11/12/2012
প্রজাপতির চোখে সাদা পতাকা
-পূণ্য আবির
নাটক সিনেমায় নায়ক নায়িকার ভ্রমণ দৃশ্যে সঙগীর কাঁধে সঙ্গিনীর মাথা এলিয়ে ঘুমিয়ে যাওয়া এবং নায়িকার ঘুমন্ত নিষ্পাপ মুখের দিকে নায়কের অপলক তাকিয়ে থাকার যে ব্যাপারটা দেখানো হয় সেটা বানোয়াট বলে প্রমাণিত হল। রেওয়াজ অনুযায়ী প্রজাপতির এতক্ষণে আমার কাধকে শিমুল তুলার বালিশ ভেবে ঘুমিয়ে পড়ার কথা, তা না করে সে গত ছয়ঘন্টা ধরে বকবক করেই যাচ্ছে এবং আমার ধারণা এইভাবে আর কিছুক্ষণ চলতে থাকলে আশপাশের মানুষের কানের পরদা ফটাস করে ফেটে যেতে পারে। অবশ্য অন্য কারো জন্য প্রজাপতির বকবকানি অসহ্য হবার কথা না, ছেলেদের জন্য যেটা অহেতুক শোরগোল মেয়েদর ক্ষেত্রে সেটাই তারুণ্যসুলভ উচ্ছাসের সামান্য নমুনা হিসেবেই বিবেচিত হয়।
পাশের রোতে বসা এক বয়স্ক ভদ্রলোক মাঝে মাঝে আমাদের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছিলেন, ভদ্রলোকের পিছনে বসা ছেলেদুটার আবার ভদ্রতার বালাই নেই, তারা হা করে প্রজাপতির কথা গিলছে। আমি মনে মনে তাদের সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, "দিল্লিকা লাড্ডু বস, ভুলেও খেয়োনা যেন, তার চেয়ে না খেয়ে পস্তানো ঢের ভাল।
প্রজাপতি যে শুধু কাধে ঘুমিয়ে পড়ার নিয়ম ভেঙেছে তাই নয় সে নারী সমাজের চিরাচরিত নিয়ম ভেঙে আমাকে জানালার পাশের সিটে বসিয়ে নিজে বসেছে করিডোরের দিকটায়,
জানালার পাশে বসলে চুল উড়তে থাকে তো, তাই এই ব্যাবস্থা।আমার জন্য বেশ ভালই হল, আমার আবার জানালার পাশে না বসলে অস্বস্তি লাগে।
বাস ব্রেক করায় সামনের দিকে ঝুকে পড়তে হল, প্রজাপতিকে দেখলাম ভারি ব্যাকপ্যাকটা টেনেটুনে নামিয়ে ফেলল, গায়ে জোর আছে বটে, সেরেনা উইলিয়ামসের শিষ্য না তো ।
দম্পতিরা সাধারণত হানিমুন করতে কক্সবাজার টাজার যায় বলেই জানি,আর আমরা এসেছি শেরপুর, গজনীতে,একটা রেস্টহাউস আছে এখানে ঐটাতেই থাকব ।মূলত
প্রজাপতির আগ্রহেই আসা। স্ত্রীর আগ্রহে সাড়া দেয়া স্বামীর অবশ্য কর্তব্য মনে করে আমিও আপত্তি করি নি। তবে বিকালে ঘুরতে বেরিয়ে জায়গাটা আমার বেশ পছন্দ হয়ে গেল, চারদিকে প্রচুর সবুজ, চাইলেই সামনের গারো পাহাড় থেকে ঘুরে আসা যায়। কিংবা প্যাডেল বোট ভাড়া করে লেকেও ভেসে বেরানো ও যেতে পারে। এখানে দুইদিন থাকব ভাবতেই ভাল লাগছে। সমস্যা একটাই, প্রজাপতি। আমার অপছেন্দ্র কাজগুলোর প্রত্যেকটাই সে বেশ আনন্দ নিয়ে করতে পছন্দ করে।
আমার পানিভীতি আছে, সাঁতার জানি না তাই লেকটাকে পাশ কাটিয়ে পাহাড়ে উঠতে যাচ্ছিলাম, পেছন থেকে প্রজাপতি হাত খামচে ধরে বলল,
-আরে আরে যাচ্ছ কোথায়? নৌকায় উঠব তো.
