02/10/2025
#তোমার_প্রেমে_আমি_পড়েছি (০৮)
সূর্য যখন মধ্য আকাশে, পুকুরের সচ্ছ পানিতে তখন এক দম্পতি সাতর কাঁটছে। মুখে রোদ পড়ায় চোখ মুখে লেপ্টে থাকা পানি আয়নার মত চকচক করছে। ৪২ ডিগ্রী তাপমাত্রায় পরিবেশ, জনজীবন যখন প্রচণ্ড গরমে হাপিয়ে উঠেছে, তখন পুকুরের পানিতে দীর্ঘ সময় ডুবে ডুবে গোসলের মাঝে অন্যরকম শান্তি কাজ করে। চরম উষ্ণতার দিনে সেই শান্তি টুকু স্বামী স্ত্রী মিলে একসঙ্গে উপভোগ করছে তারা।
সিরাতের পরণে সাদামাটা বাটিক প্রিন্টের একটি কামিজ সেট। মাথার ওড়না কোমরে গোজা। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে পানিতে ভেসে বেড়াচ্ছে। সম্পূর্ণ শরীর পানির মধ্যে ডুবে থাকায় শারীরিক অবয়ব স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে। নাইয়াজ সে দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসে। সিরাত প্রথমে ভ্রু কুচকে তাকিয়ে থাকে সেদিক। পর মুহূর্তে নিজের দিকে তাকাতেই হাসির কারণ খুজে পায়। লজ্জায় রাঙা হয়ে ওঠে মুখটা। দুহাতে আজলা ভরে পানি উঠিয়ে নাইয়াজের দিকে ছুড়ে মা"রে। নাইয়াজ খিলখিল করে হেসে ওঠে। সিরাত তাতেও লজ্জা পায়। তবে এবার সে স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকে স্বামীর মুখ পানে। নাইয়াজকে এই প্রথম প্রাণ খুলে হাসতে দেখতে সে। দেখতে ভারি সুন্দর লাগছে। যে মানুষগুলো সচরাচর আওয়াজ করে হাসে না, হঠাৎ করে হাসতে দেখলে তাদের অন্যরকম সুন্দর লাগে।
নাইয়াজের বেলায় ও সেটাই ঘটেছে।
নাইয়াজের শ্যামবর্ণের দীর্ঘকায় শরীরে সাদা রঙের পাতলা স্যান্ডু গেঞ্জিটা আটসাট হয়ে লেগে আছে। সাদা গেঞ্জি আর নীল সাদার মিশেলে চেক লুঙ্গিতে তাকে পুরোদস্তুর বাঙালি পুরুষ লাগছে। বড় পুকুরটাতে তারা দুজন ব্যতীত আপাতত আর কেউ নেই। নতুন জামাই এবং মেয়েকে গোসলের জন্য ছেড়ে দেওেয়া হয়েছে।
নাইয়াজ হঠাৎ করেই জিজ্ঞাসা করলো, "সিরাত, তুমি আমার সামনেও এত লজ্জা পাও কেন? আমি কি পরপুরুষ?"
সিরাত চোখ নামিয়ে ফেললো। এ প্রশ্নের উত্তর দিবে কী? লজ্জা যে নারী শিরায় শিরায় বহন করে।
নাইয়াজ প্রশ্নের উত্তর পেল না। তবে মোটেও দূরত্ব না রেখে সিরাতের একদম মুখোমুখি গিয়ে দাড়ালো। দুহাতে কোমর জড়িয়ে ধরে বললো, "এত লজ্জা কৈ থেকে আসে? লজ্জার গোডাউন সম্পর্কে আমাকেও জানাও। আমি একটু লজ্জা টজ্জা পাওয়া শিখি।"
নাইয়াজের হাত কোমরে গিয়েই থেমে থাকে নি। আঙুলগুলো অবাধে আশেপাশে ঘোরাঘুরি করছে। সিরাত শিহরণে কেঁপে কেঁপে উঠছে। হৃদস্পন্দন দ্রুত বেগে উঠানামা করছে। সিরাত কষ্ট সাধ্যে কোমর থেকে নাইয়াজের হাতদুটো সরিয়ে দিলো।
"আপনি এমন করতে থাকলে আমি কিন্তু পানি থেকে উঠে যাব। দিন দুপুরে পুকুরে এসব কি করছেন? লোকে দেখলে কি বলবে?"
