10/08/2026
১৯২২ সালের ২৬ নভেম্বর।
মিশরের রাজাদের উপত্যকা।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা খনন করার পর একটা বন্ধ দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন হাওয়ার্ড কার্টার।
দরজায় ছোট্ট একটা ছিদ্র করা হলো।
তিনি একটা মোমবাতি ভেতরে ধরলেন।
..কয়েক সেকেন্ড তিনি কিছুই বললেন না।
পেছন থেকে লর্ড কার্নারভন জিজ্ঞেস করলেন,
"কিছু দেখতে পাচ্ছেন?"
কার্টারের উত্তরটা আজ ইতিহাসের অংশ।
"Yes... wonderful things."
কিন্তু জানেন, আমার কাছে আরও অদ্ভুত লাগে অন্য একটা বিষয়।
ওই মুহূর্তে কার্টার বুঝতেই পারেননি, তিনি একটা সমাধি খুঁজে পাননি।
তিনি এমন একজন মানুষের নাম ফিরিয়ে আনছিলেন, যাকে পৃথিবী প্রায় ভুলেই গিয়েছিল।
সেই নাম...
তুতানখামেন।
আজ পৃথিবীর সবচেয়ে পরিচিত ফারাওদের একজন।
অথচ তাঁর জীবনের গল্পটা অবাক করার মতো ছোট।
তিনি ছিলেন না মিশরের সবচেয়ে শক্তিশালী শাসক।
না সবচেয়ে বড় সামরিক বিজেতা।
না তাঁর নামে তৈরি হয়েছিল বিশাল কোনো পিরামিড।
তবু হাজার হাজার বছর পরে আজও তাঁর নামই সবার আগে উচ্চারণ করা হয়।
কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে তিন হাজার তিনশো বছরেরও বেশি পেছনে।
সেই সময় মিশর শুধু একটা সাম্রাজ্য ছিল না।
এটা ছিল বিশ্বাস, ক্ষমতা আর রাজনীতির এক অদ্ভুত মিশ্রণ।
আর ঠিক তখনই সবকিছু বদলে দিতে শুরু করেছিলেন একজন মানুষ।
ফারাও আখেনাতেন।
তিনি বহু দেবতার পরিবর্তে সূর্যদেব আতেনকে কেন্দ্র করে নতুন ধর্মীয় ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করেন।
রাজধানী পর্যন্ত নতুন জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হয়।
কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর সেই পরিবর্তন খুব বেশি দিন টেকেনি।
পুরোনো পুরোহিতরা আবার প্রভাব ফিরে পান।
আমুন দেবতার উপাসনা আবার শুরু হয়।
এই অস্থির সময়েই সিংহাসনে বসেন এক শিশু।
প্রথমে তাঁর নাম ছিল তুতানখাতেন।
কিছুদিনের মধ্যেই সেই নাম বদলে রাখা হয় তুতানখামেন।
নামের এই পরিবর্তনটা ছোট মনে হতে পারে।
কিন্তু এর মধ্যেই লুকিয়ে ছিল একটা বড় ঘোষণা।
মিশর আবার পুরোনো বিশ্বাসে ফিরে যাচ্ছে।
একটা বিষয় এখানে খেয়াল করার মতো।
তখন তাঁর বয়স মাত্র আট বা নয় বছর।
এত বড় সিদ্ধান্ত কি সত্যিই একজন শিশুর পক্ষে নেওয়া সম্ভব?
