31/05/2026
#নীল #দহন'
#লেখিকা -- #মুন
২১.
অন্য দলটা মাঠ থেকে একপ্রকার বিদায় নেওয়ার পর, এবার জয়হান আর রিজবি আর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। নিজেদের বউদের ওপর অন্য একটা ছেলের এই একচ্ছত্র আধিপত্য আর জয়ের আনন্দ দেখে তাদের ভেতরের পুরুষালি অহংকার আর জেলাসি এক্কেবারে মাথায় চড়ে বসল। রিজবি কোমর থেকে শার্টের হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে মাঠে নেমে এল। জয়হানও তার সানগ্লাসটা খুলে টি-শার্টের কলারে ঝুলিয়ে গম্ভীর মুখে কোর্টে এসে দাঁড়াল। রিজবি বলটা এক হাতে লুফে নিয়ে অন্য দলের কোর্টে থাকা লিওনার্দোকে উদ্দেশ্য করে বলল,
"খুব তো অন্য দলকে হারিয়ে হিরো সাজা হচ্ছে! এবার আমাদের ফেস করো।"
শুরু হলো আসল টক্কর। এবার জয়হান আর রিজবি কোনো সাধারণ খেলা খেলছিল না, তাদের প্রতিটা শটের পেছনে ছিল ভেতরের জমে থাকা সমস্ত রাগ। জয়হান বল বাতাসে ভাসিয়ে এক একটা মারাত্মক জোরালো আর গতিময় শট মারতে লাগল, আর রিজবিও পুরো শক্তি দিয়ে বল অন্য কোর্টে আছড়ে ফেলতে লাগল। কিন্তু লিওনার্দোও কম ছিল না! তার শরীরটা ছিল ভীষণ চটপটে আর স্পোর্টি। জয়হান আর রিজবি যত জোরেই বল মারুক না কেন, লিওনার্দো চিতাবাঘের মতো লাফিয়ে উঠে প্রতিটা বল হাত দিয়ে ব্লক করে দূরে ঠেলে দিতে লাগল। শাকিরা আর এলোরা পেছনে দাঁড়িয়ে তাদের এই জানপ্রাণ দিয়ে ডিফেন্স করা দেখে হাততালি দিচ্ছিল।
খেলার একপর্যায়ে মেজাজ হারিয়ে জয়হান এলোরাকে আউট করার জন্য এক্কেবারে লক্ষ্য করে সোজা একটা তীব্র গতির বল ছুঁড়ে মারল। বলের স্পীড এত বেশি ছিল যে এলোরা ভয়ে চোখ বন্ধ করে চিৎকার দিয়ে উঠল। কিন্তু বলটা এলোরার গায়ে লাগার ঠিক এক সেকেন্ড আগে, লিওনার্দো বিদ্যুতের গতিতে দৌড়ে এসে এলোরার সামনে নিজের শরীরটা বাড়িয়ে দিল। বলটা লিওনার্দোর পিঠে লেগে ছিটকে বাইরে চলে গেল। সে এক হাত দিয়ে এলোরাকে আগলে ধরে বলল, "আর ইউ ওকে, সিস্টার-ইন-ল?" এলোরা হাঁফ ছাড়তে ছাড়তে মাথা নাড়ল।
এই দৃশ্য দেখে ওপাশে রিজবির মাথা আরও গরম হয়ে গেল। সে এবার শাকিরাকে টার্গেট করে পুরো গায়ের জোরে একটা বাঁকা শট মারল। কিন্তু এবারও শাকিরাকে বাঁচানোর জন্য লিওনার্দো বাজপাখির মতো ডাইভ দিল। নিজের শরীর বালি দিয়ে মাখামাখি করে সে শাকিরার দিকে আসা বলটাকেও এক হাত দিয়ে রিসিভ করে ওপাশে পার করে দিল। রিজবি আর জয়হান মিলে জানপ্রাণ দিয়ে, গায়ের সমস্ত শক্তি খাটিয়েও শেষ রক্ষা করতে পারল না। লিওনার্দোর নিখুঁত টাইমিং আর চিল-লাইক রিফ্লেক্সের কাছে তারা দুই ভাই এক্কেবারে খড়কুটোর মতো উড়ে গেল। রেফারি বাঁশি বাজিয়ে ঘোষণা করল—লিওনার্দো, শাকিরা আর এলোরার টিম উইনার!
রিজবি আর জয়হান হাপাতে হাপাতে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। পরাজয়ের গ্লানি আর জেলাসিতে রিজবির ফর্সা মুখটা তখন লাল টকটকে হয়ে গেছে। সে ওপাশে লিওনার্দোর উল্লাস দেখে দাঁত কিড়মিড় করে জয়হানকে বলল,
"শালা! কীভাবে দাঁত কেলিয়ে হাসছে দেখেছ ভাইয়া? ইচ্ছা করছে ওখানেই গিয়ে ওর দাঁতগুলো ভেঙে দিই।"
জয়হান চরম ক্লান্তিতে আর কোনো উত্তর দিল না, সে শুধু এক হাত দিয়ে কপাল মুছল।ঠিক তখনই ঘটল সেই ঐতিহাসিক দুর্ঘটনা! লিওনার্দো জয়ের আনন্দে নাচতে নাচতে সোজা ওপাশ থেকে দৌড়ে এল রিজবির দিকে। রিজবি কিছু বুঝে ওঠার আগেই, লিওনার্দো তার সেই চওড়া দুই হাত দিয়ে রিজবিকে এক্কেবারে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে কোলাকুলি করতে লাগল। সে রিজবির পিঠ চাপড়ে পরম উৎসাহে চিল্লিয়ে বলল, "আরে চুদির ভাই! আমরা জিতে গেছি! উই ওন ব্রো!"
