Chotanagpur Voice

Chotanagpur Voice It is a blog on contemporary issues of Chota Nagpur Region

আস্থা আবার কংগ্রেসেইপশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে আজ এক নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্ত...
03/06/2026

আস্থা আবার কংগ্রেসেই

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে আজ এক নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীকোন্দল, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ এবং সাংগঠনিক দুর্বলতা ক্রমশ প্রকাশ্যে চলে আসছে। যে দল একসময় বাংলার মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক ছিল, আজ সেই দলের ভিতরেই দেখা যাচ্ছে অনিশ্চয়তা ও বিভাজনের চিত্র।
রাজনীতির অলিন্দ থেকে গ্রামবাংলার চায়ের আড্ডা— সর্বত্র একটি কথাই শোনা যাচ্ছে, তৃণমূল কংগ্রেস আর আগের জায়গায় নেই। পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি, জেলা পরিষদ কিংবা পুরসভায় তৃণমূলের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা থাকলেও কর্মী-সমর্থকদের একাংশের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অনেকেই মনে করছেন, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে দল মানুষের থেকে দূরে সরে গেছে।
এই পরিস্থিতিতে বাংলার রাজনৈতিক পরিসরে আবারও ভরসার জায়গা হিসেবে উঠে আসছে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। যে কংগ্রেস একসময় বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল, সেই কংগ্রেস আজ নতুনভাবে নিজেকে পুনর্গঠিত করছে। শুধু বাংলায় নয়, সারা দেশেই কংগ্রেস আবার বিজেপির প্রধান বিকল্প শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
গত কয়েক বছরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কংগ্রেসের রাজনৈতিক উপস্থিতি বৃদ্ধি পেয়েছে। সংসদের ভিতরে ও বাইরে সাধারণ মানুষের সমস্যা, গণতান্ত্রিক অধিকার, বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি এবং সামাজিক সম্প্রীতির প্রশ্নে কংগ্রেস ধারাবাহিকভাবে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে। ফলে জাতীয় রাজনীতিতে কংগ্রেসকে ঘিরে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে।
এই পরিবর্তনের অন্যতম মুখ হয়ে উঠেছেন । একসময় যাঁকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা হালকাভাবে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল, আজ তিনি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিরোধী নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, সাধারণ মানুষের সমস্যাকে সামনে নিয়ে আসা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান তাঁর জনপ্রিয়তাকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।
বাংলার মানুষ সবসময়ই জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়েছে। তাই যখন সারা দেশে কংগ্রেস নতুন উদ্যমে এগিয়ে চলেছে, তখন বাংলার মানুষও সেই পরিবর্তনের দিকে নজর রাখছে। তৃণমূলের প্রতি হতাশ একাংশের কাছে কংগ্রেস আজ শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক দল নয়, বরং একটি বিকল্প রাজনৈতিক দর্শন ও স্থিতিশীলতার প্রতীক হয়ে উঠছে।
গ্রামে-গঞ্জে, মাঠে-ঘাটে, বাজারে-মোড়ে আজ অনেক পুরনো কংগ্রেস কর্মী আবার সক্রিয় হওয়ার কথা ভাবছেন। যাঁরা একসময় কংগ্রেস ছেড়ে অন্য দলে গিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যেও পুরনো রাজনৈতিক শিকড়ে ফিরে যাওয়ার মানসিকতা তৈরি হচ্ছে। কারণ তাঁরা বিশ্বাস করেন, সর্বভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গি, গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য এবং বহুত্ববাদী চেতনার ধারক হিসেবে কংগ্রেসের এখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
বাংলার রাজনীতি আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। মানুষ উন্নয়ন চায়, স্বচ্ছতা চায়, গণতান্ত্রিক পরিবেশ চায় এবং রাজনৈতিক সৌজন্য চায়। সেই প্রত্যাশার কেন্দ্রে ধীরে ধীরে আবার জায়গা করে নিচ্ছে কংগ্রেস।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলায়, দল বদলায়, নেতৃত্ব বদলায়। কিন্তু মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারে কেবল সেই শক্তিই, যে মানুষের পাশে দাঁড়ায়। বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলার বহু মানুষের কাছে সেই ভরসার নাম আবার— কংগ্রেস।

দুর্ঘটনার কবলে ট্রাক্টর, মৃত ১পুরুলিয়া জেলার বোরো থানার জাওড়া ও পিটিদিরির মাঝামাঝি এলাকায় এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ট্রাক্...
06/05/2026

