05/08/2026
অর্থকথা কেন গুরুত্বপূর্ণ
অনেকেই বলেন অর্থকথা বুদ্ধবাণী নয়। তাদের বক্তব্যে আমি একমত নই। কারণ বুদ্ধ কখনো কখনো সংক্ষেপে ধর্মদেশনা দেন। উদারণস্বরূপ মধুপিণ্ডিক সূত্রের কথা ধরা যাক। সেখানে বুদ্ধের সংক্ষিপ্ত উপদেশ বুঝতে না পেরে ভিক্ষুরা গিয়েছিল মহাকচ্চান ভান্তের কাছে। মহাকচ্চান ভান্তে তাদেরকে বুঝিয়ে দেওয়ার পরে তারা আবার গেল বুদ্ধের কাছে। বুদ্ধ বললেন, হে ভিক্ষুগণ, মহাকচ্চান হচ্ছে পণ্ডিত, মহাপ্রজ্ঞাবান। আমাকে এর অর্থ জিজ্ঞেস করলে আমিও সেভাবেই ব্যাখ্যা করতাম। সেটিকে তোমরা সেভাবেই গ্রহণ করো।
এভাবে বুদ্ধ মহাকচ্চান ভান্তের কথাকে অনুমোদন করেছিলেন। সেটি তো শুধু ত্রিপিটকে উল্লেখ করা হয়েছে বলে আমরা এই আড়াই হাজার বছর পরেও জানতে পারছি, কিন্তু ত্রিপিটকে এই সূত্রের ব্যাখ্যা উঠে না আসলে সেটি কীভাবে বুঝা সম্ভব হতো? তখন এক পণ্ডিত বলতেন এক কথা, আরেক পণ্ডিত বলতেন আরেক কথা। সে-রকম যাতে বুদ্ধবাণীর অর্থের বিকৃতি না হয় সেই উদ্দেশ্যে সেই প্রথম সঙ্গীতির পাঁচশজন অর্হৎ কর্তৃক অর্থকথা নির্ধারিত করা হয়েছে।
পারাজিকা অর্থকথায় বলা হয়েছে, ভগবানের অভিপ্রায় জেনে উপালি থেরো প্রমুখগণ কর্তৃক অর্থকথা রেখে দেওয়া হয়েছে। এই প্রথম সঙ্গীতিকারক মহাথেরোগণ সবাই ছিলেন প্রতিসম্ভিদাপ্রাপ্ত অর্হৎ। তাই তাঁরা জানতেন, বুদ্ধ কোন কথার মাধ্যমে কী বুঝিয়েছেন, কোন শব্দের অর্থ কী হবে।
এ কারণেই চূলগ্রন্থবংশে বলা হয়েছে, কারা প্রাচীন আচার্য? সেই পাঁচশজন অর্হৎ, যারা (প্রথম সঙ্গীতিতে) পাঁচটি নিকায়ের নাম, অর্থ, অভিপ্রায়, তার বানান সংশোধনসহ অবশিষ্ট কাজ করেছিলেন। কাদের জন্য তারা এত কষ্ট স্বীকার করতে গেলেন? আমি তো বলি, তারা এই আমাদের জন্যই এত কষ্ট স্বীকার করেছেন। অথচ এখন আমরা তাদের কথাগুলোকে পর্যন্ত অস্বীকার করতে বসেছি।
ধর্মপদের গাথাগুলো দেখুন, জাতকগুলো দেখুন। মূল ত্রিপিটকে সেগুলো কেবল গাথা আর গাথা। সেগুলো যে বুদ্ধ কী উদ্দেশ্যে কখন কোথায় কাকে বলেছেন তার কোনো হদিশ মেলে না। অথচ জাতক হচ্ছে বুদ্ধবাণীর নয়টি অংশের মধ্যে অন্যতম। তাহলে সেগুলো কোথায় জানা যাবে? এর একমাত্র ভরসা হচ্ছে সেই প্রাচীন অর্হৎদের রেখে যাওয়া অর্থকথা।
অর্থকথা ছাড়া বুদ্ধবাণীকে বুঝতে গেলে পদে পদে ভুল বুঝার সম্ভাবনা। ত্রিপিটকের বিভিন্ন সূত্রের পটভূমি, পালি শব্দগুলোর অর্থ ও অভিপ্রায় এই অর্থকথা পড়লে তবেই মালুম হয়।
উদাহরণ হিসেবে দেখুন সূত্রপিটকের সংযুক্তনিকায়ের দেবতা-সংযুক্তের সূত্রগুলো। দেবতা-সংযুক্তের প্রথম সূত্রটি হচ্ছে ওঘতরণ সূত্র, সোজা বাংলায় প্লাবন উত্তীর্ণ সূত্র। এক দেবতা গভীর রাতে আবির্ভূত হয়ে বুদ্ধকে জিজ্ঞেস করলেন, মহাশয়, কীভাবে আপনি প্লাবন উত্তীর্ণ হলেন?
বুদ্ধ বললেন, বন্ধু, না দাঁড়িয়ে, না সাঁতরে আমি প্লাবন উত্তীর্ণ হয়েছি।
দেবতা আবার জিজ্ঞেস করলেন, মহাশয় কীভাবে না দাঁড়িয়ে, না সাঁতরে আপনি প্লাবন উত্তীর্ণ হলেন?