রিজবি এই অতর্কিত আলিঙ্গনে এক্কেবারে জমে পাথর হয়ে গেল। সে রাগে আর অস্বস্তিতে লিওনার্দোকে ধাক্কা দিয়ে সরাতে যাবে, ঠিক তখনই লিওনার্দো ইতালিয়ানদের চিরাচরিত ফ্রেন্ডলি স্টাইলে টপ করে রিজবির ওই শক্ত, ফর্সা গালে একটা জোরদার চুমু খেয়ে বসল! চুমুটা খেয়েই সে রিজবির কাঁধ ঝাঁকিয়ে অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে বলল,
"তুমি আসলেই একটা গ্রেট চুদির ভাই!" বলেই সে একগাল হেসে শাকিরা আর এলোরাকে ডাকতে ডাকতে ওদিকে চলে গেল। ওদিকে রিজবির অবস্থা তখন দেখার মতো! একটা পরপুরুষ, তাও আবার একজন বিদেশি তার গালে এভাবে কিস করে দেবে—এটা সে কেন, চৌদ্দ গুষ্টিও কখনো ভাবেনি। তার মনে হচ্ছিল সে এখনই বমি করে দেবে। সে নিজের হাত দিয়ে গালটা পাগলের মতো ডলতে ডলতে থুতু ফেলতে লাগল,
"ওয়াক... থু! শালা... ওয়াক! কী নোংরা রে ভাই!"
পেছন থেকে জয়হান এতক্ষণ হাঁ করে এই দৃশ্য দেখছিল। এবার সে আর নিজের হাসি থামাতে পারল না। সে তালি বাজিয়ে হাহা করে হাসতে হাসতে বলল, "ওয়াও রিজবি! কী সুন্দর সিন! তোর বউ শাকিরা তোকে আজ পর্যন্ত এত সুন্দর করে কোনোদিন সবার সামনে কিস করতে পারল না, অথচ এই বিদেশি ছেলেটা এক সেকেন্ডে কাজটা করে ফেলল! মানতেই হবে, ছেলেটার স্পীড আছে!"
রিজবি রাগে, লজ্জায় আর ঘেন্নায় এক্কেবারে রি রি করতে করতে বলল, "ধুর ভাইয়া! ইয়ার্কি মারো না তো! ওয়াক থু... শালা গে নাকি? ছেলেদের গালে কিস করে বেড়াচ্ছে! আমার তো পুরো শরীর ঘেন্নায় ঘিনঘিন করছে।"
দূর থেকে শাকিরা আর এলোরা রিজবির এই ছটফটানি আর গাল ডলা দেখে মুখ চেপে হাসতে হাসতে শেষ হয়ে যাচ্ছিল। বিশেষ করে শাকিরা মনে মনে ভাবল—যেমন কর্ম, তেমন ফল! শাকিরার মনটা অনেকদিন পর এক পরম তৃপ্তিতে ভরে উঠল। সব হইচই, খেলাধুলা আর আনন্দ শেষে সাগরের বুকে টকটকে লাল সূর্যটা একসময় ডুবে গেল। সন্ধ্যার অন্ধকার নামতেই পুরো বিচ আর রিসোর্টজুড়ে জ্বলে উঠল রঙিন সব আলো। জয়হান আর রিজবি মাঠে নেমেছিল ঠিকই, কিন্তু তাদের কপালে তো আর আসল আনন্দ জোটেনি; তারা শুধু দূর থেকে রাগ নিয়েই দাঁড়িয়ে ছিল। আসল মজা আর হুল্লোড় তো করল শাকিরা, এলোরা আর লিওনার্দো।
রাত বাড়তেই যে যার মতো ক্লান্ত শরীর নিয়ে নিজেদের রুমে ফিরে এল। এলোরা রুমে ঢুকেই আলমারি থেকে জামাকাপড় বের করে নিজের ট্রাভেল ব্যাগ গোছাতে শুরু করল। কারণ জয়হান আগেই বলে দিয়েছে—কাল সকালেই তাদের সিঙ্গাপুরের এই সুন্দর রিসোর্ট ছেড়ে দেশের উদ্দেশ্যে রওনা দিতে হবে। শেষ মুহূর্তের তাড়াহুড়ো এড়াতে সে মন দিয়ে গোছগাছ করছিল। ওদিকে জয়হানের মাথাটা তখনো একটু ঝিমঝিম করছিল। সারা দিনের ধকল আর খেলাধুলার ক্লান্তিতে তার এখন একটা কড়া সিগারেটের খুব প্রয়োজন। সে এলোরাকে ব্যাগ গোছাতে দেখে আলতো করে বলল, "আমি একটু নিচে থেকে আসছি।" এই বলে সে রুমের বাইরে চলে এল এবং লবির পেছনের ওপেন-এয়ার স্মোকিং জোনে গিয়ে দাঁড়াল।
সেখানে গিয়ে জয়হান তো এক্কেবারে অবাক! সে দেখল, অন্ধকারের মধ্যে লাইটারের আলো জ্বেলে শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে ধূমপান করছে সেই ইতালিয়ান ছেলে লিওনার্দো। জয়হান একটু ইতস্তত করে ইংরেজিতেই তাকে জিজ্ঞেস করল, "Hey, you smoke?।"
লিওনার্দো ঠোঁটের কোণে মৃদু হেসে ধোঁয়া ছেড়ে ইংরেজিতেই উত্তর দিল, "Yeah, sometimes. When I’m tired or thinking about something.।"