আমি যতদূর সম্ভব চোখ উপরে তুলে ফেললাম,
-মাথা খারাপ, আমার পানিভীতি আছে সাঁতার জানি না
খুশিতে প্রজাপ্তি দাত কেলিয়ে হাসল। সম্ভবত স্বামীর এই দূরবলতায় সে যারপরনাই আনন্দিত, আমাকে অভয় দিয়ে বলল,
-কোন সমস্যা নেই আমি সাঁতার জানি ডুবে গেলে টেনে তুলতে পারব
এমন গূণবতী স্ত্রীর অনুরোধ এড়ানো মুশকিল, তাই কিছুক্ষণ গাইগুই করে আমি রাজি হয়ে গেলাম আর নিজেকে লেকের মাঝখানে আবিষ্কার করতে আমার দশ মিনিটের বেশি লাগল না।
স্বভাবজাত নারীসুলভ ভঙ্গিতে প্রজাপতি লেকের পানি নাড়াচাড়া করছে, আঁজলা ভরে পানি তোলা আর ছেড়ে দেয়ার ছেলেমানুষি খেলা। চোখে চোখ পড়তেই মুখ টিপে হাসল। আশ্চর্য! সানাই আর প্রজাপতির মুখ টিপে হাসার ভঙ্গিটা বেশ কাছাকাছি। বেশ কিছুক্ষণ কোন কথা বলছিলাম না বলেই হয়ত প্রজাপতি ওড়নায় হাত মুছে ফেলে আমার হাত ধরল,
-কি ব্যাপার মুড অফ নাকি?
আমি জবাবদিহিতার কোন কারন খুজে পেলাম না, নিজের ভেতর সেই পুরনো রাগটা টের পাচ্ছিলাম ক্রমশ, সেই পুরনো রাগ আর অভিমান সানাইয়ের বিয়ে ঠিক হয়ে যাবার পর থেকে যেটা আমার সঙ্গী হয়েছিল,আজ আবার অনেকদিন পর মাথাচাড়া দেয়ার চেষ্টা করছে। প্রজাপতি আমার দিকে ঝুকে এসে বলল,
-আরে হয়েছে কি? আমাকে বলা যাবে না? আমাকে বল
আমি বিরক্ত হয়ে বললাম
-সবই তোমাকে বলতে হবে কেন? আর শুনতেও তোমার ভাল লাগবে না
-কি এমন ঘটনা যে নিজের স্ত্রী কেও বলা যাবে না?
আমার মাথায় রক্ত উঠে গেল,
-আরে আজব, দুইদিন আগে বিয়ে হয়েছে বলে কি সব কথা বলতে হবে? আর এতই যখন ইচ্ছা তখন শোন, সানাই নামে একটা মেয়েকে আমি ভালবাসতাম, চার মাস আগে তার বিয়ে হয়ে গেছে আর এখন তাকে আমি মিস করছি, শুনলে তো এখন শান্তি লাগছে?
আমার গলা নিশ্চই খুব উঁচু হয়ে গিয়েছিল, আশপাশের নৌকা থেকে মানুষজন আমাদের দেখছে, প্রজাপতিও হা করে আমার কথা শুনছিল নিজেকে সামলে নিয়ে অনুনয়ের সুরে বলল,
-সিনক্রিয়েট করো না প্লিজ, ও টা তো অতীত, সানাইয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, তাকে ফিরে তো আর পাচ্ছো না, আর না পেলেই বা কি? আমরা তো আছিই, আমরা তো একসাথে ভাল থাকার চেষ্টা করতে পারি
আমি চুপ থেকে রাগ সামাল দিতে চেষ্টা করছি, কোথায় যেন পড়েছিলাম দাড়ানো অবস্থায় রাগ উঠলে বসে পড়তে হয় সে হিসেবে আমার শুয়ে পড়া উচিত কারন নৌকায় বসেছিলাম, কিন্তু নৌকায় শোয়ার জায়গা নেই।তাই রাগটা কমল না মনে হয়, বললাম,
-আর আমি তোমাকে ভাল থাকতে দিব কেন? আমাকে তো সানাই ভাল থাকতে দেয়নি, আমার ভাল থাকা নিয়ে তো সানাই মাথা ঘামায়নি
প্রজাপতি চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে,তার চোখেমুখে অবিশ্বাস, তার উচ্ছাস আর সরলতা দিয়ে হয়ত সে বিশ্ব জয় করতে পারে কিন্তু আজকের দিনটা আমার দিন আজকে আমিই জিতব, মেয়েটা কাঁদবে কিনা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না কাঁদলে কাঁদুক আমার কি? পৃথিবীর হৃদয়হীন মানুষদের তালিকায় আর ও একটা নাম যোগ হলে তাতে আমার আর কিছু আসে যায় না।
