08/03/2026
৭.
গত কয়েকদিন ধরে ওই মেয়েটি তাকে ক্রমাগত মেসেজ করছিল। হাশাম তার সাথে কথা বলতে চায়নি, কিন্তু মেয়েটির মিনতির কারণে আজ সে জবাব দিচ্ছে।
"জি, বলুন আমি আপনার কী সাহায্য করতে পারি?" শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করা হলো। ওদিকে মাহি খুশিতে অজ্ঞান হওয়ার জোগাড়। কতক্ষণ ধরে সে স্ক্রিনে তার পাঠানো বার্তার দিকে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। অন্যদিকে হাশাম বিরক্ত হয়ে জবাবের অপেক্ষা করছিল,মাহি মেসেজ দেখার পর যেন পুরোপুরি নিশ্চুপ হয়ে গেছে।"
"আমি আপনার সাথে বন্ধুত্ব করতে চাই" অনেকক্ষণ পর, কাঁপানো আঙুলে সে টাইপ করল।
"দুঃখিত মোহতারেমা, আমি নারীদের সাথে বন্ধুত্ব করি না।" মাহির চেহারার রঙ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
"কিন্তু কেন?" সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
"কারণ এটা আমার জন্য শোভনীয় নয়।"
মাহি দেখেছিল, হাশামের ফ্রেন্ড লিস্টে কোনো মেয়ে অ্যাড ছিল না।
"কিন্তু আমি আপনাকে চিনি, আপনার মনে থাকবে প্যারিসে আইফেল টাওয়ারের কাছে আমাদের দেখা হয়েছিল।" সে তাকে কিছু মনে করিয়ে দিতে চাইল।
"না, আমার কিছু মনে নেই এবং এখন আপনি আমাকে বিরক্ত করবেন না। খোদা হাফেজ..." কথাটি বলে তার উত্তর না শুনেই সে অফলাইন চলে গেল।
ওদিকে মাহি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বসে রইল।
সে তার কথা শোনাও পছন্দ করছে না, যার জন্য মাহি হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
---------------
সেদিন রোহান ক্লাসে দেরিতে এসেছিল। কালো রঙের আপার পরা, যার হুডি তার অর্ধেক চেহারা লুকিয়ে রেখেছিল, সে অনুমতি ছাড়াই ভেতরে এসে নিজের জায়গায় বসে পড়ল। বসার সাথে সাথেই সে প্রতিদিনের মতো জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। লেকচারের প্রতি তার কোনো মনোযোগই ছিল না। হানাম তাকে প্রথম দিন থেকেই কোনো ধনী বাবার বিগড়ে যাওয়া ছেলে বলে মনে করেছিল।
"আপনি লেকচারের দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন না কেন রোহান??" অতিষ্ঠ হয়ে সে তাকে জিজ্ঞেস করল। রোহান অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল। তার দৃষ্টিতে বরাবরের মতোই শীতলতা ছিল।
"কারণ আপনি ফর্মুলা ভুল লিখেছেন ম্যাম।" সে একটি বিদ্রূপাত্মক হাসি ছুঁড়ে দিয়ে বলল।
হানাম ঘাবড়ে গিয়ে বোর্ডের দিকে তাকাল, সত্যিই তার ফর্মুলা ভুল ছিল। পুরো ক্লাস তাকে মনোযোগ দিয়ে শুনছিল কিন্তু কেউ ধরতে পারেনি, আর সে— যে এক নজরও দেখেনি কীভাবে জানতে পারল?
"দুঃখিত" হানাম ফর্মুলাটি আবার লিখল।
"আচ্ছা ম্যাম, আপনার বয়স কত?" রোহানের দিক থেকে প্রথম প্রশ্ন এল।
"উনিশ বছর আর কয়েক মাস।" সে সত্য কথাটি বলে ফেলল।
"ম্যাট্রিক কবে করেছিলেন?" দ্বিতীয় প্রশ্ন হাজির।
"প্রায় চার বছর আগে" সে অবুঝের মতো জবাব দিচ্ছিল। হানাম অনুভব করল তার চোখে চুম্বকীয় আকর্ষণ আছে যা তাকে জবাব দিতে বাধ্য করছে।
"তাহলে আপনি মাস্টার্স কীভাবে করলেন?" তার প্রশ্নে হানাম ঘাবড়ে গেল। ম্যাম সামিয়ার বলা মিথ্যা তাকে বিপদে ফেলে দিয়েছে। পুরো ক্লাসে গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল।
"এখানে যাদের নিজেদেরই কিছু জানা নেই, তারা আমাদের পড়াবে?" তার কণ্ঠস্বর ছিল অবজ্ঞাপূর্ণ।
হানামের চেহারার রঙ চটে গেল। তার খুব খারাপ লাগছিল। সে মিথ্যা বলেনি কিন্তু দোষ তার ওপর এসেছে। সে পুরোপুরি প্রস্তুতি নিয়ে লেকচার তৈরি করে আসত। আজ কে জানে কীভাবে ফর্মুলা ভুল হয়ে গেল। আর আজই রোহান জাবিল, ওরফে আর.জে, তাকে ধরে ফেলল।
"এখান থেকে কাল শুরু করব।" সে ব্যাগ গুছিয়ে ক্লাস থেকে বেরিয়ে এল। ক্লাসের সময় এমনিতেও শেষ হয়ে গিয়েছিল, এক-দু মিনিট বাকি ছিল। সে বুঝতে পারেনি কখন তার চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে গেছে। সময় তাকে খুব সংবেদনশীল বানিয়ে দিয়েছে আর আর.জের কথা তার হৃদয়ে আঘাত করেছে। সে দ্রুত পায়ে গেটের দিকে যাচ্ছিল।
একটি অশ্রুবিন্দু তার চোখ থেকে গালে গড়িয়ে পড়ল যা সে হাতের তালু দিয়ে তাড়াতাড়ি মুছে ফেলল, যাতে কেউ দেখে না ফেলে।
এই রোহান জাবিলের কারণে উম্মে হানামের চোখে প্রথম জল এল। কে জানে নিয়তি সামনে কী লিখেছে...!!!