জয়হান মাথা নেড়ে বলল, "ওহ, আচ্ছা।" সেও নিজের পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরাল। এতক্ষণের রেষারেষি ভুলে দুই পুরুষ তখন লাইটারের আলো আর সিগারেটের ধোঁয়ায় একটু শান্ত হওয়ার চেষ্টা করছিল। ঠিক তখনই ওপর থেকে নিচে নেমে এল রিজবি। সকালের সেই হ্যাঙ্গওভার আর দুপুরের পরাজয়ের পর তার মেজাজ তখনো খিটখিটে। নিজের ভেতরের অস্থিরতা কমাতে আর একটু ড্রিংক করার উদ্দেশ্যে সে নিচে নামছিল। কিন্তু নামার পথেই তার চোখ গেল স্মোকিং জোনের দিকে। সেখানে জয়হান আর লিওনার্দোকে একসাথে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে ভুরু কুঁচকে হনহন করে সেদিকে এগিয়ে এল। রিজবিকে আসতে দেখেই লিওনার্দোর চোখমুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে তার সেই চেনা ও প্রিয় বাংলা গালিটা মুখ ফুলিয়ে বেশ জোর গলায় আউড়ে ডাকল,
"আরে চুদির ভাই! এদিকে আসো, এদিকে আসো!"
আবারও নিজেকে 'চুদির ভাই' শুনতে হওয়ায় রিজবির ভেতরের রক্ত এক পলকে মাথায় চড়ে গেল। সে দাঁত কিড়মিড় করে রাগে ফেটে পড়তে যাবে, ঠিক তখনই লিওনার্দো পকেট থেকে একটা দামি বিদেশি সিগারেটের প্যাকেট বের করে একখানা সিগারেট রিজবির দিকে বাড়িয়ে দিল। শুধু বাড়িয়েই দিল না, নিজের লাইটারটা জ্বেলে পরম ভদ্রতার সাথে রিজবির সামনে ধরে রাখল। রিজবি এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে তো নিচে নেমেছিলই নেশার খোঁজে, নিজের মেজাজ ঠান্ডা করার জন্য। আর সামনে এত দামি একটা বিদেশি সিগারেট, তাও আবার কেউ একজন ওভাবে লাইটার জ্বেলে ধরে রাখছে—এটা দেখে রিজবির ভেতরের সব রাগ যেন কর্পূরের মতো উবে গেল! সে আর এক সেকেন্ডও নখরা না করে লিওনার্দোর বাড়িয়ে দেওয়া সিগারেটটা নিজের ঠোঁটে চেপে ধরল। লাইটারের আগুনে টান দিয়ে এক বুক ধোঁয়া ফুসফুসে টেনে নিয়ে সে একটা তৃপ্তির দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। ধোঁয়াটা ওপরের দিকে ছেড়ে রিজবি আড়চোখে লিওনার্দোর দিকে তাকাল। ছেলেটার মুখে এখনো সেই নিষ্পাপ, বন্ধুবৎসল হাসি। রিজবি মনে মনে ভাবল,
"আসলে আমি ছেলেটাকে যেমন ভেবেছিলাম, ও বোধহয় অতটাও খারাপ না। একটু অদ্ভুত আর পাগল কিসিমের, কিন্তু মানুষ হিসেবে বেশ দিলখোলা আর ভালোই তো!'
এক সিগারেটের টানেই রিজবির মনের সব শত্রুতা যেন মুহূর্তের মধ্যে ধোঁয়ার মতো বাতাসে মিলিয়ে গেল। তিন পুরুষ তখন নিস্তব্ধ রাতের অন্ধকারে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ধোঁয়া ওড়াতে লাগল।
_______________
পরদিন সকালের আলো ফুটতেই রিসোর্টজুড়ে এক ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেল। সবার ফ্লাইট সকাল ৮টায়, তাই আর এক মুহূর্তও দেরি না করে ভোর ভোর ঘুম থেকে উঠে পড়ল সবাই। যে যার ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিয়ে রিসোর্টের লবিতে নেমে এল চেক-আউট করার জন্য। ঠিক তখনই দূর থেকে ভারী বুটের আওয়াজ পাওয়া গেল। সবাই তাকিয়ে দেখল—পিঠে একটা মস্ত বড় ট্রাভেল ব্যাগ ঝুলিয়ে, চোখে দামি ব্ল্যাক সানগ্লাস আর পরনে স্টাইলিশ জ্যাকেট পরে হিরোর মতো হেঁটে আসছে লিওনার্দো! তার পুরো প্রস্তুতি দেখে মনে হচ্ছে সে-ও কোনো লম্বা সফরে বেরিয়েছে। লিওনার্দোকে ওভাবে তৈরি হতে দেখে রিজবি নিজের চোখ কুঁচকে জয়হানের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, "
"কী ব্যাপার ভাইয়া? এই মালটা আবার সাতসকালে এত বড় ল্যাগেজপত্র নিয়ে কোথায় যাচ্ছে? ও কি আজই ইতালি ব্যাক করছে নাকি?"
