28/06/2025
দেব – যার নামের মানেই এখন কোটি বাঙালির কাছে “বিশ্বাস”, “উৎসাহ” আর “লড়াই করে উঠে দাঁড়াবার সাহস”। আজ যাঁকে আমরা বড় পর্দায় সুপারস্টারের আসনে দেখি, তাঁর জীবনটা একদমই মসৃণ ছিল না। দীপক অধিকারী থেকে দেব হয়ে ওঠার গল্পটা যতটা রঙিন দেখায়, তার চেয়ে বহু গুণ বেশি কঠিন ছিল সেই পথ।
দেবের জন্ম ১৯৮২ সালের ২৫ ডিসেম্বর, পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার মহাগ্রামে। তাঁর বাবা গুরুপদ অধিকারী তখন একজন সাধারণ ইলেকট্রিশিয়ান, যারা কাজ করতেন ভারতীয় রেলওয়েতে। পরিবারের অবস্থা খুব একটা সচ্ছল ছিল না। ছোটবেলা থেকেই দেব দেখেছেন কীভাবে তাঁর বাবা-মা কঠোর পরিশ্রম করে সন্তানদের মানুষ করতে চাইছেন। মা মিনা অধিকারী ঘরের প্রতিটি খুঁটিনাটি সামলাতেন, আর ছোট দীপককে বুকের মধ্যে সাহস আর স্বপ্ন জোগাতেন।
ছোটবেলায় দেব খুবই দুষ্টু ছিলেন। খেলাধুলা, নাটক, গান—সবকিছুতেই আগ্রহ ছিল তাঁর। তবে তার চেয়েও বড় ছিল মনের মধ্যে থাকা এক অদ্ভুত "আমি কিছু করব" ভাব। সিনেমার পর্দায় নায়কদের দেখে তাঁর মন বলতো—একদিন আমিও হব।
পড়াশোনার জন্য তিনি পাড়ি দেন মুম্বই শহরে। পরিবার অনেক কষ্ট করে টাকাপয়সা জোগাড় করে তাঁকে মুম্বই পাঠায় ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার জন্য। পড়তেন "Purushottam Institute of Engineering and Technology" নামের এক প্রতিষ্ঠানে, ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন নিয়ে। কিন্তু ক্লাসে বসে তাঁর মন পড়ত না—মন চলে যেত ফিল্ম স্টুডিওর দিকে।
নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি দেব শুরু করেন স্টুডিওতে কাজ করা। সেটে লাইট ধরার কাজ, কেবল টানা, সিনিয়রদের চা-জল দেওয়া, সবার পেছনে দাঁড়িয়ে শেখা—তিনি সব করতেন চুপচাপ। কোনো অহংকার ছিল না, ছিল শুধু শেখার তীব্র ইচ্ছা। একসময় তিনি পরিচালক আব্বাস-মাস্তানের সঙ্গে কাজ করেন অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে। তখন কেউ জানত না, এই ছেলেটাই একদিন পর্দা কাঁপাবে।
এত কষ্টের পর প্রথমবার একটি ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ পান—‘Agnishapath’। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেই সিনেমাটি মুক্তিই পায়নি। তখন তাঁর মনে হয়েছিল, সব কিছুই শেষ হয়ে গেল। হতাশা, অপমান আর দুশ্চিন্তার মধ্যে দিয়ে দিন কেটেছে তাঁর। পরিবার তাঁকে বলত—চাকরি খোঁজো, নিরাপদ কিছু করো। কিন্তু তাঁর ভেতরের আগুন তখনও নিভে যায়নি।
২০০৭ সাল। অবশেষে এক পরিচালক তাঁর ওপর ভরসা রাখেন—রবি কিনাগি। দেব কাস্ট হন পায়েল সরকারের বিপরীতে, রোমান্টিক ছবি ‘I Love You’-তে। ছবিটি মুক্তির পর বাজিমাত। যুবসমাজ পাগল হয়ে গেল দেবের জন্য। সিনেমার নায়ক হিসেবে তিনি নিজের জায়গা পাকা করে ফেললেন, আর শুরু হলো দেবের আসল যাত্রা।
