08/03/2026
উনিশ বছর পর কলকাতায় ফিরে তসলিমা নাসরিনের কণ্ঠে স্বাধীন চিন্তা, মানবাধিকার ও সংস্কারের আহ্বান
ক্রিটিক, আগস্ট ০৩, ২০২৬॥
“আজ আমি আবার কলকাতায় ফিরে এসেছি” এই একটি বাক্য উচ্চারণ করতেই যেন কেটে গেছে প্রায় উনিশ বছর। দীর্ঘ নির্বাসন, হারিয়ে যাওয়া ঠিকানা, দেশছাড়া জীবনের অসংখ্য ক্ষত আর ভাষার প্রতি অবিচল ভালোবাসা, সব মিলিয়ে কলকাতায় ফিরে নিজের বক্তব্য শুরু করেন নির্বাসিত বাঙালি লেখক তসলিমা নাসরিন।
তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তিগত জয় বা রাজনৈতিক অহংকারের জন্য তিনি কথা বলতে আসেননি। তাঁর কণ্ঠ বরাবরই সমানাধিকারের পক্ষে, মানবাধিকারের পক্ষে, ধর্মীয় সমতার পক্ষে, মুক্তবুদ্ধির পক্ষে এবং মানুষের নির্ভয়ে কথা বলার অধিকারের পক্ষে।
বক্তৃতার শুরুতেই তসলিমা নাসরিন স্মরণ করেন তাঁর জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা আগস্ট মাসকে। এই মাসেই তাঁর মায়ের জন্মদিন, এই মাসেই তাঁর স্বাধীনতার স্মৃতি, আবার এই মাসেই ১৯৯৪ সালের ৮ আগস্ট তাঁকে বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। সেই নির্বাসনের ৩২ বছর পূর্ণ হতে আর মাত্র কয়েক দিন বাকি, এই কথাটি বলতে গিয়েও তাঁর কণ্ঠে ধরা পড়ে দীর্ঘ বেদনার ইতিহাস।
তিনি বলেন, রাষ্ট্র একজন মানুষকে দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে, কিন্তু তার হৃদয় থেকে জন্মভূমিকে মুছে দিতে পারে না। বহু বছর পর কলকাতায় আশ্রয় পেলেও ২০০৭ সালের ২২ নভেম্বর পশ্চিমবঙ্গ সরকারও তাঁকে সেখান থেকে চলে যেতে বাধ্য করে। তাঁর ভাষায়, তিনি কোনো অপরাধ করেননি, কোনো আদালত তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করেনি। তবু ধর্মীয় মৌলবাদের চাপে তাঁকে নিজের ঘর, শহর, ভাষার পরিবেশ এবং স্বাভাবিক জীবন হারাতে হয়েছে।
ভাষা ও সংস্কৃতির প্রশ্নে তসলিমার বক্তব্য ছিল আবেগময়। ইউরোপ তাঁকে নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও আশ্রয় দিয়েছে, এ জন্য তিনি কৃতজ্ঞ। কিন্তু নাগরিকত্ব আর নিজের ঘর এক জিনিস নয়। একটি ঘর গড়ে ওঠে ভাষা, সংস্কৃতি, স্মৃতি এবং মানুষের ভালোবাসায়। তাঁর কাছে বাংলা ভাষাই সেই চিরস্থায়ী ঠিকানা।
নিজের সাহিত্যজীবনের শুরুর কথাও স্মরণ করেন তসলিমা নাসরিন। ময়মনসিংহে বসে কৈশোরে কলকাতার কবিতা পড়েছেন, গান শুনেছেন, নাটক শুনেছেন। পশ্চিমবঙ্গের ছোট কাগজে লেখালেখিও শুরু করেছিলেন। তাঁর বিশ্বাস, রাজনৈতিক সীমান্ত বাংলা ভাষাকে বিভক্ত করতে পারেনি; সাহিত্য দুই বাংলার মানুষের মধ্যে একটি অদৃশ্য সেতু তৈরি করেছে।
বক্তৃতার বড় একটি অংশজুড়ে ছিল মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্ন। তাঁর মতে, একজন লেখকের জীবন রক্ষা মানে শুধু একজন মানুষকে রক্ষা করা নয়; রক্ষা করা তার কথা বলার অধিকার, লেখার অধিকার এবং স্বাধীনভাবে চিন্তা করার অধিকার। কোনো সভ্য রাষ্ট্রে বইয়ের উত্তর বই দিয়েই দিতে হয়, যুক্তির উত্তর যুক্তি দিয়েই দিতে হয়, হুমকি, সহিংসতা কিংবা নির্বাসনের মাধ্যমে নয়।
