It's moon

It's moon “যে প্রেম বলা হয়ে ওঠে না,
আমি তাকে গল্প বানিয়ে রাখি
সময়ের পাতায়।”🦋🕊️

 #নীল  #দহন'  #লেখিকা -- #মুন২১. অন্য দলটা মাঠ থেকে একপ্রকার বিদায় নেওয়ার পর, এবার জয়হান আর রিজবি আর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে...
31/05/2026

#নীল #দহন'
#লেখিকা -- #মুন
২১.
অন্য দলটা মাঠ থেকে একপ্রকার বিদায় নেওয়ার পর, এবার জয়হান আর রিজবি আর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। নিজেদের বউদের ওপর অন্য একটা ছেলের এই একচ্ছত্র আধিপত্য আর জয়ের আনন্দ দেখে তাদের ভেতরের পুরুষালি অহংকার আর জেলাসি এক্কেবারে মাথায় চড়ে বসল। রিজবি কোমর থেকে শার্টের হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে মাঠে নেমে এল। জয়হানও তার সানগ্লাসটা খুলে টি-শার্টের কলারে ঝুলিয়ে গম্ভীর মুখে কোর্টে এসে দাঁড়াল। রিজবি বলটা এক হাতে লুফে নিয়ে অন্য দলের কোর্টে থাকা লিওনার্দোকে উদ্দেশ্য করে বলল,

"খুব তো অন্য দলকে হারিয়ে হিরো সাজা হচ্ছে! এবার আমাদের ফেস করো।"

শুরু হলো আসল টক্কর। এবার জয়হান আর রিজবি কোনো সাধারণ খেলা খেলছিল না, তাদের প্রতিটা শটের পেছনে ছিল ভেতরের জমে থাকা সমস্ত রাগ। জয়হান বল বাতাসে ভাসিয়ে এক একটা মারাত্মক জোরালো আর গতিময় শট মারতে লাগল, আর রিজবিও পুরো শক্তি দিয়ে বল অন্য কোর্টে আছড়ে ফেলতে লাগল। কিন্তু লিওনার্দোও কম ছিল না! তার শরীরটা ছিল ভীষণ চটপটে আর স্পোর্টি। জয়হান আর রিজবি যত জোরেই বল মারুক না কেন, লিওনার্দো চিতাবাঘের মতো লাফিয়ে উঠে প্রতিটা বল হাত দিয়ে ব্লক করে দূরে ঠেলে দিতে লাগল। শাকিরা আর এলোরা পেছনে দাঁড়িয়ে তাদের এই জানপ্রাণ দিয়ে ডিফেন্স করা দেখে হাততালি দিচ্ছিল।

খেলার একপর্যায়ে মেজাজ হারিয়ে জয়হান এলোরাকে আউট করার জন্য এক্কেবারে লক্ষ্য করে সোজা একটা তীব্র গতির বল ছুঁড়ে মারল। বলের স্পীড এত বেশি ছিল যে এলোরা ভয়ে চোখ বন্ধ করে চিৎকার দিয়ে উঠল। কিন্তু বলটা এলোরার গায়ে লাগার ঠিক এক সেকেন্ড আগে, লিওনার্দো বিদ্যুতের গতিতে দৌড়ে এসে এলোরার সামনে নিজের শরীরটা বাড়িয়ে দিল। বলটা লিওনার্দোর পিঠে লেগে ছিটকে বাইরে চলে গেল। সে এক হাত দিয়ে এলোরাকে আগলে ধরে বলল, "আর ইউ ওকে, সিস্টার-ইন-ল?" এলোরা হাঁফ ছাড়তে ছাড়তে মাথা নাড়ল।

এই দৃশ্য দেখে ওপাশে রিজবির মাথা আরও গরম হয়ে গেল। সে এবার শাকিরাকে টার্গেট করে পুরো গায়ের জোরে একটা বাঁকা শট মারল। কিন্তু এবারও শাকিরাকে বাঁচানোর জন্য লিওনার্দো বাজপাখির মতো ডাইভ দিল। নিজের শরীর বালি দিয়ে মাখামাখি করে সে শাকিরার দিকে আসা বলটাকেও এক হাত দিয়ে রিসিভ করে ওপাশে পার করে দিল। রিজবি আর জয়হান মিলে জানপ্রাণ দিয়ে, গায়ের সমস্ত শক্তি খাটিয়েও শেষ রক্ষা করতে পারল না। লিওনার্দোর নিখুঁত টাইমিং আর চিল-লাইক রিফ্লেক্সের কাছে তারা দুই ভাই এক্কেবারে খড়কুটোর মতো উড়ে গেল। রেফারি বাঁশি বাজিয়ে ঘোষণা করল—লিওনার্দো, শাকিরা আর এলোরার টিম উইনার!

রিজবি আর জয়হান হাপাতে হাপাতে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। পরাজয়ের গ্লানি আর জেলাসিতে রিজবির ফর্সা মুখটা তখন লাল টকটকে হয়ে গেছে। সে ওপাশে লিওনার্দোর উল্লাস দেখে দাঁত কিড়মিড় করে জয়হানকে বলল,
"শালা! কীভাবে দাঁত কেলিয়ে হাসছে দেখেছ ভাইয়া? ইচ্ছা করছে ওখানেই গিয়ে ওর দাঁতগুলো ভেঙে দিই।"

জয়হান চরম ক্লান্তিতে আর কোনো উত্তর দিল না, সে শুধু এক হাত দিয়ে কপাল মুছল।ঠিক তখনই ঘটল সেই ঐতিহাসিক দুর্ঘটনা! লিওনার্দো জয়ের আনন্দে নাচতে নাচতে সোজা ওপাশ থেকে দৌড়ে এল রিজবির দিকে। রিজবি কিছু বুঝে ওঠার আগেই, লিওনার্দো তার সেই চওড়া দুই হাত দিয়ে রিজবিকে এক্কেবারে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে কোলাকুলি করতে লাগল। সে রিজবির পিঠ চাপড়ে পরম উৎসাহে চিল্লিয়ে বলল, "আরে চুদির ভাই! আমরা জিতে গেছি! উই ওন ব্রো!"

রিজবি এই অতর্কিত আলিঙ্গনে এক্কেবারে জমে পাথর হয়ে গেল। সে রাগে আর অস্বস্তিতে লিওনার্দোকে ধাক্কা দিয়ে সরাতে যাবে, ঠিক তখনই লিওনার্দো ইতালিয়ানদের চিরাচরিত ফ্রেন্ডলি স্টাইলে টপ করে রিজবির ওই শক্ত, ফর্সা গালে একটা জোরদার চুমু খেয়ে বসল! চুমুটা খেয়েই সে রিজবির কাঁধ ঝাঁকিয়ে অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে বলল,

"তুমি আসলেই একটা গ্রেট চুদির ভাই!" বলেই সে একগাল হেসে শাকিরা আর এলোরাকে ডাকতে ডাকতে ওদিকে চলে গেল। ওদিকে রিজবির অবস্থা তখন দেখার মতো! একটা পরপুরুষ, তাও আবার একজন বিদেশি তার গালে এভাবে কিস করে দেবে—এটা সে কেন, চৌদ্দ গুষ্টিও কখনো ভাবেনি। তার মনে হচ্ছিল সে এখনই বমি করে দেবে। সে নিজের হাত দিয়ে গালটা পাগলের মতো ডলতে ডলতে থুতু ফেলতে লাগল,

"ওয়াক... থু! শালা... ওয়াক! কী নোংরা রে ভাই!"

পেছন থেকে জয়হান এতক্ষণ হাঁ করে এই দৃশ্য দেখছিল। এবার সে আর নিজের হাসি থামাতে পারল না। সে তালি বাজিয়ে হাহা করে হাসতে হাসতে বলল, "ওয়াও রিজবি! কী সুন্দর সিন! তোর বউ শাকিরা তোকে আজ পর্যন্ত এত সুন্দর করে কোনোদিন সবার সামনে কিস করতে পারল না, অথচ এই বিদেশি ছেলেটা এক সেকেন্ডে কাজটা করে ফেলল! মানতেই হবে, ছেলেটার স্পীড আছে!"

রিজবি রাগে, লজ্জায় আর ঘেন্নায় এক্কেবারে রি রি করতে করতে বলল, "ধুর ভাইয়া! ইয়ার্কি মারো না তো! ওয়াক থু... শালা গে নাকি? ছেলেদের গালে কিস করে বেড়াচ্ছে! আমার তো পুরো শরীর ঘেন্নায় ঘিনঘিন করছে।"

দূর থেকে শাকিরা আর এলোরা রিজবির এই ছটফটানি আর গাল ডলা দেখে মুখ চেপে হাসতে হাসতে শেষ হয়ে যাচ্ছিল। বিশেষ করে শাকিরা মনে মনে ভাবল—যেমন কর্ম, তেমন ফল! শাকিরার মনটা অনেকদিন পর এক পরম তৃপ্তিতে ভরে উঠল। সব হইচই, খেলাধুলা আর আনন্দ শেষে সাগরের বুকে টকটকে লাল সূর্যটা একসময় ডুবে গেল। সন্ধ্যার অন্ধকার নামতেই পুরো বিচ আর রিসোর্টজুড়ে জ্বলে উঠল রঙিন সব আলো। জয়হান আর রিজবি মাঠে নেমেছিল ঠিকই, কিন্তু তাদের কপালে তো আর আসল আনন্দ জোটেনি; তারা শুধু দূর থেকে রাগ নিয়েই দাঁড়িয়ে ছিল। আসল মজা আর হুল্লোড় তো করল শাকিরা, এলোরা আর লিওনার্দো।

রাত বাড়তেই যে যার মতো ক্লান্ত শরীর নিয়ে নিজেদের রুমে ফিরে এল। এলোরা রুমে ঢুকেই আলমারি থেকে জামাকাপড় বের করে নিজের ট্রাভেল ব্যাগ গোছাতে শুরু করল। কারণ জয়হান আগেই বলে দিয়েছে—কাল সকালেই তাদের সিঙ্গাপুরের এই সুন্দর রিসোর্ট ছেড়ে দেশের উদ্দেশ্যে রওনা দিতে হবে। শেষ মুহূর্তের তাড়াহুড়ো এড়াতে সে মন দিয়ে গোছগাছ করছিল। ওদিকে জয়হানের মাথাটা তখনো একটু ঝিমঝিম করছিল। সারা দিনের ধকল আর খেলাধুলার ক্লান্তিতে তার এখন একটা কড়া সিগারেটের খুব প্রয়োজন। সে এলোরাকে ব্যাগ গোছাতে দেখে আলতো করে বলল, "আমি একটু নিচে থেকে আসছি।" এই বলে সে রুমের বাইরে চলে এল এবং লবির পেছনের ওপেন-এয়ার স্মোকিং জোনে গিয়ে দাঁড়াল।

সেখানে গিয়ে জয়হান তো এক্কেবারে অবাক! সে দেখল, অন্ধকারের মধ্যে লাইটারের আলো জ্বেলে শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে ধূমপান করছে সেই ইতালিয়ান ছেলে লিওনার্দো। জয়হান একটু ইতস্তত করে ইংরেজিতেই তাকে জিজ্ঞেস করল, "Hey, you smoke?।"

লিওনার্দো ঠোঁটের কোণে মৃদু হেসে ধোঁয়া ছেড়ে ইংরেজিতেই উত্তর দিল, "Yeah, sometimes. When I’m tired or thinking about something.।"

জয়হান মাথা নেড়ে বলল, "ওহ, আচ্ছা।" সেও নিজের পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরাল। এতক্ষণের রেষারেষি ভুলে দুই পুরুষ তখন লাইটারের আলো আর সিগারেটের ধোঁয়ায় একটু শান্ত হওয়ার চেষ্টা করছিল। ঠিক তখনই ওপর থেকে নিচে নেমে এল রিজবি। সকালের সেই হ্যাঙ্গওভার আর দুপুরের পরাজয়ের পর তার মেজাজ তখনো খিটখিটে। নিজের ভেতরের অস্থিরতা কমাতে আর একটু ড্রিংক করার উদ্দেশ্যে সে নিচে নামছিল। কিন্তু নামার পথেই তার চোখ গেল স্মোকিং জোনের দিকে। সেখানে জয়হান আর লিওনার্দোকে একসাথে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে ভুরু কুঁচকে হনহন করে সেদিকে এগিয়ে এল। রিজবিকে আসতে দেখেই লিওনার্দোর চোখমুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে তার সেই চেনা ও প্রিয় বাংলা গালিটা মুখ ফুলিয়ে বেশ জোর গলায় আউড়ে ডাকল,
"আরে চুদির ভাই! এদিকে আসো, এদিকে আসো!"

