Mehrun Tabassum

  • Home
  • Mehrun Tabassum

Mehrun Tabassum শব্দের ভাঁজে লুকিয়ে রাখি অব্যক্ত ঋতুগুলো।

08/03/2026

৭.

গত কয়েকদিন ধরে ওই মেয়েটি তাকে ক্রমাগত মেসেজ করছিল। হাশাম তার সাথে কথা বলতে চায়নি, কিন্তু মেয়েটির মিনতির কারণে আজ সে জবাব দিচ্ছে।
"জি, বলুন আমি আপনার কী সাহায্য করতে পারি?" শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করা হলো। ওদিকে মাহি খুশিতে অজ্ঞান হওয়ার জোগাড়। কতক্ষণ ধরে সে স্ক্রিনে তার পাঠানো বার্তার দিকে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। অন্যদিকে হাশাম বিরক্ত হয়ে জবাবের অপেক্ষা করছিল,মাহি মেসেজ দেখার পর যেন পুরোপুরি নিশ্চুপ হয়ে গেছে।"
"আমি আপনার সাথে বন্ধুত্ব করতে চাই" অনেকক্ষণ পর, কাঁপানো আঙুলে সে টাইপ করল।
"দুঃখিত মোহতারেমা, আমি নারীদের সাথে বন্ধুত্ব করি না।" মাহির চেহারার রঙ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
"কিন্তু কেন?" সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
"কারণ এটা আমার জন্য শোভনীয় নয়।"
মাহি দেখেছিল, হাশামের ফ্রেন্ড লিস্টে কোনো মেয়ে অ্যাড ছিল না।
"কিন্তু আমি আপনাকে চিনি, আপনার মনে থাকবে প্যারিসে আইফেল টাওয়ারের কাছে আমাদের দেখা হয়েছিল।" সে তাকে কিছু মনে করিয়ে দিতে চাইল।
"না, আমার কিছু মনে নেই এবং এখন আপনি আমাকে বিরক্ত করবেন না। খোদা হাফেজ..." কথাটি বলে তার উত্তর না শুনেই সে অফলাইন চলে গেল।
ওদিকে মাহি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বসে রইল।
সে তার কথা শোনাও পছন্দ করছে না, যার জন্য মাহি হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

---------------

সেদিন রোহান ক্লাসে দেরিতে এসেছিল। কালো রঙের আপার পরা, যার হুডি তার অর্ধেক চেহারা লুকিয়ে রেখেছিল, সে অনুমতি ছাড়াই ভেতরে এসে নিজের জায়গায় বসে পড়ল। বসার সাথে সাথেই সে প্রতিদিনের মতো জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। লেকচারের প্রতি তার কোনো মনোযোগই ছিল না। হানাম তাকে প্রথম দিন থেকেই কোনো ধনী বাবার বিগড়ে যাওয়া ছেলে বলে মনে করেছিল।
"আপনি লেকচারের দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন না কেন রোহান??" অতিষ্ঠ হয়ে সে তাকে জিজ্ঞেস করল। রোহান অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল। তার দৃষ্টিতে বরাবরের মতোই শীতলতা ছিল।
"কারণ আপনি ফর্মুলা ভুল লিখেছেন ম্যাম।" সে একটি বিদ্রূপাত্মক হাসি ছুঁড়ে দিয়ে বলল।
হানাম ঘাবড়ে গিয়ে বোর্ডের দিকে তাকাল, সত্যিই তার ফর্মুলা ভুল ছিল। পুরো ক্লাস তাকে মনোযোগ দিয়ে শুনছিল কিন্তু কেউ ধরতে পারেনি, আর সে— যে এক নজরও দেখেনি কীভাবে জানতে পারল?
"দুঃখিত" হানাম ফর্মুলাটি আবার লিখল।
"আচ্ছা ম্যাম, আপনার বয়স কত?" রোহানের দিক থেকে প্রথম প্রশ্ন এল।
"উনিশ বছর আর কয়েক মাস।" সে সত্য কথাটি বলে ফেলল।
"ম্যাট্রিক কবে করেছিলেন?" দ্বিতীয় প্রশ্ন হাজির।
"প্রায় চার বছর আগে" সে অবুঝের মতো জবাব দিচ্ছিল। হানাম অনুভব করল তার চোখে চুম্বকীয় আকর্ষণ আছে যা তাকে জবাব দিতে বাধ্য করছে।
"তাহলে আপনি মাস্টার্স কীভাবে করলেন?" তার প্রশ্নে হানাম ঘাবড়ে গেল। ম্যাম সামিয়ার বলা মিথ্যা তাকে বিপদে ফেলে দিয়েছে। পুরো ক্লাসে গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল।
"এখানে যাদের নিজেদেরই কিছু জানা নেই, তারা আমাদের পড়াবে?" তার কণ্ঠস্বর ছিল অবজ্ঞাপূর্ণ।
হানামের চেহারার রঙ চটে গেল। তার খুব খারাপ লাগছিল। সে মিথ্যা বলেনি কিন্তু দোষ তার ওপর এসেছে। সে পুরোপুরি প্রস্তুতি নিয়ে লেকচার তৈরি করে আসত। আজ কে জানে কীভাবে ফর্মুলা ভুল হয়ে গেল। আর আজই রোহান জাবিল, ওরফে আর.জে, তাকে ধরে ফেলল।
"এখান থেকে কাল শুরু করব।" সে ব্যাগ গুছিয়ে ক্লাস থেকে বেরিয়ে এল। ক্লাসের সময় এমনিতেও শেষ হয়ে গিয়েছিল, এক-দু মিনিট বাকি ছিল। সে বুঝতে পারেনি কখন তার চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে গেছে। সময় তাকে খুব সংবেদনশীল বানিয়ে দিয়েছে আর আর.জের কথা তার হৃদয়ে আঘাত করেছে। সে দ্রুত পায়ে গেটের দিকে যাচ্ছিল।
একটি অশ্রুবিন্দু তার চোখ থেকে গালে গড়িয়ে পড়ল যা সে হাতের তালু দিয়ে তাড়াতাড়ি মুছে ফেলল, যাতে কেউ দেখে না ফেলে।
এই রোহান জাবিলের কারণে উম্মে হানামের চোখে প্রথম জল এল। কে জানে নিয়তি সামনে কী লিখেছে...!!!

------------

সে তার কাপড় ব্যাগে রাখছিল, এমন সময় দরজায় টোকা পড়ল।
"আরে বি জান, আপনি ভেতরে আসুন, ওখানে কেন দাঁড়িয়ে আছেন?" হাশাম বি জানকে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সম্মানের সাথে তার দিকে এগিয়ে গেল। হাত ধরে বিছানায় এনে বসাল।
"প্রস্তুতি শেষ?" বি জান ভালোবাসার দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
"জি বি জান, মাত্র শেষ হয়েছে ।" সে হাসল।
"তুমি চলে গেলে ঘর আবার খালি হয়ে যাবে। মাদিহাও দুই-তিন মাস পর আসে আর রোহান তো আসে নিজের মর্জিতে। আমি তোমাদের চেহারা দেখার জন্য তৃষ্ণার্ত হয়ে থাকি।"
বি জান উদাস ছিলেন।
"আরে আপনি উদাস হবেন না আমার প্রিয় মা জান, আমি প্রতিদিন আপনাকে ফোন করব এবং আর.জে-কেও বলব যেন বাড়িতে তাড়াতাড়ি ঘুরে যেতে।সে গভীর মমতায় বি জানের হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিল। যখন বি জানের ওপর তার খুব মায়া হতো ,তখন সে তাঁকে মা জান বলে সম্বোধন করত।"
"আমার বাচ্চা, আমাকে সবচেয়ে বেশি চিন্তায় রাখে রোহান।তুমি তো খুব বুদ্ধিমান কিন্তু ওর সাথে জানি কী সমস্যা?"
"আপনি চিন্তিত হবেন না ও এখনও বাচ্চা, বিশ বছর বেশি বয়স নয় এবং আপনি জানেনও যে ও সবার মতো নয়, ওর সময় লাগবে সবকিছু বোঝার জন্য।" হাশাম সান্ত্বনা দিল।
"তুমি তো এমন ছিলে না হাশাম যখন তুমি বিশ বছরের ছিলে তখনও খুব বুদ্ধিমান ছিলে।"
"সেটা এজন্য যে আমি আপনার ছেলে।" সে মৃদু হাসল।
"রোহান আমার কাছে তোমার চেয়েও বেশি প্রিয় হাশাম, আমি মায়ের চেয়ে বেশি ভালোবাসা দিয়েছি ওকে, আমি জানি না কাল আমার শিক্ষা-দীক্ষা নিয়ে কেউ আঙুল তুলবে কি না।" বি জান চিন্তিত ছিলেন।
"আচ্ছা এখন আপনি চিন্তা করবেন না, জলদি খাবার দিন আমার খিদে লেগেছে। এখান থেকে লাহোর যাব, আপনার স্নেহের পাত্রের সাথে দেখা করার পরই প্যারিসের ফ্লাইট নেব।" সে প্রফুল্ল চিত্তে বলছিল।
"এখনই দিচ্ছি, তুমি আমাকে আগে কেন বলোনি যে খিদে লেগেছে?" বি জান তাকে ধমকের সুরে বকুনি দিয়ে উঠলেন, সে উল্টো মুচকি হাসল।

