03/09/2026
নফসের বিরুদ্ধে লড়াই
নফসের ব্যাধি
১. অহংকার:
এ সর্ম্পকে কয়েকটি হাদিস ও কুরআনের আয়াত রয়েছে। মহান আল্লাহর সঙ্গে কৃত সর্বপ্রথম গোনাহ হলো অহংকার।
▪️এ ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারিমে ইরশাদ করেন,
নিশ্চয় তিনি (আল্লাহ) অহংকারীদের ভালোবাসেন না। (সূরা নাহল, আয়াত-২৩)
▪️আল্লাহ তাআলা বলেন, যখন আমি ফেরেশতাদের বললাম, তোমরা আদমাকে সিজদা করো, তখন ইবলিস ছাড়া সবাই সিজদা করল। শুধু সে অহংকার বশত সিজদা করতে অস্বীকার করল। আর সে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলো। (সূরা বাকারা, আয়াত-৩৪)
▪️অহংকারীদের জায়গা হচ্ছে জাহান্নাম। যেটা রাসুল (সা.) সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন,
হারিস ইবনু ওয়াহাব খুযাঈ রাযি. থেকে বর্ণিত,
তিনি বলেন, আমি নবী (সা.) কে বলতে শুনেছি, আমি কি তোমাদেরকে জান্নাতী লোকদের পরিচয় বলবো না? তারা দুর্বল এবং অসহায়, কিন্তু তারা যদি কোনো ব্যাপারে আল্লাহর নামে কসম করে বসেন, তাহলে তা পূরণ করে দেন। আমি কি তোমাদেরকে জাহান্নামী লোকদের পরিচয় বলবো না? তারা রূঢ় স্বভাব, অধিক মোটা, এবং অহংকারী তারাই জাহান্নামী। (সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৪৯১৮)
▪️অপর একটি হাদিসে এসেছে,
অহংকারী মানুষ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।
▪️রাসুল সা. ইরশাদ করেন, যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।
একজন সাহাবি বলেন, মানুষ তো চায় যে, তার কাপড় সুন্দর হোক এবং তার জুতা সুন্দর হোক (এটা কি অহংকার বলে গণ্য হবে?) রাসুল সা. বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ সুন্দর। অতএব, তিনি সুন্দর পছন্দ করেন। তবে অহংকার হচ্ছে সত্য প্রত্যাখান ও মানব অবমূল্যায়ন।(মুসলিম হাদিস-৯১)
▪️আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত,
রাসুল সা. ইরশাদ করেন,
একদা এক ব্যাক্তি এক জোড়া জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক পরে চলছিল। তা নিয়ে তার খুব গর্ববোধ হচ্ছিল। তার জমকালো লম্বা চুলগুলো সে খুব যত্ন সহকারে আঁচড়ে রেখেছিল। হঠাৎ আল্লাহ তাআলা তাকে ভূমিতে ধসিয়ে দেন এবং সে কিয়ামত পর্যন্ত এভাবেই নিচের দিকে নামতে থাকবে। (বুখারী হাদিস, ৫৭৮৯)
▪️আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত ,
রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন,
তিন ব্যাক্তির সঙ্গে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা কথা বলবেন না, তাদের গোনাহ থেকেও পবিত্র করবেন না, তাদের দিকেও রহমতের দৃষ্টিতেও তাকাবেন না এবং তাদের জন্য আছে কঠিন শাস্তি। তারা হচ্ছে বৃদ্ধ ব্যভিচারী, মিথ্যুক রাষ্ট্রপতি ও দাম্ভিক ফকির। (মুসলিম হাদিস, ১০৭)
কিছু কথন:
> অহংকার ধ্বংসের সুতো বুনে। আর আমরা সেই সুতো ব্যবহার করে নিজেরাই নিজেদের আত্মিক উন্নয়নে কপাট লাগাই!
