজ বাঁচান!'"
**হাবলু:** (ভয়ে ঢোক গিলে) "তুমি একা গিয়েছিলে ওখনে?"
**দ্বিগুণ দা:** "হ্যাঁ, একটা ডবল ইঞ্জিন স্পিডবোট নিয়ে আমি রাতের অন্ধকারে ঠিক ওই ট্রায়াঙ্গেলের ডেঞ্জার জোনে ঢুকলাম। চারপাশটা ঠিক আজকের মতোই কুয়াশায় ঢাকা, আর সমুদ্রের জলটা নীল নয়—একদম আলকাতরার মতো কালো! হঠাৎ দেখলাম, সমুদ্রের মাঝখানে জলটা বনবন করে ঘুরে মস্ত এক ডবল সাইজ ঘূর্ণি তৈরি করছে। কম্পাস বিকল, জিপিএস ডেড! চোখের পলকে আমার বোটটা টেনে নিল সেই জলের অতল গভীরে।"
**পটল:** "ওরে বাবা! তারপর? তুমি মরে যাওনি?"
**দ্বিগুণ দা:** "মরব কেন? দ্বিগুণ দা কি এত সহজে হার মানে? জলের তলায় প্রায় পাঁচশো ফুট নিচে গিয়ে যখন আমার জ্ঞান ফিরল, দেখলাম আমি এক অদ্ভুত কাঁচের প্রাসাদে বন্দি। আর আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সাত ফুট লম্বা এক ছায়ামূর্তি, যার গায়ে আঁশের মতো চামড়া আর চোখ দুটো জ্বলন্ত কয়লার মতো লাল! সে খসখসে গলায় বলল, 'মানব সন্তান! তুই এমন এক জায়গায় এসেছিস যেখান থেকে কেউ ফেরে না। আমিই এই ট্রায়াঙ্গেলের রক্ষক—কালভৈরব!'"
**হাবলু:** (হাঁ করে) "বলো কী! সে তোমাকে খেতে আসেনি?"
**দ্বিগুণ দা:** "এসেছিল রে! তার হাতে ছিল এক বিশাল আদিম তলোয়ার। সে বলল, 'যদি বাঁচতে চাস, তবে আমার একটা ধাঁধার উত্তর তোকে ডবল লজিকে দিতে হবে, নইলে তোকে এই জলের তলায় চিরকাল বন্দি থাকতে হবে।' ধাঁধাটা ছিল—*পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী অথচ অদৃশ্য জিনিসটা কী?*"
**পটল:** "কী ছিল ওটার উত্তর? বাতাস? নাকি অন্ধকার?"
**দ্বিগুণ দা:** (একটু রহস্যের হাসি হেসে) "তোদের ওই সিঙ্গেল মগজে ওটাই আসবে! আমি তখন বিন্দুমাত্র ভয় না পেয়ে, মুখের কোণে জমে থাকা সমুদ্রের নোনা জলটা থুতু করে ফেলে বললাম, 'কালভৈরব, ওটার উত্তর হলো—**মানুষের লোভ আর টেবলের দোকানের চায়ের বাকি খাতার রহস্য!** দুটোই অদৃশ্য, কিন্তু ওটার ভারে পুরো দুনিয়া ডবল হয়ে তলিয়ে যাচ্ছে!' উত্তরটা শোনা মাত্রই সেই ছায়ামূর্তি বিকট চিৎকার করে উঠল। প্রাসাদের কাঁচের দেওয়ালগুলো চুরমার হয়ে ভেঙে গেল!"
**হাবলু:** "তারপর? সাবমেরিনটা পেলে?"
**দ্বিগুণ দা:** "হ্যাঁ, সেই ভাঙা প্রাসাদের পেছনেই নিখোঁজ সাবমেরিনটা আটকে ছিল। আমি ওটার চেইন ধরে এক হাতে টেনে ডবল স্পিডে সমুদ্রের ওপরে নিয়ে এলাম। আমেরিকানরা তো আমায় দেখে জয়ধ্বনি দিতে লাগল! কিন্তু আসল রহস্যটা কিন্তু অন্য জায়গায়..."
