09/04/2025
অন্ধকারের আর্তনাদ
গ্রামের নাম শ্যামপুর। বর্ষার শেষ, চারদিকে থমথমে অন্ধকার। বিদ্যুৎ নেই, শুধু ঝিঁঝি পোকার একটানা ডাক আর ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ। রহমত আলী, বৃদ্ধ কৃষক, দাওয়ায় বসে তামাক টানছিলেন। রাত গভীর, বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে।
হঠাৎ, দূরে একটা করুণ yআর্তনাদ ভেসে এলো। বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠলো রহমত আলীর। এমন কান্না তিনি আগে কখনো শোনেননি – যেন কোনো পশুর নয়, আবার মানুষেরও নয়। কেমন যেন গলায় আটকে আসা গোঙানির মতো।
তিনি কান খাড়া করে রইলেন। কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর আবার সেই আর্তনাদ, তবে এবার যেন আরও কাছে। রহমত আলীর সারা শরীর হিম হয়ে এলো। পুরনো দিনের কথা মনে পড়লো – গ্রামের elders রা বলতেন, অমাবস্যার রাতে নাকি বনবিবি রুষ্ট হলে এমন আওয়াজ বের হয়। কেউ যেন একা বাইরে না বের হয়।
সাহস করে রহমত আলী লাঠিটা হাতে নিলেন। উঠোনে নেমে চারদিকে তাকালেন। কিছুই দেখা যাচ্ছে না, নিকষ কালো অন্ধকার। শুধু বাঁশঝাড়ের পাতাগুলো বাতাসে তিরতির করে কাঁপছে।
আবার সেই আর্তনাদ। এবার মনে হলো যেন বাড়ির পেছনের পুকুর পাড় থেকে আসছে। রহমত আলীর পায়ের পাতা ঠান্ডা হয়ে গেল। পুকুর পাড়ে তো কারো যাওয়ার কথা না। ছোট খোকাটাকেও আজ কেমন যেন অন্যমনস্ক লাগছিল।
ধীরে ধীরে, টলতে টলতে রহমত আলী পুকুর পাড়ের দিকে এগোলেন। বুকের ভেতর ধুকপুক করছে। হাতে ধরা লাঠিটা ঘামাচি ধরা হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরেছেন।
পুকুর পাড়ে পৌঁছে তিনি থমকে দাঁড়ালেন। আবছা অন্ধকারে পুকুরের কালো জল চিকচিক করছে। আর জলের ঠিক মাঝখানে...
রহমত আলীর চোখ বিস্ফারিত হলো। যা দেখলেন, তা কোনো দুঃস্বপ্নেও দেখা যায় না। জলের উপর, একটি অস্পষ্ট, লম্বাটে ছায়া ভাসছে। তার শরীর থেকে দুর্বল আলো ঠিকরে বের হচ্ছে, আর সেই আলোয় দেখা যাচ্ছে বীভৎস এক মুখ – লম্বাটে, চোখগুলো কোটর থেকে ঠেলে বেরিয়ে আসা, আর মুখের দুপাশে ধারালো দাঁতের সারি।
আর সেই ছায়া থেকেই ভেসে আসছে সেই করুণ, বুকফাটা আর্তনাদ।
রহমত আলীর হাত থেকে লাঠি পড়ে গেল। তিনি পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন, কথা বলার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছেন। তার মনে হলো, বনবিবি নয়, এ যেন আরও ভয়ংকর কিছু – কোনো অভিশাপ, কোনো পিশাচ।
ছায়াটা ধীরে ধীরে জলের নিচে ডুবতে শুরু করলো। আর্তনাদটা ক্ষীণ হয়ে মিলিয়ে গেল অন্ধকারের সাথে।
রহমত আলী বহুক্ষণ পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর, কোনোমতে টলতে টলতে ঘরে ফিরে দরজা বন্ধ করে দিলেন। সারা রাত তিনি ঘুমাতে পারলেন না। শুধু সেই বীভৎস মুখ আর কান্নার আওয়াজ তার মনে ঘুরতে লাগলো।
সকাল হলো। গ্রামের মানুষজন পুকুর পাড়ে ভিড় করলো। রাতে রহমত আলী যা দেখেছিলেন, তা তিনি কাউকে বলতে সাহস পাননি। শুধু তার চোখের আতঙ্ক আর ফ্যাকাসে মুখ দেখেই সবাই বুঝতে পারছিল, রাতে নিশ্চয়ই কিছু ভয়ংকর ঘটেছিল।
পুকুরের জল শান্ত। রোদের আলোয় চারদিক ঝলমল করছে। কিন্তু রহমত আলীর মনে সেই রাতের অন্ধকারের আর্তনাদ আজও প্রতিধ্বনিত হয়। তিনি জানেন, শ্যামপুরের পুকুরে আজও কিছু ভয়ংকর লুকিয়ে আছে, যা রাতের অন্ধকারে আবার জেগে উঠবে।
Copied