17/10/2025
দুপুর আনুমানিক আড়াইটা।
রাস্তার ধারে চেনা দোকানে বসে চা খাচ্ছি। হালকা বাতাসে গরম চায়ের ধোঁয়া উড়ে যাচ্ছে আকাশে। ঠিক তখনই একটা মেয়ে, বয়স হয়তো তেইশ-চব্বিশ, ধীরে ধীরে দোকানে ঢুকলো। হাতে স্বচ্ছ একটা ফাইল—ভেতরে কিছু মার্কশিট আর সার্টিফিকেটের ছাপ দেখা যাচ্ছে। ঘাম আর রোদে মাখা মুখ, প্রসাধনের বিন্দুমাত্র ছোঁয়া নেই, তবু মুখটায় একধরনের মায়া—যেটা চেনা নয়, তবু আপন লাগে।
মেয়েটি ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করল—
"দাদা, এখানে ভাত বা রুটি কিছু পাওয়া যাবে?"
দোকানদার হেসে বলল—
"হ্যাঁ, পাবেন দিদি। কী খাবেন বলুন? ডাল, ডিম, সবজি, রুই মাছ, পাবদা, মুরগি, পাঠা—সবই আছে।"
মেয়েটি একটু থেমে, নিচু গলায় বলল—
"এমনি শুধু ডাল আর ভাত কত?"
"ভাত, ডাল, সবজি—পঁয়ত্রিশ টাকা।"
"আমার সবজি লাগবে না দাদা, শুধু ভাত আর ডাল দিন। তিরিশ টাকায় হবে?"
দোকানদার তাকিয়ে বলল,
"হবে দিদি, বসুন, দিচ্ছি।"
কিছুক্ষণ পর ফোন বেজে উঠল মেয়েটির।
ওর কণ্ঠে একরাশ ক্লান্তি, তবু মমতা—
"হ্যাঁ মা, বলো! হ্যাঁ, ব্যাংকের ইন্টারভিউ ভালো দিয়েছি। হ্যাঁ, খেয়েছি... মাছ, সবজি, ভাত—সবই। তুমি ওষুধগুলো খেয়েছ? আচ্ছা, আমি পাঁচটার ট্রেন ধরবো। ভাইকে বলো স্টেশনে দাঁড়াতে... আচ্ছা, রাখি।"
ফোনটা রেখে মেয়েটা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে বাইরে তাকিয়ে রইল। হয়তো দূরের কোথাও দেখছিলো তার অসুস্থ মা, বা স্কুলপড়ুয়া ছোট ভাইটাকে—যাদের জন্যই আজ এই তপ্ত রোদে চাকরির যুদ্ধ করতে বেরিয়েছে সে।
আমার ভেতরটা কেমন যেন হালকা শ্রদ্ধায় ভরে গেল।
এই বয়সটাকে কী বলে জানি না—বালিকার চেয়ে বড়, যুবতীর চেয়ে ছোট।
তবু এই বয়সেই সে জীবনের ময়দানে নামছে নিজের পরিবারটাকে বাঁচানোর জন্য।
মনে মনে ভাবলাম—
"হে বালিকা, তুমি ইতিমধ্যেই যুদ্ধের অর্ধেকটা জিতে গেছ।
বাকি অর্ধেক জিতবে যেদিন নিজের উপার্জনের টাকায় মাছভাত খাবে—মনভরে!"
ঠিক তখন দোকানদার থালাটা নিয়ে এলো।
"দিদি, ভুল করে সবজি দিয়ে ফেলেছি, আপনি খেয়ে নিন প্লিজ। তিরিশ টাকাই দেবেন।"
মেয়েটা অবাক হয়ে বলল—
"কিন্তু আমি তো শুধু ডালভাত চেয়েছিলাম!"
দোকানদার মৃদু হেসে বলল—
"আমার ভুল হয়ে গেছে দিদি, আপনি না খেলে খাবারটা নষ্ট হবে। খেয়ে নিন, প্লিজ।"
আমরা সবাই ভেবেছিলাম, সত্যিই হয়তো ভুল হয়েছে।
কিন্তু বিল দিতে গিয়ে আমি দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলাম—
"দাদা, সত্যিই ভুল করে দিয়েছিলেন?"
ও একটু হেসে কানের কাছে এসে বলল—
"শুধু ব্যবসায় লাভ খুঁজলে চলবে না দাদা!
এরকম ভুলগুলো করার সুযোগও খুঁজতে হয়।
ওর খুব খিদে পেয়েছিল। আমারও গ্রামের বাড়িতে একটা বোন আছে, ওরই বয়সী..."
বলেই আবার নির্লিপ্ত মুখে ফিরে গেল নিজের চা–সিগারেট–তরকারির জগতে।
আমি চুপ করে রইলাম।
বুঝতে পারছিলাম না—কার জন্য বেশি ভালো লাগা উচিৎ—
ও মেয়েটার জন্য, না দোকানদারের জন্য?
তবু একটা কথা মনে এল—
যে যুদ্ধ বোঝে, সেই জানে যোদ্ধার ঘাম ও ক্ষুধার মূল্য।
✍️ শেষ কথা:
এই গল্পে কোনো হিরো নেই, কোনো নাটকও নয়।
শুধু দুটো মানুষ—একজন যুদ্ধ করছে বাঁচার জন্য, আরেকজন মানবতার জন্য।