"কেউ নেই তো।" নাইয়াজের নির্বিকার উত্তর।
"কেউ নেই, থাকতে কতক্ষণ। এটা পাবলিক প্লেস। যখন তখন চাচারা চলে আসতে পারেন। সবাই তো আর জানে না পুকুরে আপনি আমি আছি।"
"আপাতত তো কেউ নেই। আরেকটু কাছে আসো। বেশি না শুধু দুটো চু"মু দিব।"
সিরাত রেগেমেগে আগুন হয়ে গেল। মানুষটা এত লাগামছাড়া হয়েছে কেন? কিচ্ছু বোঝে না, কিচ্ছু শোনে ও না। নিজের মন মর্জি মত চলবে।
সিরাতের রাগান্বিত মুখ দেখে নাইয়াজ ওর দুই গালে পরপর দুটো চু"মু বসিয়ে দেয়।
"আমি নাকি রোমান্টিক না। মন বুঝি না। একটু আদর করতে গেলে এত রাগ আসে কেন?"
সিরাত আর কিছু বললো না। হাল ছেড়ে দিল। প্রসঙ্গ বদলাতে তারপর বললো, "আমি সাতারে তেমন পটু না। আমাকে আপনার সঙ্গে করে পুকুর ঘুরাবেন।"
"তখন কাছে আসা লাগবে না? শরীরের সাথে শরীর লাগবে না? লোকে দেখবে না?"
"খোচা দিচ্ছেন?"
"না। তোমার কথা তোমাকে ফিরিয়ে দিচ্ছি।"
নাইয়াজ সাতারে পটু। বিমান বাহিনীর ছয় মাস ব্যাপী ট্রেনিংয়ে তাদের সব বিষয়ে পারদর্শী করে তুলেছে। ডুব সাতার, চিত সাতার এসব কোন ব্যাপার ই না তার জন্য। নাইয়াজের বাহু দুহাতে আকরে ধরে সিরাত পুকুর ভরে ঘুরে বেড়াল। মাঝে মাঝে ছোট ছোট চু"মু একে দিল নাইয়াজের খোচা খোচা দাড়ি ভর্তি গালে। স্ত্রীর কর্মকাণ্ডে নাইয়াজ নিঃশব্দে হাসলো। মেয়ে মানুষের মন বোঝা দায়। নিজে কাছে আসবে, ছোবে। কিন্তু অপরজন কিছু বললে বা করলেই শুরু হয়ে যায় যত বাহানা!
বেশ অনেকটা সময় তারা গোসল করলো।
দুপুরে কাতলা মাছের কালিয়া, চিংড়ি মাছের মালাইকারি, ইলিশের দোপেঁয়াজা, দেশি মুরগির রোস্ট,গরুর কলিজা ভুনা, খাসির রেজালা আর প্লেন পোলাও দিয়ে নাইয়াজের লাঞ্চ হলো ভরপুর। শাশুড়ি মায়ের আদরে আপ্যায়নে গলা অব্দি খেয়ে নাইয়াজের মনে হলো, এক বেলাতেই ওয়েট বেড়ে গিয়েছে পাঁচশ গ্রাম। খেয়ে উঠতে গিয়ে নিজেকে হাতির মত ভারি মনে হলো। শেষে ডেজার্টের ঘন দুধের পায়েশ আর ছানার রসগোল্লা পরে খাব বলে এক পা দু পা করে খাবার ঘর থেকে তাকে কেঁটে পড়তে হয়েছে। শশুর বাড়ির আদর আপ্যায়ন দারুণ মজার। কিন্তু এসবের জন্য তার পেটটা আরেকটু বড় করতে হবে।
নাইয়াজ ভারি লাঞ্চের পর আধ শোয়া হয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিল। সিরাত ঘরে এলেই তাকে সবকিছু গোচগাছ করে রেডি হতে বললো।
সিরাত অবাক কন্ঠে বললো, "কেন?"
"যেতে হবে না?"