বেশিরভাগ ইতিহাসবিদের মতে, সম্ভবত না।
রাজদরবারের প্রভাবশালী উপদেষ্টা আর পুরোহিতরাই তখন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতেন।
তুতানখামেন ছিলেন ফারাও।
কিন্তু সব ক্ষমতা তাঁর হাতে ছিল না।
আর এখানেই তাঁর গল্পটা একটু অন্য রকম হয়ে যায়।
বহু বছর ধরে ইতিহাসবিদরা জানতেনই না, তুতানখামেন আসলে কার ছেলে।
এই প্রশ্নের উত্তর আসে অনেক পরে।
২০১০ সালে প্রকাশিত ডিএনএ গবেষণার পর বেশিরভাগ গবেষকের ধারণা আরও শক্ত হয় যে, তিনি সম্ভবত আখেনাতেনেরই ছেলে।
একই গবেষণা আরেকটা বিষয়ও সামনে আনে।
রাজপরিবারে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের মধ্যে বিয়ে তখন অস্বাভাবিক ছিল না।
আধুনিক গবেষকদের মতে, এর প্রভাব তাঁর শরীরের ওপর পড়ে থাকতে পারে।
কিন্তু শুধু গবেষণার রিপোর্ট পড়ে এই বিষয়টা বোঝা যায় না।
প্রমাণটা যেন অপেক্ষা করছিল তাঁর নিজের সমাধির ভেতরেই।
হাওয়ার্ড কার্টারের দল সেখানে একশোরও বেশি লাঠি খুঁজে পায়।
প্রথমে সবাই ভেবেছিল, এগুলো হয়তো শুধু রাজকীয় প্রতীক।
কিন্তু পরে যখন একটার পর একটা লাঠি পরীক্ষা করা হয়, তখন দেখা যায় অনেকগুলোর হাতল আর নিচের অংশে নিয়মিত ব্যবহারের চিহ্ন রয়েছে।
এরপর ২০০৫ সালে তুতানখামেনের মমির সিটি স্ক্যান করা হয়।
সেখানে দেখা যায়, তাঁর বাঁ পায়ে গুরুতর শারীরিক সমস্যা ছিল।
এই দুই তথ্য একসঙ্গে রেখে আজ অনেক গবেষক মনে করেন, তিনি হয়তো সত্যিই লাঠির সাহায্যে হাঁটতেন।
একজন ফারাওকে আমরা সাধারণত যুদ্ধের রথে দাঁড়িয়ে কল্পনা করি।
বাস্তবের মানুষটা হয়তো অনেকটাই আলাদা ছিলেন।
হাঁটতেই তাঁর কষ্ট হতো।
ইতিহাস অনেক সময় রাজাদের ক্ষমতার গল্প মনে রাখে।
কিন্তু মানুষটার গল্প হারিয়ে যায়।
তুতানখামেনের ক্ষেত্রেও হয়তো সেটাই হয়েছিল।
তাঁর জীবন খুব বেশি দীর্ঘ ছিল না।
প্রায় উনিশ বছর বয়সেই তাঁর মৃত্যু হয়।
কিন্তু কীভাবে?
এই প্রশ্নটা একশো বছরেরও বেশি সময় ধরে গবেষকদের ভাবিয়ে আসছে।
একসময় অনেকেই বিশ্বাস করতেন, তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল।
কারণ তাঁর মাথার খুলিতে একটা ক্ষতির চিহ্ন দেখা গিয়েছিল।
বছরের পর বছর সেই ছবিটাই বই আর ডকুমেন্টারিতে ঘুরে ফিরে এসেছে।
কিন্তু পরে আধুনিক সিটি স্ক্যান দেখায়, সেই ক্ষতি সম্ভবত মমি তৈরির সময় অথবা তারও পরে হয়েছে।
তাই এটাকে হত্যার নিশ্চিত প্রমাণ বলা যায় না।
অন্যদিকে ডিএনএ পরীক্ষায় তাঁর শরীরে ম্যালেরিয়ার জীবাণুর চিহ্নও পাওয়া যায়।
এ ছাড়া তাঁর পায়ে গুরুতর আঘাতেরও প্রমাণ মিলেছে।
বেশ কয়েকজন গবেষকের মতে, এই দুইয়ের মিলিত প্রভাবেই তাঁর মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে।
তবে এটাও নিশ্চিত নয়।
বর্তমান গবেষণা আমাদের সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দেয়।
চূড়ান্ত উত্তর নয়।
আর হয়তো এই কারণেই তুতানখামেনের গল্প আজও মানুষকে টানে।
