23/03/2024
আর্যভট্টের জ্যোতির্বিজ্ঞানে অবদান:
আমাদের এই মলয়া শীতল চিরচেনা পৃথিবী যে গোলক, এই জিনিস সর্বপ্রথম আবিষ্কার করেছিলেন আর্যভট্ট। পৃথিবী নিজ অক্ষের উপর সদা আবর্তনশীল, কীভাবে দিন ও রাত হয়, চাঁদের নিজস্ব আলো নেই, কিংবা গ্রহণের পরিপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা এসেছিল আর্যভট্ট থেকেই। প্রতি বছর নিরক্ষবৃত্তকে উত্তর-দক্ষিণ মুখে পরিভ্রমণকালে সূর্য প্রতি ছয় মাস অন্তর দুটি চরম বিন্দু অতিক্রম করে। আর্যভট্ট এই দুই বিন্দুকে ‘অয়নাস্ত’ ও ‘হরিপদী বিন্দু’ বলে অভিহিত করেন। এই দুই বিন্দুতে সূর্যের গতির একটি নির্দিষ্ট দোলনকাল রয়েছে- এটাও জ্যোতির্বিজ্ঞানী আর্যভট্ট থেকে প্রাপ্ত তথ্য।
তিনি আরও খেয়াল করেন, এই দুই বিন্দুতেই মূলত রাত এবং দিনের দৈর্ঘ্য সমান। আজকের দিনে যা, ২১শে মার্চ এবং ২৩শে সেপ্টেম্বর। জ্যোতির্বিজ্ঞানে ‘এপিসাইকেল’ শব্দটি উৎপ্রোতভাবে জড়িত। গ্রীক জ্যোতির্বিজ্ঞানী টলেমি এই এপিসাইকেল থিওরি নিয়ে নাড়াচাড়া করে গ্রহের গতিবিধিকে আয়ত্তে আনার চেষ্টা চালিয়েছিলেন। আর্যভট্টও ঘাঁটাঘাঁটি করেছেন এপিসাইকেল নিয়ে। তিনি গ্রহের গতিবিধি নিরীক্ষণে টলেমীর তুলনায় এপিসাইকেল নিয়ে আরও পরিষ্কার ও যুক্তিনির্ভর বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব প্রদান করেছিলেন। গ্রহের আকার ও অবস্থান গণনার জন্য তিনি জ্যামিতি ও গণিতের বহু নতুন তত্ত্ব আবিষ্কার করেছেন।
কোপারনিকাসের এক হাজার বছর আগেই তিনি সৌরজগতের সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্ব আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন। গ্রহণের কারণ হিসেবে চন্দ্র ও পৃথিবীর ছায়ার কথা উল্লেখ করেন তিনি। সনাতনী জ্যোতিষ শাস্ত্রে আর্যভট্ট ‘ঔদয়িক’ ও ‘আর্ধরাত্রিক’ নামে দুটি বিকল্প গণনা পদ্ধতির প্রবর্তক। আর্যভট্টের দেওয়া জ্যোতিষীয় মতবাদ সামসময়িক জ্যোতির্বিদগণের মধ্যে গভীর ছাপ ফেলতে সক্ষম হয়েছিল। তিনি হিসেব কষে পৃথিবীর আক্ষিক গতি বের করেছিলেন। তার প্রাপ্ত হিসেবমতে, পৃথিবীর পরিধি ছিল ৩৯,৯৬৮ কিলোমিটার। সেটা সে আমলের যেকোনো পরিমাপের চেয়ে সবচেয়ে শুদ্ধ তো ছিল বটেই, বরং আজকের হিসেবের সাথেও এর ফারাক মাত্র ০.২%।
৪৫৫ খ্রিষ্টাব্দে ধরণী থেকে চিরবিদায় নেন প্রাচীন জ্যোতির্বিজ্ঞানের এই শ্রেষ্ঠপুরুষ। পৃথিবী হারায় একজন মেধাবী মানুষের পদচারণা। প্রাচীন ভারতের শ্রেষ্ঠ এই জ্যোতির্বিজ্ঞানীকে শ্রদ্ধার্ঘ্য জানাতে ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দের ১৯শে এপ্রিল উৎক্ষেপিত হওয়া ভারতের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ নাম রাখা হয় ‘আর্যভট্ট’।
আর্যভট্টের শিষ্যদের মধ্যে লাটদেব, ভাস্কর, ও লগ্ন পৃথিবীতে খ্যাতিমান হতে পেরেছেন। বেদোত্তর ভারতবর্ষ জ্ঞানী-বিজ্ঞানীদের কদর করেছে যথার্থভাবে। প্রচলিত চিন্তা-চেতনার পরিবর্তে কেউ নতুন কোনো যুক্তি ও গবেষণালব্ধ ফলাফল দিয়ে কুসংস্কারের বিপক্ষে দাঁড়ালে, তা গ্রহণ করা হয়েছে সাদরে। সেজন্য, এই পৃথিবী পেয়েছে আর্যভট্ট, ব্রহ্মগুপ্ত, ভাস্করাচার্য, কণাদ, কিংবা সুশ্রুতের মতো অগ্রদূতদের। যারা প্রাচীনকালেই তাদের জ্ঞান মহিমায় পৃথিবীকে এগিয়ে নিয়ে গেছে যোজন যোজন ক্রোশ অগ্রে।