দুর্ঘটনার কবলে ট্রাক্টর, মৃত ১

পুরুলিয়া জেলার বোরো থানার জাওড়া ও পিটিদিরির মাঝামাঝি এলাকায় এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ট্রাক্টর উল্টে পুকুরে পড়ে যায়। জানা গেছে, ইঁট নামিয়ে বাড়ি ফেরার পথে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ট্রাক্টরটি রাস্তার পাশের পুকুরে পড়ে যায়।

দুর্ঘটনার সময় ট্রাক্টরে থাকা মহিলা শ্রমিকরা চাপা পড়ে যান। স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত উদ্ধারকাজে নেমে আহতদের বের করে আনেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজে সহায়তা করে।

গুরুতর আহত ট্রাক্টর চালক মধু শবরকে বারী ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। ঘটনার পর এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

বিভ্রান্তিতে কুড়মি সমাজ, সিআরআই জাস্টিফিকেশন নিয়ে নীরবতা :-জঙ্গলমহল জুড়ে কুড়মি সমাজকে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক তৎপরতা লক্ষ...
17/04/2026

বিভ্রান্তিতে কুড়মি সমাজ, সিআরআই জাস্টিফিকেশন নিয়ে নীরবতা :-
জঙ্গলমহল জুড়ে কুড়মি সমাজকে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে Amit Shah-এর বিভিন্ন জনসভায় কুড়মালি ভাষাকে অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্তির প্রতিশ্রুতি এবং Bharatiya Janata Party-র নির্বাচনী ইস্তাহারে সেই প্রতিশ্রুতির পুনরুল্লেখ কুড়মিদের মধ্যে এক ধরনের আশার সঞ্চার করেছে। তবে সেই আশার মধ্যেই তৈরি হয়েছে এক গভীর বিভ্রান্তি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অষ্টম তফসিলে কোনো ভাষাকে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে ন্যস্ত। রাজ্য সরকারের এ বিষয়ে কোনো সাংবিধানিক ক্ষমতা নেই। ফলে বিধানসভা নির্বাচনে এই দাবিকে সামনে রেখে ভোট চাওয়ার বিষয়টি অনেকের কাছেই প্রশ্নের মুখে পড়েছে। বিরোধী মহল একে “গোপাল ভাঁড়ের গল্প তাল গাছে হাঁড়ি টাঙ্গার মতো অবাস্তব প্রতিশ্রুতি” বলেও কটাক্ষ করছে।
অন্যদিকে, কুড়মি সমাজের দীর্ঘদিনের দাবি—সিআরআই (Cultural Research Institute) রিপোর্টে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও তার যথাযথ জাস্টিফিকেশন কেন্দ্রের কাছে পাঠানো—এই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে রাজনৈতিক নেতৃত্বের নীরবতা আরও জটিলতা তৈরি করেছে। এই প্রক্রিয়াটি মূলত রাজ্য সরকারের অধীন হলেও, বিষয়টি নিয়ে Amit Shah থেকে শুরু করে Suvendu Adhikari কিংবা অন্যান্য কোনো বিজেপি নেতার মুখে স্পষ্ট বক্তব্য শোনা যায়নি। বিজেপির কোন নেতা বলছে না যে,- ক্ষমতায় এলে সিআরআই রিপোর্ট সংশোধন করে পাঠানো হবে। এমনকি দলীয় প্রার্থী বা স্থানীয় নেতাদের কাছ থেকেও এ বিষয়ে নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি মেলেনি।
রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠছে—সাঁওতাল ও অন্যান্য তালিকাভুক্ত আদিবাসী সম্প্রদায়ের ভোটব্যাঙ্ক অটুট রাখতে গিয়ে কি কুড়মি সমাজকে কেবল প্রতিশ্রুতির আশ্বাসে আটকে রাখা হচ্ছে?
এছাড়াও, একসময় যারা বিজেপির বিরুদ্ধে সরব ছিলেন,জংগলমহলের বিজেপি নেতাদের দিল্লীর চঁগা বলতেন। তারাই আজ দিল্লির চঁগায় পরিনত হয়েছে। সেই অজিত মাহাত ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের অবস্থান পরিবর্তন নিয়েও সমালোচনা শুরু হয়েছে। তাঁদের মুখেও সিআরআই রিপোর্টের সংশোধন বা জাস্টিফিকেশন প্রসঙ্গে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য নেই বলে অভিযোগ উঠছে।
সমগ্র পরিস্থিতিতে কুড়মি সমাজের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। তাঁদের দাবি, ভাষা স্বীকৃতি হোক বা আদিবাসী মর্যাদা—দুই ক্ষেত্রেই প্রয়োজন পরিষ্কার রূপরেখা ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ, শুধুমাত্র নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়।
মূলদাবী থেকে সরে আসায় আন্দোলনকারীদের মধ্যে বিভ্রান্ত তৈরি হচ্ছে। রাজেস মাহাত,বিশ্বজিৎ মাহাত,বিধান মাহাতোর মতো যারা আন্দোলন থেকে উঠে এসে বিধান সভায় ভোট প্রত্যাশী হয়েছেন তাদের মুখোও সিআরআই রিপোর্ট জাস্টিফিকেশানের কোন কথা নাই। স্বভাবতই, বিভ্রান্তিতে কুড়মি সমাজ।