বুদ্ধ বললেন, হে বন্ধু, যখন আমি দাঁড়িয়ে থাকি, তখন ডুবে যাই। যখন সাঁতার কাটি, তখন ভেসে যাই। এভাবেই না দাঁড়িয়ে, না সাঁতরে আমি প্লাবন উত্তীর্ণ হয়েছি।
দেবতা বুঝ পেয়ে বুদ্ধকে অভিবাদন করে সেখানেই অন্তর্হিত হয়ে গেল।
কী বুঝা গেল? কিছুই বুঝা গেল না। অন্তত আমি কিছুই বুঝিনি। প্লাবন হচ্ছে বন্যা। সেই বন্যায় হয় দাঁড়াবেন, নয় ভেসে যাবেন। না দাঁড়িয়ে না ভেসে কীভাবে বন্যা থেকে উদ্ধার পাওয়া যায় তা আমার মাথায় ঢোকে না। নাকি হেলিকপ্টারে করে উদ্ধারের কথা বলেছেন বুদ্ধ?
যাঁরা জ্ঞানী তাঁরা হয়তো এর অর্থ বুঝবেন। কিন্তু আমাকে এর অর্থ বুঝিয়ে দেবে কে? অনুমানে একটা কিছু ধরে নেওয়া যায়। কিন্তু বুদ্ধ যে সেই অর্থেই বুঝিয়েছেন, তার নিশ্চয়তা দেবে কে?
এ কারণেই অর্থকথার দ্বারস্থ হতে হয়। এই সূত্রের অর্থকথা কী বলছে? সেখানে ব্যাখ্যা করা হয়েছে কেন বুদ্ধ এমন হেঁয়ালি করে উত্তর দিয়েছেন। এই দেবতা নিজেকে খুব জ্ঞানী মনে করত, পণ্ডিত মনে করত। তার মান নির্মূলের জন্যই বুদ্ধ এমন হেঁয়ালির ছলে উত্তর দিয়েছেন।
সাধারণ জ্ঞানেই তো বুঝা যায়, প্লাবন উত্তীর্ণ হতে হলে সাঁতরাতে হবে, অন্য কথায় প্রচেষ্টা করতে হবে। প্রচেষ্টা ছাড়া কীভাবে প্লাবন উত্তীর্ণ হতে পারে কেউ? অথচ বুদ্ধ বললেন, বন্ধু, না দাঁড়িয়ে, না সাঁতরে আমি প্লাবন উত্তীর্ণ হয়েছি।
এর মানে কী? তাই দেবতা আবার জিজ্ঞেস করলেন, মহাশয় কীভাবে না দাঁড়িয়ে, না সাঁতরে আপনি প্লাবন উত্তীর্ণ হলেন?
তখন বুদ্ধ বললেন, হে বন্ধু, যখন আমি দাঁড়িয়ে থাকি, তখন ডুবে যাই। যখন সাঁতার কাটি, তখন ভেসে যাই। এভাবেই না দাঁড়িয়ে, না সাঁতরে আমি প্লাবন উত্তীর্ণ হয়েছি।
তখন দেবতা বুঝে গেল। কলুষতার উপর দাঁড়িয়ে থাকলে তখন সংসারে ডুবে যাওয়া হয়। নিত্য নতুন সৃষ্টির প্রচেষ্টায় থাকলে সংসারে ভেসে যাওয়া হয়। তৃষ্ণার ভিত্তিতে দাঁড়ালে ডুবে যাওয়া হয়, মিথ্যাদৃষ্টির ভিত্তিতে চেষ্টা করলে ভেসে যাওয়া হয়। শাশ্বত দৃষ্টির উপর দাঁড়ালে ডুবে যাওয়া হয়, উচ্ছেদ দৃষ্টির ভিত্তিতে চেষ্টা করলে ভেসে যাওয়া হয়। ইত্যাদি ইত্যাদি।
এই অর্থগুলো অর্থকথা ছাড়া কোত্থেকে জানা যেত? এমন জ্ঞানীও আছেন যিনি হয়তো এমনিতেই বুঝে যাবেন, কোনো অর্থকথা লাগবে না। কিন্তু তাঁর প্রতি আমার যদি শ্রদ্ধা না থাকে, আস্থা না থাকে, তাহলে সেই জ্ঞানী হাজারভাবে বললেও তাঁর কথা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য বলে মনে হবে না।
এ কারণেই আধুনিককালে আর অর্থকথা রচয়িতাদের দেখা যায় না।
মায়ানমারে পেটকোপদেশ অর্থকথা এবং মিলিন্দপ্রশ্ন অর্থকথা দেখা যায়, যেগুলো গত বিংশ শতকে মায়ানমারে রচিত, কিন্তু সেগুলো কয়েকটি কারণে ষষ্ঠ সঙ্গীতিকারক ভিক্ষুদের মাঝে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। এ কারণেই আপনারা সেগুলোকে ষষ্ঠ সঙ্গায়নের পালি গ্রন্থগুলোর মাঝে খুঁজে পাবেন না।
ইংরেজিতে তো নয়ই। আমি কেবল মায়ানমারে এসে সেগুলোর দেখা পেয়েছি।
এ ব্যাপারে আরো অনেক কিছু বলা যেত। কিন্তু নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র দিতে হলে ইন্টারনেট লাগবে, যা এখানে খুব সহজলভ্য নয়। তাই অর্থকথার আলোচনা আপাতত থাক।
✍️ ভদন্ত জ্ঞানবল ভিক্ষু (প্রাক্তন নাম জ্ঞানশান্ত)