কারণ তাঁর জীবনের রহস্য শেষ হওয়ার আগেই শুরু হয়ে যায় আরেকটা রহস্য।
সেটা তাঁর মৃত্যু নয়।
সেটা ছিল তাঁর সমাধি।
আর সেই সমাধির দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলেন হাওয়ার্ড কার্টার।
দরজাটা খুলতেই সামনে দেখা গেল আরেকটা পথ।
তারপর আরও একটা সিল করা প্রবেশপথ।
এবার আর কোনো তাড়াহুড়ো করেননি তিনি।
বহু বছর ধরে যে মুহূর্তটার জন্য অপেক্ষা করেছিলেন, সেটার সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ সাধারণত তাড়াহুড়ো করে না।
অবশেষে যখন ভেতরে ঢুকলেন, তাঁর সামনে যেন ধীরে ধীরে খুলে গেল তিন হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো এক পৃথিবী।
প্রথমে চোখে পড়ল এলোমেলোভাবে সাজানো অসংখ্য জিনিস।
সোনার সিংহাসন।
রথ।
অলংকার।
অস্ত্র।
খাট।
কাঠের বাক্স।
ছোট ছোট মূর্তি।
মনে হচ্ছিল, যেন কেউ সবকিছু গুছিয়ে রেখে অল্প সময়ের জন্য কোথাও গেছে।
একটা বাক্স খুললে অলংকার।
আরেকটায় অস্ত্র।
কোথাও সুন্দরভাবে ভাঁজ করে রাখা পোশাক।
কোথাও রাজকীয় আসবাব।
শেষ পর্যন্ত সমাধি থেকে পাঁচ হাজারেরও বেশি বস্তু উদ্ধার করা হয়।
প্রতিটি জিনিসের অবস্থান নথিভুক্ত করা হয়।
ছবি তোলা হয়।
তারপর ধীরে ধীরে সেগুলো সরানো হয়।
শুধু এই কাজ শেষ করতেই লেগেছিল প্রায় দশ বছর।
কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকেই যায়।
এত মূল্যবান একটা সমাধি প্রায় অক্ষত অবস্থায় টিকে রইল কীভাবে?
বর্তমান গবেষণা বলছে, তুতানখামেনকে দাফনের কিছুদিন পর সম্ভবত এক বা দুবার সমাধিচোর ভেতরে ঢুকেছিল।
তারা কিছু ছোটখাটো মূল্যবান জিনিস নেওয়ার চেষ্টা করেছিল বলেই ধারণা করা হয়।
কিন্তু খুব বেশিদূর এগোতে পারেনি।
রাজকীয় কর্মকর্তারা বিষয়টা টের পান।
এরপর সমাধির প্রবেশপথ আবার সিল করে দেওয়া হয়।
কয়েক দশক পরে কাছাকাছি আরেকটি রাজকীয় সমাধি নির্মাণের সময় শ্রমিকদের ফেলে রাখা মাটি, পাথর আর ধ্বংসাবশেষ ধীরে ধীরে পুরো প্রবেশপথ ঢেকে দেয়।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ প্রায় ভুলেই যায়, ওই পাহাড়ের নিচে আরেকজন ফারাও শুয়ে আছেন।
হয়তো এটাই ছিল তুতানখামেনের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য।
কারণ মিশরের অসংখ্য সমাধি লুট হয়ে গেলেও তাঁর সমাধির বড় অংশ টিকে যায়।
আর সেই কারণেই আজ আমরা প্রাচীন মিশরের রাজকীয় জীবনকে এত কাছ থেকে দেখতে পারি।
তবে সমাধির সবচেয়ে বিখ্যাত বস্তু ছিল একটাই।
তুতানখামেনের সোনার মুখোশ।
প্রায় এগারো কিলোগ্রাম ওজনের এই মুখোশ শুধু সোনার জন্য বিখ্যাত নয়।
এর সূক্ষ্ম কারুকাজ, নীল ল্যাপিস লাজুলি, কোয়ার্টজ, অবসিডিয়ান আর অন্যান্য মূল্যবান উপাদানের ব্যবহার আজও গবেষকদের মুগ্ধ করে।
প্রাচীন মিশরীয়দের বিশ্বাস ছিল, মৃত্যুর পরও ফারাওয়ের পরিচয় অক্ষুণ্ণ থাকা দরকার।
এই মুখোশ সেই বিশ্বাসেরই প্রতীক।
মনে হতে পারে, এত বড় আবিষ্কারের পর পৃথিবী শুধু এই সমাধি নিয়েই কথা বলবে।
