25/01/2026
বিদেশি নাগরিক ও অভিবাসন সংক্রান্ত বিধিনিষেধ কঠোর করে নীতি প্যাকেজ ঘোষণা করেছে জাপান। শুক্রবার দেশটির সরকারের এ নতুন নীতিমালা ঘোষণা করা হয়। এতে নাগরিকত্ব (ন্যাচারালাইজেশন) প্রক্রিয়া আরও কঠিন করা ছাড়াও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে বহিষ্কারের (ডিপোর্টেশন) সংখ্যা দ্বিগুণ করার পরিকল্পনাও ।
সরকার ‘ক্যারেট অ্যান্ড স্টিক’ নীতির আওতায় একদিকে কঠোরতা আরোপের পাশাপাশি অন্যদিকে বিদেশি শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সমাজে ভালোভাবে একীভূত করতে জাপানি ভাষা শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার কথাও জানিয়েছে।
কিছু নীতির নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও সময়সীমা এখনও আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। এর মধ্যে বিদেশিদের জমি ও সম্পত্তি ক্রয়সংক্রান্ত নীতিও রয়েছে, যা আগামী গ্রীষ্মে চূড়ান্ত করা হবে।
এই বিষয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধান মন্ত্রিপরিষদ সচিব মিনোরু কিহারা বলেন,
“নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগ ও বৈষম্যের অনুভূতির প্রতিক্রিয়ায় আমরা এই নীতিপ্যাকেজ তৈরি করেছি। জাপানি নাগরিক ও বিদেশি উভয়েই যেন নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত বোধ করেন—সে লক্ষ্যেই মৌলিক নীতিমালা নির্ধারণ করা হয়েছে।”
কঠোর বিধিনিষেধ
৯৮ পৃষ্ঠার নীতিপ্যাকেজে বলা হয়েছে, ভিসার আবেদন বা নবায়নের সময় বিদেশি বাসিন্দাদের জন্য জাপানি ভাষা ও সামাজিক ব্যবস্থাবিষয়ক কোর্স গ্রহণ বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
বিশেষ করে আইন লঙ্ঘন, কর বকেয়া ও চিকিৎসা বিল অনাদায়ী থাকলে ভিসা আবেদন ও নবায়নের ক্ষেত্রে আরও কঠোর যাচাই করা হবে। স্থায়ী বসবাসের অনুমতি (পার্মানেন্ট রেসিডেন্সি) থাকা কোনো বিদেশি এ ধরনের অপরাধ করলে, তাঁদের স্ট্যাটাস বাতিল করার বিষয়েও সরকার বিবেচনা করবে। এ সংক্রান্ত নির্দেশিকা বর্তমানে প্রণয়নাধীন এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ২০২৭ সালের এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়ার কথা।
সরকার নাগরিকত্ব গ্রহণের শর্তও কঠোর করবে। বর্তমানে যেখানে ন্যূনতম পাঁচ বছর জাপানে বসবাস করলেই নাগরিকত্বের আবেদন করা যায়, সেখানে তা বাড়িয়ে কমপক্ষে ১০ বছর করার পরিকল্পনা রয়েছে। কিছু আইনপ্রণেতার মতে, ভোটাধিকার প্রদানকারী নাগরিকত্ব পার্মানেন্ট রেসিডেন্সির চেয়ে সহজ হওয়া উচিত নয়।
২০২৬ অর্থবছরে ভিসা ফি বাড়ানো হবে, যাতে অভিবাসন যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সরকারি সিস্টেম উন্নত করা যায়। জুন মাসে বিদেশি বাসিন্দার সংখ্যা রেকর্ড ৩৯ লাখে পৌঁছেছে, যা প্রশাসনিক চাপ বাড়িয়েছে।
ফি কত বাড়বে তা চূড়ান্ত না হলেও, ক্ষমতাসীন লিবারাল ডেমোক্রেটিক পার্টির আলোচনায় ভিসা ইস্যুর ফি ৩,০০০ ইয়েন থেকে বাড়িয়ে ১৫,০০০ ইয়েন এবং ভিসা নবায়নের ফি ৬,০০০ ইয়েন থেকে বাড়িয়ে ৪০,০০০ ইয়েন করার প্রস্তাব রয়েছে।
পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় জাপানের বর্তমান ভিসা ফি তুলনামূলকভাবে কম। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রে ভিসা নবায়নের ফি প্রায় ৪২০–৪৭০ ডলার এবং জার্মানিতে ৯৩–৯৮ ইউরো।