আবারও নিজেকে 'চুদির ভাই' শুনতে হওয়ায় রিজবির ভেতরের রক্ত এক পলকে মাথায় চড়ে গেল। সে দাঁত কিড়মিড় করে রাগে ফেটে পড়তে যাবে, ঠিক তখনই লিওনার্দো পকেট থেকে একটা দামি বিদেশি সিগারেটের প্যাকেট বের করে একখানা সিগারেট রিজবির দিকে বাড়িয়ে দিল। শুধু বাড়িয়েই দিল না, নিজের লাইটারটা জ্বেলে পরম ভদ্রতার সাথে রিজবির সামনে ধরে রাখল। রিজবি এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে তো নিচে নেমেছিলই নেশার খোঁজে, নিজের মেজাজ ঠান্ডা করার জন্য। আর সামনে এত দামি একটা বিদেশি সিগারেট, তাও আবার কেউ একজন ওভাবে লাইটার জ্বেলে ধরে রাখছে—এটা দেখে রিজবির ভেতরের সব রাগ যেন কর্পূরের মতো উবে গেল! সে আর এক সেকেন্ডও নখরা না করে লিওনার্দোর বাড়িয়ে দেওয়া সিগারেটটা নিজের ঠোঁটে চেপে ধরল। লাইটারের আগুনে টান দিয়ে এক বুক ধোঁয়া ফুসফুসে টেনে নিয়ে সে একটা তৃপ্তির দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। ধোঁয়াটা ওপরের দিকে ছেড়ে রিজবি আড়চোখে লিওনার্দোর দিকে তাকাল। ছেলেটার মুখে এখনো সেই নিষ্পাপ, বন্ধুবৎসল হাসি। রিজবি মনে মনে ভাবল,

"আসলে আমি ছেলেটাকে যেমন ভেবেছিলাম, ও বোধহয় অতটাও খারাপ না। একটু অদ্ভুত আর পাগল কিসিমের, কিন্তু মানুষ হিসেবে বেশ দিলখোলা আর ভালোই তো!'

এক সিগারেটের টানেই রিজবির মনের সব শত্রুতা যেন মুহূর্তের মধ্যে ধোঁয়ার মতো বাতাসে মিলিয়ে গেল। তিন পুরুষ তখন নিস্তব্ধ রাতের অন্ধকারে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ধোঁয়া ওড়াতে লাগল।
_______________
পরদিন সকালের আলো ফুটতেই রিসোর্টজুড়ে এক ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেল। সবার ফ্লাইট সকাল ৮টায়, তাই আর এক মুহূর্তও দেরি না করে ভোর ভোর ঘুম থেকে উঠে পড়ল সবাই। যে যার ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিয়ে রিসোর্টের লবিতে নেমে এল চেক-আউট করার জন্য। ঠিক তখনই দূর থেকে ভারী বুটের আওয়াজ পাওয়া গেল। সবাই তাকিয়ে দেখল—পিঠে একটা মস্ত বড় ট্রাভেল ব্যাগ ঝুলিয়ে, চোখে দামি ব্ল্যাক সানগ্লাস আর পরনে স্টাইলিশ জ্যাকেট পরে হিরোর মতো হেঁটে আসছে লিওনার্দো! তার পুরো প্রস্তুতি দেখে মনে হচ্ছে সে-ও কোনো লম্বা সফরে বেরিয়েছে। লিওনার্দোকে ওভাবে তৈরি হতে দেখে রিজবি নিজের চোখ কুঁচকে জয়হানের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, "

"কী ব্যাপার ভাইয়া? এই মালটা আবার সাতসকালে এত বড় ল্যাগেজপত্র নিয়ে কোথায় যাচ্ছে? ও কি আজই ইতালি ব্যাক করছে নাকি?"

রিজবির কথা শেষ হতে না হতেই শাকিরা তার পাশে এসে দাঁড়াল। সে লিওনার্দোর দিকে তাকিয়ে একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে রিজবিকে উদ্দেশ্য করে বলল, "উনি কোথাও যাচ্ছেন না। উনি আমাদের সাথেই বাংলাদেশে যাচ্ছেন।"

শাকিরার মুখ থেকে এই বোমা ফাটানো খবরটা শোনা মাত্র রিজবি আর জয়হান—দুজনেই এক্কেবারে আকাশ থেকে পড়ল! তাদের চোখ দুটো চড়কগাছ হয়ে গেল। তারা দুজনে একসাথে সমস্বরে চিৎকার করে উঠল, "কী?! বাংলাদেশে যাচ্ছে মানে?!"

এবার এলোরা তার ব্যাগটা জয়হানের হাতে দিতে দিতে বেশ সহজ গলায় বলল, "হ্যাঁ ভাইয়া, ঠিকই শুনেছ। আসলে লিওনার্দোর এই এশিয়ায় তেমন কোনো ভালো ফ্রেন্ড নেই। ও বলল আমরাই নাকি ওর লাইফের বেস্ট ফ্রেন্ড। তাই ও যখন বাংলাদেশ ঘোরার ইচ্ছা প্রকাশ করল, আমি আর আপু ভাবলাম—আহা, একা একটা ছেলে, ওকেও আমাদের সাথে করে নিয়ে যাই না কেন!"

জয়হান প্রথমে বেশ গম্ভীর হয়ে গেল। তার বাড়ীতে একটা বিদেশি ছেলে গিয়ে উঠবে, এটা ভেবে সে কিছু একটা বলতে চাইল। কিন্তু যখন দেখল তার বউ এলোরা নিজেই এতটা আবদার করে বলছে, তখন সে আর ‘না করতে পারল না। সে মুখটা একটু ঘুরিয়ে চুপ করে রইল। কিন্তু রিজবি তো আর জয়হানের মতো শান্ত নয়! তার ভেতরের হিংসা আর ক্ষোভ এক পলকে চাড়া দিয়ে উঠল। সে হাত নেড়ে তীব্র আপত্তির সুরে বলল,

"হোয়াট আ জোক! কিন্তু আমরা কেউ এতে রাজি না! কোনোভাবেই না!"

ঠিক তখনই জয়হান সবাইকে অবাক করে দিয়ে বলে উঠল, "আমি রাজি।"

রিজবি এক ঝটকায় নিজের ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে প্রায় আকাশ থেকে পড়ার মতো ভঙ্গি করে বলল, "কী বলছ তুমি ভাইয়া?! মাথা ঠিক আছে তোমার? একটা সম্পূর্ণ অপরিচিত, অচেনা বিদেশি ছেলেকে তুমি নিজের বাড়িতে এনে তুলবে? এটা কোনো কথা হলো?"

জয়হান তার শান্ত স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে রিজবির কাঁধে হাত রেখে বলল, "কোথায় অপরিচিত, রিজবি? ওরা তো পরিষ্কার বললই যে ও ওদের ফ্রেন্ড। তাছাড়া ছেলেটার ম্যানার্স তো আমরা কাল খেলাই দেখলা।—বেশ ভালো। একটু বাংলাদেশ ঘুরে দেখুক না কেমন, আমাদের দেশের হসপিটালিটি দেখুক, তারপর না হয় নিজের দেশে ফিরে যাবে। এতে ক্ষতি কী?"

জয়হানের এই গ্রিন সিগন্যাল পেয়ে শাকিরা মনে মনে বেশ খুশি হলো। সে রিজবির দিকে একটা তাচ্ছিল্যের চাউনি হেনে বেশ জোর গলায় বলল, "হ্যাঁ, জয়হান যখন নিজে রাজি হয়ে গেছেন, তখন এই বিষয়ে আর অন্য কারো বাড়তি কথা না বলাই ভালো।"

শাকিরার মুখে এমন কড়া আর মুখের ওপর জবাব শুনে রিজবি রাগে এক্কেবারে অগ্নিশর্মা হয়ে গেল! সে চারপাশের মানুষের তোয়াক্কা না করে শাকিরার দিকে আঙুল উঁচিয়ে চিল্লিয়ে বলল, "এই বেয়াদব মেয়ে! জয়হান কে রে তোর? ও তোর আপন ভাসুর লাগে! বড়দের সম্মান দিয়ে ‘ভাইয়া’ ডাকবি। নাম ধরে ডাকিস কোন সাহসে, হ্যাঁ?"

শাকিরা রিজবির এই রাগকে বিন্দুমাত্র পাত্তা দিল না, যেন রিজবি বাতাসে ভেসে থাকা কোনো ফালতু কথা বলছে। সে একটা তাচ্ছিল্যের ঝাড়া দিয়ে লিওনার্দো আর এলোরার হাত ধরে ট্রলির দিকে এগিয়ে চলে গেল। স্ত্রীর কাছ থেকে এমন চরম অবহেলা আর অপমান পেয়ে রিজবি অপমানে আর রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে জয়হানের দিকে তাকাল। সে নিজের চুল খামচে ধরে বলল,

"দেখলে তো ভাইয়া? দেখলে মেয়েটা কেমন চরম বেয়াদব আর অহংকারী? আমার মুখের ওপর কীভাবে চলে গেল! এর ডানা যে দিন দিন কতটা গজাচ্ছে, তুমি ভাবতেও পারবে না!"

জয়হান শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রিজবিকে শান্ত করার চেষ্টা করল, কারণ সে জানে—এই ট্রিপটা শেষ হলেও, বাংলাদেশে ফিরে এই ইতালিয়ান ছেলেকে নিয়ে তাদের জীবনে আরও বড় ধরনের ঝড় আসতে চলেছে!
______________
ঢাকার সিকদার বাড়ির বিশাল অন্দরমহলে এক এলাহী কাণ্ড শুরু হয়ে গেছে। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে খাঁটি দেশি মশলার সুবাস। জাহানারা বেগম কোমরে আঁচল জড়িয়ে সকাল থেকেই রান্নাবান্নার তদারকি করছেন। দুই ছেলে আর দুই বউ একসঙ্গে বাড়ি ফিরবে, মায়ের মন কি আর ঘরে বসে থাকে? তাছাড়া এলোরা সিঙ্গাপুর থেকে প্লেনে ওঠার আগেই ফোন করে শাশুড়িকে জানিয়ে দিয়েছিল যে, এবার শুধু তারা চারজন নয়, তাদের সাথে সুদূর ইতালি থেকে এক বিশেষ বিদেশি মেহমানও বাংলাদেশে আসছে। শাশুড়িকে সে একটু কায়দা করেই বুঝিয়ে বলেছিল, "আম্মু, বিদেশি মেহমান তো, আমাদের দেশের ঐতিহ্যবাহী সব খাবার-দাবার একটু ভালো করে আয়োজন করো।"

মেহমানের কথা শুনে জাহানারা বেগম কোনো খামতি রাখতে চাইলেন না। তিনি বাবুর্চিদের সাথে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে পোলাও, খাসির রেজালা, আস্ত মুরগির রোস্ট আর ইলিশ মাছের আইটেম তৈরি করাচ্ছেন। মায়ের এত ব্যস্ততা দেখে জারা-ও সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে পড়ল। সে হাত-মুখ ধুয়ে সোজা রান্নাঘরে এসে মায়ের পাশে দাঁড়াল। জাহানারা বেগমকে মসলা বাটতে দেখে সে বলল, "আম্মু, তুমি একা একা এত কিছু করছ কেন? দাও, সালাদ কাটার কাজ আর টেবিল গোছানোর দায়িত্বটা আমাকে দাও। আমি সব গুছিয়ে রাখছি।" মায়ের সাথে জারা-ও বেশ উৎসাহ নিয়ে মেহমানদারির কাজে হাত লাগাল।

অন্যদিকে, দুপুরের এই রাজকীয় খাবারের জন্য কাঁচাবাজারের দায়িত্বটা পড়েছে বাড়ির একমাত্র জামাই রোমান আর শ্বশুর নুরুল সাহেবের ওপর। দুই জামাই-শ্বশুর মিলে সকাল সকাল প্যান্টের পকেট গরম করে সোজা চলে গেছেন কাঁচাবাজারে। বাজারে গিয়ে দুজনের মাঝে যে ভাব আর মেলবন্ধন দেখা গেল, তা সত্যিই দেখার মতো! রোমান অত্যন্ত চতুর ছেলে। সে খুব ভালো করেই জানে যে শ্বশুরমশাইকে হাত করতে না পারলে এই বাড়িতে টেকা দায়। তাই সে নুরুল সাহেবকে এক্কেবারে তেলের ওপর রাখছে! নুরুল সাহেব যেই একটা মাছের দিকে তাকাচ্ছেন, রোমান সাথে সাথে পকেট থেকে টাকা বের করে বলছে, "

"আব্বা, আপনি জাস্ট পছন্দ করেন, দামের চিন্তা আমার ওপর ছেড়ে দেন। আপনার চয়েস মানেই সেরা চয়েস!"

