13/05/2026
অপারেশন থিয়েটারের ভেতরটা বরফ শীতল। সাদা আলো চোখে বিঁধছে। চারপাশে অচেনা যন্ত্রের শব্দ বিপ… বিপ… বিপ…।
কেউ দ্রুত হাঁটছে, কেউ গ্লাভস পরছে, কেউ ডাকছে-
“ফাস্ট… প্রেসার ড্রপ করছে…”
আর আমি?
আমি তখন শুধু এক অসহায় মা।
প্রায় ত্রিশ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে লেবার পেইনের সাথে যুদ্ধ করছি। শরীরের প্রতিটা হাড় যেন ভেঙে গিয়েছে। ব্যথা এতটাই অসহনীয় হয়ে উঠেছিল যে আমি ডাক্তারদের প্রায় চিতকার করে রিতিমত আদেশ করছিলাম-
“দয়া করে… কিছু একটা করুন… এই ব্যথা বন্ধ করুন…”
চোখ ঝাপসা হয়ে আসছিল। মনে হচ্ছিল আমি আর পারব না।
জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা একটা ক্লান্ত মানুষ আমি।
ঠিক তখনই, হঠাৎ কেউ আমার হাতটা আলতো করে ধরলো।
সাদা পোশাক, মুখে মাস্ক, চোখে অদ্ভুত শান্তি।
একজন নার্স।
সে ধীরে ধীরে আমার কানের কাছে মুখ এনে বললো-
“আমার হাত চেপে ধরো। খামচি দাও, আঁচড়াও, যা ইচ্ছা করো… কোনো সমস্যা নেই। আমি আছি তোমার পাশে। তুমি একা নও। ভয় পেও না…”
কথাগুলো খুব সাধারণ ছিল।
কিন্তু সেই মুহূর্তে, আমার কাছে মনে হয়েছিল কেউ যেন ডুবে যাওয়া মানুষকে শেষ ভরসার কাঠিটা ধরিয়ে দিয়েছে।
আমি তার হাত শক্ত করে চেপে ধরেছিলাম।
অদ্ভুতভাবে, ব্যথাটা তখনও ছিল… কিন্তু ভয়টা কমতে শুরু করেছিল।
কারণ মানুষ তখন ব্যথার চেয়ে বেশি ভয় পায় একা হয়ে যেতে।
অপারেশন শুরু হলো।
ডাক্তারদের ব্যস্ততা চলছিল, আলো আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল।
কিন্তু সেই নার্স-সে আমার মাথার পাশে দাঁড়িয়েই রইলো। পুরো সময়।
মাঝে মাঝে কপালে হাত রাখছিল।
বলছিল-
“আর একটু… তুমি খুব সাহসী…”
আমি চোখ খুলে বারবার শুধু তার দিকেই তাকাচ্ছিলাম।
মনে হচ্ছিল, এই অচেনা মানুষটাই তখন আমার সবচেয়ে আপন।
তারপর…
হঠাৎ একটা কান্নার শব্দ।
খুব ছোট্ট, খুব নতুন একটা কান্না।
আমার সন্তানের প্রথম কান্না।
সেই শব্দ শুনে আমার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়েছিল।
মনে হচ্ছিল পৃথিবীর সব ব্যথার শেষে আল্লাহ আমাকে জান্নাতের একটা দরজা খুলে দেখিয়েছেন।
আমি দুর্বল চোখে পাশে দাঁড়ানো নার্সটার নেমপ্লেটের দিকে তাকালাম।
লেখা ছিল-
“হিনা খান।”
সেদিন বুঝেছিলাম, পৃথিবীতে কিছু মানুষ আছে যারা শুধু পেশার জন্য কাজ করে না।
তারা আল্লাহর রহমত হয়ে আসে।
অন্ধকার মুহূর্তে আলো হয়ে আসে।
অচেনা হয়েও আপন হয়ে যায়।
হিনা খান হয়তো জানেই না, সেই রাতের কথা আমি আজও ভুলিনি।
সে হয়তো প্রতিদিন অসংখ্য রোগীর পাশে দাঁড়ায়।
কিন্তু আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর মুহূর্তে, সে ছিল আমার সাহস।
আজও যখন ছেলেকে দেখি, মনে পড়ে সেই বরফ শীতল অপারেশন থিয়েটার…
আর মনে পড়ে এক উষ্ণ হাতের স্পর্শ।
জীবনে কিছু স্পর্শ কখনো ভোলা যায় না।
কারণ সেগুলো শুধু হাত ছোঁয় না-
ভাঙতে বসা মনকেও বাঁচিয়ে তোলে।
(ছবিটি আইসিইউ তে থাকা মুমূর্ষু রুগির হাতের সাথে লাগিয়ে রাখার জন্য কৃত্রিম হাত বানাচ্ছে গ্লোভস দিয়ে-এমন এটা ভিডিও থেকে নেয়া স্ক্রিনশট। ভিডিওটা এত বেশি টাচি নিজের লাইফের অনেক কিছু মনে পরে গেলো। আমি আবার এলোমেলো হয়ে যাচ্ছি সেদিনের স্মৃতি মনে করতে করতে!!)