---------------

হানাম তার আচরণে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। সে একদিন ক্লাসে থাকলে দুদিন গায়েব থাকত। টেস্ট দিত না। মনোযোগ জানালার বাইরে থাকত। হানাম যত ভালোই পড়াক না কেন, সে কোনো না কোনো ভুল বের করত এবং এমন প্রশ্ন করত যে সে চাইলেও জবাব দিতে পারত না।

​"আজও সে ক্লাসে দেরিতে এসেছিল। মোবাইলের রিংটোন বাজতেই স্ক্রিনের দিকে এক পলক তাকালো এবং সবার সামনেই নির্দ্বিধায় ফোনে কথা বলতে শুরু করল।"

হানামের এই মুহূর্তে তার ওপর ভীষণ রাগ এল। এক তো সে দেরি করে এসেছে, তার ওপর ক্লাসে ফোন ব্যবহার করছে যার অনুমতি ছিল না।

"ওকে আমি আসছি, শামু কাকা।" সে ফোন বন্ধ করে উঠল এবং না জিজ্ঞেস করেই দরজার দিকে পা বাড়াল।
"কোথায় যাচ্ছেন আপনি?" হানাম রাগে জিজ্ঞেস করল।
"​ওহ, শাট আপ! তুমি আমাকে আটকানোর কে ?" সে তার দিকে না তাকিয়েই, আগুন ধরিয়ে দেওয়ার মতো ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল।
আর হানামের ধৈর্য শেষ হলো। পুরো ক্লাসের সামনে সে তার অপমান করছে। অথচ পুরো ক্লাস স্তব্ধ।
"আপনার আব্বাজানের নাম্বারটা একটু দিন তো।" সে নিজেই জানে না সে কী বলছে।
" O really ??"
সে অবাক হয়ে ঘুরল।
"জি আপনার কীর্তিকলাপ তাদের জানাতে হবে।" সে তাকে ধমকের সুরে বলছিল।
"লিখে নাও।" সে তাকে নাম্বার লিখিয়ে ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেল। ক্লাস শেষ হওয়ার পর হানাম সবার আগে রেজিস্টারে স্কোরকার্ড চেক করেছিল যাতে ওই নাম্বারটি লেখা ছিল। সে তার রাগ নিয়ন্ত্রণ করে নাম্বারটি ডায়াল করল।

-------------

হাশাম আর.জের সাথে বসে ছিল যখন তার মোবাইলে অজানা নাম্বার থেকে ফোন এল। সে কল রিসিভ করার পর ফোন কানে দিল।
"আপনি রোহান জাবিলের বাড়ি থেকে কথা বলছেন??"
ওপাশ থেকে কোনো এক মেয়ের গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
"জি... কিন্তু আপনি...?" সে এতটুকুই বলতে পারল।
"আমি ওর কলেজ থেকে মিস উম্মে হানাম কথা বলছি।​"আপনার ছেলের ব্যাপারে, আপনার সাথে আমার অত্যন্ত জরুরি কিছু কথা আছে।আপনি দয়া করে কাল কলেজে আসবেন।"
একটি শব্দ চিবিয়ে চিবিয়ে বলায় হাশাম জাবিলের মুখে হাসি ছড়িয়ে পড়ল। "আচ্ছা আপনি..."
"টু... টু..." সে কিছু জবাব দেওয়ার আগেই ফোন কেটে গেল।
হাশাম শীতল দৃষ্টিতে রোহানের দিকে তাকাল।
"কী হলো?" নিজের দিকে তাকাতে দেখে রোহান জিজ্ঞেস করল।
"কী করেছ তুমি কলেজে মিস্টার আর.জে?" হাশাম ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল। "কী?" সে নির্দোষ সেজে বলল।
হাশাম অবাক হলো। অনেকদিন পর তার কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে তার নামে অভিযোগ এসেছে। শুরুতে স্কুলের দিক থেকে শিক্ষকদের ফোন আসত। তারপর যেমনই সবাই জেনে গেল, আর কেউ ফোন করেনি।
এখন এটা অনেক বছর পর এমন হলো।
"তোমার কোনো শিক্ষকের কল ছিল, বলছিল আপনার ছেলের ব্যাপারে জরুরি কথা আছে ।" অনিচ্ছা সত্ত্বেও হাসি তার ঠোঁট ছুঁয়ে গেল।
"ওহ, বিশ্বাস হয় না সে এত বোকা।" রোহান আফসোসের সুরে মাথা নাড়াল।
"বলো তুমি কী অঘটন ঘটিয়েছ?"
"এটা তুমি তাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করবে যে ফোন করেছে। আমি তো তাকে দেখে নেব..." শেষ বাক্যটি সে নিচু স্বরে বলল।
"চলো ঠিক আছে তাহলে কাল কথা হবে এই বিষয়ে... প্যারিস যাওয়ার আগে আমি তোমার ওই শিক্ষকের সাথে দেখা করতে চাই যে আর.জের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার সাহস দেখিয়েছে ।" অথচ তার কথায় রোহানের চেহারার অভিব্যক্তি শক্ত হয়ে গেল।

"আমি তোমাকে ছাড়ব না মিস উম্মে হানাম।" সে কল্পনায় তার সাথে কথা বলছিল অথচ হাশামের গভীর দৃষ্টি এটা জানার জন্য উন্মুখ ছিল যে এর মাথায় এই মুহূর্তে কী চলছে।

উপন্যাস : সালফাইট
লেখিকা : নূর রাজপুত
অনুবাদ : শে'র এ লাফজ

#সালফাইটবাংলাঅনুবাদ #সালফাইট

08/03/2026

৬.

"আমি আগেই বলেছিলাম এই ছেলে কোনো না কোনো অঘটন ঘটাবে। ওকে এখানে ডাকার কোনো যোগ্যতাই ওর নেই!" সৈয়দ জাবিল বেশ রাগান্বিত ছিলেন। তিনি অস্থির হয়ে ড্রয়িং রুমে পায়চারি করছিলেন। সামনে বি জান কাঠের বড় এক চেয়ারে বসে ছিলেন।
"যদি ওই ছেলেটা মরে যেত? আমি গ্রামের মানুষকে কী জবাব দিতাম? এসবই আপনাদের আদর ও ভালবাসার ফল," তিনি রাগে ফেটে পড়ে বললেন।
বি জান চুপচাপ তার কথা শুনছিলেন।
"নিশ্চয়ই কোনো কারণ ছিল, যেজন্য ও এমনটা করেছে," অবশেষে বি জান মুখ খুললেন।
"কারণ যা-ই হোক, ওকে কে এই অধিকার দিয়েছে যে মানুষের মাথা ফাটিয়ে বেড়াবে? এখন আমি ওর বাবা-মাকে কী জবাব দেব যারা পঞ্চায়েত ডাকার কথা বলছে?"