জামাইয়ের এই উপচে পড়া তেল আর অতিরিক্ত খাতির দেখে নুরুল সাহেবের মনটাও এক্কেবারে গলে জল হয়ে গেছে। এমনিতেই রোমান তার একমাত্র জামাই, তার ওপর ছেলেটা ইদানীং যেভাবে শ্বশুরের মন জয় করার জন্য দিনরাত এক করে দিচ্ছে, তাতে নুরুল সাহেব আর নিজের ভেতরের পুরোনো রাগ ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি রোমানের পিঠ চাপড়ে হেসে বললেন,

"আরে রোমান, তুমি থাকতে আমার আর বাজারের চিন্তা কী! চলো, আজ ওই বড় গলদা চিংড়িগুলোও নিয়ে নিই।"

জামাই-শ্বশুরের এই জমজমাট রসায়ন আর বাড়িতে জাহানারা বেগমের রান্নার ধুমধাম—সব মিলিয়ে সিকদার বাড়ি এখন উৎসবের আমেজে মাতোয়ারা।
___________________
লং ফ্লাইট শেষে অবশেষে সিঙ্গাপুর থেকে ঢাকার মাটিতে ডানা মেলল প্লেনটি। সব ফরমালিটি শেষ করে বিমানবন্দর থেকে একে একে বের হয়ে এল শাকিরা, রিজবি, এলোরা আর জয়হান। তাদের পেছনে ইতালিয়ান ফটোগ্রাফার লিওনার্দোও তার বিশাল ব্যাকপ্যাকটা কাঁধে ঝুলিয়ে চারপাশটা বেশ কৌতূহলী চোখে দেখতে দেখতে নামল। ঢাকার চেনা গরম আর চেনা কোলাহল গায়ে লাগতেই রিজবি একটা লম্বা শ্বাস ফেলে নিজের সানগ্লাসটা ঠিক করল। ঠিক তখনই এয়ারপোর্টের এক্সিট গেটের বাইরে এক বয়স্ক ভিক্ষুক রিজবির সামনে এসে হাত পাতল। সে মলিন গলায় বলল,

"বাবা, সকাল থেকে কিচ্ছু খাইনি। বড়লোক মানুষ তোমরা, বিদেশ থেকে আইছ, আমারে কিছু টাকা দাও বাবা। আল্লা তোমাদের মঙ্গল করবে।"

রিজবি মানুষটা অন্যদের সাথে যতই রুক্ষ কিংবা রাগী ব্যবহার করুক না কেন, বাইরের সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে তার চরিত্রটা এক্কেবারে আলাদা। তার ভেতরে একটা বড় রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা আছে; সে ভবিষ্যতে একজন সফল এবং প্রভাবশালী এমপি হতে চায়। আর রাজনীতি করতে গেলে যে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হয়, দান-খয়রাত করে নিজের ইমেজ ধরে রাখতে হয়—তা সে খুব ভালো করেই জানে। তাই ভিক্ষুককে দেখা মাত্রই রিজবির ভেতরের সেই 'ভবিষ্যৎ জননেতা' ভাবটা চাড়া দিয়ে উঠল। সে বেশ দরাজ দিল দেখিয়ে পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করল। তার ইচ্ছা ছিল ছোটখাটো কোনো নোট দেওয়ার, কিন্তু মানিব্যাগ খুলতেই তার হাতে উঠে এল ১ হাজার টাকার দুটো কড়কড়ে লাল নোট। সে নোট দুটো হাতে নিয়ে মাত্র আলাদা করতে যাবে, ঠিক তখনই ঘটল এক অবিশ্বাস্য কাণ্ড! ওই বুড়ো ভিক্ষুকটা রিজবির হাতে দুই হাজার টাকা দেখা মাত্রই চোখের পলকে এক্কেবারে চিল-ছোঁ মেরে 'খপ' করে নোট দুটো টেনে নিল! টান মেরেই সে কোনোরকমে থ্যাংক ইউ বলারও তোয়াক্কা না করে, বুড়ো মানুষের সেই চিরাচরিত ধীরগতি ভুলে অলৌকিক এক গতিতে ভিড়ের মধ্যে দৌড়ে পালিয়ে চম্পট দিল!

রিজবি তো একদম হা করে নিজের খালি হাতের দিকে তাকিয়ে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। সে কয়েক সেকেন্ডের জন্য বুঝতেই পারল না তার সাথে আসলে কী ঘটে গেল! সে চিৎকার করে বলতে চাইল, "এই মিয়া! দাঁড়াও! আমি তো পুরো দুই হাজার টাকা দিতে চাইনি!" কিন্তু তার সেই চিৎকার শোনার জন্য তখন আর কেউ সেখানে ছিল না। বুড়ো ভিক্ষুক ততক্ষণে কোন গলিতে হাওয়া হয়ে গেছে, তার কোনো হদিস নেই।

রিজবির এই চরম বোকা বনে যাওয়া আর হা করা মুখটা দেখে শাকিরা আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। সে খিলখিল করে হেসে কুটিপাটি হতে লাগল। এলোরাও মুখ চেপে হাসতে লাগল, আর জয়হান পাশে দাঁড়িয়ে মুচকি হেসে মাথা নাড়ল।শাকিরা হাসতে হাসতে রিজবির একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, তার সেই দেমাগি মুখোশটা এক নিমেষে গুঁড়িয়ে দিয়ে বেশ তাচ্ছিল্যের সুরে বলল:

"বেডা মানুষ মুলত দুই প্রকার—একটা চিটার, আরেকটা বাটপার!"

শাকিরার মুখে এই খাঁটি বাংলা প্রবাদ আর নিজের এত বড় ধরা খাওয়ার অপমান সহ্য করতে না পেরে রিজবির ফর্সা মুখটা এক নিমেষে কালো হয়ে গেল। সে রাগে আর লজ্জায় দাঁত কিড়মিড় করে বলল, "ফালতু কথা বন্ধ করো শাকিরা! ভালো করতে গেলাম, আর বুড়ো ব্যাটা আমার পকেট এক্কেবারে সাফ করে দিয়ে চলে গেল!"

শাকিরার দিকে এক কদম এগিয়ে গিয়ে চড়া গলায় জিজ্ঞেস করল, "আচ্ছা! বেডামানুশ তো দুই প্রকার বুঝলাম। তা এই দুই প্রকারের মধ্যে ওই ‘চিটার’টা কে শুনি? কার কথা বলছ তুমি?"

শাকিরা একটুও ভয় পেল না। সে রিজবির চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে একটা তাচ্ছিল্যের বিষাক্ত হাসি ফুটিয়ে তুলল। তারপর অত্যন্ত শান্ত অথচ ধারালো গলায় বলল:

"বেশি দূরে খোঁজার দরকার নেই রিজবি। ঘরের ড্রেসিংটেবিলের আয়নাটার সামনে গিয়ে
একবার দাঁড়াও... ওখানেই দেখতে পাবে!

এই কথাটি বলেই শাকিরা আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। সে নিজের ট্রলি ব্যাগটা টেনে নিয়ে হনহন করে পার্কিং জোনের দিকে চলে গেল। রিজবি ওখানেই একদম স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল; শাকিরার এই চাবুকের মতো কথাটার কোনো পাল্টা জবাব তার মাথায় চট করে এল না।ওদিকে তাদের একটু পেছনেই দাঁড়িয়ে ছিল ইতালিয়ান লিওনার্দো। যদিও সে পুরো বাংলা ভাষা নিখুঁতভাবে বোঝে না, কিন্তু একজন ফটোগ্রাফার ও গভীর পর্যবেক্ষক হিসেবে মানুষের মুখের এক্সপ্রেশন আর চোখের ভাষা সে খুব ভালো পড়তে পারে। রিজবি আর শাকিরার এই অনবরত ঝগড়া, তিক্ততা আর শাকিরার চোখের ভেতরের জমাট বাঁধা অভিমান দেখে সে মনে মনে একটু ভাবল। নিজের দাড়ি চুলকাতে চুলকাতে সে ইংরেজিতেই বিড়বিড় করে বলল,

"হুম... এদের দুজনের মধ্যে সম্পর্কটা একদমই ঠিক নেই। ভেতরে অনেক অশান্তি লুকিয়ে আছে।"

ঠিক তখনই লিওনার্দোর চোখ গেল পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জয়হান আর এলোরার দিকে। জয়হান তখন খুব যত্ন করে এলোরার গায়ের ওড়নাটা ঠিক করে দিচ্ছিল, আর এলোরা সিঙ্গাপুরের গরমের পর ঢাকার ভ্যাপসা গরমে ঘেমে যাওয়ায় জয়হান নিজের পকেট থেকে রুমাল বের করে পরম মমতায় এলোরার কপাল আর গাল মুছে দিচ্ছিল। এলোরা তখন জয়হানের দিকে তাকিয়ে খুব মিষ্টি একটা হাসি দিল। এই দৃশ্যটা দেখে লিওনার্দোর মনের ভেতরটা এক নিমেষে জুড়িয়ে গেল। সে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল তাদের দিকে। তার মনে হলো, এরা দুজন যেন কোনো বাস্তব জগতের মানুষ নয়; ঠিক যেন কোনো রোমান্টিক হলিউড বা বলিউড সিনেমার ‘কিউট কাপল বড় পর্দায় যেমন নিখুঁত আর পবিত্র ভালোবাসা দেখানো হয়, এদের কেমিস্ট্রিটাও ঠিক তেমন। লিওনার্দোর ঠোঁটের কোণে একটা চমৎকার মুচকি হাসি ফুটে উঠল। সে মনে মনে ভাবল—নিজের জীবনে প্রেম না থাকুক, অন্য দুটো মানুষের এমন খাঁটি ভালোবাসা চোখের সামনে দেখতে পাওয়াটাও এক অদ্ভুত রকমের শান্তি! ইতিমধ্যেই জয়হান সিঙ্গাপুরে থাকতেই বাড়ির ড্রাইভারকে ফোন করে এয়ারপোর্টে চলে আসতে বলেছিল। দূর থেকে দেখা গেল সিকদার বাড়ির বড় মাইক্রোবাসটা এসে পার্কিংয়ে থামল এবং ড্রাইভার নেমে এসে জয়হান ও রিজবিকে সালাম জানিয়ে ব্যাগগুলো গাড়ির পেছনে তুলতে লাগল। সবাই এবার গাড়িতে ওঠার জন্য এগিয়ে এল। বসার সিটগুলো এমনভাবে বিন্যস্ত হলো যা রিজবির মেজাজ আরও এক কাঠি বাড়িয়ে দিল রিজবি নিজের রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ড্রাইভারের পাশের সামনের সিটটায় গিয়ে ধপাস করে বসল। সে পেছনের কারো মুখই দেখতে চায় না। পেছনের মাঝখানের সিট শাকিরা গাড়িতে উঠে মাঝখানের সিটে বসল এবং তার পাশে এসে বসল তাদের বিদেশি বন্ধু লিওনার্দো। দুজনে পাশাপাশি বসে সিঙ্গাপুরের ট্রিপের কিছু ছবি নিয়ে কথা বলতে লাগল। পেছনের শেষ সিটে আর তাদের ঠিক পেছনের সিটটায় পাশাপাশি বসল জয়হান আর এলোরা। এলোরা জয়হানের কাঁধে মাথা রেখে লম্বা জার্নির ক্লান্তি দূর করার চেষ্টা করছিল। গাড়িটি যখন এয়ারপোর্ট ছেড়ে ঢাকার চেনা রাস্তা দিয়ে শেখ বাড়ির দিকে রওনা দিল, তখন গাড়ির ভেতরের পরিবেশটা ছিল অদ্ভুত এক মিশ্রণে ভরা—সামনে রিজবির মনে জ্বলছিল হিংসে আর অপমানের আগুন, মাঝখানে শাকিরা আর লিওনার্দোর হালকা আড্ডা, আর পেছনে জয়হান-এলোরার সিনেমার মতো শান্ত রোমান্স। ঢাকার জ্যাম ঠেলে গাড়িটি এখন ক্রমশ এগিয়ে চলেছে।
____
গাড়ি তখন কুড়িল বিশ্বরোডের জ্যামে আটকে আছে। চারপাশের গাড়ির হর্ন আর ভ্যাপসা গরমের মাঝে জয়হান বোরিং লাগায় নিজের ফোনটা বের করল। সে ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ একটা স্ট্যাটাসের ওপর গিয়ে থমকে দাঁড়াল। লেখাটা পড়েই তার মনে হলো—এটা তো এই মুহূর্তের এই গাড়ির ভেতরের পরিস্থিতির সাথে এক্কেবারে হুবহু মিলে যাচ্ছে!সে একটু বাঁকা হেসে, গলার আওয়াজটা বেশ চড়া করে গাড়ির সবার উদ্দেশ্যে জোরে জোরে স্ট্যাটাসটা পড়তে লাগল:

