04/04/2026
আমি বুঝে নিলাম, আমার মা "ধন্যবাদ" বলতে জানে না।
আহারে! ভাই-বোনের সেই অকৃত্রিম ভালোবাসা, আর মা-বাবার সেই শাসন মাখা দিনগুলো! তখন মনে হতো—কবে বড় হবো? কবে নিজের পায়ে দাঁড়াবো?
আর আজ সাফল্যের শিখরে দাঁড়িয়ে কেবল একটাই দীর্ঘশ্বাস—কেন বড় হলাম!
আমার মায়ের বড় আফসোস, আমরা বড় হওয়ার পর তিনি আর তাঁর সব সন্তানকে একসাথে পান না। সব নাতি-নাতনিদের একসাথে দেখার সৌভাগ্য তাঁর আর হয় না। কেউ আসে বছরে একবার, কেউবা বছরের পর বছর শুধু ভিডিও কলেই কয়েক সেকেন্ডের জন্য দেখা দেয়।
আধুনিক করার নামে আমরা আমাদের সন্তানদের সাথে বড়দের এই দূরত্ব তৈরি করছি। আমরা কি আমাদের শিকড় বিকিয়ে দিচ্ছি না?
তাই ঠিক করলাম, এ বয়সে এসে, সব ভাই-বোনকে এক করব। মা-বাবাকে চমৎকার কিছু স্মৃতি উপহার দেব। কিন্তু সমস্যা হলো অভ্যস্ততা। শহরে বড় হওয়া, এসি আর আধুনিক সুবিধা ছাড়া অভ্যস্ত বাচ্চাদের গ্রামের বাড়িতে নিলে হিতে বিপরীত হতো। আমি খুঁজতে লাগলাম এমন একটা জায়গা, যেখানে হোটেলের কৃত্রিমতা থাকবে না, বরং মনে হবে নিজের বাড়ি। যেখানে চার ভাই-বোন আর মা-বাবা মিলে একসাথে থাকতে পারব।
অবশেষে মেরিন ড্রাইভের পাশে দারুণ একটা ডুপ্লেক্স বাড়ির সন্ধান পেলাম। শুনেছি এক ব্রিটিশ বাংলাদেশী পরিবার পরম মমতায় নিজেদের থাকার জন্য এটি তৈরি করেছেন। তাদের রুচির প্রশংসা করতেই হয়!
আমার স্ত্রী তো বাচ্চাদের মতো ওই তুলতুলে উঁচু ম্যাট্রেসে কিছুক্ষণ লাফালাফি করল। বাথরুমগুলোও অদ্ভূত সুন্দর—প্রশস্ত, আধুনিক ফিটিংস আর বিশাল জানালা। আমি তো বাথরুমের কমোটে বসেই জানালা দিয়ে মেরিন ড্রাইভের দিকে তাকিয়ে থাকতাম।
সেখানে আমরা কাটিয়েছি অসাধারণ ৩টি দিন। পাশের বাজার থেকে আমরা দুই ভাই মিলে বাজার করেছি, সাগরের বোট থেকে টাটকা মাছ কিনেছি। মা কখনো পুত্রবধূদের নিয়ে, কখনো আমার বোনদের নিয়ে আমাদের প্রিয় সব পিঠা বানিয়েছেন।
তৃতীয় দিনে আমরা দুই ভাই আর বোনের জামাইরা মিলে ঠিক করলাম—আজ সন্ধ্যায় বারবিকিউ আমরাই করব, কোনো নারীকে হাতই দিতে দেব না!
আমি যে রুমটায় ছিলাম, তার বেলকনিতে বিকেলে হাজার হাজার পাখি আসত। একদিন বেলকনির দরজা খোলা রেখেই বিচে গিয়েছিলাম, ফিরে এসে দেখি রুমের ভেতরেই দুটো পাখি নির্ভয়ে বসে আছে! বাচ্চারা ওগুলো ধরার জন্য কী যে দৌড়াদৌড়ি করল!
এই কদিন তারা স্লাইড, ট্রেম্পোলিন আর ব্যাডমিন্টন নিয়ে মেতে ছিল। তারা এই প্রথম বুঝতে শিখল যে এরা কেবল খেলার সাথী নয়—এরা কাজিন, এদের সাথে রক্তের সম্পর্ক।
আসার সময় যখন সবাই যার যার গাড়িতে উঠে যাচ্ছিল, তখন আমার ৩ বছরের মেয়েটা দৌড়ে গিয়ে আমার মায়ের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। আকুতিভরা কণ্ঠে বলল, "দাদু, আমাদের গাড়িতে আসো।" এই দৃশ্যটাই বলে দেয়—রক্তের টান কোনো আধুনিকতা দিয়ে মেটানো সম্ভব নয়। অন্তত আমার এখন এই আক্ষেপ নেই যে, শেষ বয়সে মা-বাবার জন্য আমি আমার সর্বোচ্চটা করিনি।
এ বাড়িটির প্রতি মায়া পড়ে গেছে। চেক আউট করার সময়, লন্ডন থেকে বাড়ির মালিক ফোন করে বললেন, ভাই, কোন ভুলত্রুটি হলে ক্ষমা করবেন। মনে করবেন, #কক্সবাজার এ আপনার নিজের একটি বাড়ি আছে। প্রতিবছর অন্তত একবার আসবেন। অমায়িক!!! বাড়িটির প্রতি মায়া পড়ে গেলো।
পুরো ট্যুরটা ছিল স্বপ্নের মতো। হোটেলের চার দেয়ালের বাইরেও যে পরিবার নিয়ে এভাবে থাকা যায়, তা কক্সবাজারে ঐ হলিডে ডুপ্লেক্সে না গেলে বুঝতাম না।
জীবনে অনেক বড় বড় সিদ্বান্ত নিয়েছি, বড় বড় প্রজেক্ট, বড় ব্যবসা করেছি। তবে, এ ছোট কাজটি আমার হৃদয়কে এত বিশালভাবে প্রভাবিত করবে, এত বড় আবেগ হয়ে ধরা দিবে বুঝতেই পারিনি।
আসার সময় মা কে বললাম,
আম্মা গাড়ির সামনের সীটে আমার পাশে এসে বসো। তোমার ছেলে, ড্রাইব করে, কত দেশ বিদেশ ঘুরেছে, তোমাকে নিতে পারিনি। আজ দেশে এসে মনে হলো, সব জায়গায় যদি তোমাকে নিতে পারতাম।
মা তার হাতখানি রাখলো, আমার মাথার উপর। কিছুই বললোনা।
বললো না, THANK YOU.
তার চোখেমুখে সে এক অন্যরকম অভিব্যক্তি। আমার মাথায় হাত রেখে, গাড়ীর পেছনে আমার স্ত্রী সন্তানের দিকে তাকালো। পাশের গাড়ীতে ভাইয়ের পরিবার, বোন এর পরিবার, একে একে বিদায় নিচ্ছে, এক এক জনের গন্তব্য এক এক দিকে।
আমি বুঝে নিলাম, আমার মা "ধন্যবাদ" বলতে জানে না। তার হৃদয়ে প্রাপ্তির যেমন সুখ আবার একই সাথে বিচ্ছিন্নতার এক অমোঘ কালো মেঘ, এ যেন রোদ বৃষ্টির লুকোচুরির আবেগঘন মুহুর্ত। স্মৃতিতে থাক সারাজীবন- এ Britannia Holiday Home এর সিন্ধুকে
, #পরিবারের #গল্প #ইনানী #বীচ, #সাগর #সমুদ্র #বাড়ি #মা, #বাবাছেলে