24/02/2026
আজকে আপনাদের সাথে আমার ইউরোপে পড়তে আসার পিছনের জার্নিটা শেয়ার করবো। আশা করি আপনারা অনেক কিছু উপলব্ধি করতে ও শিখতে পারবেন।
আমি তখন ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র। আমার বন্ধুদের সবার লক্ষ্য একটাই, কলেজ শেষে দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে চান্স পাওয়া। আমারো তাই। ছাত্র হিসেবে আমি খারাপ ছিলাম না, স্বপ্ন দেখতেই পারি। কিন্তু এক করোনা মহামারী সবকিছু চেঞ্জ করে দিলো। কলেজ বন্ধ হবার পর সবার মতো আমিও অনলাইনে খুব বেশি এক্টিভ হয়ে যাই (এডিক্টেডও বলতে পারেন)। তখন বন্ধুদের সাথে প্রচুর কথা হতো। দিনরাত আড্ডা দিতাম। ঠিক তখনি আমার এক ফ্রেন্ড রাফি দেশের বাইরে পড়াশোনা নিয়ে বেশ ঘাটাঘাটি করছিলো। দেশের বাইরে পড়াশোনার সুযোগ সুবিধা, অল্প টাকায় মানসম্মত শিক্ষা, স্কলারশিপ এইসব বিষয়ে কথা হতো আমাদের। প্রথমে বিষয়গুলো অবাস্তব মনে হতো। ভাবতাম একটা শিক্ষার্থী লেখাপড়া করবে, তাকে এতো সুযোগ-সুবিধা দেয়ার কি আছে। তারপর আমিও একটু ঘাটাঘাটি শুরু করি। বিভিন্ন দেশের সুযোগ সুবিধা নিয়ে কথা হতো আমাদের। সাথে আরো ২জন বন্ধু যোগ দেয়, ইসতিয়াক আর ফাহাদ। আমরা একই ক্লাসে পড়ি। ৪জন প্রতিরাতে গ্রুপ কলে থাকতাম ঘন্টার পর ঘন্টা। সবাই প্রচুর রিসার্চ করি কোন দেশ আমাদের জন্য ভালো হবে।
রাফির পছন্দ ছিলো ফিনল্যান্ড🇫🇮, আমার ইতালি🇮🇹 , ফাহাদের জাপান🇯🇵 আর ইশতিয়াকের আমেরিকা🇺🇸 । তখন থেকে আমরা প্রতিরাতে ইংরেজি চর্চা করতাম। ঘন্টার পর ঘন্টা এভাবেই চলতো। কিন্তু তখনো আমি অফিসিয়ালি IELTS এর প্রিপারেশন শুরু করিনি। তখন আরো কিছু বন্ধুদের বিদেশে পড়াশোনার ব্যাপারে বলি। কেউ বলে এইসব ভুয়া, কেউ বলে দেশের বাইরে যাবে না, কেউ আবার মক করে। আমাদের গ্রুপ ৪জনেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। আরেকটা কথা, আমি যে লকডাউনে শুধু প্রোডাক্টিভ কাজ করেছি বিষয়টি একদমই এমন নয়। অনলাইন গেইমে আমার প্রচুর আসক্তি ছিলো। ফ্রি ফায়ারের প্রো ছিলাম তখন, এলাকার প্রথম ফ্রি ফায়ার গেমারও আমি😁।
যাই হোক- এভাবে লকডাউন শেষ হয়, ক্যাম্পাসে ফিরি। তখন আবারো সেই একাডেমিক লেখাপড়া শুরু হয়। এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেলাম। বাসায় তখন আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানাই। কিন্তু বাসা থেকে কেউ সহস পাচ্ছিলো না। আমাদের গ্রাম থেকে কেউ দেশের বাইরে পড়তে যায়নি। তাছাড়া আমি ভালো ছাত্র, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাবো, সেখানেই পড়বো এমনটাই চেয়েছিলো আব্বু-আম্মু। তাও আমি প্রতিনিয়ত বুঝাতে থাকি সুযোগ সুবিধার ব্যাপারে। তারা বুঝে, কিন্তু সাহসটা পায় না। আব্বু আমার স্কুল এবং কলেজের অনেক শিক্ষকদের সাথে পরামর্শ করে। সবাই একটা উপদেশই দেয়- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। IELTS যেকোনো সময় দেয়া যাবে কিন্তু ভর্তি পরীক্ষা মিস করলে ভবিষ্যত অন্ধকার। বাসা থেকে রিস্ক নিতে চায়নি। ভর্তি হলাম উদ্ভাসে কিন্তু কোনোভাবেই মন বসাতে পারিনি।
