02/16/2026
ড. ইউনূস আজ বিদায় নিলেন এমন একটা জায়গা থেকে, যেখান থেকে এক বছর আগেও বাংলাদেশকে কল্পনা করাই কষ্টকর ছিল। ভাঙা অর্থনীতি, হাপাতে থাকা ব্যাংকখাত আর ধসে পড়া আস্থা – এই সবকিছুর মাঝখান দিয়ে তিনি একটা রক্তাক্ত দেশের হাতে অন্তত ন্যূনতম ভরসার মতো একটা হিসাব রেখে গেলেন।
রিজার্ভ, খাদ্য মজুদ আর ঋণের বোঝা ক্ষমতা নেওয়ার সময় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল হাতে–গোনা কয়েক মাসের আমদানি ব্যয়ের সমান, প্রায় ১৫–১৯ বিলিয়ন ডলারের মতো নিচু এক স্তরে নেমে গিয়েছিল এই সেফটি কুশন।
দেড় বছরের মাথায় সেই রিজার্ভ টেনে তোলা হয়েছে প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি, ২৯ বিলিয়ন ডলারের আশেপাশে – যাতে অন্তত ছয় মাসের খাদ্য আমদানি চালিয়ে নেওয়ার মতো সুরক্ষা থাকে পরের সরকারের জন্য।
এই রিজার্ভ বাড়ানোটা কোনো “জাদু” ছিল না, বরং কড়া মুদ্রানীতি, সুদের হারের কৃত্রিম বাঁধন খুলে দেওয়া, ব্যাংকবোর্ড পাল্টে দেওয়া আর অকারণ খরচে কাটছাঁট – এসব অপছন্দনীয় সিদ্ধান্তের ফল।
একই সময়ে আগের আমলের স্ফীত হয়ে ওঠা সরকারি ঋণ, যা শেখ হাসিনার শাসনামলে কয়েক বছরে ১৪ লাখ কোটি টাকারও বেশি বেড়ে দেশকে চেপে ধরেছিল, তার সুদ–কিস্তি টেনে নেওয়ার ভারও পড়েছে ইন্টেরিম সরকারের ঘাড়ে।
রিজার্ভ জমাতে জমাতে, সেই পুরোনো ঋণের ঘা সামলাতে সামলাতে, নিত্যপণ্যে ভর্তুকি দিয়ে বাজার ঠান্ডা রাখার চেষ্টা – সব মিলিয়ে সময়টা ছিল এমন, যেখানে টাকা জমানোর চেয়ে টিকে থাকাটাই আসল চ্যালেঞ্জ ছিল।
ভাঙা দেশটাকে টেনে তোলার চেষ্টা যে বাংলাদেশটাকে তারা হাতে পেয়েছিল, সেটা ছিল “দুর্বাঘাসের মতো নেতিয়ে পড়া” – রাজনৈতিকভাবে, অর্থনৈতিকভাবে, নৈতিকভাবেও।
ব্যাংকের ভেতরে খারাপ ঋণ, বাইরে ডলার–সংকট, এর মধ্যে আইএমএফের কড়া শর্ত, আর সবার উপর মানুষের নরম কিন্তু গভীর অবিশ্বাস – এই সব মিলিয়ে দেশের হাঁপ ধরা অবস্থা।
এই অবস্থায় ইন্টেরিম সরকার প্রথমে মরার গাছে পানি দেওয়ার চেষ্টা করেছে – ব্যাংকিং সেক্টরে পরিচ্ছন্নতা আনতে, অকারণ উন্নয়ন–প্রকল্প গুছিয়ে ফেলতে, আমদানির বিল মেটাতে, আর গরিবের বাজার যেন একেবারে ভেঙে না যায় – তার জন্য নিত্যপণ্যের ওপর শুল্ক কমানো, খাদ্য আমদানিতে এলসি শিথিল করা, বাজারদর নিয়ন্ত্রণে সরাসরি হস্তক্ষেপের মতো অপছন্দনীয় কিন্তু প্রয়োজনীয় কাজ করেছে।
তার বিনিময়ে যে সাধারণ মানুষের কষ্ট এক ঝটকায় কমে গেছে – তা না, কিন্তু পুরো ভেঙে পড়াটাও যে ঠেকানো গেছে, সেই ক্রেডিট একেবারেই শূন্য নয়।
ক্ষমতার লোভ নয়, কাজের সুযোগ চাওয়াড. ইউনূস শুরু থেকেই বলেছেন, তিনি ক্ষমতার চেয়ার না, দায়িত্ব পেতে রাজি হয়েছেন – তাও ছাত্রদের অনুরোধ, রাজনৈতিক সমঝোতা আর নির্দিষ্ট সময়সীমার শর্তে।