টাকার বান্ডেল ঘিরে প্রশ্নচিহ্নে “মূল মানতা”: সরগরম ভোট রাজনীতিকুড়মি সমাজে “মূলখুঁটি” বা “মূল মানতা” হিসেবে পরিচিত অজিত প...
14/04/2026

টাকার বান্ডেল ঘিরে প্রশ্নচিহ্নে “মূল মানতা”: সরগরম ভোট রাজনীতি

কুড়মি সমাজে “মূলখুঁটি” বা “মূল মানতা” হিসেবে পরিচিত অজিত প্রসাদ মাহাতকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক দানা বেঁধেছে। সম্প্রতি একটি ভিডিওতে তাঁর সঙ্গে টাকার লেনদেনের দৃশ্য সামনে আসায় নির্বাচনী আবহে তীব্র চর্চা শুরু হয়েছে। কারণ, চলতি বিধানসভা নির্বাচনে তাঁর পুত্র বিশ্বজিৎ মাহাত বিজেপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
ভিডিওটির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই অজিত প্রসাদ মাহাত তা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেননি। তাঁর বক্তব্য, এটি হয়তো কোনো আন্দোলনের খরচ সংক্রান্ত সময়ের ভিডিও। তবে এই ব্যাখ্যাতেই ধোঁয়াশা কাটেনি। সমাজের একাংশের প্রশ্ন—একসঙ্গে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ আন্দোলনের নামে জমা হওয়ার যুক্তি কতটা গ্রহণযোগ্য?
এদিকে, অতীতেও তাঁর আর্থিক ব্যয়ের বিষয় নিয়ে আলোচনা ছিল। বিশেষ করে আগের লোকসভা নির্বাচনে বিপুল খরচের উৎস নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে জনমনে। সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর ঘনিষ্ঠ কয়েকজন সহযোদ্ধার সঙ্গত্যাগের ঘটনাও আলোচনায় এসেছে, যেখানে অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘অবৈধ আর্থিক লেনদেন’-এর অভিযোগের ইঙ্গিত মিলছে বলে দাবি করছেন স্থানীয়রা।
এছাড়া, অতীতে বিভিন্ন অডিও-ভিডিও রেকর্ড, ঘাটশিলাতে গোপন চুক্তি—এইসব নিয়ে আগে কানাঘুষো থাকলেও, এবার সরাসরি ভিডিও প্রকাশ্যে আসায় শিক্ষিত মহলে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। অনেকেই জানতে চাইছেন—যিনি সমাজের পথপ্রদর্শক হিসেবে পরিচিত, তাঁর ভূমিকা ও স্বচ্ছতা নিয়ে এই প্রশ্ন উঠলে সমাজ কোন পথে এগোবে?

নির্বাচনের মুখে এই বিতর্ক যে রাজনৈতিক সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে, তা সময় বলবে । তবে, বিভিন্ন প্রশ্নচিহ্নে মূল মানতার শিকড় আলগা হতে শুরু করেছে এটা বলাই বাহুল্য।

12/04/2026
একটা আদর্শের (আইডিওলজি) অপঘাতে মৃত্যু__________________________________________অজিত প্রসাদ মাহাত—পুরুলিয়া জেলার এক প্রতি...
24/03/2026

