07/09/2026
কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিকে ৩,৩০০টি ক্ষে*প**ণা*স্ত্র ও ড্রোন নি*ক্ষেপ করেছে। এসব হামলার বিপুল অংশই বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা ড. আনোয়ার গারগাশ। হিলি ফোরামে এক বিশেষ বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। তিনি জানান, নি*ক্ষেপ করা অধিকাংশ ক্ষে**পণা**স্ত্র ও ড্রোন আমিরাতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রতিহত করেছে।
গারগাশ বলেন, টানা এই হামলা শুধু সংযুক্ত আরব আমিরাতের সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতাই তুলে ধরেনি, বরং দেশটির সামগ্রিক জাতীয় সক্ষমতা ও সংকট মোকাবিলার দৃঢ়তাও প্রকাশ করেছে।
তিনি বলেন, আকাশে যখন ক্ষে*পণা**স্ত্র উড়ছিল, তখনও চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে আমিরাতের তেলবহির্ভূত বৈদেশিক বাণিজ্য ১৩ শতাংশ বেড়েছে। এতে স্পষ্ট হয়েছে, দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা থেমে যায়নি এবং ভবিষ্যতের জন্য নির্ধারিত লক্ষ্যগুলোও ঠিক পথেই এগোচ্ছে।
তিনি বলেন, “স্বাভাবিকভাবেই কিছু খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কিন্তু আমাদের অর্থনীতি থেমে যায়নি। এটি প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রেখেছে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতেও সম্প্রসারণ ঘটেছে।”
সংকট বদলে দেবে গোটা অঞ্চল
গারগাশের মতে, ছয় মাস ধরে চলা এই সংকট তার দৃষ্টিতে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-কৌশলগত কাঠামো ও রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে।
তিনি বলেন, “আমার দৃষ্টিতে, এই সংকট এমন একটি আঞ্চলিক ভূ-কৌশলগত বাস্তবতা তৈরি করবে, যা আগের অঞ্চলটির তুলনায় আরও জটিল ও অনেক বেশি অনিশ্চিত।”
তিনি আরও বলেন, “তবে আমার সামান্যই সন্দেহ আছে যে আমরা আরও জটিল উপসাগরীয় অঞ্চল এবং আরও চ্যালেঞ্জিং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।”
এই পরিস্থিতিতে কৌশলগত স্বনির্ভরতা কোনো স্লোগান নয়, বরং একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত বলে মন্তব্য করেন তিনি। এর মাধ্যমে আমিরাত তার অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে, জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হয়েছে বলে তিনি জানান।
ইরানের সঙ্গে হামলা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত যোগাযোগ বজায় রাখা প্রয়োজন হবে বলেও মন্তব্য করেন গারগাশ। তিনি বলেন, “ভূগোল আমাদের সামনে যোগাযোগ ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প রাখে না।” তবে তিনি প্রয়োজনীয় কার্যকর সম্পর্ক পুনঃস্থাপন এবং পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠনের মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরেন।
ইরানকে আ**ক্রমণ না করা উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর হা**মলাকে তিনি “পূর্বপরিকল্পিত পছন্দের যুদ্ধ” এবং “কৌশল ও রাষ্ট্র পরিচালনায় গভীর ব্যর্থতা” হিসেবে বর্ণনা করেন।
তার ভাষ্য, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ইরান প্রতিবেশীদের সঙ্গে এমন সব সম্পর্কের সেতু ধ্বং*স করেছে, যেগুলো গড়ে উঠতে কয়েক দশক সময় লেগেছিল।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে কার্যকর সম্পর্ক আবারও প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হলেও তেহরানের সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর সম্পর্কের পেছনে থাকা পারস্পরিক সদিচ্ছার ভিত্তি ধ্বং*স হয়ে গেছে। সেই আস্থা ফিরিয়ে আনতে বহু বছর, এমনকি কয়েক দশকও লেগে যেতে পারে।
আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া ‘হতাশাজনক’
সংকট মোকাবিলায় আরব, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াকে “অকার্যকর ও হতাশাজনক” বলে মন্তব্য করেন গারগাশ।
তার মতে, যু**দ্ধ ঠেকানো, জ্বালানি ও সামুদ্রিক বাণিজ্য সুরক্ষিত রাখা এবং গাজায় শুরু হওয়া সংঘাতকে আরও বিস্তৃত সংঘ**র্ষে রূপ নেওয়া থেকে ঠেকানোর ক্ষেত্রে সম্মিলিত প্রতিক্রিয়া প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।
তিনি বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলো আলাদাভাবে নিজেদের সক্ষমতা দেখিয়েছে। কিন্তু দেশগুলোর পৃথক প্রতিক্রিয়া সমানভাবে কার্যকর কোনো সম্মিলিত কৌশলে রূপ নেয়নি।
গারগাশ বলেন, “আমি মনে করি না, সম্মিলিতভাবে আমরা হুমকির মাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কৌশলগত প্রতিক্রিয়া দেখাতে পেরেছি।”
তার মতে, সমস্যা ছিল ইরান থেকে আসা চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে বোঝাপড়ার অভাব নয়; বরং অভিন্ন মূল্যায়নকে যথেষ্ট ঐক্যবদ্ধ প্রতিক্রিয়ায় পরিণত করতে না পারা।