রিজবির কথা শেষ হতে না হতেই শাকিরা তার পাশে এসে দাঁড়াল। সে লিওনার্দোর দিকে তাকিয়ে একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে রিজবিকে উদ্দেশ্য করে বলল, "উনি কোথাও যাচ্ছেন না। উনি আমাদের সাথেই বাংলাদেশে যাচ্ছেন।"
শাকিরার মুখ থেকে এই বোমা ফাটানো খবরটা শোনা মাত্র রিজবি আর জয়হান—দুজনেই এক্কেবারে আকাশ থেকে পড়ল! তাদের চোখ দুটো চড়কগাছ হয়ে গেল। তারা দুজনে একসাথে সমস্বরে চিৎকার করে উঠল, "কী?! বাংলাদেশে যাচ্ছে মানে?!"
এবার এলোরা তার ব্যাগটা জয়হানের হাতে দিতে দিতে বেশ সহজ গলায় বলল, "হ্যাঁ ভাইয়া, ঠিকই শুনেছ। আসলে লিওনার্দোর এই এশিয়ায় তেমন কোনো ভালো ফ্রেন্ড নেই। ও বলল আমরাই নাকি ওর লাইফের বেস্ট ফ্রেন্ড। তাই ও যখন বাংলাদেশ ঘোরার ইচ্ছা প্রকাশ করল, আমি আর আপু ভাবলাম—আহা, একা একটা ছেলে, ওকেও আমাদের সাথে করে নিয়ে যাই না কেন!"
জয়হান প্রথমে বেশ গম্ভীর হয়ে গেল। তার বাড়ীতে একটা বিদেশি ছেলে গিয়ে উঠবে, এটা ভেবে সে কিছু একটা বলতে চাইল। কিন্তু যখন দেখল তার বউ এলোরা নিজেই এতটা আবদার করে বলছে, তখন সে আর ‘না করতে পারল না। সে মুখটা একটু ঘুরিয়ে চুপ করে রইল। কিন্তু রিজবি তো আর জয়হানের মতো শান্ত নয়! তার ভেতরের হিংসা আর ক্ষোভ এক পলকে চাড়া দিয়ে উঠল। সে হাত নেড়ে তীব্র আপত্তির সুরে বলল,
"হোয়াট আ জোক! কিন্তু আমরা কেউ এতে রাজি না! কোনোভাবেই না!"
ঠিক তখনই জয়হান সবাইকে অবাক করে দিয়ে বলে উঠল, "আমি রাজি।"
রিজবি এক ঝটকায় নিজের ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে প্রায় আকাশ থেকে পড়ার মতো ভঙ্গি করে বলল, "কী বলছ তুমি ভাইয়া?! মাথা ঠিক আছে তোমার? একটা সম্পূর্ণ অপরিচিত, অচেনা বিদেশি ছেলেকে তুমি নিজের বাড়িতে এনে তুলবে? এটা কোনো কথা হলো?"
জয়হান তার শান্ত স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে রিজবির কাঁধে হাত রেখে বলল, "কোথায় অপরিচিত, রিজবি? ওরা তো পরিষ্কার বললই যে ও ওদের ফ্রেন্ড। তাছাড়া ছেলেটার ম্যানার্স তো আমরা কাল খেলাই দেখলা।—বেশ ভালো। একটু বাংলাদেশ ঘুরে দেখুক না কেমন, আমাদের দেশের হসপিটালিটি দেখুক, তারপর না হয় নিজের দেশে ফিরে যাবে। এতে ক্ষতি কী?"
জয়হানের এই গ্রিন সিগন্যাল পেয়ে শাকিরা মনে মনে বেশ খুশি হলো। সে রিজবির দিকে একটা তাচ্ছিল্যের চাউনি হেনে বেশ জোর গলায় বলল, "হ্যাঁ, জয়হান যখন নিজে রাজি হয়ে গেছেন, তখন এই বিষয়ে আর অন্য কারো বাড়তি কথা না বলাই ভালো।"
শাকিরার মুখে এমন কড়া আর মুখের ওপর জবাব শুনে রিজবি রাগে এক্কেবারে অগ্নিশর্মা হয়ে গেল! সে চারপাশের মানুষের তোয়াক্কা না করে শাকিরার দিকে আঙুল উঁচিয়ে চিল্লিয়ে বলল, "এই বেয়াদব মেয়ে! জয়হান কে রে তোর? ও তোর আপন ভাসুর লাগে! বড়দের সম্মান দিয়ে ‘ভাইয়া’ ডাকবি। নাম ধরে ডাকিস কোন সাহসে, হ্যাঁ?"
