17/10/2025
পরকীয়াকে আমরা সমাজে সবসময়ই ঘৃণার চোখে দেখি। বলি অন্যায়, পাপ, চরিত্রহীনতা।
কিন্তু সত্যিই কি তাই? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে থাকে কিছু অপ্রকাশিত কান্না, অগোচরে জমে ওঠা একাকীত্ব?
একটা মেয়ে যখন ভালোবাসার স্বপ্নে ভর করে বিয়ে করে বা সম্পর্কে জড়ায়, তখন তার প্রত্যাশা খুব বড় কিছু নয়। সে চায় একটু সময়, সামান্য যত্ন, আর সঙ্গীর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার অনুভূতি। অথচ বেশিরভাগ সময়েই দেখা যায় বাস্তব ছবিটা একেবারেই উল্টো।
প্রথম প্রথম সবকিছুই যেন সুন্দর। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কথোপকথন, ছোটখাটো চমক, মনখারাপ হলে সান্ত্বনা। কিন্তু সময় যত এগোয়, সম্পর্ক যেন ধীরে ধীরে ঝাপসা হতে থাকে। ছেলেটির ব্যস্ততা বাড়তে থাকে, অফিসের কাজের চাপ, বন্ধুদের আড্ডা, মোবাইলে ডুবে থাকা-সব মিলিয়ে সম্পর্কের জায়গাটা সরে যায় প্রান্তে।
মেয়েটি তখন এক ছাদের নিচেই থাকে, অথচ মনে হয় দুটো আলাদা পৃথিবীতে বসবাস করছে তারা।
সেদিনের সেই অন্তহীন কথোপকথন এখন সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে "খেয়েছ?" বা "ঘুমাচ্ছ?"-এর মতো যান্ত্রিক প্রশ্নে। কখনো কখনো তো সেইটুকুও আর থাকে না।
বলা হয়, সময় না থাকার চেয়ে ইচ্ছা না থাকার কারণেই মানুষ দূরে সরে যায়।
অফিসের ব্যস্ততা, মিটিং, কাজের চাপ-এসবের অজুহাতে একজন মানুষ তার প্রিয়জনের জন্য দুই মিনিটও বের করতে পারে না। অথচ সেই একই মানুষ অফিসের টয়লেটে বসেও সোশ্যাল মিডিয়া ঘাটতে পারে, বন্ধুদের গ্রুপে মিম শেয়ার করতে পারে। তবে সঙ্গীর একটি ম্যাসেজের রিপ্লাই দেওয়া কি সত্যিই এত কঠিন?
মেয়েটি যখন প্রতিদিন অপেক্ষা করে, ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে থাকে, আশা করে তার সঙ্গী হয়তো আজ একটু তাড়াতাড়ি ফিরবে, তাকে জড়িয়ে ধরে বলবে—“তুমি আছো বলেই আমি বেঁচে আছি"-তখন সেই আশা ভেঙে যায়। কারণ ছেলেটির ফেরাটা কেবল ক্লান্ত শরীর আর ফোনের আলোয় ডুবে থাকা এক চুপচাপ মানুষ হয়ে যায়।
একটা কথা মনে রাখতে হবে-মেয়েরা প্রতিদিনের উপহার বা ব্যয়বহুল সারপ্রাইজ চায় না। তারা চায়, সঙ্গী যেন তাদের প্রতি দায়িত্ববান হয়, সময় দেয়, মন দিয়ে শোনে। রোজ ঘরে ফেরার সময় একটা হাসিই তো সবচেয়ে বড় উপহার।
কিন্তু যখন সেই প্রাপ্তি মেলে না, যখন প্রতিদিনের একাকীত্ব বুকের ভেতর জমে পাথর হয়ে যায়, তখনই কোনো এক মানুষ অজান্তেই হয়ে ওঠে ভরসার জায়গা। সেই মানুষ হয়তো ফোনে খোঁজ নেয়, মনখারাপের সময়ে সান্ত্বনা দেয়, সময় দেয়। মেয়েটি তখন বোঝে-সে আর একা নয়। এখানেই শুরু হয় সেই সম্পর্ক, যেটাকে আমরা সমাজের চোখে বলি "পরকীয়া।"
কিন্তু ভাবুন তো, আসল অন্যায়টা কোথায়? মেয়েটি কি দোষী, যে নিজের একাকীত্ব থেকে মুক্তি খুঁজতে ভালোবাসার একটু ছায়া খুঁজেছে? নাকি দোষ সেই পুরুষের, যে প্রতিদিনের দায়িত্বের আড়ালে তার ভালোবাসার মানুষটিকে উপেক্ষা করেছে?
সত্যিটা হলো, পরকীয়া কোনো হঠাৎ ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা নয়। এটা আসলে সেই অপ্রাপ্তির আর্তনাদ, সেই শূন্যতার আর্তনাদ, যেটা মানুষ চেপে রাখতে রাখতে একদিন আর পারে না।
সমাজ যতই আঙুল তুলুক, আমরা যদি সম্পর্কের ভিতটা শক্ত করে না গড়ি, ভালোবাসাকে প্রতিদিন যত্নে না রাখি, তবে এই গল্পের শেষ একই হয়-মেয়েটি খারাপ হয়ে যায়.. কেবল ছেলেটির চোখে নয়, গোটা সমাজের চোখে। অথচ আসল দোষীকে খোঁজার চেষ্টা করে না কেউ।
পরকীয়া শুধু সম্পর্ক ভাঙার গল্প নয়, এটা আসলে এক সম্পর্কের ভেতর ভালোবাসার মৃত্যু আর অন্য কোথাও বেঁচে থাকার আকুতি।