সরকার ২০২৭ সালের মধ্যে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে বহিষ্কারের সংখ্যা দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা করেছে, যাতে বহিষ্কার আদেশ অমান্যকারীদের সংখ্যা কমানো যায়। ২০২৪ সালে এ ধরনের বহিষ্কারের সংখ্যা ছিল ২৪৯টি।
যেসব বিদেশি ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়া বা অপরাধের কারণে দেশ ছাড়ার আদেশ পেলেও তা মানেন না, সরকার তাদের জন্য বিমান টিকিট কিনে নিজ দেশে ফেরত পাঠায়—পরিস্থিতি অনুযায়ী একা অথবা ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার এসকর্টের মাধ্যমে।
গত বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ২০৩টি রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে বহিষ্কারের মধ্যে তুরস্কের নাগরিকদের সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি (৪১ জন), এরপর ফিলিপাইনের (৩২ জন) এবং শ্রীলঙ্কার (২৭ জন) নাগরিক।
জাপানি ভাষা শিক্ষা কর্মসূচি
ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা বিদেশিদের জন্য বড় সমস্যা হওয়ায় সরকার বিদেশে জাপানি ভাষা শিক্ষা কর্মসূচি জোরদার করতে চায়, যাতে জাপানে প্রবেশের আগেই প্রস্তুতি নেওয়া যায়। পাশাপাশি অভিবাসী শিশুদের জন্য প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাও উন্নত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
অনেক বিদেশি বাসিন্দা পর্যাপ্ত জাপানি ভাষা শিক্ষার সুযোগ পান না, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায়। ২০২৪ অর্থবছরে ৩৮.২% পৌরসভায় স্থানীয় সরকার বা বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে কোনো জাপানি ভাষা কোর্স ছিল না।
এই পৌরসভাগুলোতে বিদেশি বাসিন্দার সংখ্যা ছিল ১,৭০,৪৫৫ জন, যা আগের বছরের তুলনায় ২১% বেশি। প্রিফেকচারভিত্তিক হিসাবে ওকিনাওয়ায় সর্বোচ্চ ৮১% পৌরসভায় ভাষা কোর্স নেই, এরপর তোত্তোরি (৭৪%) এবং হোক্কাইডো (৭১%)।
২০২৭ সালে বিতর্কিত টেকনিক্যাল ইন্টার্ন প্রোগ্রামের পরিবর্তে চালু হতে যাওয়া নতুন ব্যবস্থার আওতায় আসা বিদেশি শ্রমিকদের জন্য এই আগস্ট থেকে Japan Foundation Test for Basic Japanese (জাপানি ভাষা দক্ষতা পরীক্ষা) দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হবে।
রিয়েল এস্টেট ও জমি ক্রয়
বিদেশিদের দ্বারা জমি ও রিয়েল এস্টেট ক্রয়ের বিষয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকবে। এ বিষয়ে গ্রীষ্মে একটি পৃথক নীতিমালা প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে। আপাতত সরকার বিদেশিদের কন্ডোমিনিয়াম মালিকানা ও ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ শুরু করবে।
দূরবর্তী দ্বীপগুলো বিদেশিদের দ্বারা কেনা নিয়ে উদ্বেগের প্রেক্ষিতে, সরকার এসব দ্বীপ রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করছে।
গত অক্টোবরে ইয়ামাগুচি প্রিফেকচারের সুয়ো-ওশিমা শহরের এক বাসিন্দা প্রায় ৫,৬০০ স্বাক্ষরসহ একটি পিটিশন দাখিল করেন, যেখানে এক চীনা নাগরিক শহরের কাসাসা দ্বীপে ৩,৭০০ বর্গমিটার জমি কেনার পর বিদেশিদের রিয়েল এস্টেট ক্রয়ে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের দাবি জানানো হয়।
বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে যে বিদেশি মালিকানা নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, কারণ দ্বীপটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও জাপানের আত্মরক্ষা বাহিনীর ঘাঁটির কাছাকাছি অবস্থিত।