28/09/2025
এই সেই গর্ত।
এই সেই গর্ত যেখানে রাষ্ট্র আমাদের এক জায়গায় আনতে চেয়েছিল। গর্তটার নাম "তুমি আমার বিপদে দূরে সরে যাবে, আমি তোমারটায়"।
সময়টা অক্টোবর, ২০০৫। Cabinet Committee of Economic Affairs (CCEA) অনুমতি দিলেন PPP (Public-Private Partnership) মডেলের। যদিও শিক্ষাক্ষেত্রে এটার আইনী অধিকার এখনও প্রতিষ্ঠিত নয়, তবে এই বিরাট ক্ষেত্রকে কোন corporate sector ই ছেড়ে দেবে। ফলে শুরু হল সরকারের উপর corporate sector এর সেই অমোঘ আদেশ -"হঠাও, নতুন নিয়োগ বন্ধ কর, ছাঁটাই কর, তুলে দাও, কমিয়ে আন"।
আমাদের বুঝে নিতে হবে
১. শিক্ষাক্ষেত্র সরকারের কাছে বর্তমানে একটি তাৎক্ষনিকভাবে লাভজনক ক্ষেত্র নয় (বিলম্বিত ক্ষেত্রে এটা অবশ্যই লাভজনক , তবে মানবসম্পদ সৃষ্টি ও তার ব্যবহারের কথা ওঁনাদেরকে না বোঝানোই ভালো, ওগুলো বোঝার জন্য ওঁরা রাজনীতির জগতে পা রাখেননি)।
২. এই ক্ষেত্র থেকে তোলাবাজির সুযোগ প্রায় শুন্যের দিকে। বেসরকারি স্কুল খুললে সেখান থেকে রোজগারের কত রাস্তা!
৩. বিনামূল্যে বই, খাবার, জুতো, ব্যাগ এসব দিয়ে নিজেদের পকেটে আর কতটুকু থাকে? এখান থেকে তোলা? সে আর ক পয়সা? সর্বোপরি
৪. শিক্ষক/শিক্ষিকাদের বেতন বাবদ এই বিপুল পরিমাণ অর্থ।
ফলত উদ্যোগ নাও দুর্নীতি করে নিয়োগ করে মামলা- মোকদ্দমার মধ্যে তাকে ঢুকিয়ে দেবার। বছরের পর বছর গড়িয়ে যাবে। আমরা ভাবব আমার কী? গেছে তো ওদের। অর্থাৎ গর্তের মধ্যে প্রবেশ করলাম কিছুজন।
এরপর ধাপে ধাপে সবাই এগোলাম ওই গর্তের দিকে।
বিপদ যে "শিক্ষাব্যবস্থাকে গুটিয়ে আনার মাধ্যমে" সেটা না বুঝে বুঝলাম তোমার সমস্যা তোমার, আমারটা আমার। ফল? আজকের এই পরিস্থিতি। এর পরে অন্য ক্ষেত্রগুলোও আসবে (এর আগে ব্যাঙ্ক এবং রেলের কথা ভাবুন)।
কিছু জনকে অন্যদের থেকে পৃথক করার পদ্ধতিগুলো এক নয়। কারন সবাইকে একসাথে বের করলে সেই বিক্ষোভ রাষ্ট্র সামলাতে পারবে না। সুতরাং আগে এল নিয়োগে দুর্নীতি করে কিছু স্বচ্ছভাবে চাকরি পাওয়াদের হটিয়ে দাও, তারপর এল মামলা চলছে, তাই নিয়োগ করতে পারছি না, অর্থাৎ নতুনদের আটকে দাও, TET দিয়েছেন পাশ করে নিযুক্তও হয়েছেন, কিন্তু হাতে সার্টিফিকেট নেই, এল কম ছাত্র/ছাত্রী বিশিষ্ট বিদ্যালয়গুলিকে তুলে দেবগর নিদান, এল একটি শিক্ষককে দিয়েই বিদ্যালয় চালিয়ে তার মুখ দিয়ছ রক্ত বের করছ দেবার উদ্যোগ, আপাতত সর্বশেষ সংযোজন আইন পরিবর্তন করে যত শিক্ষক/শিক্ষিকা আছেন সবাইকেই TET এ বসাও। একসাথে একটি নিয়মে সবাইকে বের করে দিলে তাদের মধ্যে ঐক্য গড়ে উঠবে যে! কে না জানে রাষ্ট্র সবথেকে বেশি ভয় পায় শোষিত জনগনের ঐক্যকে !
দোসর হিসেবে এল মিডিয়া। কোন শিক্ষক/শিক্ষিকা কীভাবে নিযুক্ত হয়েছেন তার চুলচেরা বিশ্লেষণে অভিভাবককুল ভাবতে বসলেন কাদের কাছে আমরা সন্তানদের পাঠাচ্ছি? খুব একটা দোষ দেওয়াও যায় না। নিজেদের দায় অস্বীকার করাও যায় কী? অভিভাবকদের কাছে, সমাজের কাছে শিক্ষক/শিক্ষিকারা হয়ে গেলেন শ্রেণীশত্রু।
প্রত্যেককে পরস্পরের বিরোধী কর। তারপর ফেল একটাই গর্তে। এই রাজনৈতিক চালের (এটা চিরকালীনও বটে) মুখে আমরা কোন সালের ব্যাচ, কোন স্তরের শিক্ষক/শিক্ষিকা সেটা বিবেচনার মধ্যে যত আনব তত গর্তটার দিকে এগোব। আমাদের পেশা গুরুত্বপূর্ণ না কী স্তরের শিক্ষক/শিক্ষিকা সেটা বিবেচ্য ? কি করব সেটা আমাদেরকেই ঠিক করতে হবে।
মনে রাখবেন গনতন্ত্রের "তন্ত্র"টা যতই প্যাঁচাল হোক শেষ পর্যন্ত সেটা নিয়ন্ত্রন করে "গন"ই।
পুড়ছে সবকিছুই। এই পোড়া গন্ধ বাতাসে মিশে পৌঁছাচ্ছে অন্য সরকারি ক্ষেত্রগুলিতেও। আমরা কী সেটা দেখতে দেখতে সবকিছু শ্মশান না হয়ে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করব না কী মাঠে নামব? সবাই একসাথে নামব নাকি একা লড়ে দেওয়ালে পিঠটা ঠেকিয়ে ফেলব। খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে, এবং সেটা নিতে হবে আপনাকেই।
✍️(সংগ্রহ করা)