14/12/2025
শিল্প না শিল্পী
শ্যামল পটুয়া বসে আছে তার ভাঙা চালাঘরে, যেখানে সূর্যের আলো ঢুকতেও যেন ইতস্তত করে। আজ তার মন বিষাদে ভরা। সামনে পড়ে আছে একটি প্রায়-সম্পূর্ণ মাটির ঘোড়া—তার জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম। কিন্তু কালকের মেলাতেই সে বিক্রি হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ।
শ্যামল জানে, এই মাটির ঘোড়া, যা তার হাতের সূক্ষ্ম কারুকার্যে জীবন্ত হয়ে উঠেছে, তা একদিন ভেঙে যাবে। কালের ধুলোয় মিশে যাবে। হয়তো কেউ কৌতূহলবশে একবার ধরবে, তারপর ফেলে দেবে কোনো এক অব্যবহৃত কোণে। এটাই তার শিল্পের পরিণতি। তার তৈরি সরাচিত্র, মাটির পুতুল, পটের ছবি—সবকিছুরই একটি মৃত্যু আছে।
বহু বছর আগে তার গুরুমশাই তাকে বলেছিলেন,
“শ্যামল, আমাদের কাজ হলো ক্ষণস্থায়ী জিনিস তৈরি করা। যা একদিন শেষ হবেই। তুই যতই যত্ন করিস, মাটির তৈরি জিনিস তোকে ছেড়ে যাবেই।”
গুরুদেব একটি শুকনো তালপাতার ওপর লিখে ছিলেন—
“শিল্পের মৃত্যু আছে।”
শ্যামল প্রতিবাদ করেছিল,
“কিন্তু গুরুদেব, তবে আমরা কেন এত কষ্ট করে শিল্প গড়ব, যদি তা শেষ হয়ে যায়?”
গুরুমশাই তখন হাসলেন। তিনি শ্যামলের হাতে একটি মাটির দলা তুলে দিলেন।
“এই মাটিটা দেখছিস? এটা এখন প্রাণহীন। কিন্তু যখন তোর হাত এতে ছোঁয়া দেবে, তখন এই মাটি অমর হয়ে উঠবে।”
তিনি বললেন,
“শিল্পের রূপের মৃত্যু আছে। তোর ঘোড়াটা হয়তো ভেঙে যাবে। কিন্তু তোর হাতের স্পর্শ, তোর মনের ভাবনা, যে আবেগ দিয়ে তুই এর চোখ এঁকেছিস—সেটা কখনও মরবে না। যে দেখবে, তার মনে ওই ঘোড়াটার অস্তিত্ব গেঁথে থাকবে। তোর শেখানো কৌশল বেঁচে থাকবে তোর নাতির হাতে। তুই সেই অমরত্বের স্রষ্টা।”
গুরুদেব তালপাতার লেখাটায় একটি নতুন অংশ যোগ করলেন—
“শিল্পীর মৃত্যু নেই।”
শ্যামল আজ সেই সত্য উপলব্ধি করছে। তার হাতের ঘোড়াটা হয়তো দু’দিন পর ভেঙে যাবে, কিন্তু এই শিল্পের প্রতি তার যে গভীর প্রেম, তা তার প্রতিটি নিঃশ্বাসে, তার প্রতিটি বংশধরের হাতের কাজে বেঁচে থাকবে।
আজ তার শরীর দুর্বল, তুলি ধরতে কষ্ট হয়। কিন্তু তার ভেতরে শিল্পীসত্তাটা এখনও জেগে আছে। সে জানে, এই ঘোড়াটা বিক্রি হোক বা না হোক, সে নিজের মৃত্যু দিয়েও তার শিল্পকে অমর করে তুলবে, কারণ শিল্পীর আত্মা কখনও ধ্বংস হয় না—তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কেবল রূপ পরিবর্তন করে বেঁচে থাকে।
শ্যামল তখন মুচকি হেসে তার ঘোড়াটির ওপর শেষ স্পর্শটুকু বুলিয়ে দিল।
✍️
কলমে -ইন্দ্রানী পালিত কর্মকার
পেনোগ্রাফি - দীপ
সৌজন্যে অচেনা path