03/02/2026
বুদ্ধ কেন ঋদ্ধি প্রদর্শন বা অলৌকিক কোন কিছু দেখাতে নিষেধ করেছেন ?
বুদ্ধ কেন ঋদ্ধি প্রদর্শন করতে নিষিদ্ধ করেছিলেন, তা জানার পূর্বে আমরা প্রথমে জানব যে, ঋদ্ধি কি?
ঋদ্ধি বা চমৎকার হল এক হয়ে অনেক হওয়া, অনেক হয়ে এক হওয়া, হঠাৎ প্রকট হওয়া, হঠাৎ অন্তর্ধান হওয়া, দেওয়াল বা প্রাচীরের ভিতর দিয়ে পারাপার করা, যেরকম আকাশ মার্গে যাতায়াত করে, সেরকম পর্বতের ভিতর দিয়েও বিনা কষ্টে নিমিষেই পার হয়ে যাওয়া। পৃথিবী বা মাটির উপর চলার মত জলের উপরও স্বচ্ছন্দে চলাচল করা, মাটি ভেদ করে চলতে পারা, আকাশে পাখির মত উড়ে যাওয়া, মহা তেজবান সূর্য বা চন্দ্রকেও হাতে স্পর্শ করতে পারা, ব্রহ্মলোক পর্যন্ত স্বীয় শরীর দ্বারা বশীভূত করে রাখা ইত্যাদিই হল ঋদ্ধি।
এক সময় ভগবান তথাগত বুদ্ধ নালন্দার পাবারিক আম্রবনে বিহার করতেন। তখন কেবট্ট গৃহপতিপুত্র নামে এক প্রসিদ্ধ ব্রাহ্মণ সেখানে ভগবান বুদ্ধের সাথে সাক্ষাতের জন্য গিয়েছিলেন। তিনি বুদ্ধ তথাগতকে অভিবাদন করে একান্তে উপবেশন করলেন।
একান্তে উপবেশনরত কেবট্ট গৃহপতিপুত্র ভগবান বুদ্ধকে বললেন-‘ ভন্তে ভগবান! এ নালন্দা জনপদ হল অতীব সমৃদ্ধ, ধন-ধান্যপুর্ণ এবং প্রচুর সম্পদশালী ব্যক্তিদের আবাসস্থল। এখানকার লোক আপনার প্রতি অনেক শ্রদ্ধা সম্পন্ন। হে ভগবান তথাগত! আপনি এক ভিক্ষুকে নির্দেশ দিন যে, তিনি যেন এ নালন্দা জনপদে অলৌকিক ঋদ্ধি সমূহ প্রদর্শন করেন। এরকম করলে নালন্দার লোক ভগবানের প্রতি আরও অধিক পরিমাণে শ্রদ্ধান্বিত হয়ে যাবেন।’
এরকম বললে ভগবান তথাগত বুদ্ধ কেবট্ট গৃহপতিপুত্রকে বললেন-‘ কেবট্ট! আমি ভিক্ষুদেরকে এরকম উপদেশ প্রদান করিনা যে, ....... ভিক্ষুগণ! আস, তোমরা শ্বেত বস্ত্র পরিহিত গৃহস্থদেরকে নিজেদের অর্জিত ঋদ্ধি প্রদর্শন করো।’
দ্বিতীয়বার এবং তৃতীয়বারও কেবট্ট ভগবান তথাগত বুদ্ধকে ভিক্ষুদের দ্বারা ঋদ্ধি শক্তি প্রদর্শনের আগ্রহ করেছেন এবং বললেন-‘ ভন্তে! আমি আপনাকে ছোট করার জন্য বলছিনা, বরং আপনাকে মহান করার জন্যই এরকম আগ্রহ প্রকাশ করছি।’
