01/10/2025
ফ্রান্স সরকার আমাকে গ্রেপ্তার করেছিল এবং রোমানিয়ার নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করতে বলেছিল। টেলিগ্রামের প্রতিষ্ঠাতা পাভেল দুরভ ফাঁস করছেন, কীভাবে বিশ্বের ক্ষমতাশালী দেশগুলো বাকস্বাধীনতাকে দমন করার চেষ্টা করছে।
পাভেল বলেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের পরাধীনতা এবং ইতালির স্বাধীনতা এই দুই সমাজব্যবস্থা দেখেই তিনি বড় হয়েছেন। স্বাধীনতা অর্থের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। ভয় এবং লোভ হলো স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় শত্রু। তাই তিনি সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্য নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত রাখেন, যাতে কোনো ভয় তাকে তার নীতি থেকে সরাতে না পারে।
পাভেল প্রায় ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে অ্যালকোহল, তামাক, কফি বা অন্য কোনো ধরনের মাদক থেকে সম্পূর্ণ দূরে আছেন। তিনি ১১ বছর বয়সে একটি বই পড়ে জানতে পারেন যে, অ্যালকোহল মস্তিষ্কের কোষকে প্যারালাইজড করে এবং কিছু কোষকে চিরতরে মেরে ফেলে। মস্তিষ্ক যদি আপনার সবচেয়ে মূল্যবান যন্ত্র হয়, তবে কেন আপনি স্বল্পমেয়াদী আনন্দের জন্য এটিকে নষ্ট করবেন?
পাভেল কোনো স্মার্টফোন ব্যবহার করেন না, শুধুমাত্র টেলিগ্রামের ফিচার পরীক্ষার জন্য ছাড়া। তিনি মনে করেন, ফোন আমাদের মনোযোগ নষ্ট করে এবং অন্য মানুষ বা সংস্থা আমাদের চিন্তাভাবনাকে নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ পেয়ে যায়। তিনি দিনের বেশিরভাগ সময়, বিশেষ করে সকালে, ফোন থেকে দূরে থেকে গভীর চিন্তাভাবনা এবং সৃজনশীল কাজ করতে পছন্দ করেন।
মানসিক শক্তির মূল ভিত্তি হলো শৃঙ্খলা। তিনি প্রতিদিন সকালে ৩০টি পুশ-আপ এবং ৩০টি স্কোয়াট করেন। এছাড়া সপ্তাহে ৫-৬ দিন জিমে যান এবং আইস বাথ নেন। তিনি বলেন, এই কাজগুলো করার ইচ্ছা না থাকলেও জোর করে করি, কারণ এটি আমার আত্ম-শৃঙ্খলাকে শক্তিশালী করে, যা জীবনের অন্য সব ক্ষেত্রে সফলতা নিয়ে আসে।
টেলিগ্রামের মূল ইঞ্জিনিয়ারিং দলে মাত্র ৪০ জন সদস্য রয়েছে। পাভেলের দর্শন হলো, বেশি কর্মী মানেই ভালো কাজ নয়। কম কর্মী থাকলে তারা দায়িত্ব এড়াতে পারে না এবং অটোমেশনের মাধ্যমে কাজকে আরও দক্ষ করে তোলে। টেলিগ্রামের ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত বার্তা সম্পূর্ণ এনক্রিপ্টেড এবং এর ডেটা সেন্টারগুলো বিভিন্ন দেশে বিভক্ত, যাতে কোনো একটি দেশের সরকার তথ্যের জন্য চাপ সৃষ্টি করতে না পারে।
গত বছর পাভেল ফ্রান্সে পৌঁছানোর সাথে সাথেই পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। টেলিগ্রাম ব্যবহারকারীদের দ্বারা সংঘটিত প্রায় ১৫টি অপরাধের জন্য তাকে দায়ী করা হয়, যা ছিল এক কথায় অযৌক্তিক। তাকে প্রায় চার দিন জানালাবিহীন এক কংক্রিটের সেলে রাখা হয়। পাভেল এই ঘটনাকে কাফকার লেখা The Trial উপন্যাসের সাথে তুলনা করেছেন, যেখানে একটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা একজন ব্যক্তিকে অযৌক্তিকভাবে হয়রানি করে।
