09/13/2026
সংকটে সামাজিক যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতা
______মির্জা গালিব উজ্জ্বল
পারিবারিক কলহ আর কেবল চার দেয়ালের ভেতরের ব্যক্তিগত মনস্তাপের নাম নয়; এটি এখন এক ভয়াবহ সামাজিকভাবে মহামারীতে রূপ নিয়েছে। বৈবাহিক জীবনের সুবাতাসের খোঁজে যাত্রা শুরু হলেও তার করুণ সমাপ্তি ঘটছে মানসিক ট্রমা, বিচ্ছেদ কিংবা মর্মান্তিক ধ্বংসের মধ্য দিয়ে। অথচ, প্রতিটি মানুষেরই চাওয়া ছিল একটু শান্তিতে থাকা, একটু ভালো থাকা। তবে প্রশ্ন ওঠে—কোথায় গলদ? কেন যাপিত জীবনের অতি সাধারণ মুহূর্তগুলো দিনশেষে বিস্ফোরণে রূপ নিচ্ছে? সাম্প্রতিক সামাজিক কাঠামোর চুলচেরা বিশ্লেষণে পাঁচটি ভয়াবহ রূপরেখা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
অর্থনীতির কশাঘাত ও চাহিদার চরম অপূর্ণতা
নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ পরিবারের জীবনের স্বাভাবিক ছন্দকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিচ্ছে। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য হারিয়ে মানুষ আজ দিশেহারা। অতীতের যে স্বচ্ছন্দ জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত ছিল মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত সমাজ, আজকের বাস্তবতায় তা অকল্পনীয়। জীবনমানের এই অনাকাঙ্ক্ষিত অবক্ষয় এবং নিত্যদিনের চাহিদার অপূর্ণতা পরিবারের কর্তা ও কর্ত্রীকে প্রতিনিয়ত এক ধরনের মানসিক অস্থিরতার মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে। এই আর্থিক চাপই দম্পতিদের মধ্যে তৈরি করছে প্রচণ্ড ক্ষোভ, যার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটছে তুচ্ছ বিষয় নিয়ে কলহে।
ডিজিটাল বিভ্রম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিষাক্ত প্রভাব: আমাদের জীবনের ওপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুকের আগ্রাসন আজ সামাজিক অস্থিরতার অন্যতম জ্বালানি। একদিকে লোভনীয় অনলাইন শপিংয়ের অন্তহীন প্রচারণা অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটার যে মোহ তৈরি করছে, তা সীমিত আয়ের পরিবারগুলোতে আর্থিক অনটনকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। অন্যদিকে, ফেসবুকে তথাকথিত 'চেতনা' কিংবা 'সচেতনতা' বিক্রির নামে বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট—"কী দেখে বুঝবেন আপনার সঙ্গী প্রতারক" কিংবা "নিজের অধিকার চিনে রাখুন"—এর মতো পোস্টগুলো দম্পতিদের পারস্পরিক বিশ্বাসের মজবুত ভিত্তিতে চরম আস্থার সংকট তৈরি করছে। ডলার উপার্জনের চটকদার প্রতিযোগিতায় মানুষের ব্যক্তিগত সম্পর্কের পবিত্রতা আজ সস্তা প্রদর্শনীতে রূপ নিয়েছে।
পারস্পরিক তুলনামূলক প্রতিযোগিতা ও মনস্তাত্ত্বিক অবক্ষয়: সন্তানের স্কুল কিংবা বিকেলের আড্ডায় মায়েরা যে সময়টুকু পার করছেন, তার বড় একটি অংশজুড়ে জায়গা করে নিচ্ছে ক্ষতিকর তুলনা ও পরচর্চা। পোশাকের আভিজাত্য, কে কতটা দামি জীবনযাপন করছেন, কার স্বামীর উপার্জন কেমন—এসব অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতায় জড়াচ্ছে গৃহিণী ও পেশাজীবী নারীরা। নিজ জীবনের প্রাপ্তির চেয়ে অন্যের চাকচিক্য দেখে নিজের সঙ্গীর ওপর অযাচিত চাপ সৃষ্টি করার এই প্রবণতা দম্পতির মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
কোথায় এর শেষ?
নব্য বিবাহিত প্রজন্ম থেকে শুরু করে দীর্ঘদিনের সংসার সামলানো মধ্যবয়সী দম্পতি—সব স্তরেই আজ সহনশীলতা ও আস্থার তীব্র সংকট। সমাধান পেতে হলে সবার আগে এই অলীক প্রতিযোগিতার বলয় থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক প্রচারণাকে রুখে দিয়ে নিজেদের আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য বিধান এবং পারস্পরিক খোলামেলা কথোপকথনের চর্চাকে ফিরিয়ে আনাই হতে পারে এই সামাজিক ক্ষয় থেকে মুক্তির একমাত্র উপায়। অন্যথায়, এই নীরব ধ্বংসাত্মক প্রবণতা আমাদের সমাজ ব্যবস্থার মৌলিক একক—'পরিবারকে' পুরোপুরি ভেঙে ছারখার করে দেবে।