"বাবা সাঈঁ, আপনি চিন্তিত হবেন না। আমি কথা বলছি। এমনিতেও ওই ছেলেটিই আগে অভদ্র আচরণ করেছিল," হাশাম এগিয়ে এসে তাকে সান্ত্বনা দিল। "অবশ্যই ওর কাজটা ভুল ছিল, কিন্তু আমি নিজে সেটা সামলে নিতাম। এই ছেলে মারার কে?"
পুরো ঘটনায় মাদিহা চুপচাপ বসে ছিল।
"যাও, ওকে ডেকে আনো। ও ওই ছেলের বাবা-মার কাছে ক্ষমা চাইবে," বি জান মাদিহাকে বললেন আর.জেকে ডেকে আনতে।
"কিন্তু বি জান, ও তো চলে গেছে," মাদিহা খুব শান্ত স্বরে উত্তর দিল।

"দেখলেন তো? আমাদের মানুষের সামনে লজ্জিত করে নিজে পালিয়ে গেল," সৈয়দ জাবিল গর্জে উঠলেন।
"ভালোই হয়েছে বাবা সাঈঁ যে ও চলে গেছে। এখানে থাকলে আবার কোনো অঘটন ঘটাত। আপনি বিশ্রাম নিন, আমি ওদের সাথে কথা বলছি। ওরা যদি পঞ্চায়েতের কথা বলে, তবে তাই হোক। সৈয়দ বংশের মেয়ের দিকে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য ছুড়ে দেওয়ার অপরাধে ওদের পরিবারকেও শাস্তি পেতে হবে," হাশাম কঠোর স্বরে কথাটি বলে হাভেলি থেকে দরবারী অংশের দিকে চলে গেল।
"সমস্যা হলো বিচারক তো আমিই। যদি আপনার আদুরে ছেলেকে ক্ষমা চাইতে হয়, ও কোনোদিন চাইবে না, উল্টো আমাকেই অপদস্থ করবে," সৈয়দ জাবিল বি জানকে উদ্দেশ্য করে বলছিলেন।
বি জান বুঝতে পারছিলেন না আর.জেকে তিনি কীভাবে শুধরাবেন।

-----------------

হানাম খুব খুশি মনে ক্লাস থেকে বের হলো। ক্লাসের ছাত্রছাত্রীরা ভালোই ছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার আত্মবিশ্বাস ফিরে এল এবং সে শোকর আদায় করল যে প্রথম দিনটা অন্তত ভালো কেটেছে। কলেজ থেকে সরাসরি সে তার অ্যাকাডেমিতে এল, যেখানে মেহরুর সাথে ক্যান্টিনে বসে সিঙ্গাড়া খাচ্ছিল।
"প্রথম দিন কেমন কাটল?" মেহরু জিজ্ঞেস করল।
"ভালোই।"
"কেউ কি জ্বালিয়েছে?" মেহরু দ্বিতীয় প্রশ্ন করল।
"না, এখনো তেমন কিছু হয়নি। তবে আমি নিজে খুব ক্লান্ত হয়ে গেছি, এখন শুধু ঘুম পাচ্ছে।" হানামের কথা শুনে মেহরুর মায়া হলো।
"আগেই তো বলেছিলাম, ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিস।" মেহরুর খারাপ লাগল, হানামকে সত্যিই খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছিল।
"কিছু হবে না মেহরু, মাত্র দুই মাসেরই তো ব্যাপার। তুই শুধু দোয়া কর আল্লাহ যেন আমাকে সাহস দেন। কে জানে ওই মানুষগুলো কারা যারা দিনরাত কাজও করে আবার পড়াশোনায় টপ করে!" হানাম আজ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিল যে একসাথে দুটো কাজ করা কতটা কঠিন।
"তোর মতোই হয় তারা হানি, আর তুৃই দেখে নিস-একদিন আল্লাহ তোকে অনেক সাফল্য দান করবেন।"
"আমীন সুম্মা আমীন।" হানাম তার কথায় হাসল।
"আচ্ছা জলদি কর, আমাদের ক্লাস শুরু হতে চলল।"
"দাঁড়া, এই চা-টুকু খেয়ে নিই তারপর ক্লাসে যাচ্ছি।" হানাম চায়ের কাপ তুলে নিয়ে বলল।
মেহরু পরম মমতায় তাকে দেখছিল। মেহরুন-নিসারের কাছে উম্মে হানাম খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ছোটবেলা থেকেই তারা বন্ধু। মেহরু বেশ স্বচ্ছল পরিবারের মেয়ে। টাকা-পয়সার অভাব নেই। সে চাইলে এফএসসি-র পর ভালো কোনো কলেজ বা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হতে পারত, কিন্তু সে হানামের সাথে এই সাধারণ অ্যাকাডেমিতে পড়াই পছন্দ করেছে। সে হানামের এক প্রকৃত এবং অকৃত্রিম বন্ধু।

-----------------

"এই লোকটা আমার মেসেজের জবাব দিচ্ছে না কেন?" মাহি ল্যাপটপের সামনে বসে ছিল। সে তিন দিন আগে হাশামকে মেসেজ করেছিল কিন্তু সে কোনো উত্তর দেয়নি। মাহির নিশ্বাস যেন আটকে আসছিল।
"এমন কীভাবে হতে পারে যে মাহিন হামদান কাউকে মেসেজ করবে আর সেই লোক তাকে ইগনোর করবে?" তার খুব কষ্ট হচ্ছিল। বাইরে পড়তে থাকা বরফ তাকে আরও উদাস করে দিচ্ছিল।
"মাহি তুমি মন খারাপ করবে না, হয়তো উনি তোমার মেসেজ দেখেননি, হয়তো ব্যস্ত আছেন।" এলা তাকে দুপুরে সাহস দিয়েছিল, কিন্তু মাহির মন যেন ডুবে যাচ্ছিল।
"এখনও ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট accept করেননি।" সে হতাশ হতে শুরু করল।
"হয়তো উনি দেখেননি।" সে নিজেকে সান্ত্বনা দিচ্ছিল।
"মিস্টার হাশাম জাবিল, শুধু একবার কথা বলে নিন।" আরও একটি মেসেজ পাঠিয়ে সে ল্যাপটপ বন্ধ করে দিল। এক অদেখা বিষাদ তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল।

-----------------

আজ তার কলেজে তৃতীয় দিন ছিল, যখন সে ক্লাসে দুটি নতুন মুখ দেখতে পেল। একটি মেয়ে এবং একটি ছেলে। ছেলেটিকে ঠিক বাচ্চা বলা যায় না। সে একদম শেষ বেঞ্চে বসে ছিল। হানামের কাছে তাকে কিছুটা অদ্ভুত মনে হলো। ঘন ঘন চুল, যা জেল দিয়ে পেছনের দিকে চিপকে রাখা হয়েছে এবং তা ঘাড় স্পর্শ করছে। সে অন্য ছাত্রছাত্রীদের মতো ইউনিফর্মও পরেনি। মেয়েরা বারবার পেছনে ফিরে তাকে দেখছিল। অথচ ছেলেটির দৃষ্টি জানালার বাইরে খোলা আকাশের দিকে নিবদ্ধ। হানাম ক্লাসে ঢুকতেই সবাই সালাম দিল। ছেলেটি একবার হানামের দিকে তাকাল, তার চোখে কিছুটা বিস্ময় ছিল, তারপর আবার জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল।
"এই নতুন ম্যাম কবে এলেন?" মেয়েদের সারির একদম শেষে বসা মেয়েটি তার পাশের জনকে জিজ্ঞেস করল।
"হ্যাঁ, দুদিন আগে যখন তুই আর তোর বন্ধু দুজনই অনুপস্থিত ছিলি। তোর মা তো প্রিন্সিপাল, উনি কি কিছু বলেননি?"
"না, আমাকে তো কেউ কিছু বলেনি। এমনিতেও এসব বিষয়ে আমার কোনো আগ্রহ নেই। আমরা এখানে মাত্র কয়েক মাসের জন্য এসেছি, এসব দিয়ে আমাদের কী কাজ?" রুশনা এক রাশ ভঙ্গিতে চুলগুলো পেছনে ঝটকা দিয়ে বলল।

