05/06/2026
পরিচিত এক মেয়ের মোহরানা ছিল ৩ লাখ৷ শুনে অবাকই হয়েছিলাম, কারণ তার স্বামীর ব্যাপারে যতদূর জেনেছিলাম - ছেলেটা নিম্নবিত্ত পরিবারের, পড়াশোনাও বেশি করেনি। সব মিলিয়ে মাহর আরও কম হলেও কারও কোনো সমস্যা ছিল না, যেহেতু ছেলের স্বভাব-চরিত্র ভালো। কিন্তু সে ছেলে মাহর দিতে একদমই কার্পণ্য করেনি, নিজের সেরাটা দিয়েছে। শুনেছিলাম, ৩ লাখ টাকা সে খুব কষ্ট করে উপার্জন করে জমিয়েছিল এবং তার স্ত্রীও তাতে বেশ খুশি।
এটাই মূলত দেনমোহরের ভিত্তি যে, এমন পরিমাণ মাহর দিতে হবে যাতে মেয়ে সন্তুষ্ট হয়। রেফারেন্স দিচ্ছি, মন দিয়ে শুনুন:
وَآتُوا النِّسَاءَ صَدُقَاتِهِنَّ نِحْلَةً ۚ
"আর তোমরা নারীদেরকে তাদের মাহর সন্তুষ্টচিত্তে (নিহলাতান) দিয়ে দাও।" [সূরা নিসা: ০৪]
এই আয়াত বুঝতে হলে ক্লাসিক্যাল স্কলারগণের ব্যাখ্যা শুনতে হবে। যেমন:
১. এখানে নিহলাতান মানে মেয়ের সন্তুষ্টির ব্যাপারে জোর দেওয়া হয়েছে; মেয়ের সৌন্দর্য, শিক্ষা বা বাবার সম্পদ কিচ্ছু না। এই আয়াত প্রমাণ করে যে, মেয়েকে চাপ দিয়ে বা লজ্জা দিয়ে কম মাহর নিতে বাধ্য করা জায়েজ নয়। মাহর নির্ধারণে মেয়ের ইচ্ছা ও সন্তুষ্টি প্রাধান্য পাবে। [ইমাম জাসসাস (আহকামুল কুরআন)]
২. মাহর নির্ধারণে মেয়ের ইচ্ছা ও সম্মানই প্রধান। বাবার অবস্থা এর মানদণ্ড নয়। [ফাতাওয়া আলমগীরী (হানাফি ফতোয়া সংকলন)]
উম্মে হাবিবা (রা.) এর বাবা কাফির ছিলেন এবং তিনি নিজে ছিলেন বিধবা ও অসহায়। সেই অবস্থাতেই রাসূল (ﷺ) তাঁকে উচ্চ মাহর দিয়েছিলেন। [সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা, তাবাকাত ইবনে সা'দ]
৩. মাহর মেয়ের ব্যক্তিগত হক্ব। এটা নির্ধারণে তার সন্তুষ্টি প্রাধান্য পাবে। এটা কোনো পণ্যের মূল্য নয় যে তার গুণাগুণের ভিত্তিতে হিসাব করা হবে। [রদ্দুল মুহতার (ইবন আবেদীন, হানাফি)]
৪. ইমাম কুরতুবী (রহ.) এর তাফসির অনুযায়ী, নিহলাতান মানে প্রতিদানের আশা ছাড়াই উপহার। অর্থাৎ মাহর এমনভাবে দিতে হবে যেন মেয়ে মনে করে এটা তার প্রাপ্য অধিকার এবং তাকে খুশি করে দেওয়া হয়েছে।
সুতরাং, কোনো পণ্যের যেমন গুণাগুণ বা খুঁত দেখে দাম নির্ধারণ করা হয়, নারীর ক্ষেত্রে বিষয়টি তেমন নয়। নারীর রূপ, গুণ বা বংশমর্যাদাকে পণ্যের মতো পরিমাপ করে মাহরের মূল্য ধরার বিধান ইসলামে নেই। এছাড়া সৌন্দর্য বা ভার্জিনিটির মূল্য হিসেবে মাহর নির্ধারণের ব্যাপারে কোনো দলিল পাওয়া যায়নি। রাসূল (ﷺ) কখনো কোনো মেয়েকে তার মাহরে সন্তুষ্ট না হয়ে বিয়ে করতে বাধ্য করেননি।
কাজেই যারা বলে, পুরুষ যেভাবে সন্তুষ্ট হয় সেভাবে মাহর নিতে হবে, তারা আয়াতের স্পষ্ট অর্থ বিকৃত করছে। মেয়েকে চাপ দিয়ে, লজ্জা দিয়ে, 'বাবা গরীব' বলে বা 'লোভী' বলে কম মাহর নিতে বাধ্য করা সরাসরি সূরা নিসার আয়াতের বিরোধিতা। কারণ ইমাম কুরতুবী (রহ.), ইবন কাসীর (রহ.), ইমাম জাসসাস (রহ.) সকলেই একমত যে, এই শব্দটি পুরুষের উপর দায়িত্ব চাপিয়ে দিচ্ছে, তুমি এমন মাহর দাও যাতে মেয়ে সন্তুষ্ট হয়। এটা পুরুষের সন্তুষ্টির কথা বলছে না, বলছে মেয়ের সন্তুষ্টির কথা। কারণ মাহর হলো মেয়ের হক্ব, পুরুষের দয়া নয়।