এরপর একদিন বাসায় না বলেই নরসিংদী থেকে IELTS এর বই কিনি ইশতিয়াককে সাথে নিয়ে। সেদিন রাতেই ছবি তুলে নিচের স্টোরিটা দেই। আসলেই নিজের স্বপ্নের বিরুদ্ধে চলা খুব কঠিন। বাসায় কিছু ইউটিউব ভিডিও দেখে শুরু করি প্র্যাক্টিস করা। ইংরেজি ভাষার উপর আমার যথেষ্ট কমান্ড ছিলো। স্কুল থেকে কলেজ, কেউ ইংরেজিতে আমার থেকে বেশি নম্বর পায়নি। এইসবের মাঝেও আমি বাসায় দেখানোর জন্য নামমাত্র উদ্ভাসের কোচিং করতে থাকি, সপ্তাহে ১-২ দিন যেতাম। আব্বু বলতো ভর্তি পরীক্ষা আর IELTS ২টা একসাথে চেষ্টা করতে। আমিও চেষ্টা করেছি কিছুদিন। কিন্তু কোনোভাবেই একসাথে ২টা সম্ভব হচ্ছিলো না। বাসায় অনেক বুঝিয়ে রাজি করালাম শুধুমাত্র IELTS এ ফোকাস করতে। বাসা থেকে যথেষ্ট সাপোর্ট পেয়েছি। আমার উপর বিশ্বাস ছিলো তাদের। তবে মনে মনে যে একটা ভয় কাজ করতো সেটা আমি বুঝতাম। আত্মীয় স্বজনদের মাঝে কেউ ইউরোপে পড়তে যায়নি, যদি ভিসা না হয়, এইসব সামাজিক ভয় কাজ করতো। অনেকে তো অনেক কথা বলেছে আমার এই জার্নিতে। খুব কাছের আত্মীয়দের থেকেও নিচু মানসিকতার পরিচয় পেয়েছি।
যাই হোক, বাসায় প্রিপারেশন নিয়ে ২মাস পর পরীক্ষা দেই। আলহামদুলিল্লাহ স্কোর আসে ৬। আমি সন্তুষ্ট ছিলাম না, কিন্তু আব্বু আম্মু খুশি ছিলো যে এই স্কোর দিয়ে মোটামুটি সব দেশেই চান্স হবে। ইতালির জন্য দরকার ছিলো ৫.৫। এরই মধ্যে আমি পছন্দের সাবজেক্ট এবং ইউনিভার্সিটি পছন্দ করে ফেলি। প্রভিশনাল সার্টিফিকেট আর IELTS দিয়ে আবেদন করি। আলহামদুলিল্লাহ ২দিনের ভিতর অফার লেটার পাই। তারপর আর অন্য কোথাও আবেদন করিনি। ধাপে ধাপে সব ডকুমেন্টস যোগাড় করে ভিসা আবেদন করি। আবেদনের মাসখানেক পর ইন্টারভিউ কল আসে এম্বাসি থেকে। ভিসা ইন্টারভিউয়ের দিনই আমার ভিসা ইস্যু হয়, আর তারপর টিকেট কেটে সোজা ইতালি।
আমার এই জার্নিতে অনেক আত্মীয় ফিনানশিয়ালি হেল্প করেছে, মেন্টাল সাপোর্ট দিয়েছে। তবে তাচ্ছিল্য করা আত্মীয়দের সংখ্যাও কম না। ভিসা পাওয়ার পর তাদের রূপ পাল্টে গেছে। এখন আমি তাদের চোখে আইডল, তাদের ছেলে-মেয়েকে বিদেশে পড়াতে আমার সাহায্য চায়, হাহাহা। আমি আগের সবকিছুর জন্য সবাইকে মাফ করে দিয়েছি, তবে তাদের ব্যবহার ভুলে যাইনি। যাই হোক, আল্লাহ সবার মনের ইচ্ছা পূরণ করুক (আমিন)।
আর হ্যাঁ, ভালো কথা- আমার বন্ধুরা সবাই এখন দেশের বাইরে লেখাপড়া করছে। রাফি ফিনল্যান্ডে, আমি ইতালিতে, ফাহাদ জাপানে আর ইশতিয়াকের আমেরিকা থেকে রিজেকশন আসলেও সে এখন দক্ষিন কোরিয়াতে ভালো আছে আলহামদুলিল্লাহ। আমাদের পরে আরো কিছু বন্ধু-বান্ধব উচ্চশিক্ষায় বিদেশে এখন। আমরা গ্রুপ খুলে পরবর্তী শিক্ষার্থীদের তথ্য দিয়ে সাহায্য করছি, ভালো লাগে বিষয়গুলো। আমি সবার প্রতি কৃতজ্ঞ, স্পেশালি রাফি, ফাহাদ, ইশতিয়াকের প্রতি কারন শুরুটাই সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ। আমার জার্নির শুরুতে তারা ছিলো। আমার পরিবার সবসময় আমার উপর বিশ্বাস রেখেছে, মেন্টাল সাপোর্ট দিয়েছে তারা ধন্যবাদেরও উর্ধ্বে। আমার বাকিটা জীবন দিয়ে চেষ্টা করে যাবো তাদের সন্তুষ্টি অর্জন করতে ইনশাআল্লাহ।
যারা সবটুকু পড়েছেন, আপনাদেরকেও ধন্যবাদ। আপনাদের জন্য আমার জীবন থেকে নেয়া কিছু উপদেশ দিচ্ছি:
১. আপনার যদি কোনো কিছুতে সৎ ইচ্ছা থাকে, তাহলে সেটা অর্জন করার আগ পর্যন্ত লেগে থাকুন।
২. আশেপাশে অনেক মানুষ থাকে যারা কখনো আপনাকে ভালো কাজে উপদেশ দিবে না, বরং আপনি কিছু করতে গেলে নেগেটিভ মন্তব্য করবে প্রকাশ্যে অথবা গোপনে। তাদের কথা কানে নেয়া যাবে না।
৩. এমন বন্ধু বানাবেন যাদের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য আপনার মতোই সৎ, স্বচ্ছ। যেনো একে অপরকে সাহায্য ও মোটিভেট করতে পারেন।
আজ আর নয়। অনেক কথা বলে ফেললাম। আমার ভিসা প্রসেসিং নিয়ে আরেকদিন বলবো। আপনাদের যদি দেশের বাইরে লেখাপড়া করার ইচ্ছা থাকে তাহলে আমার পেইজ এবং ইউটিউব চ্যানেলটা ফলো করতে পারেন। আমি নিয়মিত বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিয়ে কন্টেন্ট বানিয়ে থাকি। ধন্যবাদ আর শুভকামনা রইলো সবার প্রতি❤️