"আজ ক্লাসে দুটি নতুন মুখ দেখতে পাচ্ছি, আপনারা কি নিজেদের পরিচয় দেবেন?" হানাম ক্লাসে থাকা ওই দুই শিক্ষার্থীকে বলল।
"আমি রুশনা এই কলেজের মালিকের মেয়ে " সে শুধু এটুকুই বলল এবং তারপর ছেলেটির দিকে মুখ ফেরাল।
"আর আপনি?" হানাম ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করল, যে কে জানে বাইরের আকাশে কী খুঁজছিল।
"আপনার সাথে কথা বলছি আপনি কি শুনতে পাচ্ছেন না?" হানাম কৃত্রিম রাগ নিয়ে বলল।
ছেলেটি তার কণ্ঠের লুকানো রাগ অনুভব করে তার দিকে তাকাল। মেরুন রঙের ফ্রক, যা গোড়ালি থেকে কিছুটা ওপরে, তার ওপর একটি কালো রঙের সোয়েটার পরা। মেরুন ওড়না নেওয়া এই মেয়েটি তার কাছে কোনো দিক থেকেই শিক্ষিকা মনে হচ্ছিল না। তার চোখ এক সেকেন্ডে হানামকে স্ক্যান করে নিল, ওদিকে হানাম তার এমন চাহনিতে ঘাবড়ে গেল। ছেলেটি যেন হঠাৎ তড়িৎ গতিতে দাঁড়িয়ে পড়ল, পুরো ক্লাসে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল। হানাম খেয়াল করল যে ক্লাসে সে-ই সবচেয়ে লম্বা। এই শীতেও টি-শার্ট পরা ছেলেটিকে বেশ শান্ত দেখাচ্ছিল।
ওর কি শীত লাগে না? হানাম মনে মনে ভাবল।
"নাম কী আপনার?" হানাম জিজ্ঞেস করল।
ছেলেটি গভীর দৃষ্টিতে তাকে দেখছিল।
"রোহান জাবিল সৈয়দ রোহান জাবিল।" সে হানামের চোখের দিকে তাকিয়ে কথাটি বলল, তার কণ্ঠস্বর ছিল বেশ গম্ভীর ও দরাজ।
"ম্যাম, এ হলো আর.জে-" ক্লাসের একটি মেয়ে কিছু বলতে চেয়েছিল কিন্তু রোহান তার দিকে রক্তচক্ষু নিয়ে তাকাতেই মেয়েটি ওখানেই থেমে গেল।
"ঠিক আছে, আপনি বসুন। আজকের লেকচার শুরু করি।" হানাম দায়সারাভাবে কথাটি বলে বই হাতে নিল। ওদিকে রোহানের শীতল দৃষ্টি তখনও তার ওপরেই স্থির। এই প্রথম কেউ তাকে দাঁড়াতে বা বসার হুকুম দিল।
সে নিজের জায়গায় দাঁড়িয়েই রইল। হানাম তাকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কিছুটা দ্বিধায় পড়ল।
"আর আপনার পরিচয়?" ছেলেটি জিজ্ঞেস করল।
"উম্মে হানাম নাম আমার আর আমার পরিচয় অতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, আপনি বসুন।" হানাম হাসল।
রোহান কিছুটা অবাক হলো-হয়তো এই মেয়েটি সত্যিই তাকে চেনে না, অথবা ইচ্ছা করেই না চেনার ভান করছে।

--------------

"জানিস মেহরু, আজ ক্লাসে একটা নতুন ছেলে এসেছে, মানে পুরনোই কিন্তু গত কয়েকদিন অনুপস্থিত ছিল তাই আজই দেখা হলো।"
"তারপর...?" মেহরু জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল।
"অদ্ভুত এক মানুষ, একদিকে এত বড় হয়েও এখনো এফ.এস.সি-তে পড়ছে, আর অন্যদিকে পুরো লেকচার জুড়ে সে শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।"
"ছেলেরা খুব দ্রুত বড় হয়ে যায় রে হানি.. আর হয়তো ওর কোনো সমস্যা আছে।" মেহরুর কথায় হানাম মাথা নেড়ে সায় দিল।

মানুষের শরীর গলিয়ে দেওয়ার মতো গরম পড়ছিল। মনে হচ্ছিল যেন আকাশ থেকে আগুন ঝরছে... তৃষ্ণায় হানামের গলা শুকিয়ে আসছিল। দূরে সে একটি নদী দেখতে পেল, তপ্ত মাটির ওপর নগ্ন পদে হেঁটে সে সেই নদীর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।
পায়ে ফোস্কা পড়ে গিয়েছিল, কিন্তু তৃষ্ণার তীব্রতা তাকে সামনে এগোতে বাধ্য করছিল। নদীর কাছে পৌঁছাতেই বাতাসে গরমের তীব্রতা আরও বেড়ে গেল। নদীর দিকে তাকাতেই তার চোখ কপালে উঠল-নদীতে জলের বদলে লাভা বয়ে যাচ্ছে! সে ভয় পেয়ে এক কদম পেছনে সরে এল, তখনই কেউ তাকে পেছন থেকে ধাক্কা দিল এবং সে টগবগ করে ফুটতে থাকা আগুনের নদীতে গিয়ে পড়ল। আগুন শরীর পুড়িয়ে দিতেই সে চিৎকার করে জেগে উঠল। মুখ ঘামে ভেজা। মোটা লেপের নিচে তার যেন দম আটকে আসছিল।
"কী হয়েছে হানি, তুই ঠিক আছিস তো ?" চিৎকার শুনে আসিয়া বেগম জেগে উঠেছিলেন।
"আম্মা ও ওটা " শব্দগুলো তার গলায় আটকে গেল।
ঘরের জিরো বাল্বের আলোতে মেয়ের মুখের আতঙ্ক মা সহজেই দেখতে পাচ্ছিলেন। "কী হয়েছে? কোনো বাজে স্বপ্ন দেখেছিস?" আসিয়া বেগম জিজ্ঞেস করলেন।
"পা... পানি " শুকনো গলায় কোনোমতে সে বলতে পারল।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আসিয়া বেগম তাকে এক গ্লাস জল দিলেন এবং সে এক নিশ্বাসে তা পান করে ফেলল।
"কতবার বলেছি এশার নামাজ পড়ে শুতে। কাজ আর ব্যস্ততা নিজের জায়গায়, কিন্তু নামাজ ছাড়া কি কোনো বুদ্ধিমানে কাজ?" আসিয়া বেগম আয়াতুল কুরসি পড়ে তাকে ফুঁ দিয়ে দিলেন।
সে আজ খুব ক্লান্ত ছিল। কলেজ, অ্যাকাডেমি আর তারপর নিজের অ্যাসাইনমেন্ট তৈরির পর তার আর উঠে এশার নামাজ পড়ার শক্তি ছিল না। শয়তান জয়ী হয়েছিল আর সে নামাজ না পড়েই ঘুমিয়ে পড়েছিল। আর এখন ভয় পেয়ে জেগে উঠেছে। তার দ্রুত চলা হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক হতে কিছুক্ষণ সময় লাগল।
"আল্লাহ আমাকে মাফ করে দিন, আর কখনো নামাজ ছাড়ব না !!" তার চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে এল। স্বপ্নটি তাকে খুব খারাপভাবে ভয় পাইয়ে দিয়েছিল।
"শয়তান কুমন্ত্রণা দিয়েছে আর কিছু না। ওসব ভাবিস না, ঘুমিয়ে পড়।" আম্মা তাকে আদর করে বললেন।
সে জেগে রইল। শীতের রাত এমনিতে দীর্ঘ হয়, পুরো এক ঘণ্টা পর তার চোখে ঘুম এল। সে জানত না যে এই স্বপ্নের প্রভাব তার জীবনে কতটা গভীর হতে যাচ্ছে।

উপন্যাস : সালফাইট
লেখিকা : নূর রাজপুত
অনুবাদ : শে'র এ লাফজ

#সালফাইটবাংলাঅনুবাদ #সালফাইট

08/03/2026

৫.

