18/05/2026
জিলহজ্ব মাসের প্রথম ১০ দিন (বিশেষ করে প্রথম নয় দিন, কারণ ১০ম দিন ঈদুল আজহা হওয়ায় সেদিন রোজা রাখা হারাম) ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত বরকত ময় ও মর্যাদাপূর্ণ।
এই দিনগুলোর এবাদত আল্লাহর কাছে বছরের অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রিয়।
হাদিসের আলোকে জিলহজের প্রথম নয় দিনের রোজা রাখার অতুলনীয় ফজিলত নিচে বিস্তারিত সাজিয়ে দেওয়া হল।
১. আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল
রাসুলুল্লাহ (সা.) এই দিনগুলোর আমলকে সর্বোত্তম বলে ঘোষণা করেছেন।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
জিলহজের প্রথম ১০ দিনের আমলের চেয়ে আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় আর কোন আমল নেই। সাহাবী রা. জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও কি এর চেয়ে উত্তম নয়? তিনি বললেন, না জিহাদ ও নয়। তবে সেই ব্যক্তির কথা ভিন্ন, যে নিজের জান ও মাল নিয়ে জিহাদে বের হয়েছে এবং এর কোন কিছুই আর ফেরত নিয়ে আসেনি (অর্থাৎ শহীদ হয়েছে)।
[সহীহ্ বোখারী, ৯৬৯]
২. প্রতিটি রোজার সাওয়াব এক বছরের রোজার সমান।
এই দিনগুলোতে সাধারণ নফল রোজার চেয়ে বহু গুণ বেশি চাওয়া পাওয়া যায়।
হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম বলেছেন : জিলহজের প্রথম ১০ দিনে ইবাদত করা আল্লাহর কাছে অন্য যেকোনো দিনের এবাদতের চেয়ে বেশি প্রিয়। এবং প্রতিটি দিনের রোজা এক বছরের রোজার সমতুল্য এবং প্রতিটি রাতের ইবাদত লাইলাতুল কদরের ইবাদতের সমতুল্য।
[তিরমিজি শরীফ, ৭৫৮]
৩. আরাফার দিনের রোজা : দুই বছরের গুনাহ মাফ
৯ই জিলহজ্জ বা আরাফাতের দিনের রোজা এই নয়টি রোজার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং ফজিলতপূর্ণ।
যারা হজে যাননি, তাদের জন্য এই রোজা রাখা সুন্নত।
হযরত আবু কাতাদা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আরাফার দিনে রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, এটি তার পরবর্তী এক বছর এবং পরবর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা (ক্ষমা হয়ে) যাবে।
[সহীহ্ মুসলিম, ১১৬২]
৪. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিয়মিত আমল।
এই রোজাগুলো এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে কখনোই এমনটি বাদ দিতেন না।
হযরত হাফসা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, চারটি আমল নবী করিম সাঃ কখনো ছাড়তেন না—আশুরার রোজা, জিলহজের প্রথম নয় দিনের রোজা, প্রত্যেক মাসের তিনটি (তথা ইয়ামি বীজের) রোজা এবং ফজরের ফরজের পূর্বে দুই রাকাত সুন্নত নামাজ।
[সূনানে নাসায়ী, ২৪১৬]
৫. পবিত্র কুরআনুল মাজীদে জিলহজের প্রথম দশ দিন।
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনের সূরা ফাজর এর শুরুতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের কসম খেয়েছেন। তার মধ্যে একটি হলো জিলহজ্জের এই ১০ দিন।
পবিত্র কুরআনের বাণী, আল্লাহ তা'আলা বলেন, কসম ভোরের এবং কসম ১০ টি রাতের। [সূরা আল—ফাজর-১/২]
তাফসীরে ইবনে কাসীর সহ প্রায় সব তাফসীর গ্রন্থে, এখানে ১০টি রাত বলতে জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিন ও রাতকেই বুঝানো হয়েছে। আল্লাহ তায়া’লা কুরআনে কোন সাধারণ বিষয়ের কসম খান না। যে বিষয়ের কসম খাওয়া হয়, তার গুরুত্বপূর্ণ আল্লাহর কাছে অপরিসীম।
৬. রমজানের শেষ দশদিন বনাম জিলহজ্জের প্রথম দশদিন।
ইসলামি শরীয়তে এই দুই দশকের ফজীলত নিয়ে উলামায়ে কেরাম একটি চমৎকার বিশ্লেষণ করেছেন।
ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. এই দুই দশকের তুলনা করতে গিয়ে বলেছেন—রমজানের শেষ দশকের মর্যাদা বেশি, কারণ এতে শবেকদর রয়েছে।
জিলহজ্জের প্রথম ১০ দিনের মর্যাদা বেশি, কারণ এতে আরাফারর দিন ও কুরবানির দিন রয়েছে।
সুতরাং দিনের বেলা ইবাদত (যেমন :রোজা রাখা) ও জিকিরের জন্য জিলহজের প্রথম নয় দিন বছরের সেরা দিন।
৭. এই দিনগুলোতে রোজা রাখার আত্মিক ও আধ্যাত্মিক উপকারিতা।
এই নয় দিন রোজা রাখা কেবল সওয়াব অর্জনের মাধ্যম নয়, বরং একজন মুমিনের আত্মশুদ্ধির জন্য এক মহৌষধ:
জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একদিন রোজা রাখে, আল্লাহ তার মহামন্ডল কে জাহান্নামের আগুন থেকে 70 বছরের দূরত্বে সরিয়ে নেন।
[সহীহ্ বোখারী] জিলহজ্জের মত পবিত্র মাসে রোজা রাখলে এই পুরস্কারের মর্যাদা যে আরো কত বৃদ্ধি পাবে, তা সহজেই অনুমেয়।
দোয়ার কবুলিয়ত: রোজাদারের দোয়া আল্লাহর কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়না। বিশেষ করে জিলহজ্জের ৯ দিন এবং আরাফার বিকেলে দোয়া আল্লাহর কাছে খুব দ্রুত কবুল হয়।
গুনাহ বর্জনের প্রশিক্ষণ : কোরবানির মূল উদ্দেশ্য হলো নিজের পশুবৃত্তিকে জবাই করা। বিশেষ করে জিলহজ্জপর প্রথম নয় দিন রোজা রাখার মাধ্যমে মানুষ তার নফস বা কু-প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার শক্তি অর্জন করে, যা তাকে কোরবানির মুল চেতনার দিকে ধাবিত করে।
৮. আরাফার দিনের রোজার বিশেষ ফজিলত ও গুরুত্ব।
৯ই জিলহজ্জ বা আরাফার দিনের রোজা কেন দুই বছরের গুনাহ মাফ করে? মুহাদ্দিসগণ এর ব্যাখ্যায় বলেন:
মানুষের জীবনে সাধারণত ছোটখাটো ভুল ত্রুটি বা সগিরা গুনাহ প্রতিনিয়ত হয়ে থাকে। আরাফার দিনের একটিমাত্র রোজা আল্লাহর দরবারে এতটাই মকবুল যে, আল্লাহ তার বান্দার পেছনের এক বছরের কৃত গুনাহ মাফ তো করেনই, উপরন্ত বান্দার প্রতি দয়াশীল হয়ে আগামী এক বছর তাকে বড় কোন গুনাহে লিপ্ত হওয়া থেকে হেফাজত করেন অথবা অগ্রিম গুনাহ মাফ করে দেন।
তবে মনে রাখতে হবে, বড় গুনা বা কবিরা গুনাহ এবং বান্দার হকের (কারো পাওনা বা অধিকার নষ্ট করা) জন্য খাঁটি তাওবা বা ক্ষমা চেয়ে নেওয়া জরুরী।
৯. সালফে সালেহিন বা পূর্বসূরিদের আমল কেমন ছিল?
হযরত হাসান বসরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি, ইমাম আতা রহমাতুল্লাহি আলাইহি, এবং প্রখ্যাত তাবেয়ীগণ জিলহজের চাঁদ দেখার পর থেকে নিজেদের এবাদতের প্রতি বহুগুণ বাড়িয়ে দিতেন।
সাঈদ ইবনে যুবায়ের রহমতুল্লাহি আলাইহি, যিনি একজন প্রখ্যাত তাবিয়ী ছিলেন, জিলহজের প্রথম দশ দিন এলে এবাদতে এতটাই মগ্ন হয়ে যেতেন যে, তাকে দেখে মনে হতো তিনি নিজের সাধ্যের শেষ সীমানায় পৌঁছে গেছেন। তিনি বলতেন, তোমরা জিলহজের রাতে তোমাদের ঘরের বাতি নিভিয়ে দিও না (অর্থাৎ সারারাত জেগে ইবাদত করো এবং দিনে রোজা রাখো)।
যদি কোন ব্যক্তি অলসতা বসত বা গুরুত্ব না বুঝে এই নয়টি রোজা মিস করেন তবে তিনি মূলত :
নয় বছর নফল রোজা রাখার সমপরিমাণ সওয়াব হারালেন!
নয়টি লাইলাতুল কদরের সমান মর্যাদা পূর্ণ রাতের এবাদতের সাওয়াব থেকে বঞ্চিত হলেন!
দুই বছরের গুনাহ মাফের এক রাজকীয় সুযোগ হাতছাড়া করলেন!
জিলহজ মাসের প্রথম রোজা ১৮ই মে সোমবার থেকে ২৭ তারিখ বুধবার পর্যন্ত! ( মানে আজ রাত থেকে সাহরি খেয়ে ২৭ তারিখ পর্যন্ত রাজা রাখবেন)
আসুন আমরা সকলেই জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশদিন আমল ও দোয়ায় কাটাবো, এবং শে/য়া/র করে সবাইকে আমলের সুযোগ করে দিবো ইনশা আল্লাহ।💚💚❤️❤️💚💚💚💚❤️❤️🤲🤲🤲🤲🤲