একটা আদর্শের (আইডিওলজি) অপঘাতে মৃত্যু
__________________________________________
অজিত প্রসাদ মাহাত—পুরুলিয়া জেলার এক প্রতিবাদী সত্তা, এক সংগ্রামী চেতনার নাম। তিনি শুধু একজন ব্যক্তি নন, বরং শোষিত-বঞ্চিত মানুষের কণ্ঠস্বর, যিনি দীর্ঘদিন ধরে মানুষের অধিকার ও সম্মানের জন্য লড়াই করে এসেছেন। ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার রাজনীতি থেকে শুরু করে সমাজ আন্দোলনের ময়দান—সব জায়গাতেই তাঁর উপস্থিতি ছিল স্পষ্ট, সক্রিয় এবং প্রভাবশালী। মানুষের দুঃসময়ে তিনি ছিলেন প্রথম সারির সহযোদ্ধা, এক অর্থে ‘মুক্তিদূতের কান্ডারী’।
একসময় তাঁর নেতৃত্ব ও প্রভাবে ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা প্রায় ১১৬টি পঞ্চায়েত দখল করেছিল—যা তাঁর সংগঠনিক ক্ষমতা ও জনভিত্তির স্পষ্ট প্রমাণ। কিন্তু রাজনৈতিক সমীকরণ বদলেছে, ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে, এবং সেই সঙ্গে আন্দোলনের পথও কিছুটা পরিবর্তিত হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর যখন পুরোনো শক্তিগুলির জনপ্রিয়তা কমতে শুরু করে, তখন অজিত প্রসাদ মাহাত আবার সমাজ আন্দোলনের দিকে ঝুঁকেন। এবং এখানেই তিনি হয়ে ওঠেন এক অনন্য জনপ্রিয় মুখ—একজন সামাজিক নেতা, যিনি আদর্শের কথা বলেন, সংগ্রামের কথা বলেন।
তিনি বারবার একটি কথাই উচ্চারণ করেছেন—“লড়াই হয় একটি আইডিওলজির উপর দাঁড়িয়ে।”
কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই আইডিওলজি কী?
এই আইডিওলজি কোনো আমদানিকৃত মতবাদ নয়। এটি ছোটনাগপুর মালভূমির ভূমিপুত্রদের নিজস্ব জীবনদর্শন—যেখানে ভাষা, সংস্কৃতি, প্রকৃতি, সমাজ ও ন্যায়ের এক স্বতন্ত্র মেলবন্ধন রয়েছে। কুড়মি, ভূমিজ, মাহালি, শবরসহ বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিজস্ব বিচারব্যবস্থা, সামাজিক নীতিনির্ধারণ এবং সহাবস্থানের যে ধারা—তা কেবল একটি সংস্কৃতি নয়, বরং এক প্রাচীন ও স্বনির্ভর আইডিওলজি। এই আদর্শ প্রকৃতি-নির্ভর, মানবিক এবং সামষ্টিক জীবনের ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে।
অজিত প্রসাদ মাহাত আজীবন এই আদর্শকে রক্ষা ও প্রতিষ্ঠা করার জন্য লড়াই করেছেন। তাঁর বক্তব্যে, তাঁর আন্দোলনে, তাঁর সংগ্রামে এই আদর্শের ছাপ স্পষ্ট ছিল। কিন্তু জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে সেই আদর্শের পথ থেকে তাঁর সরে যাওয়াটা এক গভীর প্রশ্নের জন্ম দেয়।
যখন তিনি বিজেপির মতো কট্টর হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক ধারার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেন, তখন সেই প্রাচীন আদিবাসী আইডিওলজির সঙ্গে এক স্পষ্ট দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। কারণ হিন্দুত্ববাদ একটি কেন্দ্রীভূত, একমাত্রিক সাংস্কৃতিক ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যেখানে বহুস্তরীয় আদিবাসী সংস্কৃতি ও বিচারধারার জন্য আলাদা জায়গা কমে আসে।
এর পেছনে বৃহত্তর একটি বাস্তবতাও রয়েছে—ভারতের বিভিন্ন আদিবাসী অঞ্চলে প্রায় ১৫০-১৬০টি সামাজিক সংগঠন কাজ করছে, যাদের একটি বড় অংশ আদিবাসী সমাজের নিজস্ব চিন্তাধারা ও সংস্কৃতিকে ধীরে ধীরে প্রভাবিত করছে। কখনও উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি, কখনও সামান্য আর্থিক প্রলোভন—এই সবকিছুর মধ্য দিয়ে এক ধরনের সাংস্কৃতিক রূপান্তর ঘটানো হচ্ছে। এর ফলে আদিবাসী সমাজের নিজস্ব আইডিওলজি ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে অজিত প্রসাদ মাহাতের অবস্থান পরিবর্তন কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়—এটি একটি বৃহত্তর আদর্শিক সংকটের প্রতিফলন। যিনি একসময় সারনা ধর্মের সংগ্রামী হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তিনিই যখন হিন্দুত্ববাদের পথে হাঁটেন, তখন প্রশ্ন ওঠে—এটা কি কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তন, নাকি একটি আদর্শের অপঘাতে মৃত্যু?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আবেগ বা ব্যক্তিগত আনুগত্যের ঊর্ধ্বে উঠে, সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বিষয়টিকে বিচার করতে হবে। কারণ এখানে কোনো ব্যক্তি নয়, বরং একটি আদর্শ, একটি সংস্কৃতি, একটি অস্তিত্বের ভবিষ্যৎ জড়িয়ে আছে।
শেষ পর্যন্ত, এই ঘটনাকে যদি আমরা নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করি, তাহলে দেখতে পাব—এটি শুধু একজন নেতার পথ পরিবর্তন নয়, বরং একটি প্রাচীন আদর্শের টালমাটাল অবস্থা, যা আমাদের সবাইকে ভাবতে বাধ্য করে—আমরা কোন পথে এগোচ্ছি?