"হানি, তোর আসমারা আপুর কথা মনে আছে? স্কুলে আমাদের সিনিয়র ছিল," মেহরু সামনে বসা হানামের কাছে জানতে চাইল, যে তখন দ্রুত হাতে রেজিস্টারে কলম চালাচ্ছিল।
"না, বিশেষ মনে নেই..." হানাম উত্তর দিল।
"আরে ওই যে, যার সাথে আমার বেশ ভালো বন্ধুত্ব ছিল, যে টপ করেছিল..." মেহরু মনে করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল।
"কী হয়েছে তার?" এবার হানাম একটু চমকে উঠে জিজ্ঞেস করল।
"ওনার মায়ের একটা প্রাইভেট কলেজ আছে, বেশ ভালোই চলছে। তাদের দুই মাসের জন্য একজন শিক্ষকের প্রয়োজন। কাল আসমারা আপু ফোন করেছিল, জিজ্ঞেস করছিল যদি কোনো শিক্ষক থাকে... এফ.এস.সি-র স্টুডেন্টদের পড়াতে হবে, মাত্র দুই মাসের জন্য।"
হানাম এবার মাথা তুলে মেহরুর দিকে তাকাল।
"সে কি আমাকে রাখবে...?" হানামের তীক্ষ্ণ মস্তিষ্ক মেহরুর কথার ইঙ্গিত ধরে ফেলেছে।
"হ্যাঁ, আমি কথা বলেছি। সে বলছিল যদি ডেমো ভালো দিতে পারস তবে..."
"আমি চেষ্টা করব... এই দুই মাসই আমার জন্য অনেক।" হানামের মগজ এখন দ্রুত কাজ করতে শুরু করেছে।
"এমনিতে ওখানে সব শিক্ষকরাই অনেক হাই কোয়ালিফাইড, কিন্তু এখন ওদেরও নিরুপায় অবস্থা। আর আসমারা আপু আমার কথা ফেলবেন না, ওনি ওনার মাকে রাজি করিয়ে নেবে। কিন্তু তুই ভেবে দেখ, একসাথে দুটো কাজ সামলাতে পারবি তো?" মেহরু কিছুটা চিন্তিত হলো।
"কলেজের সময় কখন?" হানাম জানতে চাইল।
"সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত," মেহরু জানাল।
"ব্যস, তাহলেই হবে। অ্যাকাডেমির সময় দুপুর দুটো থেকে শুরু হয়, আর তাছাড়া মাত্র তো দুই মাসের ব্যাপার। আমি কিছু একটা ব্যবস্থা করে নেব।" হানামের মন থেকে যেন মস্ত বড় একটা বোঝা নেমে গেল, কিন্তু এখন তার মনে নতুন এক দুশ্চিন্তা-কে জানে চাকরিটা সে আদেও পাবে কি না?

---------------

হাশাম আর.জেকে ডাকতে তার ঘরে এল, কিন্তু তাকে সেখানে দেখতে পেল না। বাথরুমের দরজা বন্ধ ছিল এবং ঝরনার শব্দ শুনে সে আন্দাজ করল আর.জে ভেতরে আছে। সে কিছু বলতে যাবে এমন সময় তার নজর পড়ল আর.জের ফোনের ওপর, ফোনটার স্ক্রিন তখন বারবার জ্বলে উঠছিল।" হাশামই ছিল একমাত্র ব্যক্তি যে আর.জের ফোন ধরার সাহস রাখত।
হাশাম এগিয়ে গিয়ে ফোনটা হাতে নিল, আর পরক্ষণেই সে যেন এক বৈদ্যুতিক শক খেল। হ্যাঁ, মোবাইল ফোন থেকেই আওয়াজ এল
"Don't touch my phone, you bromides!"
মোবাইলের স্ক্রিন থেকে আওয়াজটি ভেসে এল এবং সেই একই বাক্য সেখানে জ্বলজ্বল করছিল। একটি প্রকান্ড বাঘ মুখ হাঁ করে তাকে খেয়ে ফেলার মতো দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, যার মুখে এই কথাগুলো ঝলমল করছিল।
"কী হলো শামু কাকা? ভয় পেয়ে গেলে...?" ভেতর থেকে আর.জের আওয়াজ ভেসে এল। কে জানে সে কীভাবে সব বুঝে ফেলে।
"জলে ডুবে মরো তুমি! তুমি আসলে চরম এক জঘন্য লোক!" হাশাম রেগে আগুন হয়ে গেল, আর ওদিকে আর.জের অট্টহাসি শোনা গেল।
"ব্রোমাইড সাহেব, আমার ঘরে কী নিতে এসেছেন...?" তার মুখে 'ব্রোমাইড' শুনে হাশাম আরও ক্ষেপে গেল।
"তুমি ব্রোমাইড মানে জানও?"
"সেটা তো আপনিই জানবেন শামু কাকা। ইংরেজি সাহিত্য তো আপনিই পড়ছেন।"
"ব্রোমাইড মানে হলো পুরনো ধ্যান-ধারণার মানুষ। আমাকে কি তোমার সেকেলে মনে হয়?" আর.জের মুখে 'ব্রোমাইড' ডাকটা হাশামের খুব খারাপ লাগল।
"জি একদম... শামু কাকা, আপনি পুরনো ফ্যাশনের মানুষ, সেটা আপনার পোশাক দেখলেই বোঝা যায়," আর.জে মুখরোচক জবাব দিল।
হাশাম দাঁতে দাঁত চেপে রাগ সংবরণ করল।
​"গোসল সেরে জলদি নিচে আসো... মাদিহা এসেছে, তোমাকে ডাকছে।"
মাদিহা হাশামের ছোট বোন, যে ডাক্তার হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কথাটি বলে হাশাম আর সেখানে দাঁড়াল না, ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। কারণ আর.জের সাথে তর্কে যাওয়া মানেই সময়ের অপচয়।

-----------------

"থাক হানি। এক সাথে দুটো কাজ তোর দ্বারা হবে না, পরে বলবি যে পড়াশোনায় মন দিতে পারছিস না," আসিয়া বেগম নিজের মেয়েকে বোঝাতে চাইলেন।
"সেটা তো এমনিতেও পারছি না আম্মা। বরং এই কাজে তো আমার লাভই হবে, মাত্র তো দুই মাসের কথা," হানাম বলল, আসিয়া বেগম চুপ করে রইলেন।
"ভালোই তো, যেতে দিন না আম্মা। ঘরে থাকলেও তো ও শুধু বই গিলবে। বাইরে বেরোবে, দুনিয়া দেখবে, ওর রাগটাও একটু কমবে," মাহাম ফোড়ন কাটল। হানাম তাকে রাগী দৃষ্টিতে দেখল।
"ওকে ছাড়, তুই খেয়ে নে। ওর তো কথা বলাই কাজ," আসিয়া বেগম হানামকে বললেন, যে খুব দ্রুত রেগে যেত। তবে সেই রাগটা অন্যদের ওপর কমই প্রকাশ পেত, বরং সব রাগ নিজের ভেতরে চেপে রাখার কারণে সে খুব তিক্তভাষী হয়ে উঠেছিল।
"ব্যাস আম্মা, মাত্র দুই মাস। ওরা দশ হাজার টাকা দেবে। এক মাসের টাকা দিয়ে এক বারের ফিস হয়ে যাবে, আর পরের মাসের বেতন দিয়ে একটা মোবাইল নেব, ইন্টারনেটের খুব দরকার পড়ে আমার।"

আজ সে খুব পরিশ্রম করে ক্লাস নিয়েছিল এবং প্রিন্সিপালের তার ডেমো পছন্দ হয়েছে। কাল থেকে সে আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষকতা শুরু করতে যাচ্ছে।
"এটাও ভাগ্যের কথা যে ওরা আমাকে রেখে দিল। যদি না করত তবে কী হতো...?" হানাম আর বলতে পারল না।
"রাখবে না কেন? যে শিক্ষককে ত্রিশ হাজার টাকা দিতে হতো, তার বদলে এখন দশ হাজারে শিক্ষক পেয়ে গেছে। রাখবে না মানে...?" মাহাম খোঁচা দিতে ছাড়ল না।
"তুই চুপচাপ বিছানা করে দে, আমার খুব ঘুম পাচ্ছে।"
"সেটাই তো করছি, আগে চোখ মেলে দেখ তো," হানামের কথায় বিছানা করতে থাকা মাহাম বিরক্তির সাথে উত্তর দিল। হানামের মন তখন শিক্ষকতার ভাবনায় ডুবে আছে। সে শিক্ষকতা পছন্দ করত না, কিন্তু সময় মানুষকে দিয়ে কী কী করিয়ে নেয়, তা সে এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিল। সে শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শান্ত রইল।

-----------------

সে ফুটবল হাতে নিয়ে সৈয়দ হাভেলি থেকে বেরিয়ে এল, তার গন্তব্য এখন মাঠের দিকে যেখানে এলাকার ছেলেরা ফুটবল খেলে।
"আরে আর.জে, আয় আয়..." ছেলেরা তাকে দেখে ডাকল, আর সে হাসিমুখে তাদের দিকে এগিয়ে গেল। তার চোখ কাউকে খুঁজছিল।
কাল মাদিহা তাকে বলেছিল যে সে যখন ড্রাইভারের সাথে বাড়ি ফিরছিল, তখন এক ছেলে বাইক নিয়ে তাদের পিছু নিয়েছিল এবং কিছু কুরুচিপূর্ণ কথা বলেছিল-এমনকি সে যে সৈয়দ বংশের মেয়ে, সেটা জানার পরেও।
দ্রুতই তার "কম্পিউটারের চেয়েও তেজ" মস্তিষ্ক সেই ছেলেটিকে শনাক্ত করে ফেলল। আর তারপর সে ফুটবলের সাথে...

