30/05/2026
2025 সালের 31st August এ আমি আমার বড়ো জামাইবাবুর কাছে একটা মেসেজ লিখেছিলাম। সেটা আজ হঠাৎ আমার চোখে পড়ে গেলো। তাই share করলাম আপনাদের সাথে।
অনুরোধ রইলো - শেষ পর্যন্ত পড়বার জন্য .... 🙏 👇
আজ তোমাদের কাছে আমার মনের কিছু লুকানো কথা বলবার জন্য লিখতে বসেছি। হয়তো সবকিছু বলা যায় না মুখে, তাই এই মেসেজের আশ্রয় নিলাম।
আমার জীবনের শুরুটা কিন্তু সহজ ছিল না।
মা-বাবা জন্ম দিলো ঠিকই, কিন্তু আমাকে কাছে রাখতে পারলো না। সেই শূন্যতা তোমরা দু’জন পূর্ণ করেছো। আমাকে ছেলের মতো বড় করেছো, মানুষ করেছো, পড়াশোনা শিখিয়েছো, ইঞ্জিনিয়ার বানিয়েছো। দিদি যখন নিজের হাতে খাইয়ে দিতো, সেই ভালোবাসা আজও মনে আছে। আমি জানি, তোমরা না থাকলে আমি হয়তো এই জায়গায় আসতেই পারতাম না। দিদি আমাকে কোনোদিন ছেলে ছাড়া ভাই হিসেবে ভাবেনি।
কিন্তু জীবনের পথে অনেক অভাব, অবহেলা, কষ্ট জড়িয়ে রইলো।
এমন বাবার ঔরসে আমার জন্ম, যেখানে আমি বাড়ি আসলে বাবার খরচ বেড়ে যেতো। জন্মের পর থেকে বাবার নিজের হাতে কিনে দেওয়া একটা জামা-প্যান্টও আমি পাইনি।
অথচ তুমি ও দিদি, সবসময় আমার পাশে থেকেছো, অভাব বুঝতে দাওনি। বরং আমাকে জন্ম না দিলেও তুমি প্রকৃত বাবার ভূমিকা পালন করেছো। তোমাদের সেই অবদান আমি কোনোদিন ভুলতে পারবো না। সেটা সম্ভবও নয় আমার পক্ষে।
তারপরেও কেন যেন সমস্যাগুলো আমাকে সবসময় তাড়া করেছে। হয়তো কোনো জন্মে আমি অনেক বড় একজন পাপী মানুষ ছিলাম।
বড় বড় কোম্পানিতে চাকরি করেছি। Tata গ্রুপে নিজের সাফল্যের পর সাফল্য পেয়েছি, নিজেকে বারবার প্রমাণ করেছি। অনেক প্রমোশন, পুরস্কার, অ্যাওয়ার্ড সব পেয়েছি।
—তবুও ভিতরে ছিলো এক গভীর শূন্যতা। রাতের পর রাত চোখের জল ফেলেই ঘুমাতে হতো। আমার সাফল্যের আনন্দ আমি যাঁদের সঙ্গে ভাগ করতে চেয়েছি, তাঁরা (তুমি ও দিদি) কোনোদিন সেটা গ্রহণ করেনি। আমার ভালোবাসা, আমার অবদান—সবই যেন কোথাও অদৃশ্য হয়ে গেছে।
কখনও টের পেয়েছো কিনা জানিনা। কোনোদিন চোখের জল ছাড়া আমার ঘুম আসত না। কারণ, যে মানুষ দু’জনের জন্য আমার সেই খ্যাতি অর্জন সম্ভব হয়েছিল, তাঁরা আমার ইনকামের পয়সায় কোনোদিন তাঁদের জন্য কিছু করতে দিলেন না আমাকে। আমার মনে আছে, আমি একবার কিছু সাবান, আরও কিছু জিনিস নিয়ে এসেছিলাম। দিদি বলেছিল – ভাই, এইসব আনবি না এখানে।
কেনো? আমার ঐ ইনকামের পয়সায় কোনো পাপ ছিল কি? না, কোনো পাপ বা ভনিতা ছিলো না।