জঙ্গলমহলের মাটিতে ইতিহাস কখনো সরল রেখায় এগোয় না- এখানে প্রতিটি পরিবর্তন এসেছে ধীরে, মানুষের নীরব সহিষ্ণুতা আর হঠাৎ বিস...
21/03/2026

জঙ্গলমহলের মাটিতে ইতিহাস কখনো সরল রেখায় এগোয় না- এখানে প্রতিটি পরিবর্তন এসেছে ধীরে, মানুষের নীরব সহিষ্ণুতা আর হঠাৎ বিস্ফোরিত প্রতিবাদের মিলিত স্রোতে। পশ্চিম মেদিনীপুর, পুরুলিয়া, বাঁকুড়ার এই বিস্তীর্ণ অরণ্যবেষ্টিত অঞ্চল বহু দশক ধরে উন্নয়নের বঞ্চনা, নিরাপত্তাহীনতা এবং রাজনৈতিক উপেক্ষার সাক্ষী। অথচ একই সঙ্গে এই অঞ্চলই দেখিয়েছে মানুষের অদম্য বেঁচে থাকার ইচ্ছা, নিজেদের অধিকারের জন্য দাঁড়ানোর সাহস। এই প্রেক্ষাপটে একটি ভুল ধারণা বহুদিন ধরে প্রচলি : যে কেউ যদি বড় রাজনৈতিক দলের প্রার্থী না হন, যদি তাঁর দলের সরকার গঠনের সম্ভাবনা না থাকে, তবে তিনি মানুষের সেবা করতে পারবেন না। বাস্তবতা কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন।

ভারতের সংবিধান যে গণতন্ত্রের কাঠামো নির্মাণ করেছে, সেখানে একজন বিধায়কের কাজ কেবল সরকার গঠন করা নয়; তাঁর প্রধান দায়িত্ব তাঁর এলাকার মানুষের প্রতিনিধিত্ব করা, তাঁদের সমস্যা বিধানসভায় তুলে ধরা এবং প্রশাসনিক স্তরে সমাধানের পথ তৈরি করা। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৬৪ বা ১৭০ সরকার গঠনের রূপরেখা দেয়, কিন্তু একজন নির্বাচিত প্রতিনিধির নৈতিক দায়িত্বকে সীমাবদ্ধ করে না। একজন স্বতন্ত্র বা ছোট দলের বিধায়কও প্রশ্ন তুলতে পারেন, মনোযোগ আকর্ষণ প্রস্তাব আনতে পারেন, কমিটির মাধ্যমে নীতি প্রভাবিত করতে পারেন। বাস্তবে দেখা গেছে, ভারতের বহু রাজ্যে স্বতন্ত্র বিধায়কেরা প্রায়শই ক্ষমতাসীনদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে স্থানীয় উন্নয়নের কাজ এগিয়ে নিয়েছেন।

জঙ্গলমহলের ইতিহাসে ফিরে তাকালে এই সত্য আরও স্পষ্ট হয়। ২০০৮ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে এই অঞ্চলে যে অস্থিরতা দেখা গিয়েছিল, তার মূল কারণ ছিল দীর্ঘদিনের অবহেলা: রাস্তা নেই, স্বাস্থ্যব্যবস্থা নেই, শিক্ষার সুযোগ সীমিত। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালের আগে এই অঞ্চলের বহু গ্রামে পাকা রাস্তার সংযোগ ছিল না, বিদ্যুতায়নের হারও ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে কম। নীতি আয়োগের বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচকে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ দরিদ্রতার যে চিত্র উঠে এসেছে, সেখানে জঙ্গলমহলের জেলাগুলি দীর্ঘদিন পিছিয়ে ছিল। এই পরিস্থিতিতে বড় দলগুলির প্রতিশ্রুতি বারবার এলেও বাস্তব পরিবর্তন এসেছে ধীরে, কখনো আন্দোলনের চাপ, কখনো স্থানীয় নেতৃত্বের দৃঢ় অবস্থানের ফলে।

এখানেই স্বতন্ত্র বা ছোট দলের প্রতিনিধিদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তারা প্রায়শই দলীয় হাইকম্যান্ডের নির্দেশে আবদ্ধ থাকে না, বরং সরাসরি মানুষের সমস্যার সঙ্গে যুক্ত থাকে। একজন স্বতন্ত্র বিধায়ক যদি সত্যিকারের জননেতা হন, তবে তাঁর কাছে প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি পানীয় জলের সমস্যা, প্রতিটি স্কুলের অভাব ব্যক্তিগত দায়িত্বের মতো হয়ে ওঠে। বড় দলের বিধায়ক অনেক সময় দলীয় রাজনীতির জটিলতায় আটকে যান, কিন্তু স্বতন্ত্র প্রতিনিধি স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করে দ্রুত সিদ্ধান্ত আনতে পারেন।