গ্রেপ্তার হওয়ার পর ফরাসি গোয়েন্দা সংস্থা পাভেলের সাথে যোগাযোগ করে এবং রোমানিয়ার নির্বাচনে Conservative candidate টেলিগ্রাম চ্যানেলগুলো বন্ধ করে দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করে। পাভেল সরাসরি এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন, কারণ এটি ছিল রাজনৈতিক সেন্সরশিপ এবং তার নীতির পরিপন্থী।
পাভেল ১১ বছর বয়সে সেন্ট পিটার্সবার্গের একটি পরীক্ষামূলক স্কুলে ভর্তি হন, যেখানে গণিত এবং চারটি বিদেশী ভাষার (ল্যাটিন, ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান) উপর চরম গুরুত্ব দেওয়া হতো। এই কঠোর এবং প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষাই তার চিন্তাভাবনার ভিত্তি তৈরি করেছিল।
ছোটবেলায় ভিডিও গেমসের প্রতি তার প্রচণ্ড নেশা ছিল। পর্যাপ্ত গেমস না পাওয়ায়, তিনি নিজেই গেমস তৈরি করা শুরু করেন। এভাবেই তার প্রোগ্রামিং জগতে প্রবেশ। পরবর্তীতে তিনি একাই VK (রাশিয়ার ফেসবুক) নামক সোশ্যাল নেটওয়ার্কের প্রথম সংস্করণ তৈরি করেন।
পাভেল মনে করেন, একজন B প্লেয়ার পুরো দলের কাজের গতি কমিয়ে দেয় এবং A প্লেয়ারদের অনুপ্রেরণা নষ্ট করে। তাই তিনি কোডিং কম্পিটিশনের মাধ্যমে বিশ্বের সেরা ইঞ্জিনিয়ারদের খুঁজে বের করেন, যারা ইতিমধ্যেই টেলিগ্রামের ব্যবহারকারী এবং এর দর্শন বোঝে।
টেলিগ্রামই প্রথম মেসেজিং অ্যাপ যা এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন চালু করেছিল। পাভেল বলেন, আমরা এমন একটি সিস্টেম তৈরি করেছি যেখানে কোনো সরকারের কাছে ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত বার্তা শেয়ার করা অসম্ভব। এর চেয়ে বরং আমরা সেই দেশে আমাদের পরিষেবা বন্ধ করে দেব।
পাভেল মনে করেন, এডওয়ার্ড স্নোডেন যা করেছেন তা অত্যন্ত সাহসিকতার কাজ। স্নোডেনের ফাঁস করা তথ্যই পৃথিবীকে দেখিয়েছে যে, সরকারগুলো কীভাবে গোপনে জনগণের ওপর নজরদারি চালায়।
২০১৮ সালে রাশিয়া এবং ইরান টেলিগ্রাম নিষিদ্ধ করে, কারণ এটি সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। কিন্তু পাভেল ডিজিটাল প্রতিরোধের মাধ্যমে এবং প্রক্সি সার্ভার ব্যবহার করে সেই নিষেধাজ্ঞা বহুলাংশে অকার্যকর করে দেন।
পাভেল প্রথমবার স্বীকার করেন যে, ২০১৮ সালে তাকে বিষ প্রয়োগে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। তিনি বলেন, আমার পুরো শরীর অবশ হয়ে আসছিল, আমি দেখতে বা শ্বাস নিতে পারছিলাম না। আমি ভেবেছিলাম আমি মারা যাচ্ছি। এই ঘটনার পর তিনি আরও নির্ভীক হয়ে ওঠেন এবং মনে করেন যে তিনি এখন বোনাস জীবনে বেঁচে আছেন।
পাভেল তার ব্যক্তিগত জীবনযাত্রার খরচ চালান তার বিটকয়েন বিনিয়োগ থেকে, টেলিগ্রাম থেকে নয়। তিনি ২০১৩ সালে কয়েক মিলিয়ন ডলারের বিটকয়েন কিনেছিলেন এবং বিশ্বাস করেন যে, সরকারগুলো যেভাবে টাকা ছাপছে, তাতে বিটকয়েনের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল।
পাভেল স্বীকার করেন যে, প্রায় ১৫ বছর আগে তিনি S***m Donor হিসেবে অনেক নিঃসন্তান দম্পতিকে সাহায্য করেছিলেন। তাই তার জৈবিক সন্তানের সংখ্যা ১০০-র বেশি হতে পারে। তিনি তার উইলে এই সমস্ত সন্তানদের সমান অংশীদার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তবে তারা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরেই সেই সম্পত্তি পাবে।