মাঠে ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ স্বাভাবিক খেলার পর সে ছেলেটিকে লক্ষ্য করে ফুটবলে এক লাথি মারল এবং বল সরাসরি তার মুখে গিয়ে লাগল। ছেলেটি টাল সামলাতে না পেরে নিচে পড়ে গেল। সে উঠে দাঁড়ানোর আগেই আর.জে তার মাথার কাছে পৌঁছে গেল। অন্য সব ছেলেরা আর.জের পাগলামি দেখে পালিয়ে গেল, আর সে তখন উন্মত্তের মতো ছেলেটিকে হাত আর পা দিয়ে পেটাতে শুরু করল। যদি তার সাধ্য থাকত, সে ছেলেটিকে মেরেই ফেলত। দেখতে সে ছিপছিপে পাতলা গড়নের হলেও, শরীরের তুলনায় সে ছিল বেশ শক্তিশালী।
"বড় সাঈঁ, জলদি চলুন! বাইরে মাঠে ছোট সাঈঁ..." হাভেলির কর্মচারী দৌড়ে দৌড়ে হাশামের কাছে এল।
"কী হয়েছে আর.জের?" ছোট সাঈেঁর নাম শুনেই হাশাম সতর্ক হয়ে গেল এবং এক ঝটকায় উঠে বসল।
"জি ওই যে, বাইরে সাঈঁ একটা ছেলেকে মারছেন..." কর্মচারী হাঁপাতে হাঁপাতে কোনোমতে বলল, আর হাশাম তার কথা শেষ হওয়ার আগেই বাইরের দিকে দৌড় দিল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সে মাঠে পৌঁছে গেল। ছেলেটি নিচে পড়ে ছিল, আর আর.জে তার মুখে ঘুষি মারছিল।
"আর.জে, পাগল হয়ে গিয়েছ? ছাড়ো ওকে!" হাশাম তাকে টেনে হিঁচড়ে ছেলেটির থেকে আলাদা করল, যার মুখ দিয়ে তখন রক্ত বের হচ্ছিল। আর.জের কব্জি থেকে মুক্ত হওয়ার পর ছেলেটি ব্যথায় কাতরাতে লাগল। কর্মচারী ছেলেটিকে তুলে সেখান থেকে নিয়ে গেল।
"তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? তুমি কি পাগল হয়ে গেছো, অসভ্য কোথাকার!" ছেলেটির অবস্থা দেখে হাশাম প্রচণ্ড রেগে গেল এবং আর.জেকে জোরে একটা ধাক্কা দিল।
আর.জে রক্তচক্ষু নিয়ে সেদিকেই তাকিয়ে ছিল যেদিকে কর্মচারীটি ছেলেটিকে নিয়ে গেছে।
"কেন মারলে ওকে?" হিশাম প্রশ্ন করল। আর.জে কোনো উত্তর না দিয়ে হাভেলির দিকে হাঁটা দিল।
"তোমাকে জিজ্ঞেস করছি, উত্তর দেও!" সে জবাব না দেওয়ায় হাশাম চিৎকার করে উঠল।
" রিল্যাক্স , শামো কাকা অকারণে চেচামেচি করছেন কেন?" সে এমন শান্ত স্বরে কথাটি বলল যেন কিছুই হয়নি, যা দেখে হাশাম হতভম্ব হয়ে গেল।
"আমাকে ফিরে যেতে হবে। দেরি হয়ে যাচ্ছে, প্যাকিং করতে হবে। চলুন চা খাই, তারপর আমি চলে যাব আর আপনি সুযোগ পাবেন না।"
তার নিজের হাতও জখম হয়েছিল। সে হাশামকে রাগে জ্বালিয়ে দিয়ে সামনে এগিয়ে গেল, আর হিশাম মাথায় হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

-----------------

সকাল সকাল কলেজের স্টাফ রুমে বসে ছিল হানাম। আজ তার প্রথম দিন। সে ভীষণ ঘাবড়ে যাচ্ছিল। মনে মনে কেবল দোয়া করছিল যেন তার প্রথম অভিজ্ঞতা সফল হয়।
"মিস হানাম, আসুন, আপনাকে আপনার ক্লাস দেখিয়ে দিই," কলেজের কো-অর্ডিনেটর তাকে ডাকলেন। হানাম নিজেকে সামলে নিয়ে তাঁর পেছনে পেছনে হাঁটা দিল।

"এটি এফ.এস.সি পার্ট টু-র ক্লাস। আজ থেকে আপনি এদের কেমিস্ট্রি পড়াবেন," কথাটি বলে দুজনে ক্লাসে প্রবেশ করলেন।
ক্লাসের একদিকে মেয়েরা, অন্যদিকে ছেলেরা বসে ছিল। হানাম নিজে এখনও বয়সে ছোট, সে বুঝতে পারছিল না এই ছেলেদের কীভাবে সামলাবে।

"স্টুডেন্টস, ইনি তোমাদের কেমিস্ট্রির নতুন ম্যাম। সবাই ওনাকে স্বাগত জানাও," কো-অর্ডিনেটর সামিয়া ক্লাসে তার পরিচয় করিয়ে দিলেন। "উনি কেমিস্ট্রিতে মাস্টার্স করেছেন," সামিয়ার এই কথায় হানাম চরম চমকে উঠল। উনি মিথ্যা বলেছেন! হানাম তো নিজেই এখন ছাত্রী। সে জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিল কেন তার ভুল পরিচয় দেওয়া হলো, কিন্তু সেই সুযোগ পেল না। কিছু বলার আগেই সামিয়া ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেলেন।
ক্লাসের ছাত্রছাত্রীরা তাকে একদৃষ্টে দেখছিল। হানাম অতটা আত্মবিশ্বাসী ছিল না, তার ওপর এটিই ছিল তার প্রথম কাজ। সে বেশ ঘাবড়ে যাচ্ছিল।
"ম্যাম, আপনার নাম কী?" একটি মেয়ে জিজ্ঞেস করল।
"উম্মে হানাম," হানাম নিজেকে যথাসম্ভব আত্মবিশ্বাসী করে তুলে বলল।

"নাইস নেম, ম্যাম" ছেলেদের দিক থেকে প্রথম মন্তব্যটি এল। হানাম আল্লাহর নাম নিয়ে ক্লাসে সবার পরিচয় নিতে শুরু করল।

উপন্যাস : সালফাইট
লেখিকা : নূর রাজপুত
অনুবাদ : শে'র এ লাফজ

#সালফাইটবাংলাঅনুবাদ #সালফাইট

08/03/2026

৪.

সকাল তিনটে বাজে এবং এই হাড়কাঁপানো শীতে সে সাঁতার কাটছে। হাশাম নিজের ঘরের জানালা দিয়ে তাকে দেখল এবং তারপর মাথা নেড়ে জানালা বন্ধ করে দিল। সে এমনই ছিল। সারারাত তার চোখে ঘুম আসত না। তবে সকাল পাঁচটা বাজতেই তার চোখ বন্ধ হয়ে আসত।সে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র তিন ঘণ্টা ঘুমাত।