শাকিরা রিজবির এই রাগকে বিন্দুমাত্র পাত্তা দিল না, যেন রিজবি বাতাসে ভেসে থাকা কোনো ফালতু কথা বলছে। সে একটা তাচ্ছিল্যের ঝাড়া দিয়ে লিওনার্দো আর এলোরার হাত ধরে ট্রলির দিকে এগিয়ে চলে গেল। স্ত্রীর কাছ থেকে এমন চরম অবহেলা আর অপমান পেয়ে রিজবি অপমানে আর রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে জয়হানের দিকে তাকাল। সে নিজের চুল খামচে ধরে বলল,
"দেখলে তো ভাইয়া? দেখলে মেয়েটা কেমন চরম বেয়াদব আর অহংকারী? আমার মুখের ওপর কীভাবে চলে গেল! এর ডানা যে দিন দিন কতটা গজাচ্ছে, তুমি ভাবতেও পারবে না!"
জয়হান শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রিজবিকে শান্ত করার চেষ্টা করল, কারণ সে জানে—এই ট্রিপটা শেষ হলেও, বাংলাদেশে ফিরে এই ইতালিয়ান ছেলেকে নিয়ে তাদের জীবনে আরও বড় ধরনের ঝড় আসতে চলেছে!
______________
ঢাকার সিকদার বাড়ির বিশাল অন্দরমহলে এক এলাহী কাণ্ড শুরু হয়ে গেছে। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে খাঁটি দেশি মশলার সুবাস। জাহানারা বেগম কোমরে আঁচল জড়িয়ে সকাল থেকেই রান্নাবান্নার তদারকি করছেন। দুই ছেলে আর দুই বউ একসঙ্গে বাড়ি ফিরবে, মায়ের মন কি আর ঘরে বসে থাকে? তাছাড়া এলোরা সিঙ্গাপুর থেকে প্লেনে ওঠার আগেই ফোন করে শাশুড়িকে জানিয়ে দিয়েছিল যে, এবার শুধু তারা চারজন নয়, তাদের সাথে সুদূর ইতালি থেকে এক বিশেষ বিদেশি মেহমানও বাংলাদেশে আসছে। শাশুড়িকে সে একটু কায়দা করেই বুঝিয়ে বলেছিল, "আম্মু, বিদেশি মেহমান তো, আমাদের দেশের ঐতিহ্যবাহী সব খাবার-দাবার একটু ভালো করে আয়োজন করো।"
মেহমানের কথা শুনে জাহানারা বেগম কোনো খামতি রাখতে চাইলেন না। তিনি বাবুর্চিদের সাথে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে পোলাও, খাসির রেজালা, আস্ত মুরগির রোস্ট আর ইলিশ মাছের আইটেম তৈরি করাচ্ছেন। মায়ের এত ব্যস্ততা দেখে জারা-ও সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে পড়ল। সে হাত-মুখ ধুয়ে সোজা রান্নাঘরে এসে মায়ের পাশে দাঁড়াল। জাহানারা বেগমকে মসলা বাটতে দেখে সে বলল, "আম্মু, তুমি একা একা এত কিছু করছ কেন? দাও, সালাদ কাটার কাজ আর টেবিল গোছানোর দায়িত্বটা আমাকে দাও। আমি সব গুছিয়ে রাখছি।" মায়ের সাথে জারা-ও বেশ উৎসাহ নিয়ে মেহমানদারির কাজে হাত লাগাল।
অন্যদিকে, দুপুরের এই রাজকীয় খাবারের জন্য কাঁচাবাজারের দায়িত্বটা পড়েছে বাড়ির একমাত্র জামাই রোমান আর শ্বশুর নুরুল সাহেবের ওপর। দুই জামাই-শ্বশুর মিলে সকাল সকাল প্যান্টের পকেট গরম করে সোজা চলে গেছেন কাঁচাবাজারে। বাজারে গিয়ে দুজনের মাঝে যে ভাব আর মেলবন্ধন দেখা গেল, তা সত্যিই দেখার মতো! রোমান অত্যন্ত চতুর ছেলে। সে খুব ভালো করেই জানে যে শ্বশুরমশাইকে হাত করতে না পারলে এই বাড়িতে টেকা দায়। তাই সে নুরুল সাহেবকে এক্কেবারে তেলের ওপর রাখছে! নুরুল সাহেব যেই একটা মাছের দিকে তাকাচ্ছেন, রোমান সাথে সাথে পকেট থেকে টাকা বের করে বলছে, "
"আব্বা, আপনি জাস্ট পছন্দ করেন, দামের চিন্তা আমার ওপর ছেড়ে দেন। আপনার চয়েস মানেই সেরা চয়েস!"
