11/01/2026
ছোটবেলায় আমাদের বাড়িগুলোতে
একটা খুব ভারী কাঠের দরজা থাকত।
সেই দরজাটা যখন বন্ধ হতো,
তখন বাইরের পৃথিবী জানত না,
ভেতরে কী হচ্ছে। জানতই না।
সেই বন্ধ দরজার ওপাশে
একটা আলাদা জগৎ ছিল,
যার নাম, ‘সংসার’।
সেখানে মান ছিল,
অভিমান ছিল,
দরাজ গলার হাসি ছিল,
আবার বালিশে মুখ লুকানো
গোপন কান্নাও ছিল।
কিন্তু যা-ই ছিল,
সেটা ছিল একান্তই নিজেদের।
বাইরের কারোর,
এমনকি প্রতিবেশী কাকিমা-মাসিমার ও
সাধ্য ছিল না সেই পবিত্র গণ্ডিতে উঁকি মারার।
‘লজ্জা’ বা ‘আড়াল’ শব্দগুলো
তখনো আমাদের ভূষণ ছিল,
দুর্বলতা নয়।
কিন্তু জানেন কি?
খুব নিঃশব্দে,
আমাদের অজান্তেই
সেই কাঠের দরজাটা
উইপোকার মতো
কুরে কুরে খেয়ে ফেলেছে
এক নতুন নেশা।
এখন আর আমাদের
কোনো দেওয়াল নেই।
আমরা এখন স্বেচ্ছায়
এক কাচের ঘরে বাস করি,
যেখানে আমাদের ঘুম থেকে ওঠা,
আমাদের প্রেম, আমাদের কান্না,
সব কিছুই রাজপথের ধুলোয় গড়াগড়ি খায়।
চারপাশে একটু ভালো করে তাকিয়ে দেখুন।
একটা অদ্ভুত, সর্বগ্রাসী অসুখে
আচ্ছন্ন পুরো সমাজ।
সকালে ঘুম ভাঙার পর
চোখের পিচুটি পরিষ্কার করা
থেকে শুরু করে,
কার সাথে রিকশায় উঠছি,
কোথায় যাচ্ছি,
কী কিনছি,
জীবনের প্রতিটা
তুচ্ছ, নগণ্য মুহূর্ত
এখন ‘ব্রেকিং নিউজ’।
জীবনটা এখন আর
যাপনের বিষয় নয়,
এটা এখন একটা
২৪ ঘণ্টার ‘লাইভ পারফরম্যান্স’।
এখানে একটা খুব জরুরি বিষয়
পরিষ্কার করা দরকার।
অনেকেই বলেন, “এটাই তো ডেইলি ভ্লগিং!”
না বন্ধু, ভুল করছেন।
গুলিয়ে ফেলবেন না।
‘ভ্লগিং’
একটি শিল্প হতে পারত।
এবং অনেকেই সেটা খুব সুন্দরভাবে করেন।
ভ্লগ মানে হলো,
আপনার জীবনের মাধ্যমে
একটা গল্প বলা।
আপনি হয়তো খুব ভালো রাঁধতে জানেন,
হয়তো আপনি কোনো দুর্গম পাহাড়ে ঘুরতে গেছেন,
কিংবা আপনি এমন কোনো কাজ করেন যা দেখে
দশটা মানুষ নতুন কিছু শিখবে,
অনুপ্রাণিত হবে।
যেখানে আপনার
মেধা বা সৃজনশীলতা
প্রকাশ পায়, সেটাই আসল ভ্লগিং, নতুন ক্রিয়েশন।
কিন্তু যখন একজন মানুষের
সৃজনশীলতা ফুরিয়ে যায়,
যখন দেখানোর মতো
কোনো গুণ আর অবশিষ্ট থাকে না,
ঠিক তখনই শুরু হয়, ‘আত্ম-বিপণন’ বা নিজেকে বিক্রি করা।
তখন সে ভিউজের লোভে নিজের ‘প্রাইভেসি’
বা গোপনীয়তা নিলামে তুলতে শুরু করে।
আর ঠিক তখনই শিল্প এবং অশ্লীলতার সীমারেখাটা মুছে যায়।
এই অবক্ষয়টা যে, কতটা গভীরে শিকড় গেড়েছে,
তা বোঝা যায় যখন আমরা
হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়াই।
বুকের ভেতরটা
দুমড়ে-মুচড়ে যায়
দৃশ্যগুলো দেখলে।
এর চেয়ে মর্মান্তিক,
এর চেয়ে নিষ্ঠুর দৃশ্য
আর কী হতে পারে?