"নিজের বউকে কাঁদাবেন না কখনো... কারণ শত শত হারামজাদারা বসে আছে তার চোখের পানি মুছে দেওয়ার জন্য!"

জয়হানের মুখে এই কথা শোনা মাত্রই গাড়ির ভেতরের পুরো পরিবেশ এক সেকেন্ডে থমথমে হয়ে গেল। পেছনের সিটে বসা এলোরা জয়হানের কাঁধ থেকে মাথা তুলে সোজা হয়ে বসল। সে মনে মনে ভালোই বুঝল যে জয়হান এই কথাটা এমনি এমনি বলেনি, এটা আসলে রিজবি ভাইকে একখানা পরোক্ষ খোঁচা মারার জন্যই বলেছে। ওদিকে মাঝখানের সিটে বসা শাকিরা ধক করে ওঠা বুক নিয়ে চট করে জয়হানের দিকে তাকাল, আর সামনের সিট থেকে রিজবি এক ঝটকায় ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনের সিটে বসা শাকিরার দিকে এক চরম খুনে চাউনি হানল।

পাশেই বসা ইতালিয়ান লিওনার্দো গাড়ির ভেতরের এই হঠাৎ বদলে যাওয়া থমথমে হাওয়া আর সবার চোখের ইশারা দেখে কিচ্ছু বুঝতে পারল না। সে শাকিরার দিকে একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করল, "কী হয়েছে? জয়হান কী পড়ল এমন যে সবাই ওভাবে তাকাচ্ছ? মানে কী ওটার?"

শাকিরা নিজের ভেতরের অস্বস্তি আর কষ্টটা আড়াল করার জন্য লিওনার্দোর দিকে তাকিয়ে একটা জোরপূর্বক মলিন হাসি দিল। সে বলল, "আরে না, ওটা তেমন কিছু না লিওনার্দো। জাস্ট একটা ফালতু ফেসবুক পোস্ট, ওটা নিয়ে মাথা ঘামিও না।"

কিন্তু সামনের সিটে বসা রিজবি শাকিরাকে এভাবে লিওনার্দোর সাথে কথা বলতে দেখে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। জয়হানের ওই ফেসবুক স্ট্যাটাসটা তীরের মতো তার বুকে বিঁধেছে। সে একটা তাচ্ছিল্যের তপ্ত শ্বাস ফেলে, শাকিরার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে অত্যন্ত ধারালো আর বিষাক্ত গলায় বলল:

"সব ক্ষেত্রে ওই স্ট্যাটাস খাটেনা জয়হান! কিছু কিছু নারী যদি নিজেই নিজেকে সস্তা ভেবে বসে থাকে, আর সামান্য কারণেই হাজার ছেলেদের কাছে গিয়ে সহানুভূতি পাওয়ার জন্য কান্না করে বেড়ায়—তাহলে সেইসব সস্তা নারীদের কাঁদানোই ভালো! কাঁদিয়ে সোজা করে রাখাই তাদের জন্য উপযুক্ত শাস্তি।"

রিজবির এই চরম অপমানজনক আর তীরের মতো ত্যাড়ছা কথা শুনে শাকিরার চোখের কোণটা এক নিমেষে কান্নায় আর অপমানে ভিজে উঠল। সে তীব্র ক্ষোভ আর ঘৃণা নিয়ে রিজবির ওই অহংকারী মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল।রিজবি শাকিরার চোখের সেই জল আর রাগ দেখে একটা পৈশাচিক বাঁকা হাসি হাসল, যেন শাকিরাকে এভাবে কষ্ট দিয়ে সে এক পরম বিজয় আনন্দ লাভ করেছে! এরপর সে আর কোনো কথা না বাড়িয়ে মুখটা ঘুরিয়ে সামনের জানালার দিকে তাকিয়ে রইল। গাড়ির এসি সচল থাকলেও, ভেতরের পরিবেশটা তখন এক চরম মানসিক অশান্তির আগুনে পুড়ছিল।

!
!
!
চলবে--------

31/05/2026

তারপর জয়হানের ওই রক্তমাখা ঠোঁট আর ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা চোখের দিকে তাকাল। তার নিজের দুচোখ বেয়ে তখন জল গড়িয়ে পড়ছে। সে চোখের জল মুছে, গলার সমস্ত ক্ষোভ ঢেলে দিয়ে জয়হানের দিকে তাকিয়ে বলল:

"মানুষের অভিশাপ, বোধহয় দয়া! নিঃশব্দে দুঁফোটা চোখের পানি, আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা ভারী দীর্ঘশ্বাস—খুবই ভয়াবহ জিনিস মিস্টার শিকদার!"

#গল্প #নীল #দহন #লেখিকা #মুন

31/05/2026

😌🤌

30/05/2026

🤌🙂

29/05/2026

29/05/2026

🙂🤌

29/05/2026

হ্যাঁ জান আমি দেখি আপনারা ঘুরে আসেন।🐸🙈

27/05/2026

"শালা! কীভাবে দাঁত কেলিয়ে হাসছে দেখেছ ভাইয়া? ইচ্ছা করছে ওখানেই গিয়ে ওর দাঁতগুলো ভেঙে দিই।"

জয়হান চরম ক্লান্তিতে আর কোনো উত্তর দিল না, সে শুধু এক হাত দিয়ে কপাল মুছল।ঠিক তখনই ঘটল সেই ঐতিহাসিক দুর্ঘটনা! লিওনার্দো জয়ের আনন্দে নাচতে নাচতে সোজা ওপাশ থেকে দৌড়ে এল রিজবির দিকে। রিজবি কিছু বুঝে ওঠার আগেই, লিওনার্দো তার সেই চওড়া দুই হাত দিয়ে রিজবিকে এক্কেবারে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে কোলাকুলি করতে লাগল। সে রিজবির পিঠ চাপড়ে পরম উৎসাহে চিল্লিয়ে বলল, "আরে চুদির ভাই! আমরা জিতে গেছি! উই ওন ব্রো!"

রিজবি এই অতর্কিত আলিঙ্গনে এক্কেবারে জমে পাথর হয়ে গেল। সে রাগে আর অস্বস্তিতে লিওনার্দোকে ধাক্কা দিয়ে সরাতে যাবে, ঠিক তখনই লিওনার্দো ইতালিয়ানদের চিরাচরিত ফ্রেন্ডলি স্টাইলে টপ করে রিজবির ওই শক্ত, ফর্সা গালে একটা জোরদার চুমু খেয়ে বসল! চুমুটা খেয়েই সে রিজবির কাঁধ ঝাঁকিয়ে অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে বলল,

"তুমি আসলেই একটা গ্রেট চুদির ভাই!" বলেই সে একগাল হেসে শাকিরা আর এলোরাকে ডাকতে ডাকতে ওদিকে চলে গেল। ওদিকে রিজবির অবস্থা তখন দেখার মতো! একটা পরপুরুষ, তাও আবার একজন বিদেশি তার গালে এভাবে কিস করে দেবে—এটা সে কেন, চৌদ্দ গুষ্টিও কখনো ভাবেনি। তার মনে হচ্ছিল সে এখনই বমি করে দেবে। সে নিজের হাত দিয়ে গালটা পাগলের মতো ডলতে ডলতে থুতু ফেলতে লাগল,

"ওয়াক... থু! শালা... ওয়াক! কী নোংরা রে ভাই!"

পেছন থেকে জয়হান এতক্ষণ হাঁ করে এই দৃশ্য দেখছিল। এবার সে আর নিজের হাসি থামাতে পারল না। সে তালি বাজিয়ে হাহা করে হাসতে হাসতে বলল, "ওয়াও রিজবি! কী সুন্দর সিন! তোর বউ শাকিরা তোকে আজ পর্যন্ত এত সুন্দর করে কোনোদিন সবার সামনে কিস করতে পারল না, অথচ এই বিদেশি ছেলেটা এক সেকেন্ডে কাজটা করে ফেলল! মানতেই হবে, ছেলেটার স্পীড আছে!"

#গল্প #নীল #দহন #লেখিকা #মুন

27/05/2026

so pretty 🦋💙

 #নীল  #দহন'  #লেখিকা -- #মুন২০. আজকের এই একাকীত্ব শাকিরাকে এক ঝটকায় তার শৈশবের সেই ফেলে আসা দিনগুলোতে ফিরিয়ে নিয়ে গেল। ...
27/05/2026

#নীল #দহন'
#লেখিকা -- #মুন
২০.
আজকের এই একাকীত্ব শাকিরাকে এক ঝটকায় তার শৈশবের সেই ফেলে আসা দিনগুলোতে ফিরিয়ে নিয়ে গেল। সাগরের ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে সে এক মনে বিড়বিড় করে বলতে লাগল:

"আজকের দিনটাও ঠিক সেই ছোটবেলার স্কুল ছুটির দিনগুলোর মতো একাকীত্বের, তাই না শাকিরা? যখন স্কুলের ঘণ্টা বাজত, সব ছেলেমেয়েরা হইচই করে মাঠ দিয়ে দৌড়ে পালাত। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে দেখতাম—কারো মা এসেছে, কারো বাবা এসেছে, কেউ আবার তার ভাইয়ের হাত ধরে হাসতে হাসতে বাড়ি ফিরছে। সবার জন্য কেউ না কেউ ঠিকই আসত... শুধু আমার জন্যই কেউ কোনোদিন আসত না।"

শাকিরার চোখ দুটো ট কান্নায় ভিজে উঠল। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সাগরের বুকে পা ভিজিয়ে আবার বলতে লাগল:

"মা... মা তো আসতে পারত। কিন্তু ওই যে, মুরশেদ শেখের কড়া নিয়ম! বাবার পারমিশন ছাড়া মায়ের ঘর থেকে বের হওয়া নিষেধ ছিল। কিন্তু তাই বলে নিজের একমাত্র মেয়েটাকে স্কুল থেকে আনতে একটুও মন কেমন করত না মায়ের? মুরশেদ শেখের বাড়ির লোক দেখানোর জন্য জাস্ট একটা ড্রাইভার পাঠিয়ে দেওয়া হতো। সেই ড্রাইভারের গাড়ির পেছনের সিটে একা একা বসে আমি রোজ কাঁদতাম। রাজপ্রাসাদের মতো বাড়ি ছিল আমাদের, কিন্তু কোনোদিন একটু আপন মানুষের ভালোবাসা পাইনি।"