কোনো একক দেশের নিয়ন্ত্রণে থাকা উচিত নয় হরমুজ প্রণালি
গারগাশ বলেন, হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎই বর্তমান সংঘা**তের অন্যতম কেন্দ্রীয় বিষয়। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “মূলত সামরিক পরাজয়ের” মুখোমুখি হওয়ার পর ইরান কীভাবে ভূ-কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন করতে পারে।
তার ভাষ্য, বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবহন করা মোট তেলের প্রায় এক-চতুর্থাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়। পাশাপাশি বৈশ্বিক কৃষির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সারেরও উল্লেখযোগ্য অংশ এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে এই নৌপথে বিঘ্ন ঘটলে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্বের জ্বালানি, বাণিজ্য ও খাদ্য নিরাপত্তাকেও হু*মকির মুখে ফেলতে পারে।
গারগাশ বলেন, “কোনো একক রাষ্ট্রের হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত নয়। এটি বৈশ্বিক গুরুত্বসম্পন্ন একটি আন্তর্জাতিক জলপথ, এমন কোনো কৌশলগত সুবিধা নয় যা যে দেশই এটি বন্ধ করার সক্ষমতা রাখে, সে নিজের ইচ্ছামতো ব্যবহার করবে।”
এই জলপথকে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা গ্রহণযোগ্য নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন। বাণিজ্যিক জাহাজে হা**মলার ক্ষেত্রে “পরিণতি ভোগ করতে হবে” বলেও সতর্ক করেন তিনি।
বিকল্প বাণিজ্যপথ শক্তিশালী করছে আমিরাত
গারগাশ বলেন, “সামুদ্রিক নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা সবসময়ই আমাদের অগ্রাধিকারের কেন্দ্রে ছিল। এখন এগুলো আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে সামনে এসেছে।”
তিনি জানান, আমিরাত তার পূর্ব উপকূলে বন্দর সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি পূর্ব উপকূলের সঙ্গে সংযোগকারী পাইপলাইন, রেলপথ ও বাণিজ্যিক অবকাঠামো শক্তিশালী করার পাশাপাশি বিকল্প পণ্য পরিবহন করিডরও গড়ে তোলা হচ্ছে।
তিনি বলেন, “আমাদের জ্বালানি রপ্তানি জি*ম্মি হতে দেওয়া হবে না, একইভাবে আমাদের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও থেমে থাকবে না।”
তিনি আরও বলেন, এই পরিকল্পনা নতুন করে শুরু করা হয়নি। এর বড় একটি অংশ আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল। বর্তমান সংকট এসব পরিকল্পনার বাস্তবায়ন দ্রুততর করেছে এবং কাজ শেষ করার প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়িয়েছে।
গারগাশ সংকট কমাতে দীর্ঘমেয়াদি উত্তেজনা প্রশমন, হরমুজ প্রণালিতে অবাধ নৌ চলাচল, ভবিষ্যতে ইরানের হাম**লা ঠেকাতে বিশ্বাসযোগ্য নিশ্চয়তা এবং সার্বভৌমত্ব ও অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতির প্রতি নতুন করে সম্মান প্রদর্শনের আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, যু**দ্ধ ও শান্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কোনো মি*লিশিয়া গোষ্ঠীর হাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। একই সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে স্পষ্ট শর্ত, কার্যকর যাচাই ব্যবস্থা এবং শর্ত না মানলে পরিণতির ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধক্ষমতা ও জাতীয় সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও কৌশলগত স্বনির্ভরতার অর্থ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া নয় বলে মন্তব্য করেন গারগাশ। তার মতে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমিরাতের দীর্ঘদিনের অংশীদারত্ব দেশটির নিরাপত্তা ও শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
তবে প্রতিরোধক্ষমতার পাশাপাশি নিরাপত্তা, অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, নৌ চলাচলের স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠনের বিষয়গুলো নিয়ে কার্যকর কূটনীতিও প্রয়োজন বলে তিনি জানান।
গারগাশ বলেন, “সম্পর্ক আস্থার চেয়ে দ্রুত পুনঃস্থাপন করা যায়। আস্থা হলো সেই পাহাড়, যেটি আমাদের পাড়ি দিতে হবে।”
তিনি বলেন, ইরানের আগ্রাসন প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং দেশটিকে আরও বিচ্ছিন্ন করেছে। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার পথ হলো সম্পর্কের সেতু পুনর্নির্মাণ, উত্তেজনা কমানো এবং একটি টেকসই রাজনৈতিক সমাধানে পৌঁছানো।
তিনি আরও বলেন, “কূটনীতি সফল করতে হলে শেষ পর্যন্ত ইরানের উদ্দেশ্যকে তার কথার ভিত্তিতে নয়, বরং তার কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে বিচার করতে হবে।”