08/01/2026
শীতের দুপুরে মিঠে রোদ গায়ে মেখে এক ত্রিশোর্ধ্ব যুবক দাঁড়িয়ে আছে গঙ্গাঘাটে। চোখ তার আকাশের দিকে। ছোট্ট ড্রোনটা বাজপাখির মত বৃত্তাকারে লালকুঠির চারপাশে ঘুরছে। গোটা বাড়িটার ড্রোন ভিডিও তুলে সে দেওয়ালের প্রতিটা কোণা খুঁজে দেখতে চায়। এখনো কি এই শতাব্দী প্রাচীন স্থাপত্যের গায়ে গাঁথা রয়েছে সেই দু-হাজার পুরনো বৌদ্ধ ভাস্কর্য?
ইতিহাস বলে কোন্নগরের বিখ্যাত ক্রাইপার সাহেব তার যুবা বয়সে বেশ কিছুদিন বার্মার জঙ্গলে কাটান মেটাল প্রস্পেক্টর (তামা এবং রুপোর সন্ধানকারী) হিসেবে। ঠিক যেরকম চাঁদের পাহাড়ের ডিয়েগো আলভারেজ তার জীবন অতিবাহিত করেছিলেন আফ্রিকার গভীর গহন অরণ্যে সোনা এবং হীরের প্রস্পেক্টর হিসেবে।
এখানে অবশ্য ক্রাইপার সাহেব রক্তমাংসের মানুষ। তার নামের সাথেই জড়িয়ে রয়েছে আজকের বিখ্যাত Haywards 5000 বিয়ার ব্র্যান্ডের ইতিহাস। সে গল্প আগেই লিখেছি কিভাবে তার ভাগ্নের হাতে দিয়েই কোন্নগরের বুকে শুরু হয়েছিল আজকের হেওয়ার্ডস মদের জয়যাত্রা।
এখন এই ক্রাইপার সাহেব বার্মায় থাকাকালীন এক বৌদ্ধ স্তূপে সন্ধান পেয়েছিলেন লাল বেলে পাথরে নির্মিত ভাস্কর্যের এক টুকরো যা তিনি স্মৃতি হিসেবে নিয়ে এসেছিলেন ভারতবর্ষে। পরবর্তীকালে ক্রাইপার সাহেবের মৃত্যুর পর তার ভাগ্নে এরিক হেওয়ার্ড, ১৯৪৬ সালে সেই ভাস্কর্যকে পাকাপাকিভাবে গেঁথে দেন তার মামার নির্মিত লালকুঠির উত্তর দেওয়ালে।
সবার অলক্ষ্যে ঝোপ জঙ্গলের মধ্যে এখনও কি রয়ে গেছে সেই দু হাজার বছরের পুরনো বৌদ্ধ ভাস্কর্য? এই প্রশ্নটা নিয়েই শুরু করেছিলাম খোঁজ।
তবে এর উত্তর দেওয়ার আগে ইতিহাসের দু-পাতা উল্টে দেখা যাক কিভাবে সুদূর ইংল্যান্ড থেকে বার্মা হয়ে কোন্নগরে এসে পৌঁছালেন আমাদের গল্পের নায়ক ক্রাইপার সাহেব।
রিসডন ক্রাইপারের জন্ম ১৮৫৫ সালে ইংল্যান্ডের টাভিস্টক (Tavistock) শহরে। বাবা উইলিয়াম ক্রাইপারের ছিল খনির ব্যবসা। ফলে ছেলেকে তিনি ভর্তি করেন লন্ডনের বিখ্যাত রয়্যাল স্কুল অফ মাইনসে। কুড়ি বছর বয়সে সেখান থেকে ধাতুবিদ্যার ডিপ্লোমা শেষ করে পরবর্তী পাঁচ বছর ক্রাইপার সাহেব এক অধ্যাপকের তত্বাবধানে শেখেন তামা এবং রুপো নিষ্কাশন পদ্ধতি। শেষ অব্দি ১৮৮০ সালে মাত্র ছাব্বিশ বছর বয়সে অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র হিসেবে ক্রাইপার সাহেব মনোনীত হন Royal Institute of Chemistry এর ফেলো হিসেবে। আর এই বছরই স্বদেশ ছেড়ে যুবক রিসডন ক্রাইপার পাড়ি জমালেন সুদূর বার্মার পথে।
কেনো ?