ছোটবেলায় বাবার সেই শাসনের নামে অবহেলা, আর আজ বড় হয়ে স্বামী হিসেবে রিজবির এই চরম অবমাননা—সবকিছু মিলিয়ে শাকিরার মনে হলো, তার পুরো জীবনটাই যেন এক মস্ত বড় একাকীত্বের গল্প। মুরশেদ শেখের মেয়ে হয়েও সে সেদিন যেমন একা গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকত, আজ রিজবি সিকদার বউ হয়েও এই বিশাল সমুদ্রের সামনে সে ঠিক ততটাই একা, বড্ড অসহায়। সমুদ্রের আছড়ে পড়া ঢেউগুলোর দিকে তাকিয়ে শাকিরার চোখের জল আর বাধা মানল না। নোনা জল গাল বেয়ে সাগরের পানিতে মিশে যেতে লাগল। শৈশবের সেই স্কুল ছুটির স্মৃতিটা কেবল একাকীত্বের ছিল না, সেটা ছিল এক ভয়ঙ্কর, দমবন্ধ করা অন্ধকারের গল্প। এক তীব্র আতঙ্কে শাকিরার পুরো শরীর শিউরে উঠল, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসতে লাগল।

ড্রাইভারের সেই গাড়িটার পেছনের সিটটা শাকিরার কাছে ছিল একটা চলন্ত নরক। সেই নরকের শয়তানটা—তাদের বাড়ির বিশ্বস্ত ড্রাইভার—আসলে একটা পশুপক্ষীর চেয়েও অধম ছিল। স্কুল থেকে ফেরার পথে ফাঁকা রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে সে শাকিরাকে অত্যন্ত নোংরা আর বাজেভাবে টাচ করত। শাকিরা তখন এতই ছোট যে 'গুড টাচ' আর 'ব্যাড টাচ' এর তফাত পুরোপুরি না বুঝলেও, ওই নোংরা স্পর্শে তার দম আটকে আসত, ভয়ে কুঁকড়ে যেত সে। মুরশেদ শেখ তখন ক্ষমতার লোভে, ব্যবসার কাজে বেশিরভাগ সময় দেশের বাইরে বা বাড়ির বাইরে কাটাতেন। বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে যে এই ভয়ঙ্কর অত্যাচারের কথা বলবে, সেই সুযোগটুকুও শাকিরা পায়নি। আর মাকে? মাকে তো সে জানাবে ভেবেছিল, কিন্তু ওই নরপিশাচ ড্রাইভার তাকে এমনভাবে ভয় দেখিয়েছিল যে, মাকে কিছু বললে সে মাকে মেরে ফেলবে! মায়ের ক্ষতির ভয়ে, নিজের ওপর হওয়া সব নির্যাতন মুখ বুজে সহ্য করেছিল ছোট্ট শাকিরা। সেই ছোটবেলার ভয়ঙ্কর ট্রমা আজ এত বছর পরেও শাকিরার অবচেতন মনে এমনভাবে গেঁথে আছে যে, হুট করে কেউ তাকে টাচ করলে সে এখনো এক অজানা আতঙ্কে কেঁপে ওঠে। রিজবি যখনই তার ওপর জোর খাটায়, তার ভেতরের সেই পুরনো ক্ষতটা দগদগে হয়ে ওঠে। কিন্তু পাপের ঘড়া তো একদিন না একদিন পূর্ণ হয়ই!

শাকিরার স্পষ্ট মনে আছে সেই দিনটার কথা, যেদিন ওই পিশাচ ড্রাইভারটার বীভৎস মৃত্যুর খবর এসেছিল। কেউ বা কারা তাকে তুলে নিয়ে গিয়ে এমন নির্মম শাস্তি দিয়েছিল, যা ভাবলেও সাধারণ মানুষের গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়। কেউ একজন অতি নিখুঁত পরিকল্পনায় অ্যাসিড দিয়ে ওই ড্রাইভারের পুরো মুখ পুড়িয়ে দিয়েছিল, তার ধারালো জিব কেটে ফেলা হয়েছিল যাতে সে চিৎকার করতে না পারে, আঙুলগুলো একটা একটা করে কেটে নেওয়া হয়েছিল। আর সবচেয়ে বড় কথা—তার শরীরের সেই গোপন অঙ্গটা এক্কেবারে কেটে উপড়ে ফেলা হয়েছিল, যা দিয়ে সে একটা নিষ্পাপ শিশুর পবিত্রতা নষ্ট করার চেষ্টা করত! চরম যাতনা আর ছটফটানির মধ্য দিয়ে ধুঁকে ধুঁকে মরেছিল সেই পিশাচ। সেদিন সবাই যখন ওই বীভৎস লাশ দেখে শিউরে উঠছিল, তখন ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে ছোট শাকিরা মনে মনে এক পরম শান্তি পেয়েছিল, খুশিতে তার মন নেচে উঠেছিল। সে তো মনে মনে রোজ স্রষ্টার কাছে এই প্রার্থনাটাই করত, যেন ওই লোকটার কোনোদিন ভালো না হয়।

কিন্তু বড় হওয়ার সাথে সাথে শাকিরার মনের ভেতরের সেই ভয় আর আতঙ্ক এক তীব্র ক্ষোভ আর রাগে রূপ নিতে শুরু করল—নিজের জন্মদাতা বাবার প্রতি! মুরশেদ শেখ যদি টাকার পেছনে না ছুটে নিজের মেয়ের দিকে একটু খেয়াল রাখতেন, তবে কি একটা সামান্য ড্রাইভারের এত বড় সাহস হতো? ষোভের আগুনটা আরও বেড়ে গেল যখন সে স্কুলে ওঠা শুরু করল। স্কুলের বাকি বাচ্চারা তাকে দেখে আড়ালে ফিসফিস করত, হাসাহাসি করত। একদিন এক সহপাঠী সরাসরি বলেই বসল, "তোর বাবা তো একটা আস্ত প্রতারক! তোর মায়ের আগেও তোর বাবার আরেকটা বউ ছিল!"

শাকিরা প্রথমে বিশ্বাস করতে চায়নি। কিন্তু একদিন বাবার লাইব্রেরি ঘরে লুকিয়ে পুরোনো খবরের কাগজ আর ম্যাগাজিনের আর্টিকল গুলো ঘেঁটে তার পায়ের তলার মাটি সরে গিয়েছিল। প্রতিটা বড় বড় খবরের হেডলাইনে স্পষ্ট করে লেখা ছিল মুরশেদ শেখের প্রথম বিয়ের কেলেঙ্কারির কথা। শাকিরার মনে তখন স্মৃতির এক অন্ধকার ঝড় বইছিল। খবরের কাগজের সেই পুরনো আর্টিকেলের প্রতিটা লাইন তার মাথায় কাচের মতো বিঁধে আছে। মুরশেদ শেখের প্রথম বউ কোনো সাধারণ ঘরের মেয়ে ছিল না, সে ছিল লখনউয়ের এক নামী বাইজি কন্যা! এক চরম রূপবতী এবং নর্তকী। আর সবচেয়ে বড় সত্যটা হলো, শাকিরার মা জেনেশুনেই, সব জেনেবুঝেও মুরশেদ শেখের বিপুল অর্থ-সম্পত্তি আর ক্ষমতার লোভে তাকে বিয়ে করেছিল। নিজের বাবার এমন লোভী আর কলঙ্কিত জীবনের কথা ভেবে শাকিরার যখন ঘৃণায় আর লজ্জায় দম আটকে আসছিল, ঠিক তখনই তার ভাবনার সুতোটা ছিঁড়ে গেল।পেছন থেকে চট করে একটা চেনা জুতো গলে বালির ওপর পড়ার শব্দ হলো। শাকিরা চমকে উঠে চোখ মুছে ঝট করে পেছনে তাকাল। সে দেখল, গত রাতের সেই ইতালিয়ান যুবক—লিওনার্দো—তার স্বভাবসুলভ রহস্যময় হাসিটা মুখে মেখে পকেটে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

লিওনার্দো শাকিরার লাল হয়ে থাকা চোখের দিকে তাকিয়ে একটু অবাক হওয়ার ভান করে বলল, "আরে! মিস বাংলাদেশি গার্ল তুমি এখানে? এই ভরদুপুরে সমুদ্রের পাড়ে এভাবে একা একা দাঁড়িয়ে আছ কেন? তোমার সেই ‘ডিফরেন্ট লাভ স্টোরি’র নায়ক কোথায়?"

শাকিরা নিজের ভেতরের অস্থিরতাটা লুকিয়ে একটা শুকনো ঢোক গিলে বলল, "না, এমনি... একটু বাতাস খেতে এলাম।"

লিওনার্দো সাগরের ঢেউয়ের দিকে একবার তাকিয়ে আবার শাকিরার দিকে চোখ ফেরাল। সে বেশ আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল, "আচ্ছা, তোমার সেই বোনটা আসেনি তোমার সাথে?"

শাকিরা এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে খুব ভালো করেই বুঝতে পারল, এই ইতালিয়ান ছেলেটা আসলে কার কথা বলছে। সে এতক্ষণ এলোরাকে শাকিরার বোন ভেবে বসে আছে! এক অজানা অভিমান থেকে শাকিরার মনের ভেতর তখন রাগ ফুঁসছিল। সে এক ঝটকায় মাথা ঝাঁকিয়ে বেশ রাগী আর কড়া গলায় বলল, "আমার কোনো বোন নেই! আমি আমার মা-বাবার একমাত্র সন্তান। আমি এক্কেবারে একা!"

লিওনার্দো শাকিরার এই চড়া গলা শুনে একটুও দমে গেল না। সে বরং তার দুই ভ্রু কপালে তুলে এক অদ্ভুত ও গভীর চাউনি নিয়ে তাকাল। সে আলতো করে মাথা নেড়ে বলল, "ওহ! তাই নাকি? তোমার কোনো বোন নেই? তাহলে সে তোমার কী হয়?"

শাকিরা বিরক্তি নিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিতে চাইল, কিন্তু লিওনার্দো তাকে থামিয়ে দিয়ে বেশ গম্ভীর গলায় বলতে লাগল:

"আসলে আমি জিজ্ঞেস করলাম কারণ... দূর থেকে দেখলে যে কেউ তোমাদের দুজনকে আপন বোন ভাববে। মেয়েটা কিন্তু দেখতে ঠিক একদম তোমার মতোই! তোমাদের দুজনের মাঝে অনেক মিল আছে। খেয়াল করেছ কি? তোমার গায়ের ধবধবে ফর্সা রঙ আর ওর গায়ের রঙ এক্কেবারে একই রকম। তোমরা লম্বায় একদম সমান সমান, এমনকি তোমাদের দুজনের ফেস কাটিং আর হাসির ধরণটাও অবিকল এক!"

লিওনার্দোর এই সহজ অথচ তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণটা শোনামাত্র শাকিরার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন যেন ধক করে উঠল। সে চোখ বড় বড় করে লিওনার্দোর দিকে তাকাল। এলোরার সাথে তার তেমন একটা কথা ও হয়নি তাহলে কিভাবে মিল খুজে পেনো।এত্তোদিন তো কেউ তাদের চেহারার এত নিখুঁত মিলের কথা ওভাবে বলেনি। একটু জোরেরসাথেই মাথা নাড়ল। সে বলল, "কই! আমি তো আমাদের চেহারায় কোনোদিন ওভাবে মিল দেখিনি। আপনি বোধহয় ভুল দেখছেন।"

লিওনার্দো তার কাঁধ দুখান একটু নাচিয়ে, ইতালিয়ান কায়দায় হাত নেড়ে বলল, "হতেই পারে আমি ভুল দেখছি। কিন্তু একজন ফটোগ্রাফার হিসেবে আমার চোখ তো মানুষের ফেস কাটিং আর স্ট্রাকচার খুব ভালো চেনে। দূর থেকে দেখলে আমার সত্যি মনে হয় তোমাদের মাঝে দারুণ মিল আছে।"

শাকিরা লিওনার্দোর এই অদ্ভুত কথা আর বাড়াতে চাইল না। সে আসল পরিচয়টা পরিষ্কার করার জন্য বলল, "না, মিল থাকার কোনো কারণ নেই। ও আসলে আমার হাজব্যান্ডের ভাইয়ের বউ। আর ওরা তিনজন আসলে পিঠাপিঠি কাজিন এলোরা হচ্ছে জয়হানের কাজিন বোন।"

লিওনার্দো এবার দুই ভ্রু কুঁচকে কপালে হাত দিয়ে বলল, "ওয়েট... জয়হান কে?।"
শাকিরা বলল" জয়হানের বউ।"

"যাকে আমি তোমার বোন ভাবছিলাম, তার হাজব্যান্ড আর সে নিজেরা কাজিন? মানে ভাই-বোন?"।

শাকিরা একটু হেসে বলল, "হ্যাঁ, জয়হান হচ্ছে এলোরার হাজব্যান্ড। ওরা সম্পর্কে চাচাতো ভাই-বোন হয়।"

লিওনার্দোর চোখ তো এবার চড়কগাছ! সে ইতালির মানুষ, তাদের কালচারে কাজিনদের মাঝে বিয়ে হওয়াটা বেশ অদ্ভুত আর বিরল। সে চরম অবাক হয়ে বলল, "ওহ গড! মুসলিম কালচারে কাজিনদের মাঝে বিয়ে করা যায়? ইটস লিগ্যাল?"