কিন্তু সমাধি আবিষ্কারের কয়েক মাস পর এমন একটা ঘটনা ঘটল, যেটা পুরো পৃথিবীর নজর ঘুরিয়ে দিল অন্য এক রহস্যের দিকে।
লর্ড কার্নারভন তখনও মিশরেই ছিলেন। একদিন খুব সাধারণ একটা ঘটনা ঘটে। একটা মশা তাঁকে কামড়ায়। পরে শেভ করার সময় ঠিক সেই জায়গাটাই কেটে যায়। প্রথমে কেউ বিষয়টাকে তেমন গুরুত্ব দেয়নি। একটা ছোট্ট ক্ষত... এর বেশি কিছু নয়।
কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই ক্ষতটা সংক্রমিত হতে শুরু করে। জ্বর বাড়তে থাকে। অবস্থাও দ্রুত খারাপ হতে থাকে।
অবশেষে ১৯২৩ সালের ৫ এপ্রিল, কায়রোতেই তাঁর মৃত্যু হয়। চিকিৎসকদের মতে, সংক্রমণ থেকেই রক্তদূষণ হয়েছিল, পরে নিউমোনিয়াও দেখা দেয়।
এখান পর্যন্ত সবকিছুরই চিকিৎসাবিজ্ঞানের ব্যাখ্যা ছিল।
কিন্তু বাইরে তখন আরেকটা গল্প জন্ম নিচ্ছে।
মানুষ বলতে শুরু করল, যে সমাধির দরজা তিন হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ ছিল, সেটা খোলার পরই নাকি শুরু হয়েছে অদ্ভুত সব ঘটনা।
সেখান থেকেই ছড়িয়ে পড়ে সেই বিখ্যাত নাম—
ফারাওয়ের অভিশাপ।
কেউ বললেন, এটা নাকি তুতানখামেনের প্রতিশোধ।
কেউ দাবি করলেন, কার্নারভনের মৃত্যুর সময় কায়রোর আলো নিভে গিয়েছিল।
আবার কারও মতে, একই সময়ে ইংল্যান্ডে তাঁর পোষা কুকুরও মারা যায়।
শুনতে রহস্যময় লাগে।
কিন্তু ইতিহাস একটু ধীরে কথা বলে।
এই দাবিগুলোর পক্ষে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায় না।
বরং একটা তথ্য প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়।
হাওয়ার্ড কার্টার সমাধি আবিষ্কারের পর আরও প্রায় সতেরো বছর বেঁচে ছিলেন।
অভিযানের আরও অনেক সদস্যও দীর্ঘ ও স্বাভাবিক জীবন কাটিয়েছেন।
তাই আজ বেশিরভাগ ইতিহাসবিদ মনে করেন, "ফারাওয়ের অভিশাপ" মূলত সংবাদমাধ্যমের তৈরি একটি জনপ্রিয় কিংবদন্তি।
তবে কিংবদন্তি আর ইতিহাস—দুটো সব সময় এক জিনিস নয়।
আজও তুতানখামেনকে নিয়ে গবেষণা চলছে।
নতুন প্রযুক্তি তাঁর মমি, সমাধি আর সেখানে পাওয়া বস্তুগুলোকে নতুনভাবে বুঝতে সাহায্য করছে।
কখনও একটা প্রশ্নের উত্তর মিলছে।
আবার সেই উত্তর থেকেই জন্ম নিচ্ছে নতুন প্রশ্ন।
হয়তো এটাই তুতানখামেনের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার।
তিনি জীবিত অবস্থায় পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত ফারাও ছিলেন না।
কিন্তু মৃত্যুর তিন হাজার বছর পরে তিনি হয়ে উঠেছেন প্রাচীন মিশরের সবচেয়ে পরিচিত মুখ।
আর হয়তো ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিস্ময়ও এখানেই।
মানুষটা নয়...
তাঁকে ঘিরে বেঁচে থাকা গল্পটাই হয়ে উঠেছে অমর।
হয়তো সেদিন হাওয়ার্ড কার্টার সত্যিই শুধু "wonderful things" দেখেছিলেন।
কিন্তু একশো বছরেরও বেশি সময় পরে দাঁড়িয়ে আমরা জানি—
সেই দরজার ওপাশে শুধু সোনা ছিল না।
ছিল এমন একজন মানুষের গল্প...
যাকে ইতিহাস একবার হারিয়েছিল।
তারপর আবার খুঁজে পেয়েছিল।