উদ্দেশ্য হল বার্মার জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে তামা এবং রুপোর সন্ধান করা। কাজটা একদমই সহজ নয়। ভেবে দেখুন লন্ডনের মত শহরের আরাম এবং বৈভব ছেড়ে এক যুবক চললেন আজ থেকে দেড়শো বছরের পুরনো বার্মাদেশের পথে। সে সময়ের বার্মা হল পাহাড়, জঙ্গলঘেরা এক অত্যন্ত দুর্গম দেশ।
আমার ধারণা ক্রাইপার সাহেবের পারিবারিক খনির ব্যবসাটা বন্ধ হয়ে গেলে তার পরিবার বেশ অর্থকষ্টের মধ্যে পড়ে। ফলে ক্রাইপার জুনিয়ারকে একপ্রকার বাধ্য হয়েই এই সিদ্ধান্তটা নিতে হয়।
সমস্যা হল ক্রাইপার সাহেবের কোনো লিখিত জীবনী নেই। এই পুরো তথ্যটাই বের করতে হয়েছে অজস্র পুরনো নথি ঘেঁটে এবং ক্রাইপার সাহেবের বংশধরদের সাথে বহুদিন ধরে ইমেল চালাচালির মধ্যে দিয়ে। ফলে কিছুক্ষেত্রে আমাকে circumstantial evidence এর উপর ভরসা করতে হয়েছে। ১৮ ৭২ সালে এক ব্রিটিশ সংবাদপত্রে, উইলিয়াম ক্রাইপারের খনির ব্যবসাটার liquidation নোটিস ছাপা হয়েছিল।
যাইহোক, বার্মায় ক্রাইপার সাহেব কাটিয়েছিলেন ঠিক দু-বছর (১৮৮০-১৮৮২)। এই দু-বছর ভাগ্যান্বেষণে ভদ্রলোক বহু পাহাড় জঙ্গল খুঁজে ফিরেছেন। তখনো প্রসপেক্টিং এর কাজে মেটাল ডিটেক্টরের ব্যবহার শুরু হয়নি বাণিজ্যিকভাবে। ফলে এই আকরিকের সন্ধান করা ছিল অত্যন্ত পরিশ্রমসাধ্য কাজ। বার্মার বহু দুর্গম অঞ্চলে অভিযান চালালেও আমাদের চাঁদের পাহাড়ের শঙ্করের মত ভাগ্যদেবী রিসডেন ক্রাইপারের প্রতি সদয় হননি।
ফলে দু বছরের অভিযান শেষে ভগ্নহৃদয়ে ক্রাইপার সাহেব পাড়ি জমান ব্রিটিশ ভারতবর্ষে। এর ঠিক আগেই প্রসপেক্টিং এর কাজ করতে গিয়েই বার্মার কোনো এক দুর্গম অঞ্চলে ক্রাইপার সাহেবের হাতে এসেছিল সেই দু হাজার বছরের প্রাচীন বৌদ্ধ ভাস্কর্য।
এই তথ্যটা পেয়েছিলাম ক্রাইপার সাহেবের ভাগ্নে এরিক হেওয়ার্ডের নাতি সাইমন হেওয়ার্ডের থেকে।
ভাগ্যক্রমে ক্রাইপার সাহেব ভারতবর্ষে ফিরে হাত মিলিয়েছিলেন ডেভিড ওয়াল্ডির সাথে। বলা হয় এই ওয়াল্ডি সাহেবই আদতে ক্লোরোফর্ম আবিষ্কার করছিলেন। কিন্তু এর গোটা কৃতিত্বটাই পেয়েছিল তার বন্ধু জেমন সিম্পসন। ফলে স্বদেশবাসী এবং বন্ধুর উপর তীব্র রাগে ও অভিমানে এই ওয়াল্ডি সাহেবও ভাগ্যান্বেষণে এসেছিলেন এই ভারতবর্ষের মাটিতেই। তারপর এই দুই ভগ্নহৃদয় মানুষ মিলে কিভাবে গড়ে তুলেছিলেন D.Waldies & Co. Ltd তা নিয়ে আগেই লিখেছি ফেসবুকে। সেই প্রবন্ধ এবছরের কোন্নগর বইমেলায় বই হিসেবেও বেরিয়েছে সম্প্রতি।