> অহংকার পতনের মূল। কারণ, অহংকার হচ্ছে সত্যকে উপেক্ষা করে মিথ্যার আশ্রয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা। নিজেকে বড় মনে করে কল্পনার রাজ্যে এক বিশাল অট্টালিকা নির্মাণ করা। যেই অট্টালিকায় শুধু আপনি-ই রাজা; বাকি সব প্রজা।
> অহংকার দমিয়ে রাখতে শিখুন, নতুবা এক দরজা দিয়ে বাঘ হয়ে ঢুকে, অপর দরজা দিয়ে ইঁদুর হয়ে বের হতে হবে।
> নফসকে এসলাহ করা যাবে না, যতক্ষণ না অহংকারের মতো বড় শত্রু থেকে নিজেকে আত্মগোপন করছেন।
> আমি জানি-আমার মাথা আমার টুপির চেয়ে বড় নয়; আমি জানি-আমার দেহ আমার জামা থেকে বড় নয়। ঠিক তদ্রুপ, আমার কর্মও কখনো শিক্ষার উর্ধ্বে নয়; আমার ব্যক্তিত্বও অমুকের উর্ধ্বে নয়। তবে কেনো এত অহংকার? যদি তোমার আত্মমর্যাদা তোমার হৃদয়ের চেয়ে বড় এবং তোমার অহংকার তোমার মাথার চেয়ে বড় হয়, তবে তা দূর করার চেষ্টা করো। কেননা, এটাই তোমাকে বিষণ্ণতায় নিক্ষেপ করবে; ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিবে।
> একারণে অন্যকে ঘৃণা করা, তোমার অহংকারী পরিচয় সর্বত্র তুমি যতোই নিজেকে অহংকারমুক্ত দাবি করো-না কেন। প্রচার করছে। তাই, নিজেকে অহংকারমুক্ত দাবি না-করে, অহংকারের গোড়ায় নম্রতার পানি ঢালো।
> সেই সংসার সুখের মুখ দেখতে পায় না। কর্তা-কর্তী'র মুখ নামক সংসারের উন্ননে যদি অহংকারের আগুন প্রজ্জলিত হয়, তবে উনুন থেকে শুধু আগুনের ধোঁয়া-ই বের হয়; হিমেল শীতল হাওয়া নয়। এজন্যই বলা হয়-একজন অহংকারী মহিলা সংসারের পুরো কাঠামো বিনষ্ট করতে যথেষ্ট: একজন অহংকারী মহিলা গৃহে আগুন লাগাতে যথেষ্ট।
অহংকার এমন এক চাদর, যা মানুষের সকল গুণাবলি ঢেকে নেয়। অহংকার এমন এক আবরণ, যা একজন মহৎ ব্যক্তির মহত্বকে ঢেকে দেয়। অহংকার এমন এক চাদর, যা একজন ভুলে ভরা মানুষের সমস্ত ভুলের উপর পর্দা টেনে দেয়। ফলে, ওই ব্যক্তি কখনো নিজস্ব ভুলের ব্যাপারে সম্যক অবগত হতে পারে না।
> অহংকার নিজের মধ্যেই পোষা যায়। খাবার সংগ্রহের কোনো চিন্তা থাকে না। কেননা, নফস জানে কীভাবে অহংকার নিজের মধ্যে পোষতে হয়; কীভাবে তাকে মোটা-তাজা করতে হয়।
> এই অনিশ্চিত জীবনে কীসের এত অহংকার? যেখানে প্রাণ বিয়োগে টানতে হয় অস্তিত্বের ইতি!
> মনে রাখবেন, অহংকার আপনাকে আমাকে মানসিক রোগী বানানোর জন্য যথেষ্ট। কেননা, অহংকারী নফস সর্বদাই প্রশংসার দাবিদার। এদিকে আপনার আমার খ্যাতি সীমিত সময় পর্যন্ত বহাল থাকে। এক সময় প্রশংসার পরিবর্তে নিন্দা পেতে হয়-নানান জনের কাছ থেকে। তখন অহংকারী নফস এটা কখনোই মেনে নিতে পারে না। যার ফলে ডিপ্রেশন সর্বদাই আমাদের দরজায় কড়া নাড়তে থাকে।
> অহংকার নফসের এমন এক বিপদজনক অবস্থা, যা সর্বদাই আপনার আমার ধ্বংসের কূপ খননে ব্যস্ত। অহংকার নফসের এমন এক ব্যাধি, যা দু'জন ঘনিষ্ঠ মানুষের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করতে অগাধ ভমিকা রাখে। অহংকার নফসের এমন এক ব্যাধি, যা মনের গহীনে লুকিয়ে থাকা অব্যক্ত ভালোবাসা এবং যাবতীয় গুণাবলীকে গ্রাস করে নেয়। অহংকার নফসের এমন এক ব্যাধি, যা জ্ঞান অর্জনের রাস্তায় সর্বদাই প্রতিবন্ধকতা।
আমরা বলি অমুক শিক্ষিত হয়েছে, অনেক বড় ডিগ্রি অর্জন
ধারণা ভুল। প্রকৃতপক্ষে, কোনো জ্ঞানী-ই, অহংকারী হতে পারে
করেছে, তাই দিন দিন তার অহংকার বৃদ্ধি পাচ্ছে-আসলে এই অহংকার ততই বৃদ্ধি পাবে।
না। জ্ঞান হলো অহংকার দূর করার মাধ্যম, যতই জ্ঞান বাড়বে
অহংকার ততই হ্রাস পাবে। পক্ষান্তরে যতই জ্ঞান কমবে,
> জীবনের দূরপাল্লায় তুমি কখনো সফলতার মূল লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে না, যদি তোমার অহংকার, তোমার ওপর বিজয় অর্জন করে। আগে অহংকার'কে পরাজিত করো, তারপর অন্যত্র বিজয় তালাশ করো।
> হযরত মাওলানা মাহমুদ হাসান গঙ্গোহী রহি. যখন কোনো ত্বলিবুল ইলমের মধ্যে অহংকার দেখতে পেতেন, তখন তার এই অহংকারের চিকিৎসার জন্য তাকে আদেশ দিতেন, "তুমি দৈনিক পাঠকক্ষের সামনে ছাত্রদের জুতো ঠিক করে রাখবে!" আর যখন কোনো ত্বলিবুল ইলমকে বিনয়ী দেখতেন, তখন তার জুতো তিনি নিজেই ঠিক করে দিতেন! আল্লাহু আকবার!
বই: নফসের বিরুদ্ধে লড়াই
লেখক: মাহমুদ বিন নূর