সে মাছের মতো ঠাণ্ডা জলে সাঁতার কাটছিল। সাধারণ মানুষের তুলনায় তার ঠাণ্ডা কম লাগত। চারটের সময় সে নিজের ঘরে ল্যাপটপের সামনে বসে ছিল। শালিনীর অনেকগুলো মেসেজ এসেছিল। আর সে কি আর মেয়েদের থেকে দূরে পালানোর পাত্র? সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর দিল।
"তোমার গলার আওয়াজ এত সুন্দর, তুমি প্রফেশনাল সিংগার হয়ে যাও না কেন?" শালিনী জিজ্ঞেস করল।
"Call me Aap"
তার 'তুমি' বলায় আর.জে অনেকটা হুকুম দেওয়ার স্বরেই বলল যে, "আমাকে 'আপনি' করে ডাকো।" শালিনীর হাসি ফিকে হয়ে গেল।
"ওকে... ওকে, মিস্টার আর.জে." সে জোর করে হাসল।
এরপর সে বেশ কিছুক্ষণ তাকে বিভিন্ন প্রশ্ন করতে লাগল, আর আর.জে প্রতিবারই আগের চেয়ে বেশি তাকে ধাঁধায় ফেলে দিচ্ছিল।
"যাই হোক, ভালোই হয়েছে আপনি মুসলিম নন। আমি মুসলমানদের পছন্দ করি না, কিন্তু আপনাকে সব দিক থেকেই পছন্দ হয়েছে এখন।" শালিনী এক চিলতে সুন্দর হাসি ছুড়ে দিল।
"কিন্তু আমি তোমাকে একদমই পছন্দ করি না।" সে স্পষ্ট ভাষায় জবাব দিল।
"কেন?" মেয়েটি অবাক হলো।
"তোমার চেহারায় কোনো সারল্য নেই, তোমার ঠোঁটে কোনো আকর্ষণ নেই, নাকটা একটু ছড়ানো, চোখে লাইনার লাগিয়ে বড় করেছ, আর গায়ের রঙ ফিল্টার দিয়ে ফর্সা করেছ। তোমার শরীরে কোনো ফিটনেস নেই।" সে নিপুণ দক্ষতায় উত্তর দিয়ে শালিনীর মনে যেন আগুন ধরিয়ে দিল।
বেশ কিছুক্ষণ শালিনী বিশ্বাসই করতে পারল না যে কোনো ছেলে তার সম্পর্কে এমন কথা বলতে পারে। যে নিজের সৌন্দর্য এবং বুদ্ধিমত্তা-উভয়ের জন্যই বিখ্যাত ছিল, সে এখন বাকরুদ্ধ হয়ে বসে রইল।

"How dare you..?"

হুঁশ ফেরার পর সে চিৎকার করে উঠল, ততক্ষণে আর.জে ঘুমের দেশে তলিয়ে গেছে, কারণ ঘড়িতে তখন পাঁচটার ঘণ্টা বেজে উঠেছিল।

—————

এটি রেহমান প্রোডাকশনের স্টুডিও। শানদার কেবিনের ভেতরে মিস্টার রেহমান নিজের চেয়ারে বসে আছেন। সামনে টিভিতে কোনো এক গায়কের পারফরম্যান্স দেখছিলেন।
"স্যার, আর.জে তরুণ প্রজন্মের কাছে খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তার ফ্যান ফলোয়িং এখন লক্ষ ছাড়িয়ে গেছে," সেক্রেটারি তার সামনে বসা মিস্টার রেহমানকে জানাল, যিনি খুব গভীর মনোযোগ দিয়ে গান গাওয়া ছেলেটিকে দেখছিলেন।
"জানি," মিস্টার রেহমান সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলেন।
"তবে কী ভাবছেন স্যার? আমরা আমাদের নতুন অ্যালবাম 'মার জান'-এর জন্য তাকে কাস্ট করতে পারি।"
"গলা ভালো, দমও আছে, কিন্তু ছেলেটার মধ্যে কোনো আবেগ নেই। আর তুমি জানো আমি সেইসব গায়ক পছন্দ করি যাদের কণ্ঠ হৃদয় থেকে নিঃসৃত হয়," মিস্টার রেহমান বললেন।
"জি স্যার, তাহলে এখন?" সেক্রেটারি পাশ ফিরল।
"এখন কথা হলো আমি তাকে এখনই কাস্ট করতে পারব না। আমি ততক্ষণ অপেক্ষা করব যতক্ষণ না তার ভেতর আবেগ জেগে ওঠে। তার অন্তর থেকে আসা সুর যখন আমার হৃদয়ে নাড়া দেবে, তখন আমি নিজে তার কাছে যাব। আর ততক্ষণ আমাকে অপেক্ষা করতে হবে," মিস্টার রেহমান নিবিষ্ট মনে আর.জেকে দেখতে দেখতে বললেন।
"এটা নিশ্চিত যে, যতক্ষণ আমাদের কণ্ঠ হৃদয় থেকে না আসে, ততক্ষণ তাতে কোনো প্রভাব থাকে না। আবেগের সুরে এক অন্যরকম জাদু থাকে।"
মিস্টার রেহমান নিজের সিদ্ধান্ত শোনালেন আর সেক্রেটারি তাতে মাথা নেড়ে সায় দিল। সে আর.জেকে খুব পছন্দ করত এবং চাইত যে তাদের পরবর্তী অ্যালবামে আর.জে কাজ করুক।
কিন্তু সম্ভবত তারা দুজনেই জানত না যে আর.জের কাছে 'আবেগ' নামক কোনো বস্তু নেই। আর থাকলেও, সে তা নিয়ন্ত্রণ করতে খুব ভালো করেই জানত।

"তারাই ভালো থাকে যারা নিজের আবেগ কারো সামনে প্রকাশ হতে দেয় না, নয়তো এই দুনিয়ার মানুষ বাঁচতে দেয় না।"

—————

"আপনার আদুরে ছেলেকে ভালো করে বুঝিয়ে দিন বি জান, ও যতক্ষণ মুলতানে আছে যেন কোনো নাটক না করে। নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসছে, আর ওর ওপর আমার বিন্দুমাত্র ভরসা নেই," সৈয়দ জাবিল তার সামনে বসা বি জানকে বললেন।
"ও আর এমন কিছু করবে না... ও এখন আর বাচ্চা নেই, বড় হয়েছে," বি জান সান্ত্বনা দিলেন।
"ও যত বড় হচ্ছে, ওর কীর্তিগুলো তার চেয়েও বেশি বাড়ছে। আল্লাহই জানেন এই ছেলে সৈয়দ বংশের কী দশা করবে?" সৈয়দ জাবিল, যিনি নিজের ছেলের ওপর সম্ভবত খুব বিরক্ত ছিলেন, আক্ষেপের সুরে বললেন।
"আমি হাশামের সাথে কথা বলছি... এমনিতেও কাল ও ফিরে যাবে। চিন্তার কিছু নেই।"
"কে জানে যাওয়ার সময় ও আবার কী করে বসে? ওর সম্পর্কে তো কেউ আগে থেকে কিছু আন্দাজও করতে পারে না..." সৈয়দ জাবিল উঠতে উঠতে নিজের চাদর ঠিক করলেন এবং কথাটি বলে বাইরের দিকে পা বাড়ালেন।
সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আর.জে তার বাবার কথা স্পষ্ট শুনেছিল, আর তখন তার মুখে এক রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। অর্থাৎ, নিশ্চিতভাবেই সে কিছু একটা করতে যাচ্ছিল।

—————

​"আমার সাধ্য থাকলে কোনোদিন কোথাও
এমন এক শহর গড়তাম আমি-
যেখানে বরফের মতো শুভ্র প্রেমে রবে না কোনো ভয়।
জাগতিক শোকের ছায়া পড়বে না সেখানে কখনো,
দুনিয়ার যত রীতি-নীতির শিকল,
আপন সত্তার দুঃখের যত স্বাদ,
এই সৃষ্টিজগতের যত বিষাদ আর তিক্ততা;
কোনো কিছুই যেন কারো চোখকে ছুঁতে না পারে...!!!"

সেটি ছিল এক অপূর্ব জগত, যেখানে দৃষ্টি যতদূর যায়-সাদা বরফ সবকিছুকে সাদা করে দিয়েছে। আর সেই সাদা বরফের চাদরের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা ওই প্রাসাদটি... হ্যাঁ, সে রাজকন্যাদের দেশে চলে এসেছে। তার বিশ্বাসই হচ্ছিল না যে সে সত্যিই সেখানে উপস্থিত আছে।
পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষগুলো, যারা নিজেদের ওজনের চেয়েও ভারি পশমি কোটে আবৃত ছিল, তাকে এক অদ্ভুত উষ্ণতা দিচ্ছিল। সে কদম বাড়াল এবং প্রাসাদের দিকে হাঁটতে শুরু করল। সে তখনও কিছুটা দূরত্বে ছিল যখন...