তসলিমা প্রশ্ন তোলেন, তিন দশকেরও বেশি আগে তাঁর অপরাধ কী ছিল? তিনি তো শুধু নারী-পুরুষের সমান অধিকার, সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকার এবং এমন সব সামাজিক ও ধর্মীয় কাঠামোর পরিবর্তনের কথা লিখেছিলেন, যেগুলো মানুষের স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার অধিকার কেড়ে নেয়। অথচ সেই লেখাকেই রাষ্ট্র ও মৌলবাদীরা অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।
ধর্মীয় মৌলবাদের সমালোচনা করতে গিয়ে তসলিমা নাসরিন বিশেষভাবে ইসলামি মৌলবাদের প্রসঙ্গ তোলেন। তবে একই সঙ্গে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, মৌলবাদের সমালোচনা কখনোই মুসলমান বা ইসলামের বিরুদ্ধে অবস্থান নয়। তাঁর লড়াই কোনো ধর্মবিশ্বাসী মানুষের বিরুদ্ধে নয়; বরং এমন সব চরমপন্থী চিন্তার বিরুদ্ধে, যা নারীর অধিকার, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, মুক্তচিন্তা এবং মানবাধিকারের ওপর আঘাত হানে।
তিনি বলেন, মানবাধিকার কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা সম্প্রদায়ের জন্য নয়; এটি মানুষের অধিকার। মুসলিম সমাজের ভেতরেও মুক্তচিন্তা, নারীর অধিকার এবং আধুনিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যারা নিজের জীবনে আধুনিকতা চান, কিন্তু মুসলিম সমাজের জন্য মধ্যযুগীয় ব্যবস্থা বজায় রাখতে চান, তাঁর মতে তারাই মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ক্ষতি করছেন।
ইতিহাসের দিকে ফিরে তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্বের বহু ধর্মই একসময় মতপ্রকাশ দমনের যুগ অতিক্রম করেছে। কিন্তু এখনও বহু মুসলিম দেশে ধর্মদ্রোহ বা ভিন্নমত প্রকাশের জন্য মানুষ নিপীড়নের শিকার হন। এই বাস্তবতা বদলাতে হলে সহিংসতা নয়, প্রয়োজন মুক্তচিন্তা, যুক্তিবাদ, মানবাধিকার এবং সামাজিক সংস্কার।
বক্তৃতার শেষ অংশে তিনি আবারও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন কলকাতার মানুষ এবং আয়োজকদের প্রতি। তবে সেই কৃতজ্ঞতার সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতাও উচ্চারণ করেন, কৃতজ্ঞতা কখনো স্বাধীন চিন্তার বিনিময়ে হতে পারে না। তিনি তাঁর মুক্তবুদ্ধি, প্রশ্ন করার অধিকার এবং সত্য বলার দায়িত্ব কোনো অবস্থাতেই ত্যাগ করবেন না।
উনিশ বছর পর কলকাতায় ফিরে তসলিমা নাসরিনের বক্তব্য কেবল ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তনের গল্প নয়; এটি ভাষার প্রতি আনুগত্য, নির্বাসনের বেদনা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্মীয় সহনশীলতা এবং মানবাধিকারের পক্ষে এক দীর্ঘ, দৃঢ় ও আপসহীন অঙ্গীকার।