------------
সে তার কাপড় ব্যাগে রাখছিল, এমন সময় দরজায় টোকা পড়ল।
"আরে বি জান, আপনি ভেতরে আসুন, ওখানে কেন দাঁড়িয়ে আছেন?" হাশাম বি জানকে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সম্মানের সাথে তার দিকে এগিয়ে গেল। হাত ধরে বিছানায় এনে বসাল।
"প্রস্তুতি শেষ?" বি জান ভালোবাসার দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
"জি বি জান, মাত্র শেষ হয়েছে ।" সে হাসল।
"তুমি চলে গেলে ঘর আবার খালি হয়ে যাবে। মাদিহাও দুই-তিন মাস পর আসে আর রোহান তো আসে নিজের মর্জিতে। আমি তোমাদের চেহারা দেখার জন্য তৃষ্ণার্ত হয়ে থাকি।"
বি জান উদাস ছিলেন।
"আরে আপনি উদাস হবেন না আমার প্রিয় মা জান, আমি প্রতিদিন আপনাকে ফোন করব এবং আর.জে-কেও বলব যেন বাড়িতে তাড়াতাড়ি ঘুরে যেতে।সে গভীর মমতায় বি জানের হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিল। যখন বি জানের ওপর তার খুব মায়া হতো ,তখন সে তাঁকে মা জান বলে সম্বোধন করত।"
"আমার বাচ্চা, আমাকে সবচেয়ে বেশি চিন্তায় রাখে রোহান।তুমি তো খুব বুদ্ধিমান কিন্তু ওর সাথে জানি কী সমস্যা?"
"আপনি চিন্তিত হবেন না ও এখনও বাচ্চা, বিশ বছর বেশি বয়স নয় এবং আপনি জানেনও যে ও সবার মতো নয়, ওর সময় লাগবে সবকিছু বোঝার জন্য।" হাশাম সান্ত্বনা দিল।
"তুমি তো এমন ছিলে না হাশাম যখন তুমি বিশ বছরের ছিলে তখনও খুব বুদ্ধিমান ছিলে।"
"সেটা এজন্য যে আমি আপনার ছেলে।" সে মৃদু হাসল।
"রোহান আমার কাছে তোমার চেয়েও বেশি প্রিয় হাশাম, আমি মায়ের চেয়ে বেশি ভালোবাসা দিয়েছি ওকে, আমি জানি না কাল আমার শিক্ষা-দীক্ষা নিয়ে কেউ আঙুল তুলবে কি না।" বি জান চিন্তিত ছিলেন।
"আচ্ছা এখন আপনি চিন্তা করবেন না, জলদি খাবার দিন আমার খিদে লেগেছে। এখান থেকে লাহোর যাব, আপনার স্নেহের পাত্রের সাথে দেখা করার পরই প্যারিসের ফ্লাইট নেব।" সে প্রফুল্ল চিত্তে বলছিল।
"এখনই দিচ্ছি, তুমি আমাকে আগে কেন বলোনি যে খিদে লেগেছে?" বি জান তাকে ধমকের সুরে বকুনি দিয়ে উঠলেন, সে উল্টো মুচকি হাসল।
---------------
হানাম তার আচরণে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। সে একদিন ক্লাসে থাকলে দুদিন গায়েব থাকত। টেস্ট দিত না। মনোযোগ জানালার বাইরে থাকত। হানাম যত ভালোই পড়াক না কেন, সে কোনো না কোনো ভুল বের করত এবং এমন প্রশ্ন করত যে সে চাইলেও জবাব দিতে পারত না।
"আজও সে ক্লাসে দেরিতে এসেছিল। মোবাইলের রিংটোন বাজতেই স্ক্রিনের দিকে এক পলক তাকালো এবং সবার সামনেই নির্দ্বিধায় ফোনে কথা বলতে শুরু করল।"
হানামের এই মুহূর্তে তার ওপর ভীষণ রাগ এল। এক তো সে দেরি করে এসেছে, তার ওপর ক্লাসে ফোন ব্যবহার করছে যার অনুমতি ছিল না।
"ওকে আমি আসছি, শামু কাকা।" সে ফোন বন্ধ করে উঠল এবং না জিজ্ঞেস করেই দরজার দিকে পা বাড়াল।
"কোথায় যাচ্ছেন আপনি?" হানাম রাগে জিজ্ঞেস করল।
"ওহ, শাট আপ! তুমি আমাকে আটকানোর কে ?" সে তার দিকে না তাকিয়েই, আগুন ধরিয়ে দেওয়ার মতো ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল।
আর হানামের ধৈর্য শেষ হলো। পুরো ক্লাসের সামনে সে তার অপমান করছে। অথচ পুরো ক্লাস স্তব্ধ।
"আপনার আব্বাজানের নাম্বারটা একটু দিন তো।" সে নিজেই জানে না সে কী বলছে।
" O really ??"
