11/09/2026
পর্তুগালের লিসবনে Myriad by SANA-তে আমাদের তিন দিনের একটি অসাধারণ ইভেন্ট ছিল। প্রায় ১৫০ জন মানুষ, পাঁচ তারকা হোটেল, গ্র্যান্ড ডিনার, লাঞ্চ-বুফে, ঘোরাঘুরি, গল্প, আড্ডা আর অগণিত হাসি।
কিন্তু সত্যি বলতে, এই তিন-চার দিন শুধু একটি সুন্দর ইভেন্ট ছিল না। আমার বিদেশের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতিগুলোর একটি হয়ে থাকবে এই কয়েকটা দিন।
আমার হাজব্যান্ড ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজের প্রাক্তন ছাত্র। প্রতিবছর ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশে JEXCA Europe Reunion অনুষ্ঠিত হয়। আর এই বছর সেই রিইউনিয়নের আয়োজন হয়েছিল আমাদের দেশ, পর্তুগালে। ❤️
বিয়ের পর ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজের একটি রিইউনিয়ন হয়েছিল, কিন্তু তখন আমার হাজব্যান্ড বিদেশে থাকার কারণে যেতে পারেনি। তাই ক্যাডেটদের কোনো রিইউনিয়নে এটাই ছিল আমার প্রথম অংশগ্রহণ। আর তার ওপর অনুষ্ঠানটা হলো আমার দেশ পর্তুগালে। ব্যাপারটা আমার জন্য শুরু থেকেই একটু বেশি বিশেষ ছিল।
বাংলাদেশ,আমেরিকা, ইউকে, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, আয়ারল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বিভিন্ন ব্যাচের এক্স-ক্যাডেট এবং তাঁদের পরিবার এসেছিলেন। আমরা ছিলাম পর্তুগাল থেকে একমাত্র কাপল। আর মজার ব্যাপার হলো, সেখানে আমার হাজব্যান্ডই ছিল সবচেয়ে জুনিয়র ক্যাডেটদের একজন।
পর্তুগালে থাকার কারণে হোস্ট হিসেবে সে সবার জন্য যতটা সম্ভব করার চেষ্টা করেছে।
কিন্তু আমার জন্য এই কয়েকটা দিন ছিল আরও বেশি বিশেষ।
এত দূরে, বিদেশের মাটিতে থেকেও মনে হয়েছে, আমি যেন হঠাৎ করে একটা নতুন পরিবার পেয়ে গেছি।
এত সুন্দর, ভদ্র, শিক্ষিত এবং আন্তরিক মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, যা সত্যিই আমার হৃদয় ছুঁয়ে গেছে।
সবচেয়ে অবাক করা বিষয় ছিল, তাঁদের প্রত্যেকের নিজের নিজের জায়গায় এত বড় পরিচয় ও অর্জন থাকা সত্ত্বেও তাঁদের মধ্যে বিন্দুমাত্র অহংকার দেখিনি।
আমেরিকা ও ইউকে থেকে আসা অনেক ভাই ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কিংবা নামী প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। অথচ তাঁদের সঙ্গে মিশে একবারের জন্যও মনে হয়নি, তাঁরা আমার থেকে আলাদা কেউ।
আমি তাঁদের প্রত্যেককেই ভাই বলে ডেকেছি। তাঁদের অনেকেই আমার বাবার বয়সী। তবুও কোথাও কোনো দূরত্ব অনুভব করিনি। প্রত্যেকটা ভাই-ভাবিই এতটা সহজ, আন্তরিক আর আপন ছিলেন যে মনে হয়েছে, এঁদের সঙ্গে যেন বহুদিনের পরিচয়।
জাহিদী ভাই বাংলাদেশ থেকে লাগেজ ভর্তি করে প্রায় ৬০-৭০ জন ভাবির জন্য শাড়ি নিয়ে এসেছিলেন। এত বড় একজন মানুষ, এত ব্যস্ততার মধ্যেও সবার কথা ভেবে এমন একটা কাজ করেছেন, ভাবতেই ভালো লাগে। ❤️
আর পুরো পাঁচ তারকা হোটেলটাও যেন কয়েক দিনের জন্য আমাদের নিজেদের বাড়ি হয়ে গিয়েছিল!