"হানি... হানি আপু... ওঠো, তাড়াতাড়ি!" নিজের নামের ডাক কানে এল। কেউ তাকে ডাকছে।
"হানো আপু..." জওয়াদ তার নাম বিকৃত করতে কোনো কমতি রাখত না।
"কী হয়েছে...??" সে ভীষণ বিরক্ত হলো।
"ওঠো, মেহরু আপুর কল এসেছে, তোমাকে ডাকছে..." সে লেপ টেনে সরিয়ে খবর দিল।
"আসছি আমি, তুই যা!"
"আর মাত্র সামান্য দূরত্ব বাকি ছিল, এই মানুষগুলো কখনো আমাকে আমার স্বপ্নেও শান্তিতে থাকতে দেবে না।" সে বিড়বিড় করছিল। স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ায় তার খুব কষ্ট হলো। এমন তো সবসময়ই হয়ে এসেছে, কিন্তু কেন যেন পরীদের দেশে যাওয়ার স্বপ্ন তার পিছু ছাড়ত না। সে যতই বুদ্ধিমতী হোক, যতই বড় হয়ে যাক না কেন... তার ভেতরটা এখনও আগের মতোই রয়ে গেছে, যে নিষ্পাপ পরীদের স্বপ্ন দেখে।

—————

"আর.জে, আপনার আইকিউ লেভেল কত? আপনার সবকিছু মনে থাকে? দয়া করে বলবেন কি আপনার আইকিউ লেভেল কত??" তার নতুন একটি পারফরম্যান্স ভিডিওর নিচে কেউ কমেন্ট করেছে।
এটি সত্যি যে তার শৈশব থেকে আজ পর্যন্ত ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনা মনে ছিল। তার সামনে আসা প্রতিটি মানুষকেই তার মনে থাকত। সে কিছু ভুলত না।
ছেলেটির কথা শুনে তার মুখে এক রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল... আর জীবনের কিছু অধ্যায় তার মগজে যেন পেছন দিকে উল্টে গেল, তার সামনে খোলা ল্যাপটপে এক নতুন সিনেমা চলতে শুরু করল।
"মিস্টার জাবিল, আপনি তো বলেছিলেন যে আপনার সন্তান এক অসাধারণ শিশু, যে সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক আলাদা, যার মস্তিষ্ক খুব দ্রুত কাজ করে।"
"জি, জি, একদমই তাই!" সৈয়দ জাবিল পাশে বসা নিজের স্ত্রীর দিকে এক পলক তাকিয়ে সামনে বসা ব্যক্তিকে উত্তর দিলেন।
"ভুল... একদম ভুল! আপনার ছেলে বাকি বাচ্চাদের তুলনায় অনেক বেশি নির্বোধ। সে আইকিউ লেভেল -এর যে টেস্ট দিয়েছে, তাতে প্রমাণিত হয় যে তার আইকিউ লেভেল জিরো । যদি বিশ্বাস না হয় তবে পেপারগুলো দেখে নিন..."

ওই ব্যক্তির কথা শুনে তারা দুজনেই হতবাক হয়ে গেলেন। স্কুলের প্রিন্সিপাল তাদের বাধ্য করেছিলেন যেন আর.জের আইকিউ লেভেল টেস্ট করানো হয়, এবং এরপর চাইলে তারা তাকে অন্য কোনো স্কুলে সরিয়ে নিতে পারেন। কিন্তু এখানে তো উল্টো কাণ্ড ঘটে গেল।

টেস্ট দেখার পর সৈয়দ জাবিলের বিশ্বাসই হচ্ছিল না, অথচ আর.জে শান্ত হয়ে বসে ছিল। কে জানে তার মাথায় কী চলছিল। আসলে স্কুলের প্রিন্সিপাল এবং প্রতিটি শিক্ষক যারা আর.জের ক্লাসে আসতেন, তারা সবাই তার ওপর বিরক্ত ছিলেন। নিঃসন্দেহে সে এক অসাধারণ শিশু ছিল, কিন্তু তার প্রশ্নগুলো শিক্ষকদের মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছিল। প্রিন্সিপাল ওই শিশুকে স্কুল থেকে বের করতে পারছিলেন না, তাই তিনি আর.জের বাবা-মাকে এই নতুন পরামর্শ দিয়েছিলেন, যা শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হলো।

"আমি আসছি প্রিন্সিপাল স্যার... আর.জে আসছে," সে মনে মনে বিড়বিড় করল।

"চলো বাবা...?" মিসেস জাবিল উঠতে উঠতে ছেলেকে বললেন।
"ইয়েস, মম!" সে লাফ দিয়ে চেয়ার থেকে নামল।
তারা অফিস থেকে বেরিয়ে আসছিলেন যখন সে এক ঝটকায় থামল।
"মম, শামুর ফোন তো ভেতরেই রয়ে গেছে, আমি এক্ষুণি নিয়ে আসছি," কী অদ্ভুত নিপুণতায় সে কাউকে না জানিয়েই হাশামের ফোনটি তুলে আনতে চলে গেল।
মিসেস জামিল কিছু বলার আগেই সে তার ছোট হাত ছাড়িয়ে অফিসের দিকে দৌড়ে গেল।
"উনার ছেলে আবার কোনো জিনিস ভুলে যাবে? অবাক কাণ্ড!" তিনি বিস্মিত হলেন।

" হ্যালো আঙ্কেল..." সে ওই ব্যক্তির সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
"আপনি এখন ভেতরে মিসের সাথে যে কথাগুলো বললেন না, ওসব এতে রেকর্ড হয়ে গেছে। যদি আপনি আবার সৈয়দ জাবিলকে বলেন যে আমি নির্বোধ, তবে আমি এটা সবাইকে শুনিয়ে দেব।" শিশুটি তার জ্যাকেট থেকে ফোন বের করে বলল, যা সে অনেক কষ্টে লুকিয়েছিল। ওদিকে সামনে বসা ব্যক্তিটি কিছুই বুঝতে পারছিলেন না।

"আমি বললাম তো মিস জিয়া, টাকা আপনার অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার হয়ে যাবে, আমার ওয়াইফ যেন জানতে না পারে..." সে বোতাম টিপে রেকর্ডিং অন করল, যা শুনে ওই ব্যক্তির কপালে ঘাম জমে গেল।
"বেস্ট অফ লাক, আঙ্কেল..." সে হাসতে হাসতে বাইরে বেরিয়ে এল। সে এমনই ছিল, সে এত সহজে কাউকে নিজের সম্পর্কে জানার সুযোগ দিত না।
তার মস্তিষ্ক কম্পিউটারের গতিতে কাজ করত। সে কারো ঠোঁট নাড়া দেখেই বুঝে নিত দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি কী কথা বলছে।
"বলুন না আর.জে, আপনার আইকিউ লেভেল কত? আমি আপনার ইন্টারভিউ আমাদের ম্যাগাজিনে পাবলিশ করতে চাই।"
"জিরো..." এক কথায় উত্তর দিয়ে সে ল্যাপটপ বন্ধ করল। উল্টো দিকের মানুষটি কতটা অবাক হলো সে নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা ছিল না। সে এমনই ছিল। শৈশবের সেই ঘটনা তার ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে তুলল।

—————

"তুমি ভাবতে পারবে না এলা, আজ আমি খুব খুশি..." মাহির হাত আবেগের আতিশয্যে কাঁপছিল। "বলো তো আমি এখন কী করব? কীভাবে ওই লোকটির সাথে কথা বলব...??" মাহির কণ্ঠস্বর বুজে এল।
সামনে ল্যাপটপে ওই লোকটির ছবি জ্বলজ্বল করছে। কত কষ্টে মাহি তাকে খুঁজে পেয়েছে।
"কী করবে আবার পাগল? সবার আগে ওনাকে অ্যাড করবে, তারপর কথা বলবে ।" এলা পরামর্শ দিল।
"উনি কি আমার সাথে কথা বলবেন?" মাহির বিশ্বাসই হচ্ছিল না যে ওটা সত্যিই ওই লোকটির অ্যাকাউন্ট।
"সৈয়দ হাশাম বিন জাবিল..." হ্যাঁ, এটাই ছিল সেই ব্যক্তির নাম, যিনি কড়া ইস্ত্রি করা সাদা পোশাকে, খয়েরি রঙের চাদর কাঁধের ওপর ছড়িয়ে নিজের সমস্ত আভিজাত্য নিয়ে বসে ছিলেন। সে চোখের পলক না ফেলে তার প্রোফাইল পিকচারটির দিকে তাকিয়ে ছিল।

"হুঁশে আসো মাহি... দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই কথা বলে নেও।" কথাটি বলে এলা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, আর মাহির হাত কাঁপতে লাগল। তার চোখে জল চিকচিক করছিল। মানুষটি তাকে কতটা আপন করে নিয়েছিল, সে নিজেই তা জানত না।

উপন্যাস : সালফাইট
লেখিকা : নূর রাজপুত
অনুবাদ : শে'র এ লাফজ

#সালফাইটবাংলাঅনুবাদ #সালফাইট

Address


Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Mehrun Tabassum posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

  • Want your business to be the top-listed Media Company?

Share