23/10/2025
সুমন লিন্ডা। বাড়ি নাগরাকাটার খেরকাটা। পেশায় একজন আশাকর্মী। তা আমাদের রাজ্যে তো হাজার হাজার আশাকর্মী আছেন। তাহলে সুমনের নাম করছি কেন? তার কারণ, এই মহিলা যা করেছেন, আপনি যদি তা জানেন, চমকে উঠবেন। স্যালুট করবেন।
আসল কথায় আসা যাক। কী করেছেন সুমন। নতুন করে বলার কিছু নেই যে ৪ অক্টোবর রাতে এবং ৫ অক্টোবর সকালে ভয়াবহ বন্যায় তছনছ হয়ে হয়ে যায় নাগরাকাটা ব্লকের বিস্তীর্ণ এলাকা। বন্যায় সুমনের বাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিপর্যয়ের ঠিক পরের রাতের ঘটনা। রাত তখন দেড়টা। সুমনের মোবাইল বেজে ওঠে। ফোনে জানতে পারেন সুমন, খেরকাটার এক অন্তঃসত্ত্বা প্রসব যন্ত্রণায় ছটফট করছেন। তাঁকে এখনই হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।
বলে রাখা দরকার, সুমনের স্বামী ভিনরাজ্যে কাজে গিয়েছেন। ঘরে অসুস্থ বৃদ্ধ বাবা। কিন্তু ওই ফোন পেয়েই চঞ্চল হয়ে ওঠে সুমনের মন। তিনি জানেন, এইসময় বাইরে বেরোনো মানে প্রাণ হাতে করে বেরোনো। জঙ্গলে ঘেরা চারদিক। চিতাবাঘ, হাতির ভয়। তার উপর বন্যায় সব জায়গায় বিদ্যুৎ নেই তখন। কিন্তু কোনও বাধাকেই তোয়াক্কা না করে সুমন ওই রাতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন। কয়েক কিমি হেঁটে পৌঁছে যান ওই অন্তঃসত্ত্বার বাড়িতে। তারপর ফোনাফুনি করে অনেক কষ্টে একটা গাড়ি জোগাড় করেন। তাতে করে ওই অন্তঃসত্ত্বাকে নিয়ে আসেন টন্ডু গ্রামে। এরপর তো আর গাড়ি যাওয়ার উপায় নেই। কেন নেই, সেটা আপনারা এতদিনে জেনে গিয়েছেন। কারণ, ডায়না ও গাঠিয়া নদীর উপর টানাটানি সেতু বন্যায় ভেঙে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে ওই অন্তঃসত্ত্বাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হবে কীভাবে। নদীর ধারে এসে সুমন এন ডি আর এফ কর্মীদের দেখতে পান। সবটা জানান তাঁদের। শোনামাত্র তাঁরা ওই রাতে ঝুঁকি নিয়ে স্পিড বোটে নদী পার করে দেন সুমনদের। সুমনের ফোন পেয়ে ততক্ষণে নদীর এপাড়ে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে হাজির হয়েছেন নাগরাকাটার ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিক ইরফান মোল্লা। অতঃপর বোটে নদী পেরিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে করে ওই অন্তঃসত্ত্বাকে প্রথমে নিয়ে যাওয়া হয় সুলকাপাড়া গ্রামীণ হাসপাতালে। সেখান থেকে নিয়ে আসা হয় মাল সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে। ততক্ষণে ভোরের আলো ফুটেছে। গোটা রাস্তা ওই অন্তঃসত্ত্বার সঙ্গে ছিলেন সুমন। অবশেষে মাল সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে ওই অন্তঃসত্বা ফুটফুটে কন্যা সন্তান প্রসব করেন। সেই সন্তানের নাম রাখা হয় বন্যা। মায়ের হাসিমুখ দেখে হাসপাতাল ছাড়েন সুমন। বন্যায় বিপর্যস্ত দীর্ঘ পথ পেরিয়ে ফেরেন বাড়ি। তাঁর এই অসামান্য কৃতিত্বের জন্য রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে সুমনকে পুরস্কৃত করা হয়েছে। সুমন লিন্ডা আমাদের গর্ব। ওকে কুর্নিশ।