এই লেখার এর পরের অংশগুলি
কোন পার্টিকুলার ব্যক্তিকে আক্রমণ নয়,
আমাদের কাজও সেটি নয়।
বরং বর্তমান সমাজের সিংহভাগ অংশটিকে তুলে ধরা হয়েছে।
একবার দৃশ্যটা কল্পনা করুন,
পরিবারের কোনো বয়স্ক মানুষ,
হয়তো আপনার জন্মদাতা বাবা বা মা, বা কোন অভিভাবক।
যিনি আপনাকে তিল তিল করে বড় করেছেন,
তিনি আজ জীবন-মৃ*ত্যু*র সন্ধিক্ষণে।
হাসপাতালের বেডে
তিনি যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন,শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
চিকিৎসকরা ছুটোছুটি করছেন।
আর ঠিক সেই চরম সংকটের মুহূর্তে,
তাদেরই সন্তান
এক হাতে তাদের ধরে, অন্য হাতে
মোবাইল উঁচিয়ে সেই যন্ত্রণার দৃশ্য রেকর্ড করছে!
ক্যামেরার লেন্সে
তখন ফোকাস করা হচ্ছে
বাবার যন্ত্রণাকাতর মুখটা।
ভিডিওর ক্যাপশন হবে
“বাবা খুব অসুস্থ,
সবাই প্রে করুন,
আর ভিডিওটা
শেষ পর্যন্ত দেখুন।”
ছিঃ!
ধিক্কার জানাই
এই মানসিকতাকে!
ওই মুমূর্ষু মানুষটার যন্ত্রণার চেয়েও
কি আপনার কাছে ওই মুহূর্তের
‘রিচ’ আর ‘ভিউ’ বেশি দামী হয়ে গেল?
মৃ*ত্যুশয্যাতেও মানুষ একটু
নিভৃতে থাকার অধিকার পায় না?
একে আপনারা ভ্লগিং বলেন?
আমি একে বলি,
অনুভূতির মৃ*ত্যু।
লা*শের ওপর বসে ব্যবসা করার মতো জঘন্য কাজ এটা।
শুধু কি তাই?
বাঙালির কাছে ‘অন্ন’ বা খাবার ছিল দেবতার সমান।
দুপুরে বা রাতে যখন পরিবার
খেতে বসত, তখন ওটা শুধু
খাওয়া ছিল না,ওটা ছিল
একটা মিলনমেলা।
আর আজ?
সামনে গরম ভাত,
প্রিয় মানুষের রান্না।
কিন্তু না,
সেখানেও শান্তি নেই।
এক গ্রাস ভাত,
মুখে তোলার আগেও দশটা অ্যাঙ্গেল থেকে ভিডিও করতে হবে।
“গাইজ, আজ আমি কী দিয়ে খাচ্ছি দেখো...”
খাবারটা কি ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে না?
জিহ্বায় স্বাদ পাওয়ার
আগেই কি লেন্সের ফোকাস
ঠিক করতে হচ্ছে না?
যে সময়টা
পরিবারের সাথে
গল্প করে,
হাসাহাসি করে
কাটানোর কথা,
সেই সময়টা কাটে
ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে
কৃত্রিম হাসি হেসে।
আপনারা
খাচ্ছেন কম,
আর দেখাচ্ছেন বেশি।
আপনারা
‘স্বাদ’ নিচ্ছেন না,
আপনারা
‘শট’ নিচ্ছেন।
আর সবচেয়ে ভয়ংকর হলো
বর্তমানে চারদিকে ছড়িয়ে পড়া
হাজার হাজার স্বামী স্ত্রীর এরকম প্রদর্শনী।
শোবার ঘর আর সদর রাস্তার মধ্যে
যে একটা সূক্ষ্ম সুতোর ব্যবধান থাকে,
সেটা আপনারা ছিঁড়ে ফেলেছেন।
নিজেদের একান্ত মুহূর্ত,
ঝগড়া, মান-অভিমান,
সব কিছুই যখন স্ক্রিপ্ট মেনে
ক্যামেরার সামনে করা হয়,
তখন সেই সম্পর্কের গভীরতা বলে কি আর কিছু থাকে?