জামাইয়ের এই উপচে পড়া তেল আর অতিরিক্ত খাতির দেখে নুরুল সাহেবের মনটাও এক্কেবারে গলে জল হয়ে গেছে। এমনিতেই রোমান তার একমাত্র জামাই, তার ওপর ছেলেটা ইদানীং যেভাবে শ্বশুরের মন জয় করার জন্য দিনরাত এক করে দিচ্ছে, তাতে নুরুল সাহেব আর নিজের ভেতরের পুরোনো রাগ ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি রোমানের পিঠ চাপড়ে হেসে বললেন,
"আরে রোমান, তুমি থাকতে আমার আর বাজারের চিন্তা কী! চলো, আজ ওই বড় গলদা চিংড়িগুলোও নিয়ে নিই।"
জামাই-শ্বশুরের এই জমজমাট রসায়ন আর বাড়িতে জাহানারা বেগমের রান্নার ধুমধাম—সব মিলিয়ে সিকদার বাড়ি এখন উৎসবের আমেজে মাতোয়ারা।
___________________
লং ফ্লাইট শেষে অবশেষে সিঙ্গাপুর থেকে ঢাকার মাটিতে ডানা মেলল প্লেনটি। সব ফরমালিটি শেষ করে বিমানবন্দর থেকে একে একে বের হয়ে এল শাকিরা, রিজবি, এলোরা আর জয়হান। তাদের পেছনে ইতালিয়ান ফটোগ্রাফার লিওনার্দোও তার বিশাল ব্যাকপ্যাকটা কাঁধে ঝুলিয়ে চারপাশটা বেশ কৌতূহলী চোখে দেখতে দেখতে নামল। ঢাকার চেনা গরম আর চেনা কোলাহল গায়ে লাগতেই রিজবি একটা লম্বা শ্বাস ফেলে নিজের সানগ্লাসটা ঠিক করল। ঠিক তখনই এয়ারপোর্টের এক্সিট গেটের বাইরে এক বয়স্ক ভিক্ষুক রিজবির সামনে এসে হাত পাতল। সে মলিন গলায় বলল,
"বাবা, সকাল থেকে কিচ্ছু খাইনি। বড়লোক মানুষ তোমরা, বিদেশ থেকে আইছ, আমারে কিছু টাকা দাও বাবা। আল্লা তোমাদের মঙ্গল করবে।"
রিজবি মানুষটা অন্যদের সাথে যতই রুক্ষ কিংবা রাগী ব্যবহার করুক না কেন, বাইরের সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে তার চরিত্রটা এক্কেবারে আলাদা। তার ভেতরে একটা বড় রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা আছে; সে ভবিষ্যতে একজন সফল এবং প্রভাবশালী এমপি হতে চায়। আর রাজনীতি করতে গেলে যে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হয়, দান-খয়রাত করে নিজের ইমেজ ধরে রাখতে হয়—তা সে খুব ভালো করেই জানে। তাই ভিক্ষুককে দেখা মাত্রই রিজবির ভেতরের সেই 'ভবিষ্যৎ জননেতা' ভাবটা চাড়া দিয়ে উঠল। সে বেশ দরাজ দিল দেখিয়ে পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করল। তার ইচ্ছা ছিল ছোটখাটো কোনো নোট দেওয়ার, কিন্তু মানিব্যাগ খুলতেই তার হাতে উঠে এল ১ হাজার টাকার দুটো কড়কড়ে লাল নোট। সে নোট দুটো হাতে নিয়ে মাত্র আলাদা করতে যাবে, ঠিক তখনই ঘটল এক অবিশ্বাস্য কাণ্ড! ওই বুড়ো ভিক্ষুকটা রিজবির হাতে দুই হাজার টাকা দেখা মাত্রই চোখের পলকে এক্কেবারে চিল-ছোঁ মেরে 'খপ' করে নোট দুটো টেনে নিল! টান মেরেই সে কোনোরকমে থ্যাংক ইউ বলারও তোয়াক্কা না করে, বুড়ো মানুষের সেই চিরাচরিত ধীরগতি ভুলে অলৌকিক এক গতিতে ভিড়ের মধ্যে দৌড়ে পালিয়ে চম্পট দিল!
রিজবি তো একদম হা করে নিজের খালি হাতের দিকে তাকিয়ে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। সে কয়েক সেকেন্ডের জন্য বুঝতেই পারল না তার সাথে আসলে কী ঘটে গেল! সে চিৎকার করে বলতে চাইল, "এই মিয়া! দাঁড়াও! আমি তো পুরো দুই হাজার টাকা দিতে চাইনি!" কিন্তু তার সেই চিৎকার শোনার জন্য তখন আর কেউ সেখানে ছিল না। বুড়ো ভিক্ষুক ততক্ষণে কোন গলিতে হাওয়া হয়ে গেছে, তার কোনো হদিস নেই।
রিজবির এই চরম বোকা বনে যাওয়া আর হা করা মুখটা দেখে শাকিরা আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। সে খিলখিল করে হেসে কুটিপাটি হতে লাগল। এলোরাও মুখ চেপে হাসতে লাগল, আর জয়হান পাশে দাঁড়িয়ে মুচকি হেসে মাথা নাড়ল।শাকিরা হাসতে হাসতে রিজবির একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, তার সেই দেমাগি মুখোশটা এক নিমেষে গুঁড়িয়ে দিয়ে বেশ তাচ্ছিল্যের সুরে বলল:
"বেডা মানুষ মুলত দুই প্রকার—একটা চিটার, আরেকটা বাটপার!"
শাকিরার মুখে এই খাঁটি বাংলা প্রবাদ আর নিজের এত বড় ধরা খাওয়ার অপমান সহ্য করতে না পেরে রিজবির ফর্সা মুখটা এক নিমেষে কালো হয়ে গেল। সে রাগে আর লজ্জায় দাঁত কিড়মিড় করে বলল, "ফালতু কথা বন্ধ করো শাকিরা! ভালো করতে গেলাম, আর বুড়ো ব্যাটা আমার পকেট এক্কেবারে সাফ করে দিয়ে চলে গেল!"
শাকিরার দিকে এক কদম এগিয়ে গিয়ে চড়া গলায় জিজ্ঞেস করল, "আচ্ছা! বেডামানুশ তো দুই প্রকার বুঝলাম। তা এই দুই প্রকারের মধ্যে ওই ‘চিটার’টা কে শুনি? কার কথা বলছ তুমি?"