আমার সাথে তুমি কথা বলতে না, পাশ দিয়ে চলে গেলেও ছোঁয়া যাতে না লাগে সেইদিক বজায় রাখতে। আমি এতটাই তোমার কাছে অবহেলিত ও উপেক্ষিত ছিলাম। অথচ আমার ভালোবাসা, মন, শ্রদ্ধার ভিতর কোনো নাটক ছিলো না। আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি -
আমাকে যদি চপিং করা হয়, তাহলে সেই ছোটো ছোটো টুকরোর এক কণা দিয়েও আমি তোমাদের ঋণ শোধ করতে পারবো না।
মা, যিনি জন্ম দিলেন, সেই মা-ও সঠিক সময়ে আমার পাশে দাঁড়াতে পারলেন না।
আমার উপর ঘটে যাওয়া অন্যায় অবিচার গুলোকে মুখ বন্ধ করে সহ্য করলো। বিনা অপরাধে বাড়ী ছেড়ে চলে আসার সময়ও মা আমাকে বাঁধা দিলো না। মা বিশ্বাস করেছিল অন্যের দেওয়া বদনামকে। কিন্তু নিজের জন্ম দেওয়া ছেলের উপর বিশ্বাস রাখতে পারেনি।
Hyderabad এ 8000 প্লেটলেটস নিয়ে ICU তে যখন মৃত্যুর সাথে লড়াই চালিয়ে গেছি, তখনও আমার জন্মদাত্রী মা একবারও আমাকে ফোন করে খবর পর্যন্ত নিলো না। কখনও হৃদয় দিয়ে অনুভব করেছিল কি - "আমি কথা না বললে আমার ছেলেটা ভালো থাকতে পারবে না। আমি একবার কথা বলি।।"
কোথায় থাকলো তাঁর মাতৃত্ব? চোখের জলে বা, মুখে কার কাছে কী বললেন, সেটা বড় কথা নয়—আমার সাথে কী কী করেছেন, সেটাই বড় কথা আমার কাছে।
দীপা, যার জন্য আমি আমার সবটা দেবার পরেও ও আমাকে চিনতে পারলো না। যে দীপা আগেরদিন দুপুরে আমার হাতে-পায়ে ধরে ক্ষমা চাইলো (আমার মেয়ের উপস্থিতিতে), রাতে জোর করে আমার পাশে শোবার চেষ্টা করলো, কিন্তু তাঁর 14 বছরের ব্যবহারে, বারংবার কর্তব্যে গাফিলতি দেখে তাঁর ডাকে যখন আমি সাড়া দিলাম না, ঠিক তার পরের দিন থেকে আমি হয়ে গেলাম চরিত্রহীন। সারা দুনিয়ার কাছে ভাইরাসের মতো নিমিষে ছড়িয়ে দিলো আমার দুশ্চরিত্রের খবর। আমাকে সারা দুনিয়া চরিত্রহীন হিসেবে চিনতে পারলেও কিন্তু দীপা ভালোভাবেই অনুভব করে এবং সারাজীবন অনুভব করবে যে, ও আমার সম্পর্কে কতটা ভুল করেছে। আমি যদি খাঁটি ছিলাম, আমার ভালোবাসা যদি খাঁটি ছিল, একদিন ওকে সারা দুনিয়ার সামনে চোখের জল ফেলতেই হবে।
আমার মেয়ে, সে তো বুঝতেই পারলো না সে ঠিক কী হারালো। ও বাচ্চা। এটা ঠিক, কিন্তু এতটা বাচ্চা নয় যাতে ওর কাছে কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল সেটা না ধরা পড়ে।
এটা ঠিক যে, আমি অন্যান্য বাবাদের মতো তাঁকে বিশাল কিছু দিতে পারিনি। কিন্তু যেটা দিতে চেয়েছিলাম, সেটা ওরা নিতে পারলো না।