মনে হচ্ছিল, কোনো আত্মীয়ের বিয়ে বাড়ি। সবাই একসঙ্গে খাচ্ছে, গল্প করছে, হাসছে, ঘুরছে। প্রায় ১৫০ জন মানুষ, অথচ পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে একটা অদ্ভুত সুন্দর শৃঙ্খলা, সৌজন্য আর আন্তরিকতা ছিল।
এই বিশাল আয়োজনের পেছনে মোস্তাক ভাই ,বদিউল ভাই,আসলাম ভাই এবং আরও যারা ছিলেন, তাঁদের কথা আলাদাভাবে বলতেই হয়।
তাঁরা প্রায় ছয় মাস আগে থেকেই পর্তুগালে এসে প্রস্তুতি শুরু করেছিলেন। কে কোথায় থাকবেন, কোথায় খাবেন, কোথায় ঘুরবেন, কীভাবে সবাইকে একসঙ্গে ম্যানেজ করা হবে, প্রতিটি বিষয় তাঁরা এত সুন্দরভাবে পরিকল্পনা করেছিলেন যে পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে কারও কোনো অভিযোগই ছিল না।
এতগুলো মানুষ, এতগুলো দেশ, এত বড় একটা অনুষ্ঠান একসঙ্গে সামলানো সহজ কোনো ব্যাপার নয়। কিন্তু তাঁদের পরিকল্পনা, দায়বদ্ধতা আর আন্তরিকতার কারণে সবকিছু এত সুন্দরভাবে হয়েছে যে সত্যিই অবাক হয়েছি।
তখন মনে হয়েছে, ক্যাডেটদের শৃঙ্খলা, দায়বদ্ধতা, একে অপরের প্রতি সম্মান আর সেই পুরোনো বন্ধন থেকেই হয়তো এত বড় একটা অনুষ্ঠানও এত সুন্দরভাবে করা সম্ভব।
বাংলাদেশে অনেক স্কুল, কলেজ বা ইউনিভার্সিটির অনুষ্ঠান দেখেছি। কিন্তু ক্যাডেটদের মধ্যে যে ধরনের মিল, শৃঙ্খলা আর একে অপরের প্রতি টান দেখলাম, সেটা সত্যিই অন্যরকম।
এই ইউনিটি, এই ভ্রাতৃত্ব যেন অন্যরকম এক বন্ধন।
একজন ক্যাডেট আরেকজন ক্যাডেটের জন্য প্রয়োজনে জীবনের কঠিন সময়েও পাশে দাঁড়াবে, এই বিশ্বাসটা তাঁদের সম্পর্কের মধ্যে সত্যিই আছে বলে মনে হয়েছে।
ক্যাডেট কলেজের এই বন্ধন যে এত বছর পরও এত শক্ত থাকতে পারে, সেটা নিজের চোখে না দেখলে হয়তো বিশ্বাসই করতাম না। ❤️
আর আমার হাজব্যান্ডকে দেখে আমি সত্যিই অবাক হয়েছি।
প্রথম দুই দিন আমাদের Airbnb-তে রেখে সে প্রায় ১৫০ জন মানুষকে এয়ারপোর্ট থেকে রিসিভ করেছে। টানা দুই দিন সকাল ৫টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত তার প্রায় একই কাজ ছিল। একের পর এক ফ্লাইট, একের পর এক মানুষ।
কিন্তু একবারের জন্যও ওর চোখে-মুখে বিরক্তি বা ক্লান্তি দেখিনি।
বরং আমাকে বারবার বলছিল,
আর কিছুক্ষণ পর অমুক ভাই ল্যান্ড করবে। অমুক দেশ থেকে অমুক ভাই আসছে।
ওর নিজের আনন্দের চেয়েও যেন সবার ঠিকঠাক পৌঁছানো, থাকা, খাওয়া এবং স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয়টাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
তখন মনে হয়েছে, এই মানুষগুলো সত্যিই ওর কাছে শুধু কলেজের বন্ধু নয়, নিজের পরিবারের মানুষ।
আর এই পুরো সময়টার মধ্যে আমার নিজের জন্য সবচেয়ে বড় পাওয়া ছিল কিছু অসাধারণ মানুষকে খুব কাছ থেকে পাওয়া।
বিশেষ করে আমেরিকা থেকে আসা রেবা ভাবি আর আয়ারল্যান্ড থেকে আসা সনু ভাবি আমার খুব কাছের হয়ে গেছেন।
মাত্র কয়েকটা দিনেই তাঁদের সঙ্গে এমন একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেল, যেন তাঁরা আমার বহুদিনের পরিচিত, আমার নিজের বোন।