সেই প্রবন্ধ লিখতে গিয়েই গোয়া থেকে সাইমন হেওয়ার্ড এক পারিবারিক ডকুমেন্ট পাঠান যেখানে তিন পাতাজুড়ে কোন্নগর হাউসের প্রতিটা ঘরের বিবরণ ছিল। তৎকালীন সময়ে কোন্নগরের এই লালকুঠি বা কোন্নগর হাউস ছিল অবিভক্ত বাংলার অন্যতম বিলাসবহুল বাংলো বাড়ি। আর এই বাড়ির ডকুমেন্টের মধ্যেই ছিল লাল বেলে পাথরের সেই ভাস্কর্যের উল্লেখ।
লেখাটা পড়ার পর থেকেই প্রবল উত্তেজনায় প্রথমে সাইমন হেওয়ার্ডের পাঠানো প্রতিটা পুরনো ডকুমেন্ট এবং ছবি ঘেঁটে দেখতে শুরু করি। শেষ অব্দি অজস্র সাদা কালো পুরনো ছবির মধ্যে থেকে পাওয়া গেল সেই ভাস্কর্যের ছবি। পাথরের তৈরি লতা পাতা ঘেরা সেই ভাস্কর্যের উপর মার্বেল ফলকে ল্যাটিন ভাষায় লেখা আছে:
"HANC TABULAM ANTIQUAM BUDDHENSEM, CIRCA A.U.C CCL CAELATAM, AB WILLIAM RISDON CRIPER, DOMUS CONDITORE, EX BURMA ELATAM, IN EJUS MEMORIAM NEPOS ERIC RAYWARD HIC CRNSTITUIT.
A.D. MCMXLVI."
গুগুল ট্রান্সলেটর দিয়ে ল্যাটিন থেকে ইংরেজি করায় যার অর্থ দাঁড়ালঃ
"THIS ANCIENT BUDDHIST TABLET, CARVED AROUND 250 A.U.C., BROUGHT FROM BURMA BY WILLIAM RISDON CRIPER, FOUNDER OF THE HOUSE, WAS PLACED HERE IN HIS MEMORY BY HIS GRANDSON ERIC HAYWARD.
A.D.1946.
অর্থাৎ সত্যিই এককালে কোন্নগরের লাল কুঠির বুকে সুদূর বার্মা থেকে অনা সেই বৌদ্ধ ভাস্কর্য ছিল! কিন্ত সমস্যা হল, আজও আছে কিনা তা খুঁজে দেখতে হলে লাল কুঠিতে ঢুকে দেখতে হয় একবার। কিন্তু বর্তমানে লাল কুঠিতে ব্যক্তিগত প্রবেশ নিষেধ কারণ আজ এর মালিক হল Krishi Rasayan Exports নামে এক বেসরকারী সংস্থা। ফলে সাধারন মানুষ সেখানে প্রবেশ করতে পারে না। বাড়ির সামনের বিস্তীর্ণ বাগান জুড়ে আজ বিভিন্ন সার এবং কীটনাশকের টেস্ট করা হয়। আর বাড়িটাকে ব্যবহার করা হয় মালের গোডাউন হিসেবে।
অগত্যা?
উপায় হিসেবে বেছে নিলাম প্রযুক্তিকে। ড্রোন দিয়ে গোটা বাড়ির ভিডিও এবং ছবি তুলে photogrammetry এর মাধ্যমে গোটা বাড়িটার একটা ত্রিমাত্রিক মডেল বানানো সম্ভব। সেই মডেল থেকেই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে বোঝা সম্ভব যে আজও উত্তরের দেওয়ালে আছে কিনা সেই ভাস্কর্য!