তাঁর নিজের ভাষায়, এ ছিল “স্টেট রিপেয়ারিং মিশন”; বাইরে থেকে বিনিয়োগ আনবেন, বড় দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক মেরামত করবেন, আর ভেতরে রাজনৈতিক দল, আমলা, সেনাবাহিনী–পুলিশ সবাই মিলে ঘরটা গুছিয়ে নেবে – এমন এক ভাগাভাগি স্বপ্ন।
কিন্তু বাস্তবতা ছিল খুবই অমায়িক। তিনি যখন বিদেশ সফরে গিয়ে বিনিয়োগের কথা বলছেন, সেই সময়ে দেশের ভেতরে কখনো দলীয় কোন্দল, কখনো ধর্মীয় উত্তেজনা, কখনো ছাত্র–রাজনীতির হিসাব না মেলা – সব মিলিয়ে অস্থিরতার আগুন ঠান্ডা হয়নি।
নিরাপত্তা বাহিনীও সব সময় “রিফর্মড” আচরণ করতে পারেনি, কখনো রাজনৈতিক চাপ, কখনো মাঠের বাস্তবতা – এই দুইয়ের মাঝে আটকে গেছে। ফলে ইউনূস তাঁর দক্ষতার পুরোটা দেখানোর মতো একটা স্থির মাঠ আসলে কখনোই হাতে পাননি।
বিদায়ের দিনের মুখ, ক্লান্তি আর আক্ষেপআজকে তিনি যখন বিদায়ী ভাষণ দিলেন, মুখে কৃতজ্ঞতা, চোখেমুখে ক্লান্তি, ভেতরে চাপা অনেক না–বলা কথা – সবই একসাথে দেখা গেল।
আইন–শৃঙ্খলা তিনি নিজেও স্বীকার করেছেন, “প্রত্যাশামতো হয়নি”; অর্থনীতি কিছুটা স্থিতিশীল হলেও, ঘরের মানুষের কষ্ট পুরোটা কমাতে পারেননি – এটাও স্বীকার করেছেন বিনা দ্বিধায়।
তিনি কাউকে দায়ী না করে নিজের ব্যর্থতার অংশটুকু মাথা পেতে নিলেন, এ দেশবাসীর কাছ থেকে পাওয়া সুযোগের জন্য ধন্যবাদ জানালেন, তারপর নিঃশব্দে সরে গেলেন – যেন কেউ একটা অসমাপ্ত ডায়েরি আলতো করে বন্ধ করে রেখে যাচ্ছে।
তাঁর নামে অভিযোগ আছে, সমালোচনা আছে, রাস্তায় পোস্টার আছে – কিন্তু একই সাথে আক্ষেপও আছে, আমরা একটা মানুষকে পুরো শক্তি দিয়ে কাজ করার মতো পরিবেশ দিতে পারিনি; আমাদের নিজেদের ঝগড়া, অবিশ্বাস আর অস্থিরতায় অনেকটা সম্ভাবনা অপচয় হয়ে গেছে। হয়তো একদিন, ব্যাকস্পেস চাপার আগে…আজকে হয়তো অনেকেই ভাবছে, “এই সরকার তো এমন খুব বড় কিছু করতে পারল না।”
কাল যখন নতুন সরকারকে সমালোচনা করতে বসব, যখন আবার সামাজিক মাধ্যমে লিখে হঠাৎ থেমে যাব, ব্যাকস্পেস চেপে পোস্ট ডিলিট করব – তখন হয়তো আমাদের কারও কারও মনে পড়বে, এক সময় আমাদের একজন ড. ইউনূস ছিলেন, যাকে আমরা ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারিনি।
তার চলে যাওয়ার দৃশ্যটা খুব চওড়া কোনো দৃশ্য না, কিন্তু খুব লম্বা। এই দেশের ইতিহাসে কোথাও না কোথাও, এই দেড় বছরের চাপা ক্লান্তি আর অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতিটা ঠিকই জায়গা করে নেবে – হয়তো আজ না, কাল; হয়তো আমাদের বা আমাদের সন্তানের কোনো এক রাত জাগা প্রশ্নের মধ্যে।