শাকিরা মাথা নেড়ে বলল, "হ্যাঁ, আমাদের ধর্মে আর সমাজে এটা এক্কেবারে বৈধ এবং খুব সাধারণ একটা বিষয়।"

লিওনার্দো একটু ভাবুক হয়ে মাথা দোলালো। তারপর হঠাৎ শাকিরার দিকে একটু ঝুঁকে কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, "আহা, চমৎকার! তাহলে তুমিও কি তোমার কোনো কাজিনকে বিয়ে করেছ? ওই যে কাল রাতে যে রাগী ছেলেটা তোমাকে কাঁধে তুলে নিয়ে গেল—ও কি তোমার কাজিন?"

রিজবির কথা মনে পড়তেই শাকিরার বুকটা আবার অভিমানে ছ্যাৎ করে উঠল। সে চোখ নামিয়ে মৃদু গলায় বলল, "না... রিজবি আমার কাজিন না।"

লিওনার্দো পকেটে হাত দিয়ে বালির ওপর এক কদম এগিয়ে এসে বলল, "তাহলে তোমাদের গল্পটা কেমন ছিল? কীভাবে তোমাদের শুরু হয়েছিল? হাউ ডিড ইউ গাইস মিট?"

শাকিরা সাগরের ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে নিজের অতীতের সেই সুন্দর দিনগুলোর কথা মনে করতে লাগল। তখনো তো রিজবি তাকে এত ঘৃণা করত না। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নরম গলায় বলতে লাগল:

"আমাদের প্রথম দেখা হয়েছিল আমার কলেজে। আমি তখন যেখানে পড়াশোনা করতাম, রিজবি সেখানে প্রায়ই আসত। ও তখন থেকেই বেশ বড় লেভেলের রাজনীতি করত, কলেজের ছাত্রনেতা ছিল। সেই রাজনীতির সূত্র ধরেই কলেজের বিভিন্ন প্রোগ্রামে ওর আসা-যাওয়া হতো। ওখানেই একটা অনুষ্ঠানে আমাদের প্রথম পরিচয়।"

শাকিরা একটু থেমে, ঠোঁটের কোণে একটা মলিন হাসি ফুটিয়ে আবার বলল, "পরিচয় থেকে আস্তে আস্তে কথা বলা, তারপর আমাদের মাঝে ভালোবাসা শুরু হয়। প্রায় তিন বছর আমরা চুটিয়ে প্রেম করেছি। আমাদের সম্পর্কটা তখন বড্ড সুন্দর ছিল... তারপর এই মাসেই আমাদের বিয়ে হয়ে যায়।"

বলতে বলতে শাকিরার চোখটা আবার ছলছল করে উঠল। যে ছেলেটা তিন বছর ধরে তাকে পাওয়ার জন্য পাগল ছিল, কলেজের বড় লিডার হয়েও শাকিরার একটা হাসির জন্য উন্মুখ হয়ে থাকত—সেই রিজবি আজ বিয়ের পর তাকে এতটা ঘৃণা করে! শাকিরা ভাবল, বিয়ের আগের সেই ভালোবাসার রিজবি আর আজকের এই নিষ্ঠুর রিজবির মাঝে আকাশ-পাতাল তফাত। লিওনার্দো শাকিরার এই হঠাৎ বদলে যাওয়া মুখের অভিব্যক্তি গভীর মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করতে লাগল। লিওনার্দো শাকিরার প্রেমের গল্প শুনে বেশ মুগ্ধ হওয়ার ভান করল। সে তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে হাত নেড়ে বলল,

"ওহ! লাভ স্টোরিটা তো আসলেই দারুণ! তা এই ভরদুপুরে তপ্ত বালুর ওপর দাঁড়িয়ে না থেকে চলো ওই শেডের নিচে কোথাও বসি।"

শাকিরা নিজের মনের অস্থিরতা কাটাতে আর একা থাকার একাকীত্ব থেকে বাঁচতে রাজি হয়ে গেল। তারা দুজন সৈকতের একপাশে ছাতার নিচে পাতা চেয়ারে গিয়ে বসল।
ঠিক তখনই অন্য দিক থেকে ধীর পায়ে এগিয়ে আসছিল এলোরা। জয়হানের বুকে পরম শান্তিতে ঘুমানোর পর কিছুক্ষণ আগেই তার ঘুম ভেঙেছে। ঘুম থেকে উঠেই সে ভাবল—সিঙ্গাপুরের এত সুন্দর একটা রিসোর্ট আর সমুদ্র সৈকত, এখানে এসে ঘরে বসে ঘুমালে তো পুরো ট্যুরটাই মাটি! তাই সে একটু ঘোরার জন্য রুম থেকে বের হয়েছিল। বের হয়ে প্রথমে সে শাকিরার খোঁজ নিতেই ওদের রুমে গিয়েছিল, কিন্তু সেখানে রিজবিকে একা বসে থাকতে দেখে আর শাকিরাকে না পেয়ে সে সৈকতের দিকে চলে আসে। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ এলোরার চোখ গেল ছাতার নিচে বসা দুটো মানুষের দিকে। ভালো করে তাকিয়ে সে তো এক্কেবারে অবাক! ওইদিনের সেই ইতালিয়ান ছেলেটার সাথে বেশ হাসিমুখে বসে গল্প করছে শাকিরা!

এলোরা আর এক মুহূর্ত দেরি না করে হনহন করে ওদের দিকে এগিয়ে গেল। কাছাকাছি গিয়ে সে শাকিরাকে উদ্দেশ্য করে একটু অবাক আর অভিমানের সুরে বলল, "আপু! তুমি এখানে? আমি তো তোমার রুমে গিয়ে তোমাকে হন্যে হয়ে খুঁজছিলাম!"

শাকিরা এলোরাকে দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলো। সে মুখে একটা হালকা হাসি ফুটিয়ে বলল, "হ্যাঁ আমিও ভাবছিলাম তোমাকে ডাকব। কিন্তু তুনি তো অঘোরে ঘুমাচ্ছিলে তাই আর তোমাদের ডিস্টার্ব করতে যাইনি।"
এলোরা পরক্ষণেই চোখ কুঁচকে লিওনার্দোর দিকে তাকাল। সে শাকিরার একদম কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে, বাংলায় বেশ ঝেড়ে বলল, "তা তো বুঝলাম আপু! কিন্তু এই বিদেশি বাঁদরের সাথে তুমি এখানে বসে বসে কী করছ?।"

শাকিরার ঠোঁটের কোণে একটা দুষ্টুমিভরা হাসি ফুটে উঠল। সে এলোরাকে চোখ টিপে ফিসফিস করে বলল, "আস্তে বল এলোরা! ও কিন্তু বাংলা বোঝে!"

এলোরা এক ঝটকায় চোখ বড় বড় করে নড়েচড়ে বসল। সে চরম ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলল, "অ্যাঁ! কী বললে? এই বিদেশিটা বাংলা বোঝে? ওহ আচ্ছা! তা এই খোট্টাকে বাংলা শেখাল কে শুনি?"

তাদের দুজনের এই ফিসফিসানি দেখে লিওনার্দো আর চুপ করে থাকতে পারল না। সে তার সেই অদ্ভুত ও ভাঙা ভাঙা উচ্চারণের মিষ্টি বাংলায় হেসে বলল, "আমি কোনো খোট্টা নই, সিস্টার-ইন-ল আর আমাকে কেউ বাংলা শেখায়নি, আমি নিজে গুগল থেকে বাংলা ভাষা শিখেছি। আই লাভ বাংলাদেশ!"

লিওনার্দোর মুখে স্পষ্ট বাংলায় ‘সিস্টার-ইন-ল’ আর ‘গুগল থেকে শেখা’র কথা শুনে এলোরা হা করে তাকিয়ে রইল। তার মুখের সমস্ত কথা যেন এক নিমেষে গায়েব হয়ে গেল! সে ভাবতেই পারেনি একটা ইতালিয়ান ছেলে এত সুন্দর করে তাদের নিজেদের ভাষায় এভাবে জবাব দেবে। শাকিরা এলোরার ওই বোকা বনে যাওয়া মুখটা দেখে অনেকক্ষণ পর মন খুলে খিলখিল করে হেসে উঠল। এলোরা চোখ দুটো গোল গোল করে লিওনার্দোর দিকে তাকাল। তার বাঙালি মনে ‘সিস্টার-ইন-ল’ শব্দটার আসল মানে নিয়ে একটু খটকা লাগল। সে কোমরে হাত দিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,

"কী বললে? সিস্টার-ইন-ল মানে কী, হুম? বাংলায় বলো!"

লিওনার্দো এলোরার এই জেরা দেখে শুধু মিটিমিটি হাসতে লাগল, কোনো উত্তর দিল না। শাকিরা তখন এলোরার হাতটা ধরে টেনে নিয়ে হেসে বলল, "আহা এলোরা, অনেক হয়েছে, আর জেরা করো না তো ওকে! চল, সকালের ব্রেকফাস্টের পর আর কিছুই খাওয়া হয়নি, পেটে চড়কগাছ নাচছে। আমরা তিনজন মিলে বরং ক্যাফেটেরিয়া থেকে কিছু খেয়ে আসি।"

তিনজনে মিলে রিসোর্টের সুন্দর ওপেন-এয়ার রেস্টুরেন্টের একটা টেবিল বেছে নিল। লিওনার্দো বেশ ভদ্রতা দেখিয়ে টেবিলের ঠিক মাঝখানের চেয়ারটায় বসল, আর তার দুই পাশে বসল শাকিরা ও এলোরা। ইতালিয়ান ছেলেটা শুধু দেখতেই সুদর্শন ছিল না, তার ম্যানার্স বা ভদ্রতাও ছিল চমৎকার। সে নিজেই খুব যত্ন করে চামচ দিয়ে শাকিরা আর এলোরার প্লেটে খাবার বেড়ে দিল। তারা তিনজন মিলে বেশ হাসিখুশি মুখে গল্প করতে করতে খাবার খেতে শুরু করল।

ঠিক তখনই দূর থেকে ধীর পায়ে সেই রেস্টুরেন্টের দিকে আসছিল জয়হান আর রিজবি। জয়হানের পরনে ক্যাজুয়াল শার্ট আর চোখে সানগ্লাস, আর পাশে থাকা রিজবির মুখটা তখনো রাগে আর হ্যাঙ্গওভারের যন্ত্রণায় থমথম করছে।হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ দুজনের চোখ গেল মাঝখানের ওই টেবিলটার দিকে। আর সেখানে তাকাতেই দুজন পুরুষই এক্কেবারে থমকে দাঁড়িয়ে গেল! জয়হানের শান্ত চোখের চাউনি এক নিমেষে গম্ভীর হয়ে উঠল, আর রিজবির ভেতরের রক্ত যেন রাগে টগবগ করে ফুটতে লাগল। সে দেখল—তার নিজের বিবাহিত বউ শাকিরা আর জয়হানের বউ এলোরা, দুজনে মিলে ওই বিদেশি ছেলেটার দুই পাশে বসে দিব্যি দাঁত কেলিয়ে হাসাহাসি করছে! আর ওই ছেলেটা কত বড় সাহস, তাদের প্লেটে খাবার তুলে দিচ্ছে!

