05/06/2026
পুরুষের শেষ বয়সের ভালোবাসা: প্রয়োজন নাকি ভণ্ডামি?
পুরুষ ভালোবাসতে শেখে না, পুরুষ আটকায়। আর এই আটকে পড়াটা শুরু হয় ঠিক তখন, যখন পৃথিবীর আর কোনো পথ তার জন্য খোলা থাকে না। যৌবনের তেজ, অহংকার আর ক্ষমতার দম্ভ যখন বার্ধক্যের শীতল স্রোতে ভেসে যায়, তখন পুরুষের হুঁশ ফেরে। কিন্তু সেটা কি ভালোবাসা? নাকি নিজের অসহায়ত্বের কাছে এক নির্লজ্জ আত্মসমর্পণ?
দ্রষ্টব্য: প্রতিটি পুরুষের চরিত্র একরকম নয়। এই লেখা শুধু সেই পুরুষদের জন্য যারা যৌবনে স্ত্রীকে কেয়ার বা ভালোবাসা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন।”
যেই পুরুষ যৌবনে স্ত্রীর হাতে দশটা টাকা তুলে দিতে হাজারবার ভাবতো, যার কাছে স্ত্রীর একটা শখ পূরণ করার চেয়ে সামাজিক প্রতিষ্ঠা অনেক বড় ছিল, সেই পুরুষই বৃদ্ধ বয়সে স্ত্রীর নামে বাড়ি-ফ্ল্যাট লিখে দেয়। পোস্ট অফিসের মোটা অংকের টাকা বা পেনশনের সমস্ত অধিকার তুলে দেয় সেই নারীর হাতে, যাকে সে একদিন নিজের সম্পদের সামান্য অংশীদার ভাবতেও ভয় পেত। কেন এই পরিবর্তন? হঠাৎ করে কি তার হৃদয়ে ভালোবাসার মহাসাগর জেগে উঠেছে? উত্তরটা আমাদের সবার জানা, কিন্তু আমরা স্বীকার করতে ভয় পাই। না, এটা ভালোবাসা নয়; এটা তার শেষ বয়সের ইনস্যুরেন্স পলিসি।
একটু ভেবে দেখুন, যেই লোকটা তার বাবা-মা বেঁচে থাকতে স্ত্রীকে মানুষের পর্যায়ের সম্মানটুকুও দেয়নি, যে ভাবতো বউকে বেশি ভালোবাসা দেখালে লোকে "বশীভূত" বলবে, সমাজ তাকে কাপুরুষ ভাববে—সেই লোকটাই আজ স্ত্রীর আঁচল ছাড়া এক মুহূর্ত চলতে পারে না। এর কারণ কী? কারণ, তার বাবা-মা আজ কবরে, ভাই-বোনেরা নিজেদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত, ছেলে-মেয়েরা নিজেদের জীবন গড়ে নিয়েছে। তার অসুস্থ শরীরে সেবা করার জন্য, তার একাকীত্বে সঙ্গ দেওয়ার জন্য সস্তা কেনা গোলামের মতো স্ত্রী ছাড়া আর কেউ অবশিষ্ট নেই। আজ যখন তার সেবা করার জন্য আর কোনো বিকল্প নেই, তখন হঠাৎ করেই তার স্ত্রী পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নারী হয়ে ওঠে। এই হঠাৎ জেগে ওঠা 'প্রেম' কি ভণ্ডামি নয়?
প্রশ্ন হলো, যেই নারীর যৌবনের প্রতিটা দিন কেটেছে স্বামীর অবহেলায়, যার একটা শাড়ি বা সামান্য আবদার পূরণ করতে রাতের পর রাত চোখের জলে বালিশ ভেজাতে হয়েছে, সেই নারী বৃদ্ধ বয়সে স্বামীর দেওয়া এই বিপুল সম্পদ দিয়ে কী করবে? এই টাকা কি তার হারিয়ে যাওয়া যৌবন ফিরিয়ে দেবে? তার মনের গভীর ক্ষতগুলো কি মুছে ফেলতে পারবে? যে সময়ে তার সামান্য ভালোবাসা আর সম্মানের প্রয়োজন ছিল, তখন তো স্বামী তাকে পায়ের নিচে দাবিয়ে রেখেছিল। আজ যখন তার নিজেরও এক পা কবরে, তখন এই অর্থ আর প্রাচুর্য তার কাছে অর্থহীন বোঝা ছাড়া আর কী?
পুরুষেরা বোঝে না, বা বুঝতে চায় না যে, সম্পর্কটা কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নয় যে শেষ বয়সে মোটা অংকের টাকা জমা দিয়ে সব দেনা-পাওনা মিটিয়ে দেওয়া যাবে। যৌবনে যেই ভালোবাসার চারাগাছ রোপণ করা হয়নি, বৃদ্ধ বয়সে তার ছায়ায় আশ্রয় খোঁজাটা এক চরম স্বার্থপরতা। যে পুরুষ অল্প বয়সে স্ত্রীকে মানসিক ও শারীরিকভাবে নির্যাতন করে নিজের পৌরুষ জাহির করত, আজ সেই পুরুষই স্ত্রীর সামান্য বকুনি খেয়ে চুপ করে থাকে। কারণ সে জানে, এই নারী তাকে ছেড়ে চলে গেলে তার বেঁচে থাকাটাই অর্থহীন হয়ে পড়বে। তার গতি নেই, শক্তি নেই, অর্থ ছাড়া তাকে দেখার আর কেউ নেই।
তাহলে কি আমরা বলতে পারি না যে, পুরুষের এই শেষ বয়সের 'নির্ভরশীলতা' আসলে তার সারাজীবনের পাপের প্রায়শ্চিত্ত? এটা কি সেই কর্মফল, যা সে নিজের হাতে তৈরি করেছে? যে মায়ার বাঁধনে সে যৌবনে নিজেকে আটকাতে চায়নি, আজ পরিস্থিতি তাকে সেই বাঁধনেই আটকে ফেলেছে, তবে ভালোবাসায় নয়, প্রয়োজনে।
আমার কিছু প্রশ্ন থাকলো সেইসব পুরুষদের কাছে:
১. যৌবনে স্ত্রীর প্রতি আপনার যে ভয় ছিল—"টাকা নিয়ে যদি চলে যায়"—সেই ভয়টা কি আপনার ভালোবাসার চেয়েও বড় ছিল?
২. যে সম্মান আর ভালোবাসা আপনি আজ আপনার স্ত্রীর কাছ থেকে আশা করছেন, সেই সম্মানের সামান্য অংশও কি আপনি তাকে দিয়েছিলেন, যখন তার পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ ছিল না?
৩. আপনার দেওয়া এই শেষ বয়সের সম্পদ কি আপনার সারাজীবনের অবহেলা আর নির্যাতনের ক্ষতিপূরণ হতে পারে?
এই 'আটকে পড়া' ভালোবাসা নয়, এটা একটা জীবন্ত কারাগার। যেখানে পুরুষ নিজের তৈরি করা দেয়ালে নিজেই বন্দি। আর নারী? সে তো সেই যৌবন থেকেই বন্দি, শুধু তার কারাগারের নামটা পাল্টেছে—কখনো অবহেলায়, কখনো প্রয়োজনে। এই নির্মম সত্যটা মেনে নিতে আপনার হৃদয়ে কি একটুও আগুন জ্বলে না?
লেখা সংগৃহীত