শাকিরা একটুও ভয় পেল না। সে রিজবির চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে একটা তাচ্ছিল্যের বিষাক্ত হাসি ফুটিয়ে তুলল। তারপর অত্যন্ত শান্ত অথচ ধারালো গলায় বলল:
"বেশি দূরে খোঁজার দরকার নেই রিজবি। ঘরের ড্রেসিংটেবিলের আয়নাটার সামনে গিয়ে
একবার দাঁড়াও... ওখানেই দেখতে পাবে!
এই কথাটি বলেই শাকিরা আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। সে নিজের ট্রলি ব্যাগটা টেনে নিয়ে হনহন করে পার্কিং জোনের দিকে চলে গেল। রিজবি ওখানেই একদম স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল; শাকিরার এই চাবুকের মতো কথাটার কোনো পাল্টা জবাব তার মাথায় চট করে এল না।ওদিকে তাদের একটু পেছনেই দাঁড়িয়ে ছিল ইতালিয়ান লিওনার্দো। যদিও সে পুরো বাংলা ভাষা নিখুঁতভাবে বোঝে না, কিন্তু একজন ফটোগ্রাফার ও গভীর পর্যবেক্ষক হিসেবে মানুষের মুখের এক্সপ্রেশন আর চোখের ভাষা সে খুব ভালো পড়তে পারে। রিজবি আর শাকিরার এই অনবরত ঝগড়া, তিক্ততা আর শাকিরার চোখের ভেতরের জমাট বাঁধা অভিমান দেখে সে মনে মনে একটু ভাবল। নিজের দাড়ি চুলকাতে চুলকাতে সে ইংরেজিতেই বিড়বিড় করে বলল,
"হুম... এদের দুজনের মধ্যে সম্পর্কটা একদমই ঠিক নেই। ভেতরে অনেক অশান্তি লুকিয়ে আছে।"
ঠিক তখনই লিওনার্দোর চোখ গেল পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জয়হান আর এলোরার দিকে। জয়হান তখন খুব যত্ন করে এলোরার গায়ের ওড়নাটা ঠিক করে দিচ্ছিল, আর এলোরা সিঙ্গাপুরের গরমের পর ঢাকার ভ্যাপসা গরমে ঘেমে যাওয়ায় জয়হান নিজের পকেট থেকে রুমাল বের করে পরম মমতায় এলোরার কপাল আর গাল মুছে দিচ্ছিল। এলোরা তখন জয়হানের দিকে তাকিয়ে খুব মিষ্টি একটা হাসি দিল। এই দৃশ্যটা দেখে লিওনার্দোর মনের ভেতরটা এক নিমেষে জুড়িয়ে গেল। সে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল তাদের দিকে। তার মনে হলো, এরা দুজন যেন কোনো বাস্তব জগতের মানুষ নয়; ঠিক যেন কোনো রোমান্টিক হলিউড বা বলিউড সিনেমার ‘কিউট কাপল বড় পর্দায় যেমন নিখুঁত আর পবিত্র ভালোবাসা দেখানো হয়, এদের কেমিস্ট্রিটাও ঠিক তেমন। লিওনার্দোর ঠোঁটের কোণে একটা চমৎকার মুচকি হাসি ফুটে উঠল। সে মনে মনে ভাবল—নিজের জীবনে প্রেম না থাকুক, অন্য দুটো মানুষের এমন খাঁটি ভালোবাসা চোখের সামনে দেখতে পাওয়াটাও এক অদ্ভুত রকমের শান্তি! ইতিমধ্যেই জয়হান সিঙ্গাপুরে থাকতেই বাড়ির ড্রাইভারকে ফোন করে এয়ারপোর্টে চলে আসতে বলেছিল। দূর থেকে দেখা গেল সিকদার বাড়ির বড় মাইক্রোবাসটা এসে পার্কিংয়ে থামল এবং ড্রাইভার নেমে এসে জয়হান ও রিজবিকে সালাম জানিয়ে ব্যাগগুলো গাড়ির পেছনে তুলতে লাগল। সবাই এবার গাড়িতে ওঠার জন্য এগিয়ে এল। বসার সিটগুলো এমনভাবে বিন্যস্ত হলো যা রিজবির মেজাজ আরও এক কাঠি বাড়িয়ে দিল রিজবি নিজের রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ড্রাইভারের পাশের সামনের সিটটায় গিয়ে ধপাস করে বসল। সে পেছনের কারো মুখই দেখতে চায় না। পেছনের মাঝখানের সিট শাকিরা গাড়িতে উঠে মাঝখানের সিটে বসল এবং তার পাশে এসে বসল তাদের বিদেশি বন্ধু লিওনার্দো। দুজনে পাশাপাশি বসে সিঙ্গাপুরের ট্রিপের কিছু ছবি নিয়ে কথা বলতে লাগল। পেছনের শেষ সিটে আর তাদের ঠিক পেছনের সিটটায় পাশাপাশি বসল জয়হান আর এলোরা। এলোরা জয়হানের কাঁধে মাথা রেখে লম্বা জার্নির ক্লান্তি দূর করার চেষ্টা করছিল। গাড়িটি যখন এয়ারপোর্ট ছেড়ে ঢাকার চেনা রাস্তা দিয়ে শেখ বাড়ির দিকে রওনা দিল, তখন গাড়ির ভেতরের পরিবেশটা ছিল অদ্ভুত এক মিশ্রণে ভরা—সামনে রিজবির মনে জ্বলছিল হিংসে আর অপমানের আগুন, মাঝখানে শাকিরা আর লিওনার্দোর হালকা আড্ডা, আর পেছনে জয়হান-এলোরার সিনেমার মতো শান্ত রোমান্স। ঢাকার জ্যাম ঠেলে গাড়িটি এখন ক্রমশ এগিয়ে চলেছে।
____
গাড়ি তখন কুড়িল বিশ্বরোডের জ্যামে আটকে আছে। চারপাশের গাড়ির হর্ন আর ভ্যাপসা গরমের মাঝে জয়হান বোরিং লাগায় নিজের ফোনটা বের করল। সে ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ একটা স্ট্যাটাসের ওপর গিয়ে থমকে দাঁড়াল। লেখাটা পড়েই তার মনে হলো—এটা তো এই মুহূর্তের এই গাড়ির ভেতরের পরিস্থিতির সাথে এক্কেবারে হুবহু মিলে যাচ্ছে!সে একটু বাঁকা হেসে, গলার আওয়াজটা বেশ চড়া করে গাড়ির সবার উদ্দেশ্যে জোরে জোরে স্ট্যাটাসটা পড়তে লাগল:
"নিজের বউকে কাঁদাবেন না কখনো... কারণ শত শত হারামজাদারা বসে আছে তার চোখের পানি মুছে দেওয়ার জন্য!"