কেবট্ট গৃহপতিপুত্রের উদ্দেশ্য ছিল যে, নালন্দার জনসাধারণ ভগবান বুদ্ধ তথাগতের প্রতি আরও বেশী শ্রদ্ধা সম্পন্ন হয়ে উঠুক। কিন্তু তারপরেও তথাগত বুদ্ধ কেবট্ট গৃহপতিপুত্রের প্রার্থনাতে সহমত পোষণ করেননি বা স্বীকৃতি প্রদান করেননি। তার কারণ হল, তথাগত সর্বজ্ঞ বুদ্ধ এরকম ঋদ্ধি সমূহ প্রদর্শন করলে এর দুষ্পরিণাম ভবিষ্যতে কি হবে, সে সম্পর্কে সম্যকভাবে অর্থাৎ ভালভাবেই জানতেন।
এরকম ঋদ্ধি প্রদর্শিত হলে ভবিষ্যতে প্রতারক, ঠকবাজ এবং ধূর্ত লোকেরা ধর্মকে ব্যবসার পণ্য বানিয়ে জীবিকার্জনের জন্য লোকদেরকে ঠকিয়ে লুঠ-পাট করার কাজেই ব্যস্ত থাকবে। এরকম কাজ করে যাতে কেহ লোক ঠকাতে না পারে সে উদ্দেশ্যেই তথাগত ঋদ্ধি প্রদর্শন করতে নিষিদ্ধ করেছেন।
বর্তমান সময়ে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, ঠকবাজ, প্রতারক, ধূর্ত ও ব্যভিচারী কিছু কিছু সাধু-সন্ন্যাসী গেরুয়া বস্ত্র পরিধান করে নানা রকম তন্ত্র মন্ত্রের আশ্রয় নিয়ে তাঁরা নানা রকম অলৌকিক শক্তির অধিকারী দাবী করে তন্ত্র-মন্ত্র, তাবিজ-কবচ ও যাদু-টোনার মাধ্যমে অহরহ সরল ও ধর্মপ্রাণ লোকদের অর্থ-বিত্ত, মান-সম্ভ্রম লুঠতে ব্যস্ত রয়েছেন এবং লুঠে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। তাঁরা এ সমস্ত তন্ত্র-মন্ত্রের দোহাই দিয়ে, অলৌকিক অনেক কিছুর প্রলোভন দেখিয়ে নারীদেরকে প্রায় সময় যৌন শোষণেও সিদ্ধহস্ত। উপরে সাধুর বেশ, ভিতরে হল অর্থ লুঠের ধাঁন্ধা ও যৌনাকাঙ্খা মেটানোর অভিপ্রায়।
এসমস্ত ঋদ্ধি বা চমৎকারের মত নিম্ন প্রকারের বিদ্যা এবং ঈশ্বর, আত্মা, ভাগ্য নিরূপন প্রভৃতি হল কল্পনা সমূহের পরিণাম। এগুলি হল বিষাক্ত ফলতুল্য।
এ সমস্ত দুষ্কর্ম সমূহকে বন্ধ করার জন্যই কেবট্ট গৃহপতিপুত্রের সবিনয় প্রার্থনাকে তথাগত ভগবান বুদ্ধ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। সর্বজ্ঞ বুদ্ধের সে প্রত্যাখ্যান এখনও পূর্বের মত সেরকমই প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে। যাঁরা চীবর পরিধান করে বুদ্ধ নিন্দিত উপরোক্ত প্রকারের তন্ত্র-মন্ত্র ও তাবিজ-কবচরূপ নিম্ন বিদ্যার মাধ্যমে লোক ঠকিয়ে অর্থোপার্জন করে জীবিকা নির্বাহ করছেন এবং বুদ্ধ শাসনকে কলুষিত করছেন, তাঁদেরকে চিহ্নিত করে তাঁদের কাছ হতে সাবধান থাকা আজ সময়ের দাবী। ( সুত্র ড. বরসম্বোধি ভিক্ষু) সাধু সাধু সাধু।
সূত্র সংগৃহিত।
#বুদ্ধেরঋদ্ধিপ্রদর্শন #বুদ্ধেরঅলৌকিকক্ষমতাপ্রদর্শন
#বৌদ্ধধর্ম #ত্রিপিটক