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে এর উদাহরণ রয়েছে। কেরালা, তামিলনাড়ু বা মহারাষ্ট্রে স্বতন্ত্র বিধায়কেরা প্রায়শই তাদের এলাকায় উন্নয়নের নির্দিষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়নে মুখ্য ভূমিকা নিয়েছেন। সংসদীয় গবেষণা সংস্থা পিআরএস লেজিসলেটিভ রিসার্চের তথ্য বলছে, বিধানসভায় প্রশ্ন তোলা এবং কমিটির কাজের মাধ্যমে বিরোধী বা স্বতন্ত্র সদস্যরাও নীতিনির্ধারণে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারেন। অর্থাৎ ক্ষমতায় থাকা একমাত্র পথ নয়; কার্যকর প্রতিনিধিত্বই আসল শক্তি।

জঙ্গলমহলের মানুষ বহুবার দেখেছেন, বড় বড় প্রতিশ্রুতির পরেও বাস্তব পরিবর্তন আসতে সময় লাগে। অথচ যখন কোনো স্থানীয় নেতা নির্দলীয়ভাবে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তখন ছোট ছোট পরিবর্তন দ্রুত ঘটেছে -গ্রামে পানীয় জলের টিউবওয়েল বসেছে, স্কুলে শিক্ষক নিয়োগ হয়েছে, স্বাস্থ্য শিবিরের আয়োজন হয়েছে। এই পরিবর্তনগুলো হয়তো বড় শিরোনামে আসে না, কিন্তু মানুষের দৈনন্দিন জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে।

রাজনীতি যদি কেবল ক্ষমতার অঙ্কে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি ক্ষীণ হয়ে যায়। জঙ্গলমহলের মতো অঞ্চলে রাজনীতির আসল অর্থ হলো মানুষের পাশে দাঁড়ানো, তাঁদের কণ্ঠস্বর হওয়া। একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী সেই কণ্ঠস্বরকে আরও সরাসরি এবং স্পষ্ট করে তুলতে পারেন। তিনি কোনো দলীয় স্বার্থে নয়, মানুষের স্বার্থে কথা বলেন। তাঁর কাছে প্রতিটি ভোট কেবল সংখ্যা নয়, বিশ্বাসের প্রতীক।

আজ যখন উন্নয়নের কথা বলা হয়, তখন পরিসংখ্যানের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের অভিজ্ঞতাকেও গুরুত্ব দিতে হয়। রাস্তা, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্যকেন্দ্র-এসবের পাশাপাশি দরকার মানুষের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনা। সেই আত্মবিশ্বাস জন্মায় তখনই, যখন মানুষ দেখে তাদের প্রতিনিধি সত্যিই তাদের কথা শুনছেন, তাদের সমস্যাকে নিজের সমস্যা মনে করছেন। বড় দলের টিকিট নয়, এই মানবিক সংযোগই একজন নেতার প্রকৃত শক্তি।

অতএব, এই ধারণা যে কেবল বড় দলের প্রার্থীই মানুষের সেবা করতে পারেন, তা শুধু ভুল নয়, বিপজ্জনকও। এটি গণতন্ত্রের বহুমাত্রিকতাকে অস্বীকার করে, মানুষের বিকল্প বেছে নেওয়ার অধিকারকে খাটো করে। জঙ্গলমহলের মাটিতে, যেখানে প্রতিটি পরিবর্তনের পেছনে মানুষের সংগ্রামের ইতিহাস জড়িয়ে আছে, সেখানে এই সত্য আরও প্রাসঙ্গিক - সত্যিকারের নেতা সেই, যিনি ক্ষমতার নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ান।

ভোটের আগে জল্পনার কেন্দ্রে কুড়মালি ভাষা - এই শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদটি প্রথম দেখলে মনে হতে পারে যেন একটি ভাষার দীর্ঘদিন...
11/03/2026

ভোটের আগে জল্পনার কেন্দ্রে কুড়মালি ভাষা - এই শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদটি প্রথম দেখলে মনে হতে পারে যেন একটি ভাষার দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক দাবিকে হঠাৎ করেই রাজনৈতিক সন্দেহের রঙে রাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের প্রশ্ন যেখানে মানুষের আত্মমর্যাদার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত, সেখানে সংবাদ পরিবেশনের ভাষা যদি সন্দেহ, কৌতুক বা রাজনৈতিক কৌশলের আভাস বহন করে, তবে তা কেবল একটি সংবাদ নয়, বরং একটি সমাজের অনুভূতিকে আঘাত করার সামিল হয়ে দাঁড়ায়।

পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়খণ্ডের পূর্ব সিংভূম, সারাইকেলা খারসাওয়ান এবং ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ অঞ্চলে প্রায় এক কোটিরও বেশি মানুষ কুড়মালি ভাষায় কথা বলেন বলে বিভিন্ন ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণায় উল্লেখ আছে। ভারতের জনগণনা ২০১১ সালের তথ্য অনুযায়ী কুড়মালি ভাষাভাষীর সংখ্যা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ লক্ষের কাছাকাছি বলে ধরা হয়, যদিও গবেষকরা মনে করেন বাস্তবে এই সংখ্যা এক কোটিরও বেশি। ভাষাটি মূলত কুড়মি মহাতো সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

কুড়মালি ভাষার ইতিহাস নতুন নয়। উনবিংশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ নৃতত্ত্ববিদ ই. টি. ডাল্টন এবং জর্জ গ্রিয়ারসনের ভাষা সমীক্ষায় এই ভাষার উল্লেখ পাওয়া যায়। গ্রিয়ারসনের বিখ্যাত Linguistic Survey of India গ্রন্থে কুড়মালি ভাষাকে একটি স্বতন্ত্র আঞ্চলিক ভাষা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ঝাড়খণ্ড ও জঙ্গলমহল অঞ্চলে কুড়মালি ভাষায় লোকসাহিত্য, লোকগান এবং নাটকের চর্চা আরও বিস্তৃত হয়। বহু গবেষক যেমন ড. রামদয়াল মুণ্ডা ও ড. বীরেন্দ্রনাথ মহতো কুড়মালি ভাষার সাহিত্যিক ও সামাজিক গুরুত্ব নিয়ে গবেষণা করেছেন।

এই দীর্ঘ ইতিহাসের প্রেক্ষিতে সংবাদ প্রতিবেদনে যখন লেখা হয় যে ভোটের আগে হঠাৎ করে কুড়মালি ভাষা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে এবং প্রশ্ন তোলা হয় এর পিছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, তখন সেই ভাষার সাংস্কৃতিক দাবিকে অযথা সন্দেহের আয়নায় দেখানো হয়। সংবাদপত্রের কাজ তথ্য তুলে ধরা, কিন্তু সেই তথ্যের ভাষা যদি এমনভাবে সাজানো হয় যাতে একটি সম্প্রদায়ের দাবি রাজনৈতিক চাল হিসেবে প্রতীয়মান হয়, তাহলে তা সাংবাদিকতার নিরপেক্ষতার প্রশ্ন তোলে।

ভারতের সংবিধানের অষ্টম তফসিলে বর্তমানে ২২টি ভাষা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই তালিকায় অন্তর্ভুক্তির দাবিতে বহু ভাষা আন্দোলন দীর্ঘদিন ধরে চলছে। বোড়ো ভাষা ২০০৩ সালে, সাঁওতালি ভাষা ২০০৪ সালে এবং মৈথিলী ভাষা একই সময়ে এই তফসিলে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে দীর্ঘ আন্দোলনের পর। সাঁওতালি ভাষা অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আগে কয়েক দশক ধরে সাংস্কৃতিক আন্দোলন চলেছিল। তখনও বহু সংবাদমাধ্যম একইভাবে সন্দেহ প্রকাশ করেছিল যে ভাষা আন্দোলনের পিছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। ইতিহাস দেখিয়েছে যে সেই সন্দেহ অমূলক ছিল এবং ভাষার দাবিটি ছিল সাংস্কৃতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম।

কুড়মালি ভাষার ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা দেখা যায়। ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ ও ওড়িশা মিলিয়ে কুড়মালি ভাষাভাষী মানুষের সংখ্যা কয়েক মিলিয়নের বেশি। এই ভাষায় লোকগান, পালা, জাত্রা, কৃষি সম্পর্কিত শব্দভাণ্ডার এবং মৌখিক সাহিত্য শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে আছে। পুরুলিয়া জেলার গ্রামীণ সমাজে কৃষি, উৎসব ও সামাজিক আচার অনুষ্ঠানে কুড়মালি ভাষা এখনও জীবন্ত। অনেক গ্রামে এখনও শিশুদের প্রথম ভাষা কুড়মালি। এই বাস্তবতাকে যদি সংবাদ প্রতিবেদনে শুধুমাত্র ভোটের রাজনীতির আলোয় দেখা হয়, তাহলে তা একটি ভাষার সাংস্কৃতিক অস্তিত্বকে খাটো করে দেখার শামিল।

