01/10/2026
এই যে ইউরোপে আসলাম, একটা জিনিস আমার সত্যিই খারাপ লাগে। সারা বাংলাদেশের মানুষকে আমি লিথুয়ানিয়াতে খুঁজে পাই, ছোট ছোট জেলা, উপজেলা ভিত্তিক গ্রুপ দেখি, মানুষজন একে অপরকে চেনে, সাহায্য করে। ঢাকা, বগুড়া, রাজশাহী, সিলেট, চাঁদপুর, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম—কোন জেলার মানুষ নাই! কিন্তু কুষ্টিয়ার মানুষ খুঁজতে গেলে এমন অবস্থা, মনে হয় কুষ্টিয়া থেকে কেউ ইউরোপেই আসে নাই। এমন না যে পুরো ইউরোপে কুষ্টিয়ার মানুষ নাই, অবশ্যই আছে, কিন্তু পরিমাণটা অনেক কম। বিশেষ করে লিথুয়ানিয়াতে তো আমি অনেকদিন ধরে খুঁজতেছি, ভেড়ামারার একটা মানুষ পাই না। মাঝে মাঝে মনে হয়, ভাই আমরা কি দেশের মানচিত্রে আছি নাকি নাই! 😐
আমি যখন প্রথম লিথুয়ানিয়াতে আসি, তখন অনেকেই আমাকে মেসেজ দিতো, ফোন দিতো—ভাই কিভাবে আসবো, কোন ইউনিভার্সিটিতে যাবো, কত টাকা লাগবে, কি কি ডকুমেন্ট লাগবে, ভিসা কেমন হয়। আমি আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে যতটুকু জানতাম, সবাইকে বলতাম। কাউকে বলতাম এইটা করেন, ওইটা করেন, এই জায়গায় ভুল করবেন না, এই ডকুমেন্ট আগে রেডি করেন। অনেকে কয়েকদিন কথা বলে আবার হারায়া যেত। পরে কয়েক মাস পর মেসেজ দিয়ে বলতো, ভাই ঢাকার একটা এজেন্সিতে সব জমা দিছিলাম, এত টাকা খরচ করলাম, এখন ভিসা রিজেক্ট খাইছি। কেউ হাঙ্গেরি, কেউ মাল্টা, কেউ পোল্যান্ড, কেউ লিথুয়ানিয়া—উদ্দেশ্য একটাই, যেভাবেই হোক ইউরোপে ঢুকতে হবে।
একটা সময় ছিল যখন লিথুয়ানিয়া স্টুডেন্টদের জন্য ভালো একটা সুযোগ ছিল। তুলনামূলক কম টিউশন, ভালো ইউনিভার্সিটি, পড়াশোনার পাশাপাশি কাজের সুযোগ, ইউরোপে থাকার সুযোগ—সব মিলায়া একটা ভালো রাস্তা ছিল। তখন আমি লিথুয়ানিয়াতে বসে ঢাকার, বগুড়ার, রাজশাহীর কত স্টুডেন্টকে গাইডলাইন দিছি, অনেককে লিথুয়ানিয়াতে আনছি। অথচ নিজের কুষ্টিয়ার মানুষজনকে খুঁজে পাই না। আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার কী জানেন? ভেড়ামারা কুষ্টিয়ার কেউ মেসেজ দিবে, ফোন দিবে, সবকিছু জিজ্ঞেস করবে, কি লাগবে, কত টাকা লাগবে, কোন ইউনিভার্সিটি, কিভাবে আবেদন করবে—সব তথ্য আমার কাছ থেকে নিবে। তারপর সেই তথ্য নিয়ে ঢাকায় অফিস করে বসে থাকা সুন্দরী মেয়ে দিয়ে consultation করাবে। 😂
আমি এজেন্সির বিরুদ্ধে কিছু বলতেছি না। যার যেভাবে ভালো লাগে, যেভাবে comfortable মনে হয়, সেভাবেই যাবে। কিন্তু ভাই, নিজের এলাকার একজন মানুষ বিদেশে বসে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে যদি আপনাকে বলে দেয় কী করতে হবে, কী করতে হবে না, কোথায় ভুল করলে সমস্যা হবে, কোন জিনিস আগে রেডি করতে হবে—তাহলে অন্তত কথাগুলো একটু মাথায় রাখেন। শুধু মিষ্টি কথা আর সুন্দর presentation শুনে documents আর টাকা দিয়ে দেন, পরে যখন সমস্যা হয় তখন বলেন, ভাই আমারে একটু দেখেন।
আর আমাদের কুষ্টিয়ার মানুষের একটা জিনিস আমার কাছে অনেক অদ্ভুত লাগে। নিজের এলাকার কারো মাধ্যমে বিদেশে গেলে মনে হয় মান-সম্মান কমে যাবে! মানুষ বলবে, অমুকের মাধ্যমে গেছে। আরে ভাই, বিদেশে আসার পর কেউ জিজ্ঞেস করবে না আপনি কার মাধ্যমে আসছেন। আপনার নিজের যোগ্যতা আছে কিনা, পড়াশোনা করতে পারেন কিনা, কাজ পারেন কিনা, নিজের খরচ চালাতে পারেন কিনা—এইগুলা দেখবে। আপনি কার কাছ থেকে information নিলেন সেটা কেউ দেখবে না। বরং নিজের মানুষজনের কাছ থেকে সঠিক information নিয়ে যদি একটা ভুল থেকে বাঁচতে পারেন, সেটাই লাভ।
