19/08/2025
গল্প: শেষ চুমুর পরে
✨ কখনো ভালোবাসা রয়ে যায় শুধু স্মৃতির পাতায়…
সোসাঙ্কহো আর মালবিকার গল্পে আছে প্রেম, বেদনা আর অপূর্ণতার ছোঁয়া।
একদিনের পরিচয় কি সারা জীবনের আবেগ হয়ে উঠতে পারে? ❤️💔
কলকাতার এক নামী বিশ্ববিদ্যালয়। নতুন সেশন শুরু হয়েছে। লালচে ইটের পুরনো বিল্ডিং, চারদিকে বড় বড় অশ্বত্থ আর কৃষ্ণচূড়া গাছ। সেই ভিড়ের মধ্যেই প্রথম দেখা হয়েছিল শশাঙ্ক আর মালবিকার।
শশাঙ্ক—একজন সিরিয়াস, কম কথা বলা, একটু গম্ভীর প্রকৃতির ছেলে। চোখে চশমা, হাতে সবসময় বই। বন্ধুরা তাকে বলে—
“তুই কি লাইব্রেরি তেই থাকিস? বাইরে ঘুরবি না?”
অন্যদিকে মালবিকা—একেবারেই উল্টো চরিত্র। হাসিখুশি, প্রাণোচ্ছল, গান গাইতে ভালোবাসে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কালচারাল প্রোগ্রামে প্রায়ই তার কণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত ভেসে আসে।
প্রথম দিনে ক্লাসে বসার সময় হঠাৎ দু’জনের চোখাচোখি। মালবিকা বসতে গিয়েছিল শশাঙ্কের পাশেই। আর সেখানেই শুরু হয় তাদের গল্প।
প্রথমে শুধু পড়াশোনা নিয়ে আলোচনা। শশাঙ্ক মালবিকার গণিতের সমস্যার সমাধান করে দেয়। আবার মালবিকা শশাঙ্ককে সাহিত্যের বই সাজেস্ট করে।
একদিন ক্যাম্পাসের চায়ের দোকানে মালবিকা বলল—
“শোনো শশাঙ্ক, তুমি এত চুপচাপ কেন? মানুষের সাথে মেশো না কেন?”
শশাঙ্ক একটু হেসে উত্তর দিল—
“সবাই তো মেশার মতো নয়, মালবিকা। কারো কারো সঙ্গে নিজের মতো করে কথা বলার ইচ্ছে হয়। যেমন তোমার সঙ্গে।”
এই প্রথম মালবিকা বুঝল, শশাঙ্কের গম্ভীর চেহারার আড়ালে একটা কোমল হৃদয় আছে। সেদিনের পর থেকে তারা প্রায়ই একসাথে সময় কাটাতে লাগল।
বসন্ত উৎসবের দিন। ক্যাম্পাসের চারদিকে রঙের হুল্লোড়, গানের আসর। মালবিকা লাল শাড়ি পরে এসেছে, চুলে রঙিন ফুল গুঁজে। শশাঙ্ক প্রথমবার তাকে এত সুন্দরভাবে দেখল।
সেদিন রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের কাছে দাঁড়িয়ে শশাঙ্ক হঠাৎ বলল—
“মালবিকা… আমি হয়তো কথায় ভালো নই, কিন্তু তোমাকে ছাড়া আমার এই জগতটা অসম্পূর্ণ লাগে।”
মালবিকার চোখ ভিজে উঠল। আস্তে করে বলল—
“আমিও তো তোমাকেই খুঁজে বেড়াই, শশাঙ্ক।”
সেই রাত থেকেই তাদের সম্পর্কের সূচনা। প্রতিটি দিন নতুন স্বপ্ন, নতুন পরিকল্পনা—বইয়ের পাতার মাঝে প্রেমপত্র, লেকচারের ফাঁকে ফিসফাস, ক্যান্টিনের কফির কাপে ভাগাভাগি।
কিন্তু পৃথিবী সবসময় প্রেমিক-প্রেমিকার পক্ষে থাকে না। মালবিকার বাড়িতে অন্য সমস্যা। তার পরিবার চায় সে শুধু পড়াশোনা করুক, দ্রুত বিয়ে হোক। তারা শশাঙ্ককে ভালো চোখে দেখে না—কারণ শশাঙ্ক মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসে, বাবার ছোট চাকরি, সংসারের টানাটানি।
অন্যদিকে শশাঙ্কও নিজের দায়িত্ব নিয়ে চাপে থাকে। পড়াশোনা শেষ হলে তাকে চাকরি করতে হবে, সংসার সামলাতে হবে। তবুও সে মালবিকাকে কথা দিয়েছিল—
“যাই হোক, আমি তোমাকে ছাড়ব না।”
কিন্তু সময় যত গড়াল, চাপটা বাড়তে থাকল। পরিবার, সমাজ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে তাদের সম্পর্কের ওপর ঝড় নামল।
শেষ সেমিস্টারের পর একদিন মালবিকা কাঁদতে কাঁদতে শশাঙ্ককে বলল—
“আমাদের হয়তো একসাথে থাকা সম্ভব হবে না। মা-বাবা রাজি নয়, আর আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাই না।”
শশাঙ্কের বুক ভেঙে গেল। সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল—
“তাহলে অন্তত একটা প্রতিশ্রুতি দাও, তুমি আমাকে কখনও ভুলবে না।”
একদিন, মালবিকা শশাঙ্ককে ফোন করে বললো —
"কাল চলে যাচ্ছি বিদেশে… বিয়ের ঠিক হয়েছে। তোকে শেষবার দেখতে চাই।"
শশাঙ্ক নীরবে রাজি হলো।
সেই শীতের বিকেলে তারা দুজন গঙ্গার ঘাটে মিললো।
চারপাশে কুয়াশা, ঠাণ্ডা বাতাস, গঙ্গার জলে ঢেউ।
দু’জনেই খুব কম কথা বললো।
মালবিকা কেবল তার কাঁপা হাতে শশাঙ্কের হাত শক্ত করে ধরে বললো —
"আমাদের গল্পটা শেষ হয়ে গেল, তাই না?"
শশাঙ্ক কষ্টের হাসি দিয়ে বললো —
"গল্প শেষ হয় না মালবিকা… কেবল থেমে যায় অন্য খাতায়।"
তাদের চোখে জল।
বিদায়ের আগে মালবিকা এগিয়ে এসে শশাঙ্ককে আলতো করে ঠোঁটে চুমু দিল।
সেই চুমুতে ছিল — ভালোবাসা, যন্ত্রণা, দুঃখ আর অসম্পূর্ণতার সমস্ত মিশ্রণ।
দুজনেই জানতো — এটাই তাদের শেষ।
মালবিকা সেদিন চলে গেল।
শশাঙ্ক রয়ে গেলো কলকাতায়, তার কবিতার খাতায়।
কিন্তু প্রতিটি কবিতা, প্রতিটি শব্দে সেই চুমুর উষ্ণতা, সেই ব্যথা আজও থেকে গেছে।
কিছু প্রেম পূর্ণ হয় না, কিন্তু সেই অপূর্ণতাই হয়তো তাদের সবচেয়ে গভীর পরিচয়।