সে অবাক হয়ে ঘুরল।
"জি আপনার কীর্তিকলাপ তাদের জানাতে হবে।" সে তাকে ধমকের সুরে বলছিল।
"লিখে নাও।" সে তাকে নাম্বার লিখিয়ে ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেল। ক্লাস শেষ হওয়ার পর হানাম সবার আগে রেজিস্টারে স্কোরকার্ড চেক করেছিল যাতে ওই নাম্বারটি লেখা ছিল। সে তার রাগ নিয়ন্ত্রণ করে নাম্বারটি ডায়াল করল।
-------------
হাশাম আর.জের সাথে বসে ছিল যখন তার মোবাইলে অজানা নাম্বার থেকে ফোন এল। সে কল রিসিভ করার পর ফোন কানে দিল।
"আপনি রোহান জাবিলের বাড়ি থেকে কথা বলছেন??"
ওপাশ থেকে কোনো এক মেয়ের গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
"জি... কিন্তু আপনি...?" সে এতটুকুই বলতে পারল।
"আমি ওর কলেজ থেকে মিস উম্মে হানাম কথা বলছি।"আপনার ছেলের ব্যাপারে, আপনার সাথে আমার অত্যন্ত জরুরি কিছু কথা আছে।আপনি দয়া করে কাল কলেজে আসবেন।"
একটি শব্দ চিবিয়ে চিবিয়ে বলায় হাশাম জাবিলের মুখে হাসি ছড়িয়ে পড়ল। "আচ্ছা আপনি..."
"টু... টু..." সে কিছু জবাব দেওয়ার আগেই ফোন কেটে গেল।
হাশাম শীতল দৃষ্টিতে রোহানের দিকে তাকাল।
"কী হলো?" নিজের দিকে তাকাতে দেখে রোহান জিজ্ঞেস করল।
"কী করেছ তুমি কলেজে মিস্টার আর.জে?" হাশাম ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল। "কী?" সে নির্দোষ সেজে বলল।
হাশাম অবাক হলো। অনেকদিন পর তার কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে তার নামে অভিযোগ এসেছে। শুরুতে স্কুলের দিক থেকে শিক্ষকদের ফোন আসত। তারপর যেমনই সবাই জেনে গেল, আর কেউ ফোন করেনি।
এখন এটা অনেক বছর পর এমন হলো।
"তোমার কোনো শিক্ষকের কল ছিল, বলছিল আপনার ছেলের ব্যাপারে জরুরি কথা আছে ।" অনিচ্ছা সত্ত্বেও হাসি তার ঠোঁট ছুঁয়ে গেল।
"ওহ, বিশ্বাস হয় না সে এত বোকা।" রোহান আফসোসের সুরে মাথা নাড়াল।
"বলো তুমি কী অঘটন ঘটিয়েছ?"
"এটা তুমি তাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করবে যে ফোন করেছে। আমি তো তাকে দেখে নেব..." শেষ বাক্যটি সে নিচু স্বরে বলল।
"চলো ঠিক আছে তাহলে কাল কথা হবে এই বিষয়ে... প্যারিস যাওয়ার আগে আমি তোমার ওই শিক্ষকের সাথে দেখা করতে চাই যে আর.জের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার সাহস দেখিয়েছে ।" অথচ তার কথায় রোহানের চেহারার অভিব্যক্তি শক্ত হয়ে গেল।
"আমি তোমাকে ছাড়ব না মিস উম্মে হানাম।" সে কল্পনায় তার সাথে কথা বলছিল অথচ হাশামের গভীর দৃষ্টি এটা জানার জন্য উন্মুখ ছিল যে এর মাথায় এই মুহূর্তে কী চলছে।
উপন্যাস : সালফাইট
লেখিকা : নূর রাজপুত
অনুবাদ : শে'র এ লাফজ
#সালফাইটবাংলাঅনুবাদ #সালফাইট