আমি লিথুয়ানিয়াতে বসে সবসময় কুষ্টিয়ার মানুষ খুঁজি। মনে হয়, একটা মানুষ যদি পাওয়া যায়, তার সাথে বসে কথা বলবো, এলাকার কথা বলবো, বলবো ভাই তুই কোন জায়গার, আমি কোন জায়গার। কিন্তু তেমন মানুষ পাই না। অথচ এখন লিথুয়ানিয়াতে মানুষে মানুষে ভরা। ঢাকা থেকে মানুষ আছে, রাজশাহী থেকে আছে, সিলেট থেকে আছে, চট্টগ্রাম থেকে আছে, চাঁদপুর থেকে আছে, কুমিল্লা থেকে আছে। শুধু কুষ্টিয়ার মানুষ খুঁজলে মনে হয় network connection নাই।
আরেকটা জিনিস খুব বেশি দেখি—আমাদের অনেকেই সময়ের value বুঝে না। সুযোগ যখন থাকে তখন কেউ গুরুত্ব দেয় না। এক বছর আগে বলতেছি, IELTS শুরু করেন, bank account করেন, documents গোছান, preparation নেন। তখন বলে ভাই পরে করবো, এখন তো সময় আছে। সেই “পরে” করতে করতে এক বছর চলে যায়। এক বছর পর আবার এসে বলে, ভাই বিদেশ যেতে হলে কী কী লাগে? তখন আসলে হাসবো না কান্দবো বুঝি না। ভাই, এক বছর আগে যখন বলছিলাম তখন যদি একটু সিরিয়াস হইতেন, আজকে আপনার অর্ধেক কাজ শেষ থাকতো।
বিদেশ যাওয়ার preparation মানে আজকে সিদ্ধান্ত নিলাম আর কালকে চলে আসলাম—এমন না। আগে থেকে প্রস্তুতি নিতে হয়। IELTS লাগলে IELTS, bank history লাগলে bank, academic documents লাগলে documents, passport লাগলে passport—যেটা লাগবে সেটা সময়মতো করতে হয়। কারণ opportunity সবসময় একই রকম থাকে না। আজকে যে university সহজে admission দিচ্ছে, কালকে হয়তো requirement বাড়াবে। আজকে যে country-তে visa পাওয়া comparatively সহজ, কালকে হয়তো situation change হয়ে যাবে। এই জিনিসটা আমাদের অনেকেই বুঝতে চায় না।
গত September intake-এ শুধু কুষ্টিয়া জেলা থেকেই আমার কাছে ২০০+ student যোগাযোগ করছে। একজন না, দুইজন না—শত শত মানুষ। সবাই জানতে চায় কীভাবে যাবে, কী লাগবে, কোন university, কত টাকা, visa কেমন। আমি আমার জায়গা থেকে সবাইকে guideline দিছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মাত্র ৪ জন আমার কাছে ঠিকঠাকভাবে documents গুছিয়ে দিছে। বাকি সবাই information নিলো, কথা বললো, তারপর যার যার মতো হারায়া গেল। কেউ পরে আসবে, কেউ agency খুঁজবে, কেউ আবার বলবে এখন টাকা নাই, পরে করবো। এই “পরে করবো” করতে করতেই সুযোগ চলে যায়।
এখন আবার এমনও ফোন আসে, আগে student হিসেবে Lithuania আসতে চেয়েছিল, তখন আমি বলছিলাম পড়াশোনার জন্য preparation নেন। তখন কোনো গুরুত্ব নাই। এখন ফোন দিয়ে বলে, ভাই টাকা যত লাগে লাগুক, work visa করা যায় না Lithuania-তে? তখন সত্যি মাথায় হাত দিয়া বসতে হয়। যখন student হিসেবে আসার সুযোগ ছিল তখন preparation নাই, এখন student route কঠিন হইছে তখন work visa চাই। ভাই, জীবন তো Facebook-এর reel না যে যখন যেটা মনে হইলো সেটাই করলেন আর হয়ে গেল।