ফলে শীতের দুপুরে কোন্নগরের সিঙ্গী ঘাটে দাঁড়িয়ে তুলে নিলাম ড্রোন। উত্তরের দেওয়ালে ক্যামেরা তাক করে ঝোপঝাড়ের মধ্যে দিয়েই অজস্র হাই রেজলিউশন ফটো তুলে ফিরে এলাম বাড়িতে। বাড়ি ফিরে অদম্য আগ্রহ নিয়ে ল্যাপটপ খুলে ছবিগুলো ট্রান্সফার করার পরই মনটা খারাপ হয়ে গেল।
দেওয়ালের ঐ গোটা অংশটাই যেন কেউ চেঁছে তুলে দিয়েছে। আলোছায়ার মধ্যেও ভগ্নপ্রায় চৌকো অংশটার পিছনের দিকের দেওয়ালের লাল ইটের গাঁথনিগুলো দেখা যাচ্ছে।
অর্থাৎ সেই ভাস্কর্য এবং মার্বেল ফলক - কোনোটাই নেই। শুধু খাপকাটা চৌকা দুটো গর্ত রয়ে গেছে লালকুঠির গায়ে।
এককালে ছিল বটে কিন্তু বিগত ১০০ বছরে অন্তত দু তিনবার হাত বদল হয়েছে এই বাড়ির মালিকানার। তার মধ্যেই হয়তো কেউ ভাস্কর্যটা তুলে নিয়ে বিক্রি করে দিয়েছে! এমনিতেই গোটা বাড়িটাকে বাংলো থেকে গোডাউন বানাতে গিয়ে অজস্র ভাংচুর করা হয়েছে গত কয়েক দশকে। অপূর্ব সুন্দর lancet arch এর জানলাগুলোকে ভেঙ্গে ইটের দেওয়াল গাঁথা হয়েছে জায়গায় জায়গায়। বেশ কিছু Gothic spire বা চূড়াগুলো ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। এর মধ্যেই হয়তো কোনো মিস্ত্রি এসে মেরামতের সময় অপ্রয়োজনীয় ভেবে সেই ভাস্কর্যকেও উপড়ে ফেলে দিয়েছে! সহস্রাধিক বছরের পুরনো ভাস্কর্যের ঠাই হয়েছে কোনো আস্তাকুড়ে!
আদতে ঠিক কি হয়েছে তার উত্তর আমার কাছে নেই!
নিজের শহরকে ভালোবেসে তার ইতিহাস খুঁজে বার করব বলে বহু রাত ব্যয় করেছি প্রাচীন নথি ঘেঁটে। অনেক কিছু পেয়েছি, আবার অনেক কিছুই পাইনি। এটাও তেমনই এক ব্যর্থতা ভেবেই গ্রহন করেছিলাম সেদিন।
তবে ক্রাইপার সাহেব এবং তার ভাগ্নের তৈরি আজকের বিখ্যাত হেওয়ার্ডস মদের ইতিহাসের খোঁজ করতে গিয়ে আজ থেকে চার বছর আগে যে ইতিহাস লিখেছিলাম তা প্রবন্ধাকারে প্রকাশ পেয়েছে এবছর কোন্নগর বইমেলায় মৃত্তিকা প্রকাশনীর ‘’প্রসঙ্গ কোন্নগর’’ বইতে। যারা সেই লেখা পড়েননি তারা বইটা পাবেন কোন্নগর বইমেলায় ৯ নম্বর স্টলে। এই প্রবন্ধ ছাড়াও এদেশের প্রথম বাটা কারখানা এবং কোন্নগর গ্রামের গল্প নিয়ে লেখাটাও ঠাঁই পেয়েছে সেই বইতে।
প্রকাশক আমাকে অনুরোধ করেছিল কোন্নগরের ইতিহাসের অজস্র দুষ্প্রাপ্য দলিল এবং অপ্রকাশিত ছবি সহ নিজেরই একটা বই লিখতে। এবছর সময়াভাবে আর সেটা শেষ করে উঠতে পারলাম না। আশা করি আপনাদের ভালোবাসা এবং উৎসাহকে পাথেয় করে শিগগিরি সেই কাজ শেষ করতে পারব।
____________________
১. ক্রাইপার সাহেবের তৈরি বাংলো লাল কুঠি বা কোন্নগর হাউসের থ্রিডি মডেল পাবেন এই লিংকেঃ https://poly.cam/cap.../e632327f-53fe-4c4f-b64d-92eb73ac21d4
২. লাল কুঠির ড্রোন ভিডিওঃ কমেন্টবক্সে লিংক দিলাম।
৩. লেখকের Mrittika Prakashan - মৃত্তিকা প্রকাশন থেকে সদ্য প্রকাশিত ''প্রসঙ্গ কোন্নগর'' বইটা কিনতে এই লিংকে ক্লিক করুনঃ https://boitoi.in/products/prasanga-konnagar-ed-souvik-raj
৪. এছাড়া সরাসরি প্রকাশকের সাথে এই নাম্বারে (+91 7439375635) WhatsApp এ যোগাযোগ করলেও তিনি আপনার ঠিকানায় বইটা পাঠিয়ে দেবেন।
বিশেষ ধন্যবাদঃ Simon Hayward, Liza Feeney, Subhadip Kansa Banik, Late Rathindranath Chakraborty এবং কোন্নগর ঐতিহ্য পরিষদ।
, #কোন্নগর