04/08/2026
২০০৫ সালের শেষভাগে এবং ২০০৬ সালের শুরুতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার কানসাট ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার কৃষকরা তীব্র লোডশেডিংয়ের মুখে পড়েন। সে সময় ইরি-বোরো ধানের মৌসুম চলায় সেচের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ অত্যন্ত জরুরি ছিল। কিন্তু পিল্লি বিদ্যুৎ সমিতি (REB) পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। এর ওপর যুক্ত হয়েছিল ভুতুড়ে ও অতিরিক্ত বিল, মিটার ভাড়ার নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং কর্মকর্তাদের চরম দুর্নীতি ও ঘুষবাণিজ্য। বারবার অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার না পেয়ে স্থানীয় জনসাধারণের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায়।
বিদ্যুৎ সংকট এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ সংগঠিত হতে শুরু করেন। আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে গঠিত হয় 'পল্লী বিদ্যুৎ উন্নয়ন সংগ্রাম পরিষদ'। এই আন্দোলনের মূল আহ্বায়ক ছিলেন স্থানীয় ব্যক্তিত্ব গোলাম রব্বানী। আন্দোলনটি কোনো দলীয় ব্যানারে ছিল না; এটি ছিল দলমত নির্বিশেষে কৃষক ও সাধারণ জনগণের একটি স্বতঃস্ফূর্ত নাগরিক অধিকার রক্ষা আন্দোলন।
২০০৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত দফায় দফায় চলা এই আন্দোলনে পুলিশের নির্বিচার গুলিবর্ষণে অন্তত ১৭ থেকে ২০ জন সাধারণ মানুষ ও কৃষক নিহত হন।৪ জানুয়ারি ২০০৬: আন্দোলনের শুরুতে প্রথম পুলিশের গুলিতে ২ জন বিক্ষোভকারী নিহত হন।২৩ জানুয়ারি ২০০৬: কানসাট বাজারে একটি বিশাল শান্তিপূর্ণ সমাবেশে পুলিশ ও তৎকালীন শাসক দলের ক্যাডাররা চারদিক থেকে ঘিরে ধরে নির্বিচারে গুলি চালায়। সেদিন ঘটনাস্থলেই ও পরবর্তীতে অন্তত ৮ জন নিহত হন।এপ্রিল ২০০৬: এপ্রিলের প্রথম ও দ্বিতীয় সপ্তাহে সরকার আন্দোলন দমাতে আবারও কঠোর অবস্থান নেয়। পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর গুলিতে আরও বেশ কয়েকজন আন্দোলনকারী প্রাণ হারান।হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি এই আন্দোলনে ৬০০-এর বেশি মানুষ গুরুতর আহত ও আজীবনের জন্য পঙ্গু হন। বহু মানুষকে গ্রেফতার করা হয় এবং গ্রেফতার এড়াতে হাজার হাজার গ্রামবাসী বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে বেড়াতে বাধ্য হন।
২০০৬ সালে কেন্দ্রে ক্ষমতায় ছিল বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এই আন্দোলনকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছিল এবং পরিস্থিতি কঠোর হস্তে দমনের নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল।
জেলার তৎকালীন পুলিশ সুপার (SP) এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (UNO) সরাসরি উপস্থিতিতে ও নির্দেশে পুলিশ জনতা লক্ষ্য করে লাইভ বুলেট ফায়ার করে। স্থানীয় তৎকালীন সংসদ সদস্য এবং রাজশাহী অঞ্চলের প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধেও পুলিশকে উস্কানি দেওয়ার এবং বলপ্রয়োগের নির্দেশ দেওয়ার সরাসরি অভিযোগ তোলেন আন্দোলনকারীরা।
আন্দোলন তীব্র হলে স্থানীয় প্রশাসন পুরো এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে কারফিউর মতো পরিস্থিতি তৈরি করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ছাড়াও তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলস (BDR) মোতায়েন করা হয়েছিল।
টানা চার মাসের তীব্র প্রতিরোধ, অবরোধ এবং একের পর এক লাশের মিছিলের পর তৎকালীন জোট সরকার পিছু হটতে বাধ্য হয়। ২০০৬ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে সরকারের প্রতিনিধি দল কানসাটে এসে সংগ্রাম পরিষদের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করে। চুক্তিতে কৃষকদের দাবি মেনে নেওয়া, ভুতুড়ে বিলের বিষয়ে তদন্ত এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়।
(Sources):
উইকিপিডিয়া: কানসাট পল্লী বিদ্যুতের প্রতিবাদ
প্রথম আলো: ২০০৬ সালের কানসাট বিদ্যুৎ আন্দোলনের ফিরে দেখা প্রতিবেদন
The Daily Star: Reports on Kansat Peasant Uprising and Police Casualty Case Study (2006)
BBC Bangla: কানসাটে বিদ্যুতের আন্দোলন ও সমঝোতা চুক্তি আর্কাইভস (২০০৬)