সংবাদ প্রতিবেদনের ভাষা লক্ষ্য করলে আরও একটি বিষয় চোখে পড়ে। সেখানে প্রশ্ন তোলা হয়েছে ভোটের আগে এই সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু একই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে বহু কলেজে কুড়মালি ভাষায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর স্তরে পাঠক্রম চালুর দাবি দীর্ঘদিন ধরেই উঠছে। যদি দাবি দীর্ঘদিনের হয়, তবে তা নিয়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যে কোনো সময়েই সম্ভব। সেই সিদ্ধান্তকে কেবল নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত করে দেখানো সংবাদ পরিবেশনের ভাষাগত পক্ষপাতের ইঙ্গিত দেয়।

সাংবাদিকতার নীতি অনুসারে একটি বিষয়ের পটভূমি, ইতিহাস ও তথ্য তুলে ধরা জরুরি। কুড়মালি ভাষা আন্দোলনের ক্ষেত্রে অন্তত পাঁচ দশকের ইতিহাস রয়েছে। ১৯৭০ এর দশক থেকে ঝাড়খণ্ড অঞ্চলে কুড়মালি সাহিত্য সম্মেলন, ভাষা দিবস উদযাপন এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন এই ভাষার স্বীকৃতির দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে আসছে। পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গলমহল অঞ্চলেও কুড়মালি ভাষার সাংস্কৃতিক মঞ্চ ও সাহিত্য সভা নিয়মিত আয়োজন করা হয়। এসব তথ্য সংবাদ প্রতিবেদনে অনুপস্থিত।

ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি একটি সমাজের স্মৃতি, সংস্কৃতি এবং আত্মপরিচয়ের বাহক। যখন একটি ভাষার স্বীকৃতি নিয়ে আলোচনা হয়, তখন তা একটি সম্প্রদায়ের মর্যাদা ও ইতিহাসের প্রশ্নে পরিণত হয়। সংবাদপত্র যদি সেই আলোচনাকে সন্দেহের ভাষায় উপস্থাপন করে, তবে তা কেবল একটি ভাষা নয়, একটি অঞ্চলের মানুষের আত্মপরিচয়কেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।

ভারতের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৯ ও ৩০ সংখ্যালঘু ভাষা ও সংস্কৃতির সুরক্ষার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে। একই সঙ্গে ইউনেস্কোর ভাষা সংরক্ষণ সংক্রান্ত প্রতিবেদন বলছে যে পৃথিবীতে প্রতি দুই সপ্তাহে একটি ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে আঞ্চলিক ভাষার সংরক্ষণ ও শিক্ষাব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুড়মালি ভাষাকে উচ্চশিক্ষার পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার আলোচনা সেই বৃহত্তর ভাষা সংরক্ষণ প্রক্রিয়ারই একটি অংশ।

সাংবাদিকতার ভাষা যদি একটু সংবেদনশীল হতো, তবে হয়তো শিরোনামটি ভিন্ন হতে পারত। সেখানে বলা যেত দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক দাবির প্রেক্ষিতে কুড়মালি ভাষা নিয়ে নতুন উদ্যোগ। কিন্তু তার বদলে ভোটের আগে জল্পনার কেন্দ্রে এই ভাষা কথাটি ব্যবহার করে সংবাদটি এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে পাঠকের মনে প্রথমেই সন্দেহ তৈরি হয়।

একটি ভাষা কোনো নির্বাচনের চেয়ে অনেক বড় বিষয়। নির্বাচন আসে যায়, সরকার বদলায়, কিন্তু ভাষা মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বেঁচে থাকে। কুড়মালি ভাষাও তেমনই একটি জীবন্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। সংবাদপত্রের উচিত ছিল সেই ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান দেখিয়ে তথ্যসমৃদ্ধ ও সংবেদনশীল প্রতিবেদন করা।

আজ যখন জঙ্গলমহল অঞ্চলের যুবসমাজ কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রশ্নে নতুন পথ খুঁজছে, তখন তাদের মাতৃভাষার স্বীকৃতি নিয়ে আলোচনা কোনো রাজনৈতিক জল্পনা নয়। এটি একটি ঐতিহাসিক দাবি, একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন এবং একটি সমাজের আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন।

যে সংবাদটি এই আলোচনাকে সন্দেহের ভাষায় উপস্থাপন করেছে, তার ভাষা ও উপস্থাপনা পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। কারণ সংবাদ কেবল তথ্য দেয় না, সমাজের চিন্তাভাবনাকেও প্রভাবিত করে। ভাষা নিয়ে সংবাদ লেখার সময় সেই দায়িত্ব আরও বড় হয়ে ওঠে।

Address

Purulia

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Chotanagpur Voice posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Business

Send a message to Chotanagpur Voice:

Share