আর এখন Lithuania-র situation আগের মতো না। টাকা থাকলেই হবে এমন না। University এখন student-এর profile দেখে, academic background দেখে, English দেখে, documents দেখে, eligibility দেখে। মানে শুধু টাকা আছে বললেই হবে না। আপনার যোগ্যতা থাকতে হবে, proper documents থাকতে হবে, সময়মতো preparation থাকতে হবে। Visa পাওয়া একটা ব্যাপার, কিন্তু তার আগে ভালো একটা university-তে admission পাওয়াটাও এখন অনেক বড় ব্যাপার।
আমার কথা কুষ্টিয়ার ভাই-বোনদের জন্য। নিজেকে ছোট ভাববেন না। ঢাকা থেকে পারে, রাজশাহী থেকে পারে, বগুড়া থেকে পারে, সিলেট থেকে পারে—কুষ্টিয়ার মানুষ কেন পারবে না? আমাদের সমস্যা যোগ্যতার অভাব না, আমার মনে হয় information আর planning-এর অভাব বেশি। কেউ একটা কথা বললে সেটা যাচাই না করে বিশ্বাস করেন, আবার নিজের এলাকার কেউ information দিলে সেটার value দেন না। এক বছর আগে যেটা করা দরকার সেটা করেন না, deadline আসার পর দৌড়াদৌড়ি শুরু করেন।
বিদেশে আসার জন্য কারো পা ধরতে হবে না, আবার কাউকে ছোটও করতে হবে না। নিজের যোগ্যতা থাকলে নিজের যোগ্যতায় আসবেন। কিন্তু information নিতে লজ্জা পাওয়ার কিছু নাই। নিজের এলাকার একজন মানুষ আগে আসছে, experience করছে, ভুল করছে, শিখছে—সে যদি আপনাকে সেই ভুল থেকে বাঁচাতে চায়, তার কথাটা শুনেন। নিজের টাকা, নিজের সময়, নিজের future—শেষ পর্যন্ত ক্ষতি আপনারই হবে।
আমি চাই লিথুয়ানিয়াতে একদিন কুষ্টিয়ার একটা ভালো community হোক। ভেড়ামারা, কুষ্টিয়া সদর, মিরপুর, দৌলতপুর, কুমারখালী, খোকসা—সব জায়গার মানুষ থাকুক। নতুন কেউ আসলে airport থেকে শুরু করে accommodation, university, job—যেটুকু সম্ভব সবাই সবাইকে সাহায্য করুক। কারণ বিদেশে নিজের এলাকার একটা মানুষ পাওয়া, এই জিনিসটা দেশে থাকতে যতটা সাধারণ মনে হয়, বিদেশে আসার পর ততটাই important মনে হয়।
আর একটা কথা মনে রাখবেন—Information একটা বড় হাতিয়ার। আপনার কাছে টাকা থাকতে পারে, কিন্তু information না থাকলে সেই টাকা ভুল জায়গায় চলে যেতে পারে। আপনার যোগ্যতা থাকতে পারে, কিন্তু timeline না বুঝলে opportunity মিস করতে পারেন। আপনার বিদেশ যাওয়ার অনেক ইচ্ছা থাকতে পারে, কিন্তু preparation না থাকলে শুধু ইচ্ছা দিয়ে কিছু হবে না।
তাই যারা সত্যিই বিদেশ আসতে চান, আজকে থেকেই preparation নেন। IELTS লাগলে IELTS করেন, bank account দরকার হলে করেন, documents গোছান, university requirement দেখেন, নিজের profile বুঝেন। “আগামী মাসে করবো”, “পরে করবো”, “সময় আছে”—এই কথাগুলো বলতে বলতে যেন একদিন দেখেন সুযোগটাই আর নাই।
আর হ্যাঁ, কুষ্টিয়ার মানুষ যদি লিথুয়ানিয়াতে থাকেন, আমাকে খুঁজে বের করেন। 😂 অনেকদিন ধরে খুঁজতেছি। মাঝে মাঝে মনে হয়, ভেড়ামারা থেকে লিথুয়ানিয়া পর্যন্ত কোনো direct connection-ই নাই!
কুষ্টিয়ার মানুষ কম না, মানুষ আছে। শুধু আমরা একে অপরকে খুঁজে পাই না। আর যারা আসতে চায়, তাদের বলবো—নিজের যোগ্যতার উপর বিশ্বাস রাখেন, কিন্তু information আর preparation-কে হালকা করে দেখবেন না।
কারণ সুযোগ যখন সামনে থাকে তখন আমরা দাম দিই না। আর সুযোগ চলে গেলে তখন বলি—“ভাই, একটু আগে যদি জানতাম!”
এই “আগে জানতাম না” কথাটা যেন আর কোনো কুষ্টিয়ার পোলাপানের মুখে শুনতে না হয়।