04/07/2026
দল বড় হয় ত্যাগী কর্মীদের সম্মানে, সুযোগসন্ধানীদের ভিড়ে নয়।
আজ অত্যন্ত কষ্টের সঙ্গে একটি বাস্তবতা তুলে ধরতে চাই।
বর্তমানে দেখছি, তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতাচ্যূত হওয়ার পর থেকে সেই দলের বহু সুবিধাভোগী নেতা-নেত্রী জাতীয় কংগ্রেসে যোগদানের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন। রাজনীতিতে আদর্শের পরিবর্তন হতে পারে, মতাদর্শের ভিত্তিতে কেউ দল পরিবর্তন করতেই পারেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—
তাদের স্বাগত জানাতে গিয়ে যদি দুর্দিনের কংগ্রেস কর্মীদের অপমান করা হয়, তাহলে সেই রাজনীতি কতটা আদর্শের রাজনীতি?
যারা বছরের পর বছর কংগ্রেসের পতাকা হাতে রাস্তায় থেকেছেন, মার খেয়েছেন, মিথ্যা মামলার শিকার হয়েছেন, পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলা ও ভয়ভীতি সহ্য করেছেন, রাজনৈতিকভাবে নিপীড়নের শিকার হয়েছেন—আজ তারাই অনেক ক্ষেত্রে উপেক্ষিত। অথচ যাদের নেতৃত্বে একসময় কংগ্রেস কর্মীদের ওপর অত্যাচার হয়েছে, আজ তাদেরই বড় বড় সভা করে, মালা পরিয়ে, সম্মান দিয়ে দলে নেওয়া হচ্ছে।
এতে দুর্দিনের সৈনিকদের মনোবল ভেঙে পড়া স্বাভাবিক।
আরও আশ্চর্যের বিষয়, কংগ্রেসের মধ্যেই এমন কিছু নেতা আছেন, যারা একসময় নিজের স্বার্থে দল ছেড়ে অন্য দলে গিয়েছিলেন। সেখানে সুবিধা ভোগ করে, রাজনৈতিক হিসাব বদলাতেই আবার কংগ্রেসে ফিরে এসেছেন। আজ তারাই দুর্দিনের কর্মীদের মূল্য না দিয়ে, অন্য দল থেকে আসা নেতাদের নিয়েই বেশি ব্যস্ত।
তাহলে কি ত্যাগের মূল্য সত্যিই আছে, নাকি শুধু ক্ষমতার কাছাকাছি থাকলেই সম্মান মেলে?
এই প্রসঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের ইতিহাস থেকেই আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত।
একটা সময় ছিল, যখন তৃণমূল কংগ্রেসের পতাকা ধরার মানুষও খুব কম ছিল। সেই কঠিন সময়ে অসংখ্য সাধারণ নেতা-কর্মী অপমান, লাঠি, জুতো, হামলা, মামলা—সবকিছু সহ্য করে দলকে শক্তিশালী করেছিলেন। তাঁদের ত্যাগ ও পরিশ্রমের ওপর দাঁড়িয়েই তৃণমূল একদিন পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় আসে।
কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর কী হলো?
দুর্দিনের সেই ত্যাগী কর্মীদের অনেককেই ধীরে ধীরে গুরুত্বহীন করে দেওয়া হলো।
তাদের জায়গায় অন্য দল থেকে আসা নেতা, ক্ষমতার লোভে যোগ দেওয়া সুবিধাভোগী মানুষ, এমনকি চলচ্চিত্র জগতের অভিনেতা-অভিনেত্রী ও বিভিন্ন প্রভাবশালী মুখদের সামনে আনা হলো। দলে ভিড় বাড়ল, কিন্তু সংগঠনের ভিত দুর্বল হতে শুরু করল। কারণ যে ভিত্তির ওপর অট্টালিকা তৈরি হয়েছিল, সেই ভিত্তিকেই অবহেলা করা হয়েছিল।
ফলাফল আজ পশ্চিমবঙ্গের মানুষ নিজের চোখেই দেখছেন।
ক্ষমতার ভিত্তি দুর্বল হয়ে গেলে শুধু বড় বড় মুখ দিয়ে দলকে টিকিয়ে রাখা যায় না।
অট্টালিকা যতই সুন্দর হোক, যদি তার ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়, তাহলে একদিন না একদিন সেই অট্টালিকা ভেঙে পড়বেই।
জাতীয় কংগ্রেস যেন সেই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি না করে।
কংগ্রেসকে শক্তিশালী করতে হলে অন্য দলের নেতা এনে মঞ্চ ভরানো নয়, বরং নিজের দলের ত্যাগী কর্মীদের সম্মান ফিরিয়ে দিতে হবে। যারা দুর্দিনে দলের পতাকা ছাড়েনি, তাদের মর্যাদা দিতে হবে। বর্তমান পদাধিকারী, যুব কংগ্রেস, ছাত্র কংগ্রেস, মহিলা কংগ্রেস, সেবাদল ও ব্লক-জেলা স্তরের কর্মীদের সংগঠনের মূল শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
রাহুল গান্ধী বারবার আদর্শ, ত্যাগ, কর্মীভিত্তিক সংগঠন ও সাধারণ মানুষের রাজনীতির কথা বলেন। তাই তাঁর আদর্শ বাস্তবায়ন করতে হলে সুযোগসন্ধানীদের নয়, দুর্দিনের সৈনিকদের মর্যাদা দিতে হবে।
মনে রাখবেন, অন্য দল থেকে আসা নেতা হয়তো সাময়িকভাবে ভিড় বাড়াতে পারেন, কিন্তু ইতিহাস সৃষ্টি করে ত্যাগী কর্মীরা। আর যে দল নিজের ত্যাগী কর্মীদের সম্মান দিতে পারে না, সেই দলের ভবিষ্যৎ কখনোই শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না।
✍️কলমে: মহঃ ইব্রাহিম