মশারি আমার অসহ্য লাগে তাই মশারি না টানিয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, মশার কামড়ে ঘুম ভাঙতেই পাশে তাকিয়ে প্রজাপতিকে পেলাম না। বিছানায় শুয়েই এদিক সেদিক তাকিয়ে তাকে বারান্দায় পাওয়া গেল। রুমের জানালা দিয়ে বারান্দার কিছুটা দেখা যায়। প্রজাপতির থুতনি হাতের তালুতে ভর দেয়া আর কপালটা ঠেকানো বারান্দার গ্রিলে, মাঝে মাঝে মুছে নিচ্ছে চোখের নিচটা, কাঁদছে নিশ্চয়ই।
বারান্দায় গিয়ে দাড়াতেই প্রজাপতি স্বাভাবিক গলায় বলল,
-মশার কামড়ে ঘুম ভাঙল? ভালই হয়েছে বারান্দায় একা একা ভয় লাগছিল
বারান্দায় আর কোন চেয়ার ছিল না, আমি পাশেই দাড়িয়ে রইলাম চারদিক একেবারেই চুপচাপ, একটু দূরেই গারোদের ঘরের আলো দেখা যাচ্ছে। ইতস্তত স্বরে বললাম,
-সন্ধির সাদা পতাকা নিয়ে আসলাম
-কই দেখি, বলে আমার দিকে তাকাতেই প্রজাপতির ডান চোখের ঠিক নিচে পাপড়ির সাথে একটা গোটামতন দেখা গেল, অন্জনি না এনজেইল্লা কি যেন বলে এগুলোকে। আমি "দেখাচ্ছি "বলে ঝুকে এলাম প্রজাপতির কাছাকাছি, আমার গন্তব্য ঠিক তার ডান চোখের নিচে, পাপড়ির কাছাকাছি । প্রজাপতি চোখ বন্ধ করে অপেক্ষা করছে ।
আমিই প্রথম কথা বললাম,
-তোমার চোখের জল বেশ নোনতা
-সুনীল হতে চাও নাকি?
-হলে তুমি বরূণা হবে?
প্রজাপতি কপট তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
-জীবনে কবিতাতো মনে হয় একটাই পড়েছো, বরূনা যে কথা রাখে নি, এটাই মনে নাই তোমার?
প্রজাপতির হাসি আর কান্না মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। কারেন্ট চলে গেছে কিছুক্ষণ আগে, আর শীতকালে জেনারেটর রাত এগারোটার পর বন্ধ থাকায় চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার, গারোপাড়ায় কেউ একজন গান ধরেছে, অচেনা ভাষায় বেসুরো সেই গান, কিন্তু বেশ দরদ দিয়ে গাইবার চেষ্টা করছে সে।
বারান্দার গ্রিল দিয়ে দুই হাত গলিয়ে প্রজাপতি বলল,
-ভালবাসার ফুল ধরতে চাও, তো এসো
আমিও প্রজাপতির দেখাদেখি গ্রিলের ওপাশটায় হাত গলিয়ে দিলাম
-কই?
-আরে আছে, একটু ধৈর্য ধরো , অন্ধকারে তো একটু হাতড়ালেই পেয়ে যাবে
প্রজাপতি দুলে দুলে হাসতে লাগল, মোজার্টএর সুর আমি শুনিনি কিন্তু সেটা কি এর চাইতেও আনন্দময়? হতেই পারে না। আমি বললাম,
-পাচ্ছিনা তো, তুমি কিছু পেলে?
প্রজাপতি আমার হাত ধরে বলল,
-এইতো পেয়ে গেছি, তুমি?
আমি প্রজাপতির হাত আরো শক্ত করে চেপে ধরলাম,কিছু বললাম না, যার বোঝার সে কিছু না বললেও বুঝে যাবে।
ওদিকে গারো পাড়ার সেই গানপাগল মানুষটা গেয়েই যাচ্ছে, সে ভালবাসার ফুল খুঁজে পেয়েছে কিনা কে জানে ।