কিন্তু বাস্তব জীবনের নায়কের জন্য চ্যালেঞ্জ তখনও শেষ হয়নি। অনেকেই বলেছিল—“এই ছেলেটা টিকবে না”, “ওর শুধু স্টাইল আছে, অভিনয় নেই”। দেব কিন্তু কথা কম বলে কাজ বেশি করতেন। প্রতিদিনের মতো নিজের স্ক্রিপ্ট নিয়ে পরিশ্রম করতেন, ডান্স প্র্যাকটিস, জিম, ভাষার ওপর নিয়ন্ত্রণ—প্রতিটি দিকেই নিজেকে গড়ে তুলছিলেন।
এরপর একে একে আসে ‘Challenge’, ‘Paran Jai Jaliya Re’, ‘Paglu’, ‘Khokababu’, ‘Le Chakka’, ‘Bindaas’, ‘Romeo’-এর মতো ছবি। তাঁর ভক্তসংখ্যা দিনে দিনে বাড়তে থাকে। বাচ্চা থেকে বুড়ো—সবাই দেবময় হয়ে যায়। তিনি শুধু হিরো ছিলেন না, হয়ে উঠেছিলেন স্টাইল আইকন।
কিন্তু দেব এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ নন। তিনি জানতেন, শুধুই কমার্শিয়াল ছবি করলে একসময় দর্শক মুখ ফিরিয়ে নেবে। তাই তিনি নিজের কমফোর্ট জোন থেকে বেরিয়ে আসেন। ‘Chander Pahar’-এ তিনি দেখান অ্যাডভেঞ্চার আর সাহসিকতার নতুন সংজ্ঞা। আফ্রিকার জঙ্গলে গিয়ে রিয়েল লোকেশনে শুটিং—বাংলা ইন্ডাস্ট্রির ইতিহাসে এরকম বড় প্রজেক্ট কেউ ভাবেনি। পরিশ্রম, ভয়, ঘাম—সব উপেক্ষা করে দেব নিজেকে প্রমাণ করেন নতুনভাবে।
পরবর্তীতে ‘Kabir’, ‘Password’, ‘Golondaaj’, ‘Bagha Jatin’-এর মতো ছবি করে তিনি দেখান, তিনি শুধু স্টার নন, একজন শক্তিশালী অভিনেতা।
২০১৪ সালে তিনি রাজনীতিতে পা রাখেন। অনেকেই তখন মজা করে বলেছিল—“আরেকটা সেলেব এমপি”। কিন্তু দেব প্রমাণ করেন, তিনি লোক দেখানো নেতা নন। তিনি তাঁর লোকসভা কেন্দ্র ঘাটালে গিয়ে মানুষের সঙ্গে কথা বলেন, মাটিতে বসে খায়, উন্নয়নের কাজ করেন। একের পর এক প্রজেক্ট হাতে নেন, হাসপাতাল, রাস্তা, স্কুল উন্নয়নে কাজ করেন। এখন তিনি শুধু অভিনেতা নয়, একজন দায়িত্ববান সাংসদ হিসেবেও পরিচিত।
ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে দেব বরাবরই চুপচাপ। শোনা যায়, অভিনেত্রী রুক্মিণী মৈত্র তাঁর জীবনের বিশেষ একজন। কিন্তু দেব কখনো মিডিয়ায় সম্পর্ককে প্রচার করতে চাননি। তাঁর মতে, একজন মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়—সে কেমন কাজ করছে, আর সমাজের জন্য কী করছে।
আজ দেব বাংলা সিনেমার অন্যতম মুখ। বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি, পেয়েছেন Filmfare East, Kalakar Awards, Tele Cine Awards সহ একাধিক সম্মাননা। কিন্তু তাঁর জন্য সবচেয়ে বড় পুরস্কার, কোটি দর্শকের ভালোবাসা।
দেবের জীবন আমাদের শেখায়, আপনি কোথা থেকে এসেছেন সেটা বড় কথা নয়—আপনি কোথায় পৌঁছাতে চান আর কতটা লড়াই করতে পারেন, সেটাই সবচেয়ে বড় পরিচয়।