**পটল:** "কী রহস্য?"
**দ্বিগুণ দা:** (কণ্ঠস্বর আরও নিচু করে) "সেই কালভৈরব যখন হেরে গেল, সে যাওয়ার আগে আমার চাদরের তলায় একটা অদ্ভুত কালো রঙের পাথর গুঁজে দিয়েছিল। বলেছিল, 'দ্বিগুণ দা, এই পাথরটা তোমায় ডবল ভবিষ্যৎ দেখার ক্ষমতা দেবে।' আমি ওটা পকেটে নিয়েই ফিরেছিলাম।"
ঠিক এই সময় হঠাৎ হ্যারিকেনের আলোটা দপ করে নিভে গেল! পুরো দোকান ঘুটঘুটে অন্ধকার। পটল আর হাবলু ভয়ে চিৎকার করে একে অপরকে জড়িয়ে ধরল। ঠিক তখনই পেছনের অন্ধকার থেকে একটা গম্ভীর আর কর্কশ গলা ভেসে এল—
**টেবল:** "ওরে দ্বিগুণ! বারমুডার কালভৈরব পাথর দিয়েছিল কি না জানি না, কিন্তু কাল রাতে আমার ক্যাশ বাক্স থেকে যে কুচকুচে কালো ওজনের বাটখারাটা তুই কুয়াশার মধ্যে ভুল করে পকেটে পুরেছিলি, ওটা আগে ফেরত দে! ওটার চক্করে আজ সকাল থেকে আমি খদ্দেরদের ডবল ওজনে মাল কম দিচ্ছি! আর ওদিকে তোর মা লাঠি নিয়ে এই বৃষ্টির মধ্যেই আসছে, বলছে মেজ পিসির আলমারি থেকে যে কালো চাদরটা তুই গায়ে দিয়ে পালিয়েছিস, ওটা নাকি পিসেমশাই কাল শ্রাদ্ধের বাড়িতে পরে যাবেন!"
অন্ধকারের মধ্যেই হুটোপুটি শব্দ হলো। কয়েক সেকেন্ড পর স্ট্রিট লাইটের আলোয় দেখা গেল দ্বিগুণ দা চাদরটা এক ঝটকায় কাঁধে ফেলে উঠে দাঁড়িয়েছে। ওর লম্বা চুলগুলো বৃষ্টির ছাঁটে ভিজে গেছে। সে পটলদের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল—
**দ্বিগুণ দা:** "দেখলি তো? টেবলটার হিংসে দেখ! ওটা বাটখারা নয়, বারমুডার সেই মহাজাগতিক পাথর, ওটার টানেই হ্যারিকেনটা নিভে গেল! আর টেবল ভাবছে ওটা ওজনের লোহা! সত্য কথা বললে এই দুনিয়ায় কেউ সইতে পারে না। **বেশি আইনস্টাইন সাজিস না তোরা!** আজ আসি।"
দ্বিগুণ দা চাদরটা উড়িয়ে বৃষ্টির অন্ধকারের মধ্যে দ্রুত পায়ে মিলিয়ে গেল। যাওয়ার সময় দূর থেকে ওর গলার আওয়াজ ভেসে এল—
"কাল বিকেলে ঠিক সময়ে আসিস। কাল তোদের বলব—**হিমালয়ের সেই কুখ্যাত ইয়েতি (Yeti) কেন মানুষের রক্ত খায় না, আর তিব্বতের হিমবাহের নিচে কোন ডবল প্রাচীন মমি আজও আমার দেওয়া পাসওয়ার্ডের জন্য অপেক্ষা করছে!** ওটা শুনলে তোদের রক্ত একদম হিম হয়ে ঝাপসা হয়ে যাবে!"
পটল আর হাবলু অন্ধকার মাঠের দিকে তাকিয়ে কাঁপতে কাঁপতে ভাবল, কাল কি সত্যিই কোনো মমি জেগে উঠবে?
#দুনিয়াগোল #বাঙালিরআড্ডা #দ্বিগুণদাঅফিশিয়াল #ডবলমজা