22/07/2025
পথের আলো
নিমগ্নপুর—a ছোট্ট, সবুজে ঘেরা এক গ্রাম। চারদিকে ধানক্ষেত, মাটির রাস্তা, আর নিস্তব্ধ দুপুরবেলার কোকিলের ডাক। সেই গ্রামে বাস করে ষোলো বছরের রুশনী। রুশনী একটু অন্যরকম। সবার মত শুধু রান্না-বান্না বা গরু-ছাগল চরাতেই তার মন বসে না। বইয়ের পাতায় চোখ রাখলেই তার মুখে আলো ফুটে ওঠে।
তার বাবা, হরিদাস মিস্ত্রি, গ্রামের একমাত্র ছুতার মিস্ত্রি। মা বাসন্তী বেগম গৃহিণী। তাদের সংসার খুব সাদাসিধে, কিন্তু ভালোবাসায় পূর্ণ।
রুশনী স্কুলে যায় প্রতিদিন, হেঁটে প্রায় তিন কিলোমিটার পথ পেরিয়ে। সাদা স্কুল ড্রেস, মাথায় বিনুনি করা চুল আর হাতে গাট্টাগোট্টা বইয়ের ব্যাগ নিয়ে সে যখন স্কুলে যায়, তখন গ্রামের লোকেরা তাকিয়ে বলে,
— “এই মাইয়াটা একদিন অনেক দূর যাইবো...”
রুশনীর স্বপ্ন ছিল—ডাক্তার হবে। কারণ, তার ছোট ভাইটা একবার খুব অসুস্থ হয়েছিল, আর গ্রামে ডাক্তার ছিল না। সেই ভয়াবহ রাত তার মনে গেঁথে আছে। তার ছোট ভাই সেরে উঠলেও, রুশনী নিজের ভেতর একটা দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিয়েছিল—
"আমি ডাক্তার হবো, আমি আমার গ্রামকে সেবা করবো।"
কিন্তু সব স্বপ্ন সহজে পূর্ণ হয় না।
একদিন রুশনীর বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে। ডাক্তার বলল, হার্টের সমস্যা। শহরে নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু টাকা নেই। বাড়ির গরু বিক্রি করে কোনোভাবে চিকিৎসা করানো হলো, কিন্তু বাবার কাজ বন্ধ হয়ে গেল।
এদিকে মাধ্যমিক পরীক্ষা সামনে। রুশনীর স্কুল যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। মা বলে,
— “তুই থাক ঘরে, ভাইটারে দেখ, আমি ক্ষেতে কাম করি...”
রুশনী রাতে চুপিচুপি পড়াশোনা চালিয়ে যায়। হারিকেনের আলোয়, ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দে, তার চোখে ঘুম না আসা অনেক রাত।
সে ফরম ফিলাপের টাকাও জোগাড় করতে পারে না। কিন্তু হাল ছাড়ে না। একদিন গ্রামের প্রধান, রহিম চাচা, জানতে পেরে তার পরীক্ষা ফি দিয়ে দেয়।
রুশনী পরীক্ষায় বোর্ডে মেধা তালিকায় আসে। পত্রিকায় নাম ছাপে—"নিমগ্নপুরের রুশনী, অসাধারণ ফলাফলের গল্প"।
এরপর অনেক কষ্টে, বৃত্তি নিয়ে শহরে কলেজে ভর্তি হয়। প্রথমবার শহরে গিয়ে ভয় পায়, কিন্তু ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে যায়।
চার বছর পর, আজ রুশনী একজন ডাক্তার। সে শহরে থাকতেও পারত, কিন্তু ফিরে এসেছে তার নিজ গ্রামের ক্লিনিকে। লোকজন বলে,
— “আমাদের রুশনী এখন গ্রামের আলো, আমাদের মেয়েটা আমাদেরই রত্ন।”
রুশনী এখন শুধু ডাক্তার নয়, অনেক মেয়ের অনুপ্রেরণা। সে সপ্তাহে একদিন মেয়েদের পড়ায়, তাদের স্বপ্ন দেখতে শেখায়।
শেষ কথা
রুশনীর গল্প শুধু এক মেয়ের নয়—এটি হাজারো গ্রামের মেয়েদের গল্প, যারা স্বপ্ন দেখে, লড়াই করে, আর আলো হয়ে উঠে।