তাঁদের কাছে আমি একদম মন খুলে কথা বলতে পেরেছি। নিজের কথা, নিজের অনুভূতি, জীবনের অনেক কথা খুব সহজেই শেয়ার করতে পেরেছি।
কোনো সংকোচ ছিল না, কোনো দূরত্ব ছিল না।
রেবা ভাবি আমাদের থেকে অনেক সিনিয়র। কিন্তু তাঁর সঙ্গে এক মুহূর্তের জন্যও মনে হয়নি যে তিনি আমার থেকে এত সিনিয়র। বরং মনে হয়েছে, যেন আমার খুব কাছের একজন বান্ধবী।
সনু ভাবির ক্ষেত্রেও ঠিক একই রকম একটা আপন অনুভূতি তৈরি হয়েছে।
এই কয়েকটা দিন তাঁদের সঙ্গে গল্প করে, হাসি-আনন্দ করে, মন খুলে কথা বলে আমার মনে হয়েছে, জীবনের অনেক দিনের জমে থাকা কষ্ট, একাকিত্ব আর মন খারাপ যেন কোথায় হারিয়ে গেছে।
মনে হয়েছে, বিদেশের জীবনে আমি সত্যিই একটা পরিবার পেয়েছি।
আরেকটা ঘটনা আমাকে ভেতর থেকে খুব ছুঁয়ে গেছে।
আমাদের অনেক ভাই-ভাবিই ইউকে ও আমেরিকা থেকে আসা ডাক্তার। বিভিন্ন সময়ে তাঁরা আমার বাচ্চার ব্যাপারে জানতে চেয়েছেন, কী করলে ভালো হবে, কীভাবে যত্ন নিলে ভালো হবে, এসব নিয়ে পরামর্শ দিয়েছেন।
তাঁদের এই আন্তরিকতাই আমার কাছে অনেক বড় একটা ব্যাপার।
একদিন আমি একজন ভাই-ভাবির ছবি তুলে দিচ্ছিলাম। তখনও আমি জানতাম না যে ভাই একজন ডাক্তার।
হঠাৎ ভাবি এসে আমাকে বললেন,
তোমাদের যা যা দরকার হয়, আমাকে বলবে। আমি আমেরিকা থেকে পাঠিয়ে দেব। আমি ওখানকার একজন শিশু বিশেষজ্ঞ।
কথাটা শুনে আমি সত্যিই নিজেকে আর সামলাতে পারিনি। সেখানেই আমার চোখে পানি চলে আসে, আমি কেঁদে ফেলি।
কারণ, একজন মানুষ আমাকে মাত্র কয়েক দিনের পরিচয়ে কীভাবে এতটা আপন করে ভাবতে পারেন, সেটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি ছুঁয়ে গিয়েছিল।
আমি কিছু চাইনি। কিছু বলিনি। তবুও তিনি নিজে থেকে আমার বাচ্চার কথা ভেবে বললেন, যা দরকার হবে, তাঁকে জানাতে।
এই ভালোবাসা, এই আন্তরিকতা, এই নিঃস্বার্থভাবে পাশে থাকার মানসিকতা আসলে ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
তখন আমার সত্যিই মনে হয়েছে, রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও কিছু মানুষ হৃদয়ের এতটা কাছের হয়ে যায় যে তাঁরা নিজের পরিবারের মানুষের মতোই আপন হয়ে ওঠেন।
এই রিইউনিয়নে আমি শুধু একটা সুন্দর অনুষ্ঠান দেখিনি। শুধু কয়েকটা দিন আনন্দ করিনি।
আমি এমন কিছু মানুষকে পেয়েছি, যাঁদের ভালোবাসা, আন্তরিকতা আর আপন করে নেওয়ার ক্ষমতা আমার বিদেশের জীবনে একটা পরিবারের অভাব অনেকটাই পূরণ করে দিয়েছে।
হয়তো এই মানুষগুলোর সঙ্গে আমার পরিচয় মাত্র কয়েক দিনের। হয়তো আবার কবে দেখা হবে, সেটাও জানি না।
কিন্তু কিছু সম্পর্ক সময় দিয়ে তৈরি হয় না, অনুভূতি দিয়ে তৈরি হয়।
এই কয়েকটা দিন আমাকে আবারও বুঝিয়েছে, পরিবার শুধু রক্তের সম্পর্কেই হয় না।
কখনো কখনো কিছু মানুষ খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এত আপন হয়ে যায় যে মনে হয়, তারা যেন বহুদিনের চেনা, বহুদিনের নিজের।
আর আমার জন্য এই রিইউনিয়নের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হয়তো এটাই।
বিদেশের মাটিতে হঠাৎ করে একটা পরিবার পেয়ে যাওয়া। ❤️
আলহামদুলিল্লাহ। ❤️