সত্যি বলতে এমন দায়িত্বশীল ছেলেও চারপাশে অনেক, যারা স্ত্রীর মাহর ও ভরণপোষণে কৃপণতা করে না। বরং সামর্থ্য বাড়লে স্ত্রীর প্রতি ব্যয়ও বাড়িয়ে দেয়। সুন্নাহ এটাই। রসূলুল্লহ (ﷺ) দারিদ্র্যতার সময়েও স্ত্রীদের ১২ উকিয়া মাহর দিয়েছেন। দেখবেন, কিছু লোক এমনভাবে '১২ উকিয়া' উল্লেখ করবে যেন সেটা খুব কম মাহর, অথচ সেই সময় বেশ সম্মানজনক পরিমাণ মাহর ছিল এটা এবং বর্তমানেও রূপার হিসেবে এটা প্রায় ৭ লাখের মতো। আবার, সামর্থ্য বাড়লে রাসূল (ﷺ) ৪০০০ দিরহামও দিয়েছেন উম্মে হাবিবা (রা.)কে, যেটার পরিমাণ আজকের হিসেবে কোটি টাকার বেশি। [তাবাকাতে ইবনে সাদ: ৮/৬৯]
আলী (রা.) স্ত্রীর মাহর দেওয়ার জন্য নিজের মূল্যবান সম্পদ বর্ম বিক্রি পর্যন্ত করে দিয়েছেন। [সুনান আন-নাসায়ী: ৩৩৭৭ (কিতাবুন নিক্বাহ)]
অন্যান্য নবী-রাসূলের জীবনীতেও দেখি, মূসা (আ.) দশ বছর শ্বশুর বাড়িতে কর্মচারী হিসেবে কাজ করেছেন স্ত্রীর মাহর পরিশোধের জন্য। [সূরা ক্বাসাস: ২৫-২৮]
ইয়াকূব (আ.) স্ত্রীর মোহরানা পরিশোধের জন্য সাত বছর শ্বশুর বাড়িতে মেষ চড়িয়েছেন। এমনকি আমাদের সবচেয়ে কঠোর খলিফা উমার (রা.)-এর পুত্রবধুকে ৪০০ দিরহাম মোহরানা দেওয়ার কথা হলে তিনি সেটা মেনে নেন না, এজন্য তা বাড়িয়ে মোট ৬০০ দিরহাম দেয়া হয়। (তাবাকাতে ইবনে সা’দ: ৪/১২৪, সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৩/২৩৮)[তাবাকাতে ইবনে সাদ: ৮/৬৯]
খেয়াল করুন, উমার (রা.) এর ছেলের পক্ষ থেকে মাহর কমানোর জন্য বলা হয়নি, বরং মেয়ের সন্তুষ্টিকে গুরুত্ব দিয়ে মাহর বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। নবী-রাসূল ও সাহাবায়ে কেরাম এভাবেই মোহরানাকে সম্মান করতেন। এগুলোই পুরুষত্বের চিহ্ন। আর কৃপণতা হলো মেয়েলি স্বভাবের পুরুষের বৈশিষ্ট্য। মাহর নিয়ে যারা মেয়েদের অপমান করে, তারা মূলত আল্লহ্ সুব'হানাহু ওয়া তা'আলার বিধানকেই অপমান করে। তারা চায়, মেয়ে যেন নিজের হক্ব চাওয়াকে পাপ বা লোভ মনে করে চুপ করে যাক। এজন্য আমি সবসময় বলি, পয়সাওয়ালা ছোটলোক ও দুশ্চরিত্র পুরুষের চেয়ে সেই গরীব দিনমজুর উত্তম, যে স্ত্রী-সন্তানের পেছনে হাতখুলে খরচ করতে ভালোবাসে।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার মাথায় রাখবেন, মুসলিম সমাজে দা*জ্জা'লি ফেমিনিস্ট এজেন্ডা সবসময় জিন্স-টিশার্ট পরে কিংবা রকস্টার হয়ে আসে না, অনেক সময় আসে দ্বীনের লেবাসে। মাহর কমানো, ভরণপোষণ ঠিকমতো না দেওয়া আর সবর করো বলে নারীকে তার শরঈ হক থেকে বঞ্চিত করার ন্যারেটিভ তৈরি করা - এগুলোই ওয়েস্টার্ন ফেমিনিজমের সবচেয়ে সূক্ষ্ম ফাঁদ। কারণ মেয়েরা যখন ঘরে নিরাপত্তা ও সম্মান পায় না, তখন বাইরে উপার্জনে বাধ্য হয়, আর ঠিক তখনই সেই ওয়েস্টার্ন এজেন্ডা সফল! মানে বুঝতে পারছেন?
অর্থাৎ যারা ইসলামের নামে মেয়েদের হক্ব কমাচ্ছে, সাহাবায়ে কেরামের দেওয়া সম্মানজনক মাহর কিংবা ভরণপোষণের দলিল গোপন করছে, তারা আসলে ইসলামের শ'ত্রুদের সেবা করছে, সেই ওয়েস্টার্ন এজেন্ডার সেবা করছে, যারা একজন পুরুষের স্যালারি দিয়ে তিনজন নারীকে শ্রমবাজারে নামিয়ে মুনাফা তুলতে চায়। তাদের জন্যই মুসলিম নারীর ঘরে অনিরাপত্তা থাকা জরুরি।
সুতরাং ইসলাম মেয়েদের আর্থিক সুরক্ষা দিয়েছে স্বামী, বাবা বা ভাইয়ের মাধ্যমে, এই জিনিস যারা মানতে নারাজ এবং যারা মেয়েদের শরঈ হক্বের কথা শুনলেই অসন্তোষ নিয়ে তেড়ে আসে, তাদের অবশ্যই সন্দেহের তালিকায় রাখুন। দ্বীনের লেবাস থাকলেও এরা মূলত দ্বীনের শত্রু।
০২. ০৬. ২০২৬
কলমে- Sheikh Zannat Mim