"এখনই।"
"হ্যাঁ।"
"কিন্তু, মা যে বললেন রাতে রাজহাঁসের গোশত দিয়ে চিতুই পিঠা খাওয়াবেন। তাছাড়া পুলি পিঠাও খাওয়ানো হয়নি। না না এখন গেলে চলবে না। মা রাগ করবেন।"
"এক দুপুরে যা খেয়েছি অন্তত কাল দুপুর অব্দি অনায়াসে না খেয়ে থাকতে পারব। এখন রেডি হও। আমাদের বের হতে হবে।"
"এত তাড়াহুড়োর কি আছে?"
"আছে।"
"বুঝেছি, ফ্রেন্ডরা কল করছে?
"না মিসেস। এই একটা সপ্তাহ শুধু আমাদের দুজনের।"
সিরাত নাইয়াজের হেয়ালি বুঝলো না। তবে রেডি হয়ে গেল। দুপুরের রোদ তখন মেহগনি গাছের মগডাল থেকে সবচেয়ে নিচের ডালটাতে এসে পড়েছে। সকলের আপত্তির মুখে নাইয়াজ সিরাতকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লো।
গাড়ি বাড়ির পথে না গিয়ে হাইওয়ের দিকে এগোলে সিরাত জিজ্ঞাসা করলো, "এদিকে যাচ্ছে কেন? আমরা বাড়ি যাচ্ছি না?"
"না।"
"তাহলে?"
"আপাতত আমাদের গন্তব্য ঢাকা।"
"কেন?"
"কেন আবার? আমরা ঘুরব। আজ ঢাকা গিয়ে পৌছালে কাল সারাদিন ঘুরেফিরে শপিং করবে। এরপর আমাদের গন্তব্য হবে চট্টগ্রামের কক্সবাজার।"
"হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত? আমাকে তো কিছু জানালেন না।"
"এখন জানছো তো। বললাম তো এই এক সপ্তাহ আমাদের শুধু দুজনের। এবার খুশি তো?"
"আপনার মাকে বলে এসেছেন? ওনি কি না কি মনে করবেন।"
"আমরা এক সপ্তাহ বাড়িতে থাকব না। এ কথা জানিয়েছি। তাছাড়া আমি আমার স্ত্রীকে নিয়ে ঘুরব ফিরব। এতে আমার মা কি মনে করবেন?"
"না,কিছু না। মনে না করলেই ভালো।"
"কখনোও কিছু বলেছে?"
"নাহ।"
"লুকিয়ো না। আমাকে বলবে না তো কাকে বলবে?"
সিরাত বলবে না, বলবে না, করেও সেদিনের ঘটনাটা নাইয়াজকে জানালো। সব শুনে নাইয়াজ বললো, "আমারই ভুল হয়েছে। যা হয়েছে মন খারাপ করিও না। নেক্সট টাইম কেউ তোমাকে অহেতুক কথা শোনাবে না, এই ব্যাবস্থা আমি করব। তোমার বাবার কাছ থেকে তার সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটাকে আমি হৃদয়ের একচ্ছত্র অধিকারীনি করে নিয়ে এসেছি। সে কষ্ট পাবে, হীনমন্যতায় ভুগবে এমনটা আমি হতে দেয় কি করে?"
সিরাত নাইয়াজের হাতদুটো আকরে ধরে।
"আপনি কবে থেকে এত বুঝদার হলেন, নাইয়াজ?"