রিজবি রাগে নিজের হাত দুটো শক্ত করে মুঠো পাকাল। সে জয়হানের দিকে তাকিয়ে চাপা অথচ তীব্র ক্ষোভের গলায় বলল, "ভাইয়া, দেখো! এই ছেলেটা কে? কাল মাঝরাতেও আমি স্পষ্ট দেখেছি, এই ব্যাটা সমুদ্রের পাড়ে শাকিরার একদম গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছিল। আর এখন ও আমাদের বাড়ির দুটো মেয়ের মাঝখানে নবাবের মতো বসে গিলেছে এর এত বড় সাহস হয় কী করে?"

জয়হান কোনো কথা বলল না, তবে তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সেও চোখ দুটো ছোট ছোট করে টেবিলের দিকে তাকিয়ে রিজবিকে বলল, "আমিও কিচ্ছু বুঝতে পারছি না রে রিজবি, কী হচ্ছে এসব! আর এই মেয়ে দুটোই বা কেমন, একটা বাইরের অচেনা ছেলেকে নিজেদের মাঝখানে এভাবে নবাবের মতো বসতে দিল কেন?"

দুই ভাইয়ের মনের ভেতর তখন এক চরম আগুন জ্বলছে। বিশেষ করে রিজবি, শাকিরার প্লেটে ওই ছেলের খাবার বেড়ে দেওয়া দেখে তার পুরো শরীর রি রি করে উঠছিল। সে আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে সোজা টেবিলের সামনে গিয়ে দড়াম করে এক হাত রাখল। সে রেস্টুরেন্টের বাকি মানুষের তোয়াক্কা না করে একদম কর্কশ গলায় চেঁচিয়ে বলল,

"এই চুদির ভাইটা কে, হ্যাঁ? কার পারমিশনে এখানে এসে বসেছিস?"

রিজবির মুখে এমন চরম বাংলা গালি শুনে শাকিরার তো চোখ কপালে! সে একবার ইতালিয়ান লিওনার্দোর দিকে তাকাচ্ছে, তো আরেকবার রাগে কাঁপতে থাকা রিজবির দিকে তাকাচ্ছে। ওদিকে এলোরা অবশ্য বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে নিজের প্লেটের নুডলস আর চিকেন বেশ মনমতো গপাগপ খেয়েই যাচ্ছে, যেন দুনিয়া উল্টে গেলেও তার খাওয়া থামবে না! লিওনার্দো রিজবির এই চিল-চিৎকার আর রাগ দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। সে তো গুগল থেকে সাধারণ কিছু বাংলা শিখেছে, কিন্তু 'চুদির ভাই'-এর মতো এই লেভেলের খাঁটি বাংলা গালির মানে তো আর গুগলে নেই! সে কিছু না বুঝে বোকার মতো শাকিরার দিকে তাকিয়ে ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করল,

"তোমার হাজব্যান্ড রাগ করে কী বলছে? ওটা কী শব্দ?"

শাকিরা এক চরম বিপাকে পড়ে গেল। সে ভাবল, এখন যদি এই রাগী রিজবির গালাগালির আসল মানে লিওনার্দোকে বুঝিয়ে বলে, তবে তো লিওনার্দো মাইন্ড করবে, আর এখানে একটা বিশাল মারামারি লেগে যাবে। তাই পরিস্থিতি সামাল দিতে সে চট করে একটা মিথ্যা বানিয়ে বেশ সিরিয়াস মুখে লিওনার্দোকে বলল,

"আরে না, ও খারাপ কিছু বলেনি। ও আসলে বলছে তুমি দেখতে খুব সুন্দর খুব হ্যান্ডসাম! তাই ও ওভাবে প্রশংসা করছে।"

শাকিরার এই চমৎকার ব্যাখ্যা শুনে লিওনার্দোর ফর্সা মুখটা খুশিতে ঝলমল করে উঠল। সে অত্যন্ত গর্বের সাথে চেয়ারে পিঠ ঠেকিয়ে রিজবির দিকে তাকিয়ে একগাল হেসে বলল, "থ্যাংক ইউ ব্রো তুমিও খুব চমৎকার!"

ওদিকে পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা জয়হান যখন দেখল রিজবি গালি দিল আর ওই বিদেশী সেটাকে প্রশংসা ভেবে রিজবিকে 'থ্যাংক ইউ' দিচ্ছে, সে আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। জয়হান এক হাত দিয়ে নিজের মুখ চেপে ধরে অন্য দিকে ঘুরে গেল। প্লেটে মুখ গুঁজে থাকা এলোরাও হাসির চোটে খকখক করে কেশে উঠল, সেও নিজের মুখ চেপে ধরে হাসতে লাগল। লিওনার্দো এবার আরও এক কাঠি বাড়িয়ে ভাঙা ভাঙা বাংলায় বুক ফুলিয়ে বলতে লাগল,

"দ্যাটস গুড সাউন্ড .. চুদির ভাই! ইউ আর অলসো চুদির ভাই, ব্রো!"

লিওনার্দোর মুখে নিজেকেই 'চুদির ভাই' শুনতে হবে—এটা রিজবি স্বপ্নেও ভাবেনি। সে এখন রাগ দেখাবে, নাকি হাসবে, নাকি লজ্জায় মাথা কুটবে—সেটার কোনো কূল-কিনারা খুঁজে পাচ্ছিল না। তার ফর্সা মুখটা রাগে আর চরম অস্বস্তিতে এক্কেবারে বেগুনী হয়ে গেল। স্বামীর এই চরম বলদামি আর নিজেদের ইজ্জত এভাবে পাংচার হতে দেখে শাকিরা এবার সত্যিই রেগে আগুন হয়ে গেল। সে ধপাস করে টেবিল থেকে উঠে দাঁড়িয়ে রিজবির মুখোমুখি হয়ে তীব্র ঝাঁঝালো গলায় বলল:

"অনেক নাটক হয়েছে রিজবি, এবার দয়া করে বন্ধ করো! তুমি নিজের মনটাকে যেমন নোংরা বানিয়ে রেখেছ, সবাইকে তেমন ভেবো না। আর এখানে তামাশা না বাড়িয়ে তুমি এখান থেকে যাও তো! প্লিজ, আমাকে একটু আমার মতো শান্তিতে থাকতে দাও!"

শাকিরার এই কড়া কথা আর চারপাশের লোকজনের তাকিয়ে থাকা দেখে রিজবি এবার সত্যি দমে গেল। সে লিওনার্দোকে একটা শেষ খুনে চাউনি দিয়ে, নিজের ইজ্জত বাঁচাতে জয়হানকে টেনে নিয়ে হনহন করে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে চলে গেল। রিজবি আর জয়হান রেস্টুরেন্ট থেকে চলে যাওয়ার পর শাকিরার মাথায় হঠাৎ একটা দারুণ বুদ্ধি খেলল। রিজবি তাকে প্রতিনিয়ত যে মানসিক অত্যাচার করে, তার একটা উচিত জবাব দেওয়া দরকার। সে লিওনার্দোর দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হেসে বলল,

"আচ্ছা লিওনার্দো, আজ থেকে আমরা কি ভালো বন্ধু হতে পারি? উইল ইউ বি মাই ফ্রেন্ড?"

লিওনার্দো শাকিরার এই প্রস্তাবে একগাল হেসে মাথা নেড়ে বলল, "ওহ শিওর! আজ থেকে আমরা চমৎকার বন্ধু।"

এলোরা তখনো তার চিকেন ফ্রাই চিবোচ্ছিল। বন্ধুদের এই চুক্তি দেখে সে হুট করে নিজের মুখ মুছে নড়েচড়ে বসল। সে একটু মন খারাপের ভান করে বলল, "এই! শুধু তোমরা দুজন বন্ধু হবে কেন? আমকেও নাও! আমারও কোনো ভালো বন্ধু নেই এখানে। আমিও তোমাদের বন্ধু হতে চাই।"

লিওনার্দো আর শাকিরা দুজনেই এলোরার এই কাণ্ড দেখে হেসে ফেলল। লিওনার্দো হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, "অবশ্যই, সিস্টার-ইন-ল! আমরা এখন তিনজন মিলে একটা দারুণ গ্যাং।"

ব্যস, যেই কথা সেই কাজ! তিনজনে মিলে খাওয়া-দাওয়া শেষ করেই পুরো রিসোর্ট আর সমুদ্র সৈকত জুড়ে দেদারসে ঘোরাঘুরি শুরু করে দিল। লিওনার্দো একজন প্রফেশনাল ফটোগ্রাফার হওয়ায় সে তার ক্যামেরা বের করে শাকিরা আর এলোরার নানারকম সুন্দর সুন্দর ছবি তুলতে লাগল। তারা কখনো সাগরের পানিতে পা ভিজিয়ে হাসছিল, আবার কখনো বালুর ওপর দৌড়াদৌড়ি করছিল। শাকিরা অনেকদিন পর নিজের ভেতরের সব কষ্ট ভুলে মন খুলে হাসছিল। ওদিকে রিসোর্টের একটা উঁচু বারান্দায় দাঁড়িয়ে দূরবীন ছাড়াই এই পুরো দৃশ্যটা দেখছিল জয়হান আর রিজবি। শাকিরাকে ওই বিদেশি ছেলের সাথে ওভাবে হাসতে আর ছবি তুলতে দেখে রিজবির ভেতরের হিংসার আগুন যেন এক্কেবারে দাবানল হয়ে উঠল। সে রাগে দাঁত কিড়মিড় করে বারান্দার রেলিংয়ে একটা ঘুষি মারল।

সে হনহন করে নিচে নামার জন্য পা বাড়িয়ে বলল, "না! আমি আর সহ্য করতে পারছি না ভাইয়া। এই শাকিরা দিন দিন বড্ড বেয়াদব হয়ে যাচ্ছে। আমার চোখের সামনে অন্য একটা পুরুষের সাথে ওভাবে আদিখ্যেতা করছে! আমি আজ ওই ব্যাটার হাড়গোড় একটাও আস্ত রাখব না।"

রিজবি যেমনই এক পা বাড়াল, জয়হান ঝট করে এসে তার শক্ত হাতটা চেপে ধরল। সে রিজবিকে টেনে একপ্রকার জোর করেই থামিয়ে দিল। জয়হান নিজের সানগ্লাসটা ঠিক করতে করতে অত্যন্ত গম্ভীর আর ঠান্ডা গলায় বলল:

"রিজবি, একদম থাম! মাথা গরম করে এখন ওখানে গিয়ে কোনো সিন ক্রিয়েট করতে যাস না। আমি তোকে বারণ করছি।"

রিজবি চোখ রাঙিয়ে বলল, "তুমি দেখতে পাচ্ছ না ভাইয়া, ওরা কীভাবে ঘুরছে? তোমার বউ এলোরাও তো আছে ওখানে!"