দাদা বলে যাকে জানি, সেও আমার জীবনে প্রায় অনুপস্থিত ছিল। আমি তো জন্মলগ্ন থেকে কোনোদিন অনুভবই করতে পারিনি আমার জীবনে দাদা বলে কেউ আছে। বন্ধুদের দাদাদেরকে দেখেছি, আর আমার ওই দাদা নামক বস্তুটাকেও দেখেছি। সত্যি, কতটা অভাগা আমি। হ্যাঁ, তবে এটা তো বলতেই হবে—যেবার আমি জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষা দিতে গেছিলাম, সেইবার ওই দাদা আমাকে হাফ টাইমে একটা ডাব আর দুটো সন্দেশ টিফিনে খাইয়েছিল, আর আমি জয়েন্টে পাশও করেছিলাম। ব্যাস, ওই একটা দিন আমি দাদা হিসেবে ওকে পাশে পেয়েছিলাম। আমার চরম খারাপ সময়ে ওকে মেসেজ করেছিলাম WhatsApp-এ। কিন্তু তার উত্তর আজও পেলাম না।
আর ডলিদি, ও কোনোদিন আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করেনি। এটা চূড়ান্তভাবে সত্যি। ও খুব ভালোবাসতো আমাকে। কিন্তু বুড়োদার সাথে বিয়ের পরও ও কোনো খারাপ ব্যবহার করেনি আমার সাথে, আজও করেনি। কিন্তু বুড়োদার শুকুনির চাল আমি সহ্য করিনি বলেই (আজও আমি চিৎকার করে বলতে পারি – আমার বাবার মৃত্যুর জন্য বুড়োদাই দায়ী সম্পূর্ণভাবে), ডলিদি আমার সাথে সম্পর্ক রাখেনি। তাতে আমার কোনও সমস্যা নেই।
আর মাম, তাঁর কথা আর কী বলবো? যাকে তাঁর ছোটো থেকে একসাথে নিয়ে বড়ো হলাম, তাঁকে সবদিক থেকে সঙ্গ দিলাম, সে হয়তো ভেবেই নিয়েছে তার বাবু মামা মারা গেছে।
হয়তো সে অনেক ব্যাস্ত তাঁর স্টাডি নিয়ে, গবেষণা নিয়ে। কিন্তু ইচ্ছে থাকলে বছরে একবার কল বা, মেসেজ দেওয়া যেতেই পারে। তবে আমি এটা মন থেকে বিশ্বাস করি - মাম আমাকে ভুলে যেতে পারে না। ও কোনকিছুর চাপে পড়েই হয়তো আমাকে উপেক্ষা করে। মন থেকে নয়, বাধ্য হয়ে।
জীবনে এক-একজন মানুষ ক্ষণিকের জন্য পাশে থেকেছে, কিন্তু দীর্ঘ সময়ে আমি একাই পথ চলেছি। তবুও আমি কৃতজ্ঞ, কারণ তোমাদের কাছ থেকে আমি পেয়েছি ভালোবাসা, শাসন, যত্ন।
আজ আমার মনে হয়, জীবনের সত্যিকারের সম্পর্ক সেইটা, যা সময়ের পরীক্ষায় টিকে থাকে। যেমন হীরে অমূল্য (কারণ, হিরের গাঠনিক বন্ধন অনেক শক্তিশালী), তেমনি সত্যিকারের সম্পর্কও অমূল্য। আর ভুয়ো সম্পর্ক, যত দামই দাও, একদিন মিলিয়ে যায় অন্ধকারে (যেমন, কোটি টাকার পারফিউম-ও নিমিষেই উধাও হয়ে যায় অন্ধকারে)।
তোমাদের সকলের প্রতি আমার হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর প্রণাম রইল। আমি এখন নিজের মতো আছি, ভগবান আছেন আমার সাথে—এই একার জীবনটুকুই আমার সত্যিকারের সঙ্গী।
এই মেকি সমাজের মেকি সম্পর্কের বন্ধনে আমি লিপ্ত হতে অক্ষম। তাই রোজ একবার ফোন করে 10 মিনিট কথা বলার চেয়ে, সম্পর্কের মৌলিক বন্ধন গুলোকে আরও শক্তিশালী করা উচিৎ - যাতে সম্পর্কের যে মায়াবী টান, সেটা যেন অনুভূত হয় বারংবার হৃদয় জুড়ে।
বিনম্র প্রণাম, ভালবাসা শ্রদ্ধাসহ -
ঝড়া পাতা....
বাবু