হাজার হাজার অচেনা মানুষ
আপনাদের বিছানার চাদরের রঙ চিনে ফেলছে,
আপনাদের দাম্পত্য কলহের সাক্ষী থাকছে।
এতে কি আপনাদের আত্মসম্মানে বাঁধে না?
আমার মাঝে মাঝে
খুব জানতে ইচ্ছে করে,
এই চব্বিশ ঘণ্টা
ক্যামেরা অন করে রাখা
মানুষগুলো
আসলে ‘বাঁচেন’
কখন?
ঘুম থেকে ওঠা,
প্রিয়জনের হাতে
হাত রাখা,
সন্তানের
গায়ের গন্ধ নেওয়া,
কিংবা নিছকই
চুপ করে বসে থাকা।
এগুলো তো
জীবনের অক্সিজেন।
এগুলোকে যখন
আপনারা বাজারে
পণ্য হিসেবে
সাজিয়ে দেন,
তখন আপনাদের
নিজেদের বলে
আর কী অবশিষ্ট থাকে?
টাকার বিনিময়ে
কি আমরা
আমাদের অস্তিত্বকেই
বিক্রি করে দিচ্ছি না?
দিনশেষে
আপনারা কি
মানুষ হিসেবে
বাড়ি ফেরেন,
নাকি একেকটা
‘বিক্রি হয়ে যাওয়া প্রোডাক্ট’
হয়ে বিছানায় যান?
আমি একটা কথায়
মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি
এবং আজ কোনো রাখঢাক না রেখেই বলছি,
ব্যক্তিগত জীবন কখনোই
‘পাবলিক প্রপার্টি’ হতে পারে না।
আপনার আনন্দ,
আপনার চোখের জল,
আপনার পরিবারের সুরক্ষা,
এগুলো অমূল্য রতন।
এগুলোকে
সস্তা লাইক আর কমেন্টের জন্য
নিলামে তুলবেন না।
কিছু কথা,
কিছু মুহূর্ত
শুধু নিজের
বুকের ভেতরে
আগলে রাখার
নামই জীবন।
সব কিছু
বিজ্ঞাপনে দিয়ে দেওয়ার
নাম জীবন নয়।
যারা
সত্যিকারের শিল্পী,
তারা কাজ দিয়ে
মানুষকে মুগ্ধ করেন,
নিজের হাঁড়ির খবর
বেচে নয়।
দোহাই আপনাদের,
জীবনটাকে ‘বিগ বস’-এর সেট বানাবেন না।
ক্যামেরাটা মাঝেমধ্যে বন্ধ রাখুন।
বিশ্বাস করুন,
আপনার জীবনের মুহূর্তগুলো আপনি শেয়ার করতে চাইছেন
তো শেয়ার অবশ্যই করা উচিত,
খুশি আনন্দ মানুষের মধ্যে ভাগ করতে চাইছেন,
তা অবশ্যই করা উচিত এতে আনন্দ বাড়ে এবং কষ্ট কমে।
কিন্তু আপনার ব্যক্তিগত জীবন অতিরিক্ত বেশি শেয়ার করা
আপনার জন্যই আসলে হানিকারক, ভয়ংকর ভাবে ক্ষতিকারক।
জীবনটা
অনেক বেশি সুন্দর,
অনেক বেশি পবিত্র।
টাকা হয়তো
অনেক আসবে, কিন্তু দিনশেষে
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে যেন নিজের চোখে
চোখ রেখে বলতে পারেন,
“আমি মানুষ ছিলাম, আমি পণ্য হইনি।” 🙏🏻