02/11/2025
চট্টগ্রাম বিভাগে ১০ মাসে তিন হাজার অগ্নিকাণ্ড
বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকে সৃষ্টি ৪৬%
ঘটনাস্থলে যেতে সরু রাস্তায় ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের চলে কঠিন সংগ্রাম
কাজী মনজুরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম
চট্টগ্রাম বিভাগে ১০ মাসে তিন হাজার অগ্নিকাণ্ড
চট্টগ্রাম বিভাগে একের পর এক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছেই। আগুন থেকে রেহাই পাচ্ছে না বসতবাড়ি থেকে শুরু করে অত্যাধুনিক কলকারখানাও। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স চট্টগ্রাম বিভাগীয় দপ্তরের তথ্য থেকে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বিভাগে গত জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত তিন হাজার ২৩৫টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকে ঘটছে এক হাজার ৫০৩টি, যা মোট অগ্নিকাণ্ডের প্রায় ৪৬ শতাংশ।
ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা ও নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ, নিম্নমানের বৈদ্যুতিক কেবল ও অন্যান্য সরঞ্জাম ব্যবহারের পাশাপাশি গ্যাসলাইন বা সিলিন্ডার লিকেজ, বিড়ি-সিগারেটের জ্বলন্ত টুকরা থেকেও আগুনের সূত্রপাত হচ্ছে। এ অবস্থায় চট্টগ্রামে ফায়ার সার্ভিস স্টেশন বাড়ানো এবং আগুন নেভাতে সক্ষম আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করা জরুরি। কারণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ঘটনাস্থলে যেতে সরু রাস্তায় ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের চলে কঠিন সংগ্রাম।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স চট্টগ্রাম দপ্তরের তথ্য মতে, গত ১৬ অক্টোবর চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে (সিইপিজেড) অ্যাডামস ক্যাপস অ্যান্ড টেক্সটাইলস লিমিটেডের কারখানায় আগুন লাগে।
আগুন লাগার ২৪ ঘণ্টা পর আটতলা কারখানায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটি ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ ও ‘সর্বসাধারণের প্রবেশ নিষেধ’ উল্লেখ করে কারখানার সামনে ব্যানার টানানো হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে কাজ করছে তদন্ত কমিটি। গত ১৭ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও চন্দনাইশের সীমান্তবর্তী চরতীতে কারখানার গুদামে সিলিন্ডার বিস্ফোরণে দগ্ধ হয়ে ছয়জন মারা যান।
২৬ আগস্ট চট্টগ্রাম মহানগরীর মোহরার মৌলভীবাজারের একটি বসতবাড়িতে বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকে আগুন লাগে। এতে গীতা রানী ঘোষ ও তাঁর নাতনি স্কুলছাত্রী শশী ঘোষ মারা যায়। এভাবেই ঘটছে অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহ ঘটনা।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স চট্টগ্রাম জেলা দপ্তর জানায়, গত জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে চট্টগ্রাম নগরী ও জেলায় ৫৯৯টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। তথ্য মতে, এই ১০ মাসে চট্টগ্রাম মহানগরসহ জেলায় বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ৩১৬টি, যা মোট অগ্নিকাণ্ডের ৫২.৭৫ শতাংশ।
তথ্যানুসারে, বিড়ি-সিগারেটের জ্বলন্ত টুকরা থেকে আগুন লেগেছে ১৪৯টি, চুলা (ইলেকট্রিক, গ্যাসের, মাটির ইত্যাদি) থেকে ৫৬টি, গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ বা গ্যাসের চুলা থেকে ৫১টি, ছোটদের আগুন নিয়ে খেলা থেকে পাঁচটি, কয়েল থেকে চারটি, খোলা বাতি ব্যবহারে তিনটি, উচ্ছৃঙ্খল জনতার অগ্নিসংযোগে পাঁচটি, যন্ত্রাংশের ঘর্ষণজনিত কারণে দুটি, রাসায়নিক বিক্রিয়ায় দুটি এবং আতশবাজি থেকে একটি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। এ ছাড়া কারণ উদঘাটন হয়নি এমন অগ্নিকাণ্ড আছে পাঁচটি।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের তথ্য মতে, চট্টগ্রাম মহানগরী ও জেলায় ফায়ার স্টেশন ৩৭টি। চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা শিল্প-কারখানা ও বাসাবাড়ির তুলনায় তা অপ্রতুল। সেই সঙ্গে আধুনিক যন্ত্রপাতির সমস্যাসহ জলাধার সংকট, ফায়ার হাইড্রেন্ট সুবিধা পর্যাপ্ত না থাকা, সড়কে যানজটসহ অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে আগুন লাগলেঘটনাস্থলে যেতে হিমশিম খেতে হয় ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের। বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) পরিচালক রাকিবুল আলম চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে যে বিপুলসংখ্যক মানুষের বসবাস ও কলকারখানা গড়ে উঠছে, সে তুলনায় ফায়ার সার্ভিস স্টেশন নেই। যেগুলো আছে সেগুলোয় পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি নেই। চট্টগ্রামে উন্নতমানের যন্ত্রপাতি দরকার। এখানে বড় বড় শিল্প-কারখানা আছে।’
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ রাশিদুল হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, সরু রাস্তায় ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছতে পারে না বা তার কাজ করার জন্য যতটুকু জায়গা প্রয়োজন তা থাকে না। ফলে ফায়ার সার্ভিসের যে সক্ষমতা আছে তা অনেক সময় কাজে লাগানো যায় না। মহানগরে পর্যাপ্ত পানির উৎস থাকার কথা ছিল, তা নেই, ফায়ার হাইড্রেন্টব্যবস্থা এখনো চালু করা যায়নি। এ ছাড়া নগরে প্রাকৃতিক জলাধার ছিল, সেগুলো ভরাট করে ফেলা হয়েছে।