"যবে থেকে আমাকে বুঝদার হিসাবে দেখতে চেয়েছো, তবে থেকে।"
সিরাত এই নাইয়াজকে চেনে না। একদমই না। কেমন নমনীয় স্বরে কথা বলছে। বোঝাচ্ছে, আস্থা রাখতে বলছে। এমন মানুষ ই তো জীবনে চেয়েছিল সে। চোখ দুটো সজল হয় মেয়েটির। মনে মনে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে সৃষ্টিকর্তার নিকট। মানুষটা যেন আমৃত্যু এমন থাকে।
ঢাকামুখী গ্রীন লাইন পরিবহনে টিকেট কাঁটে নাইয়াজ। টিকেট বিক্রেতা জানায়, বাসটা বিশ মিনিটের মধ্যে স্টান্ডে ঢুকবে। নাইয়াজ সিরাতকে বসিয়ে রেখে দুটো হাফ লিটারের পানির বোতল, চিপস, চকোলেট আর বিস্কুট কিনে নিয়ে আসে। সেগুলো সিরাতের হাতে নিয়ে অপেক্ষা করে পরিবহন আসার।
সম্ভব্য সময়ের আরও দশ মিনিট পরে বাস এসে পৌছায়। নাইয়াজ যত্ন করে সিরাতকে বাসে উঠিয়ে নিজেও উঠে পড়ে। নিজেদের সিটে গিয়ে বসে দুজন।
পদ্মা সেতু হওয়ায় এখন আর ঢাকা যেতে ঘন্টার ওপর ঘন্টা লেগে যায় না। আড়াই থেকে তিন ঘন্টার মধ্যে পৌঁছে যাওয়া যায়। তবে জ্যাম থাকলে ভিন্ন কথা। দশ মিনিটের পথ ও এক ঘন্টা কেঁটে যায়।
বাস ফরিদপুরের রাজবাড়ী ছেড়ে গেলেই মাগরিবের আজান হয়। চারপাশ ধীরে ধীরে আধারের কালো আস্তরণে ঢাকা পড়তে শুরু করে। বাসের লাইট জ্বলে ওঠে। অন্ধকারাচ্ছন্ন পিচঢালা সড়ক পথে বাস এগিয়ে চলছে তার নিজস্ব গতিতে। অন্ধকারে আলোর দিশারী হয়ে পথ দেখাচ্ছে লাইটগুলো।
রাতের জার্নি অন্যরকম,রোমাঞ্চকর! সিরাতের এ অভিজ্ঞতা আগে হয়নি। শীতল বাতাসে দেহ মনে কাঁপন ধরিয়ে দেয়। সিরাত গায়ে ওড়না টেনে নেয়।
নাইয়াজ সিরাতের কাধ টেনে বলে, "কাছে এসো। শীত কম লাগবে।"
সিরাত গুটিসুটি মে"রে পড়ে থাকে প্রিয়তমার বুকে। এ অনুভূতি ভাষায় প্রকাশের মত নয়। পৃথিবীর সবচেয়ে সুখের মুহূর্ত পাড় করছে সে।
~~~~~~~~~~~~~~~~~
"আমাদের বিয়ে হবে কবে? সিরাতের মত আমিও ঘুরে বেড়াতে চায়। ওরা কি সুন্দর সময় কাটাচ্ছে।"
ফাইজার সরল অভিব্যক্তিতে ফাইয়াজ হেসে ওঠে। ঠোঁট কামড়ে জানতে চায়, "তুমি কি মিস করছো আমায়?"
"না।"
"তাহলে?"
"ওদের মত ঘোরাঘুরিটাকে মিস করছি। ওরা জীবন উপভোগ করছে। আর আমি সিঙ্গেল থেকে এসব দেখছি।"
"এখন উপায়?"
"আমার এ জীবন ভালো লাগছে না। পানসে লাগে সব। কচু গাছের মগডালের সাথে গলায় রশি পেচিয়ে ঝুলে টুলে পড়ব যখন তখন।"
"তাহলে তো ভীষণ চিন্তার বিষয়।"
"অত কথা বুঝি না। আমার ভালো লাগছে না। বাই।"
"আরে, রেগে যাচ্ছো কেন? সামনের ঈদে তোমাকে আমার ঘরণী করে ঘরে তুলব। এবার বাড়ি এসে সব পাঁকা করে যাব। তারপর এসেই বিয়ে। খুশি তো?"
"এই যাহ!"
ফাইজা লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে পড়েছে।
ফাইয়াজ হেসে উঠলো।
"এটুকুতে এত লজ্জা পেলে হবে? ওরা তো মাত্র এক সপ্তাহ ঘুরবে। তারপর নাইয়াজ ক্যান্টনমেন্টে। আর ভাবি বাড়িতে। কিন্তু তোমাকে নিয়ে আমি প্রতি সপ্তাহে, ছুটির দিনগুলোতে ঘুরব। বউ রেখে আমি ঢাকায় ফিরব না। বিবাহিত হয়ে বউ ছাড়া ঘুমানোর প্রশ্নই ওঠে না।"
ওপাশ থেকে খট করে কল কেঁটে দেওেয়া হলো। ছেলেটির লাগামহীন কথা মেয়েটির যে দম আটকে মরা-র অবস্থা!
ইন শা আল্লাহ চলবে....
লেখনীতে~সুমাইয়া ইসলাম জান্নাতি