জয়হান একটা মৃদু দীর্ঘশ্বাস ফেলে সাগরের দিকে তাকাল। সে অত্যন্ত অভিজ্ঞ মানুষের মতো মাথা নেড়ে বলল:

"আমি সব দেখছি রিজবি। কিন্তু তুই খেয়াল করেছিস কি না জানি না, একজন পুরুষ হিসেবে আমি ওই ইতালিয়ান ছেলেটার চোখে আমাদের বউদের জন্য কোনো নোংরা চাউনি বা অতিরিক্ত ভালোলাগা দেখিনি। ও জাস্ট একজন ট্যুরিস্ট হিসেবে ওদের সাথে ফ্রেন্ডলি মিশছে। তাছাড়া, আমাদের তো এখানে আর থাকার কথা নেই, কাল সকালেই আমরা এখান থেকে চলে যাব। তাই এই শেষ মুহূর্তে একটা বিদেশি নাগরিকের সাথে ঝামেলা বাড়িয়ে ইন্টারন্যাশনাল

জয়হানের এই বাস্তব আর দূরদর্শী কথা শুনে রিজবি আর এগোতে পারল না। সে দূর থেকে শাকিরার সেই খিলখিল হাসির দিকে আরেকবার তাকাল। তার মনে এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি হতে লাগল—শাকিরাকে অন্য কারো সাথে দেখলে তার যেমন বুকটা ফেটে যায়, ঠিক তেমনি শাকিরার এই নিষ্পাপ হাসিটা তাকে এক অজানা মায়ায় টানে। কিন্তু নিজের অহংকারের কাছে হেরে গিয়ে রিজবি শুধু একটা তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে জয়হানের সাথে নিজের রুমের দিকে পা বাড়াল।
________________
বিনয় আর রোমান ভিড়ের একপাশ থেকে হেঁটে এসে ফাঁকা জায়গায় দাঁড়াল। চারপাশের কোলাহল এড়িয়ে বিনয় মুচকি হেসে রোমানের দিকে তাকাল।

"যারে ভালো লাগে, তার এলাকাটাও ভালো লাগে, রে ভাই!" বিনয় রোমানের কাঁধে একটা হালকা চাপ দিয়ে বলল।
রোমান একটা বাঁকা হাসি দিল। সে চারপাশটা একটু দেখে নিয়ে চাপাগলায় বলল, "হুম, যারে ভালো লাগে তার এলাকাও ভালো লাগে—এই ডায়লগটা ঠিক আছে। কিন্তু ওই ডায়লগের চক্করে পইড়াই তো তুই ওই এলাকার রাস্তার কুত্তাগুলারে পর্যন্ত বিস্কুট আর পাউরুটি খাওয়াইলি, তাই না? যাতে তোরে দেখলে ঘেউ ঘেউ না কইরা লেজ নাড়ায়! কিরে, মিথ্যা বললাম?"

বন্ধুর মুখে নিজের কীর্তির কথা শুনে বিনয় আর হাসি চেপে রাখতে পারল না। সে হাহা করে হেসে রোমানের পিঠ চাপড়ে দিল। রোমান এবার একদম রিল্যাক্সড মুডে চলে এলো। সে হঠাৎ করেই তার স্বাভাবিক গলার স্বর বদলে খাঁটি পুরান ঢাকার ভাষায় ফাজিলমি করে কথা বলা শুরু করল,
"আইলসামি করিস না তো পোলা! আমাগো লগে পাঙ্গা লইতে আইসো না। জিন্দেগীতে অনেক কিছু দেখছি, বুঝছস?"

বিনয় রোমানের মুখ থেকে হঠাৎ এমন চড়া আর অদ্ভুত টোনের ভাষা শুনে চোখ কপালে তুলে বলল, "আরে দোস্ত! তুই হঠাৎ এই ভাষায় কেন কথা বলোস?তোর কী হয়েছে?"

রোমান নিজের কলারটা একটু ঝাঁকিয়ে বুক ফুলিয়ে বলল, "আরে তুই বুঝবি না ব্যাটা! এইডা হইলো গিয়া আমার রক্তের টান! আমার দাদা আছিল পুরান ঢাকার খাস মানুষ। বাপের জন্মেও ওই রক্ত শরীর থেকে যাইবো না। রক্ত কথা কয় রে ভাই, রক্ত কথা কয়!"

বিনয় রোমানের এই 'রক্তের টান' দেখে হাসতে হাসতে প্রায় শেষ।ঠিক তখনই রোমান পকেট থেকে তার ফোনটা বের করল। বাজারে এত মানুষের হইচই আর চিল-চিৎকারের মাঝেই সে ফোনের সাউন্ড ফুল বাড়িয়ে দিয়ে একটা গান প্লে করল। গানটা বাজামাত্রই বিনয় দুই কানে হাত দিয়ে কয়েক কদম পিছিয়ে গেল। গানটা এতটাই অদ্ভুত, সস্তা আর চড়া সুরের ছিল যে, বাজারের যে কেউ শুনলে রোমানকে নির্ঘাত আস্ত একটা পাগল বা মেন্টাল ভাববে!

বিনয় চোখ-মুখ কুঁচকে কড়া গলায় বলল, "কিরে কুত্তা! তুই এই ভরবাজারে এসব কী মার্কা থার্ড ক্লাস গান শুনছিস? তোর কি মাথা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে? আর সবচেয়ে বড় কথা—তোর বউ জারা তোকে কিছু বলে না? ও এসব সহ্য করে কীভাবে?"

রোমান দাঁত কেলিয়ে হেসে গানটার ভলিউম আরেকটু বাড়িয়ে দিয়ে বলল, "আরে ধুর বোকা! জারা আবার কী বলবে? আমি কি জারার সামনে এসব গান শুনি নাকি? ওর সামনে তো আমি একদম ভদ্র লোক, ক্লাসিক্যাল ছাড়া কথাই বলি না! কিন্তু আড়ালে তো এই গায়িকা নার্গিসই আমার ক্রাশ, আমার ফেভারিট সিঙ্গার।"

বিনয় এবার নিজের কপালে হাত দিয়ে এক চরম তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে রোমানের দিকে তাকাল। সে মাথা নেড়ে অত্যন্ত আফসোসের সুরে বলল:

"ভাইরে ভাই! তোর এই চয়েস আর পছন্দের ওপর রাস্তার কুত্তা এসে মুতে দিয়ে গেছে! সত্যি বলছি, তোর রুচি এত খারাপ তা আমার জানা ছিল না। জারা যে কীভাবে তোর মতো একটা সস্তা রুচির টোয়াটোপ কোম্পানিকে ২৪ ঘণ্টা সহ্য করে, সেইটাই আমি ভাবি। ওর তো নোবেল প্রাইজ পাওয়া উচিত!"

বন্ধুর এমন জঘন্য অপমান শুনেও রোমান একটুও রাগ করল না। সে বরং আরও জোরে খেঁকখেঁক করে হেসে গান গাইতে গাইতে গেলো। সুযোগে রোমান আর বিনয় মিলে একটা চক্কর দিতে চলে গেল সুব্রতার বাড়ির সামনে। বিনয়ের মনে তখন সুব্রতাকে এক নজর দেখার জন্য তীব্র ব্যাকুলতা। সে গেটের দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে, যদি কোনোভাবে সুব্রতাকে বারান্দায় বা জানলায় দেখা যায়! ঠিক তখনই রোমানের পকেটে থাকা ফোনটা বিকট শব্দে বেজে উঠল। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রোমান তো এক্কেবারে গদগদ! সে জয়হানের নামটা বিনয়ের চোখের সামনে নাচিয়ে বুক ফুলিয়ে বলল,

"দেখলি দোস্ত? দেখলি সমন্ধির ভালোবাসা? হানিমুনে গিয়াও আমারে মিস করতে করতে পাগল হয়ে যাচ্ছে! একটু পর পরই আমাগোরে ফোন মারে।"

বিনয় সুব্রতার বাড়ির দিকে চোখ রেখেই রোমানকে একটা কনুইয়ের গুঁতো দিয়ে বলল, "চাপাটা একটু কমায়া মার শালা! ফোনটা রিসিভ কর আগে, নইলে ওপাশ থেকে জয়হান আবার খেপে বোম হবে।"

রোমান একগাল হেসে ফোনটা কান ধরে রিসিভ করল। সে একদম পুরান ঢাকার স্টাইলে গলার আওয়াজ চড়িয়ে বলল, "কিরে ব্যাটা! কী অবস্থা তোর? হানিমুন কেমন চলতাছে? দিন-রাত তো খালি রোমান্সই করতাছস মনে হয়, আমাদের কথা কি একটুও মনে পড়ে না?"

রোমানের এই ফাজিলমি শুনে ওপাশ থেকে জয়হান একদম গম্ভীর আর বিরক্ত গলায় চিল্লিয়ে উঠল, "শাট আপ, স্টুপিড ফালতু কথা বন্ধ করবি?"!

রোমান একটুও দমে না গিয়ে ফোনের স্পিকার অন করে বিনয়কে শোনাল, তারপর বলল, "আরে ভাই! একটু মুখ সামলে কথা বল। আমি এখন তোর একমাত্র আদরের বোনের জামাই! জামাই হিসেবে আমারে একটু রেসপেক্ট
দে,।"

ওপাশ থেকে জয়হান একটা তাচ্ছিল্যের তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল, "ওকে, শালা বোন জামাই! খুশি তো এবার? এই সম্মান তোকে দিলাম। এবার ফালতু প্যাচাল বন্ধ করে আমি যা বলছি, মন দিয়ে শোন।"

জয়হানের মুখ থেকে 'শালা বোন জামাই' শব্দটা শুনে রোমান বিনয়ের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল। সে ফিসফিস করে বলল, "দেখছস, শালার ব্যাটা সমন্ধি কেমন লাইনে আইছে!" তারপর ফোনে বলল, "হ্যাঁ, এবার কও ভাই, কী কাজের কথা কইবা?"

জয়হান ওপাশ থেকে বেশ সিরিয়াস গলায় বলতে লাগল

"শোন রোমান, তামাশা রাখ। তুই এখনই সোজা আমার অফিসে যা। অফিসে কিছু জরুরি ফাইল আর ইম্পর্ট্যান্ট কাজ পেন্ডিং পড়ে আছে। তুই গিয়ে ওই কাজগুলো একটু হ্যান্ডেল করবি আর সব শেষ করে রাখবি। আমরা তো আজই ঢাকা ফিরছি, বাড়ি যাওয়ার আগে আমার ওই আপডেটগুলো লাগবে।"

রোমান বুঝতে পারল জয়হান সত্যিই কাজের চাপে আছে। সে নিজের ফাজিলমি একপাশে সরিয়ে রেখে বেশ দায়িত্বশীল গলায় বলল, "ঠিক আছে ভাই, তুই কোনো টেনশন নিস না। তুই হানিমুন শেষ করে শান্তিতে দেশে ফিরতি থাক, আমি এখনই সোজা তোর অফিসে রওনা দিতাছি। সব কাজ এক্কেবারে নিখুঁতভাবে শেষ করে রাখব, তুই একদম চিন্তা করিস না।"

জয়হান ওপাশ থেকে জানিয়ে ফোনটা কেটে দিল। রোমান ফোনটা পকেটে রেখে বিনয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, "দেখলি তো? বোনের জামাইয়ের ক্ষমতা কত! জয়হান ও আমার ওপর কতটা ভরসা করে। চল দোস্ত, সুব্রতা দর্শনের পালা আজকের মতো এখানেই ইতি, এখন আমারে অফিসের দিকে ছুটতে হইবো!"

রোমান বিনয়ের কথার পিঠে আরও দুটো কড়া জবাব দেওয়ার জন্য মুখটা হাঁ করতেই বিনয় তার হাত চেপে ধরল। সে রোমানকে আর কথা বাড়ানোর সুযোগ না দিয়ে বলল, "চল চল, আর মুখ চালাইতে হইবো না। আগে জয়হানের অফিসে যাই, সেখানে গিয়ে কাজগুলা দেখে আসি। নইলে ভাইয়া ঢাকা নামার পর কাজের খবর না পাইলে আমাগো দুলাইন্যা পিটানি দিবো।"

দুই বন্ধু আর এক মুহূর্ত দেরি না করে সুব্রতার এলাকা ছেড়ে সোজা জয়হানের অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
অফিসে গিয়ে রাজকীয় এসি রুমে আরামদায়ক ঘূর্ণায়মান চেয়ারটায় বসতেই রোমানের ভেতরের সেই চিরচেনা পুরান ঢাকাইয়া নবাবী ভাবটা চাড়া দিয়ে উঠল। সে টেবিলের ওপর দুই পা তুলে দিয়ে হেলান দিয়ে বসল। তারপর চারপাশের চকচকে কাচের দেয়াল আর ফাইলের স্তূপের দিকে তাকিয়ে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে হঠাৎ খুব গম্ভীর আর দার্শনিকদের মতো মুখ করে বিনয়কে বলল, "

"জানস বিনয়? এই চেয়ারটায় বসলে আমার মাঝে মাঝে কী মনে হয়? আমার মনে হয়—আমি হইলাম এই বাংলার শেষ স্বাধীন নব

住所

Minato, Tokyo

ウェブサイト

アラート

It's moonがニュースとプロモを投稿した時に最初に知って当社にメールを送信する最初の人になりましょう。あなたのメールアドレスはその他の目的には使用されず、いつでもサブスクリプションを解除することができます。

共有する