জয়হানের মুখে এই কথা শোনা মাত্রই গাড়ির ভেতরের পুরো পরিবেশ এক সেকেন্ডে থমথমে হয়ে গেল। পেছনের সিটে বসা এলোরা জয়হানের কাঁধ থেকে মাথা তুলে সোজা হয়ে বসল। সে মনে মনে ভালোই বুঝল যে জয়হান এই কথাটা এমনি এমনি বলেনি, এটা আসলে রিজবি ভাইকে একখানা পরোক্ষ খোঁচা মারার জন্যই বলেছে। ওদিকে মাঝখানের সিটে বসা শাকিরা ধক করে ওঠা বুক নিয়ে চট করে জয়হানের দিকে তাকাল, আর সামনের সিট থেকে রিজবি এক ঝটকায় ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনের সিটে বসা শাকিরার দিকে এক চরম খুনে চাউনি হানল।
পাশেই বসা ইতালিয়ান লিওনার্দো গাড়ির ভেতরের এই হঠাৎ বদলে যাওয়া থমথমে হাওয়া আর সবার চোখের ইশারা দেখে কিচ্ছু বুঝতে পারল না। সে শাকিরার দিকে একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করল, "কী হয়েছে? জয়হান কী পড়ল এমন যে সবাই ওভাবে তাকাচ্ছ? মানে কী ওটার?"
শাকিরা নিজের ভেতরের অস্বস্তি আর কষ্টটা আড়াল করার জন্য লিওনার্দোর দিকে তাকিয়ে একটা জোরপূর্বক মলিন হাসি দিল। সে বলল, "আরে না, ওটা তেমন কিছু না লিওনার্দো। জাস্ট একটা ফালতু ফেসবুক পোস্ট, ওটা নিয়ে মাথা ঘামিও না।"
কিন্তু সামনের সিটে বসা রিজবি শাকিরাকে এভাবে লিওনার্দোর সাথে কথা বলতে দেখে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। জয়হানের ওই ফেসবুক স্ট্যাটাসটা তীরের মতো তার বুকে বিঁধেছে। সে একটা তাচ্ছিল্যের তপ্ত শ্বাস ফেলে, শাকিরার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে অত্যন্ত ধারালো আর বিষাক্ত গলায় বলল:
"সব ক্ষেত্রে ওই স্ট্যাটাস খাটেনা জয়হান! কিছু কিছু নারী যদি নিজেই নিজেকে সস্তা ভেবে বসে থাকে, আর সামান্য কারণেই হাজার ছেলেদের কাছে গিয়ে সহানুভূতি পাওয়ার জন্য কান্না করে বেড়ায়—তাহলে সেইসব সস্তা নারীদের কাঁদানোই ভালো! কাঁদিয়ে সোজা করে রাখাই তাদের জন্য উপযুক্ত শাস্তি।"
রিজবির এই চরম অপমানজনক আর তীরের মতো ত্যাড়ছা কথা শুনে শাকিরার চোখের কোণটা এক নিমেষে কান্নায় আর অপমানে ভিজে উঠল। সে তীব্র ক্ষোভ আর ঘৃণা নিয়ে রিজবির ওই অহংকারী মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল।রিজবি শাকিরার চোখের সেই জল আর রাগ দেখে একটা পৈশাচিক বাঁকা হাসি হাসল, যেন শাকিরাকে এভাবে কষ্ট দিয়ে সে এক পরম বিজয় আনন্দ লাভ করেছে! এরপর সে আর কোনো কথা না বাড়িয়ে মুখটা ঘুরিয়ে সামনের জানালার দিকে তাকিয়ে রইল। গাড়ির এসি সচল থাকলেও, ভেতরের পরিবেশটা তখন এক চরম মানসিক অশান্তির আগুনে পুড়ছিল।
!
!
!
চলবে--------