30/05/2026
মায়ের মৃত্যুর পর অনেকেই স্মৃতি ধরে রাখতে ছবি, চিঠি কিংবা পুরনো জিনিস আঁকড়ে থাকেন। অভিনেতা সায়াজী শিন্দে অন্য পথ বেছে নিয়েছিলেন। তিনি ঠিক করেছিলেন, মায়ের স্মৃতি এমন কিছুর মধ্যে বাঁচিয়ে রাখবেন যা মানুষের জীবনেও কাজে লাগে। সেই সিদ্ধান্ত থেকেই শুরু হয়েছিল গাছ লাগানোর এক দীর্ঘ যাত্রা, যা আজ মহারাষ্ট্র জুড়ে ছড়িয়ে পড়া বিশাল সবুজ আন্দোলনে পরিণত হয়েছে।🎋🎋
সাতারা জেলার কৃষক পরিবারে বড় হওয়া সায়াজি শিন্ডে ছোটবেলা থেকেই খরা, শুকিয়ে যাওয়া জমি আর গ্রামের কষ্ট খুব কাছ থেকে দেখেছেন। ১৯৭৮ সালে বাঁধ নির্মাণের জন্য তাঁদের পরিবারের জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। পরে বহু বছর অপেক্ষার পর বিকল্প জমি মিলেছিল। সেই অভিজ্ঞতা তাঁর মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। তিনি বুঝেছিলেন, জমি আর গাছ হারালে শুধু প্রকৃতি নয়, মানুষের জীবনও বদলে যায়।🎋
২০১৫ সালের দিকে মহারাষ্ট্র ভয়াবহ খরার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল। বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে তিনি দেখেছিলেন রোদে পুড়ে যাওয়া ফাঁকা জমি, যেখানে আশ্রয় দেওয়ার মতো একটি বড় গাছও নেই। সেই সময় তাঁর মা প্রায় ৯২ বছরের বৃদ্ধা। মাকে হারানোর চিন্তা তখন তাঁকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিচ্ছিল। তিনি পরে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, কাউকে চিরকাল বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব নয়, কিন্তু তার স্মৃতিকে মানুষের কাজে লাগানো যায়। সেই ভাবনা থেকেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন, মায়ের নামে হাজার হাজার বীজ ও চারা গাছ লাগাবেন।👥💚
শুরুর দিকে নিজের গ্রামেই প্রায় দুই হাজার গাছ লাগানো হয়েছিল। পরে হায়দরাবাদ থেকে দুটি ট্রাকে করে চারা আনা হয়। প্রতিটি ট্রাকের খরচ ছিল প্রায় এক লক্ষ টাকা। ধীরে ধীরে এই উদ্যোগের নাম হয় Sahyadri Devrai। ‘দেবরাই’ শব্দের অর্থ পবিত্র বনভূমি। মহারাষ্ট্রের বহু এলাকায় একসময় গ্রামের মানুষ এই ধরনের বনকে রক্ষা করতেন। সায়াজি শিন্ডে সেই পুরনো ধারণাকেই নতুনভাবে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন।💚
আজ এই উদ্যোগের মাধ্যমে মহারাষ্ট্রের ২৯টিরও বেশি এলাকায় ৬ লক্ষ ৫০ হাজারের বেশি দেশীয় গাছ লাগানো হয়েছে। কিছু প্রতিবেদনে সক্রিয় কাজের জায়গার সংখ্যা ৪৮ বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। শুধু গাছ লাগিয়েই কাজ শেষ হয়নি। প্রতিটি চারার যত্ন নেওয়া হয়েছে বছরের পর বছর। কারণ তাঁর মতে, ছবি তোলার জন্য গাছ লাগানো সহজ, কিন্তু তাকে বড় করে তোলা অনেক কঠিন।
এই প্রকল্পে বিদেশি বা সাজসজ্জার গাছের বদলে বেছে নেওয়া হয়েছে বট, অশ্বত্থ, তেঁতুলের মতো দেশীয় প্রজাতি। কারণ এই গাছগুলো শুধু ছায়া দেয় না, পাখি, প্রজাপতি, পোকামাকড় এবং ছোট প্রাণীদের জন্যও নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করে। একটি বড় বটগাছ একসঙ্গে বহু জীবের আশ্রয় হতে পারে। তেঁতুল গাছ ভবিষ্যতে গ্রামের মানুষের আয়ের উৎসও হতে পারে। সায়াজি শিন্ডে জানিয়েছিলেন, একটি গ্রামে যদি এক হাজার তেঁতুল গাছ বড় হয়ে ওঠে, তাহলে প্রায় পনেরো বছর পরে সেই গ্রাম বছরে প্রায় এক কোটি টাকার ফলন পেতে পারে।
গাছ কাটার বিরুদ্ধেও সরব হয়েছেন তিনি। উন্নয়ন প্রকল্পের নামে বহু পুরনো গাছ কেটে ফেলার বদলে তিনি গাছ স্থানান্তরের পক্ষে কথা বলেছেন। বিভিন্ন সময়ে নিজের অর্থে ২০০টিরও বেশি বটগাছ অন্য জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার কাজেও সাহায্য করেছেন। তাঁর দাবি ছিল, পরিকল্পনা ঠিক থাকলে উন্নয়ন আর পরিবেশকে একসঙ্গে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব।🎋🌳🌴🏡
সিনেমার জগতে ‘শূল’, ‘সরকার রাজ’, ‘সঞ্জু’র মতো ছবিতে অভিনয় করে জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন সায়াজি শিন্ডে। কিন্তু পরে তিনি বলেন, খ্যাতির বাইরে গিয়ে এমন কিছু করতে চেয়েছিলেন যা বহু বছর পরেও মানুষের কাজে লাগবে। সেই কারণেই তাঁর কাছে আজ সবচেয়ে বড় পরিচয় অভিনেতা নয়, গাছ লাগানো মানুষ হিসেবে পরিচিত হওয়া।
এই পুরো আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে এক মায়ের স্মৃতি। একজন ছেলে বুঝতে পেরেছিলেন, মৃত্যু থামানো যায় না। কিন্তু একটি গাছ বড় হলে তার ছায়ায় মানুষ দাঁড়ায়, পাখি বাসা বাঁধে, মাটি জল ধরে রাখে। সেই জীবনচক্রের মধ্যেই হয়তো তিনি মাকে বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন।💚👥🌳🎋🇮🇳🇮🇳