21/08/2026
কোলকাতার একটা হোটেলে আগুনে পুড়ে কয়েকজন বাংলাদেশি মা'রা গেছেন। শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত।
কারো মা, কারো বাপ, কারো স্বামী, কারো সন্তান, কারো স্বজন। ভাড়া কম বলে ছোট একটা হোটেলে উঠসিলেন। যাওয়ার আগে হয়তো জমি বন্ধক দিয়া গেছেন, কেউ গহনা বেচসেন, কেউ সমিতি থেকে টাকা তুলসেন। বাঁচার লাইগ্যা গেছিলেন। ফিরসেন কফিনে।
আমি তাদের আত্মার শান্তি কামনা করি। শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই।
এই মানুষগুলা কোলকাতা গেলো ক্যান?
ডাক্তার সাহেবরা, প্রশ্নটা আপনাদের।
আপনারা বলবেন ওইখানে টেস্ট সস্তা, ওইখানে ইনভেস্টিগেশন ভালো। রোগীকে জিজ্ঞাসা করেন তো একবার। রোগী মেশিনের কথা বলবে না। রোগী বলবে, "উনি আমার পুরা কথাটা শুনসেন।" রোগী বলবে, "উনি আমার চোখের দিকে তাকায়া কথা কইসেন।" রোগী বলবে, "উনি বলসেন, চিন্তা কইরেন না, ও সুস্থ হইয়া বাড়ি ফিরবে।"
এইটুকু। এই এতটুকুর লাইগ্যা একটা পরিবার পাসপোর্ট বানায়, ভিসার লাইনে দাঁড়ায়, ট্রেনে চড়ে, অচেনা শহরের সস্তা হোটেলে গিয়া ওঠে। আর কফিনবন্দি হইয়া দেশে ফিরে।
আর দেশে আমাদের রোগীর অভিজ্ঞতাটা কী?
বিকাল থাইকা সিরিয়ালে বসা। রাত এগারোটায় নাম ডাকে। ঘরে ঢুকতে না ঢুকতে প্রেসক্রিপশন লেখা শুরু হইয়া গেছে। রোগী তখনো তার কষ্টের কথাটা শেষ করতে পারে নাই। তিন মিনিট। কোনো কোনো দিন দুই মিনিট। একটা প্রশ্ন করলে বিরক্তির শব্দ। কখনো ধমক। ধমক শুনেই দ্বিতীয় প্রশ্ন করার সাহস আর হয় না। বাইর হওয়ার সময় হাতে থাকে টেস্টের লম্বা লিস্ট, আর বুকের ভিতরে থাকে সেই একই ভয়, যেই ভয়টা নিয়া সে ঢুকসিলো।
মানুষ ডিগ্রি দেইখা দেশ ছাড়ে না। মানুষ দেশ ছাড়ে অপমান নিয়া।
এইবার একটা অপ্রিয় কথা বলি। কিছু মনে কইরেন না।
আমার রাজশাহী মেডিক্যালের কয়েকজন সহপাঠী কোলকাতায় আর পশ্চিমবঙ্গের নানা শহরে কাজ করে, খুব ভালো পজিশনে। বিভাগীয় প্রধান পর্যন্ত। আমি তাদের চেম্বারে গেছি, রোগী দেখা দেখসি। তাদের বাসায় গেছি, লাইফস্টাইল দেখসি। আমার দুই সহপাঠী নেপালে, দুইজনেই প্রফেসর হইয়া রিটায়ার করসে। তাদের বাসায়ও গেছি।
দুইটা বিস্ময়কর জিনিস দেখসি।
এক নম্বর, তারা সময় নেয়। কোনো কোনো রোগীর পিছনে আধা ঘন্টা। আমার মেডিক্যাল কলেজের এক সহপাঠী বন্ধু কোলকাতার খুব বিখ্যাত একটা ক্যান্সার হাসপাতালের বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট বিভাগের প্রধান। যেই জিনিসটা সে জানে না বা পারে না, অকপটে রোগীকে বইলা দেয়। আমি তার মুখ দেখসি রোগী দেখার সময়। অখণ্ড মনোযোগ। রোগীর কথার উপরে আর কিছু নাই। আর ডাক্তার হিসাবে যেইটা বলে, খুব কনফিডেন্টলি বলে, রোগী ভরসা পায়। বলে, উনাকে সুস্থ কইরা বাড়ি পাঠানো আমার দায়িত্ব, আপনি ভাইবেন না।
একটা ভয় পাওয়া পরিবারের কাছে এই একটা বাক্য কী জিনিস, ভাবা যায় না। যে কোনোদিন হাসপাতালের করিডোরে সারারাত দাঁড়ায়া থাকসে, খালি সে বুঝবে।
দুই নম্বর, সে দিনে দশজনের বেশি রোগী দেখতেই পারে না। আর তার জীবনযাপন খুব সাধারণ। আমি প্যারিসে অনেক ডাক্তারের বাসায় গেছি, আমার সহকর্মীরাই আছে। তাদেরও লাইফস্টাইল মডেস্ট। ফ্যাবুলাস না। বাংলাদেশের ডাক্তারদের মতো না।
এইখানেই আসল কথাটা।
ব্যাংকক সিঙ্গাপুরে যাইতেসে, একটা কথা ছিলো। কিন্তু ইন্ডিয়ার অর্থনৈতিকভাবে সবচাইতে দুর্বল রাজ্যগুলার একটা, সেই পশ্চিমবঙ্গ আপনার রোগী টাইনা নিয়া যাইতেসে। কী দিয়া নিতেসে? টাকা দিয়া না। মেশিন দিয়া না। সময় দিয়া, মনোযোগ দিয়া, আর ভরসা দিয়া।
আপনারা কি নিজেদের কোলকাতার ডাক্তারদের চাইতে ইনফিরিওর মনে করেন? আপনাদের হাত খারাপ না, মাথা খারাপ না, ডিগ্রিও কম না। আপনারা যেইটা রোগীকে দেন না, সেইটা কিনতে টাকা লাগে না।
তাহলে আপনাদের গ্লানিটা হয় না ক্যান?
প্রচুর উপার্জন করতে হবে, প্রচুর রোগী দেখতে হবে। এই ট্রাপ থেকে বাইর হইতে না পারলে আমরা আমাদের রোগীকে তৃপ্ত করতে পারবো না। সার্ভিসের কম্পিটিশনে আমরা কোলকাতার কাছে হারতেই থাকবো।
আর যারা হারতেসে, তারা আমরা না। তারা ওই মানুষগুলা, যারা জমি বেইচা ভিসার লাইনে দাঁড়ায়।
ওই হোটেলটায় যারা পুড়সেন, তাদের একজনকে যদি দেশের একটা চেম্বারে একজন ডাক্তার আধা ঘন্টা সময় দিতেন, চোখের দিকে তাকায়া বলতেন, "চিন্তা কইরেন না, আমি আছি," তাহলে হয়তো ওই রাতে তারা নিজের বিছানায় ঘুমাইতেন।
আ'গু'নে পো'ড়া লা'শ ভরা কফিনটার দায় আ'গু'নে'র একার না, আপনারো।