03/06/2026
লড়াই মানুষের মর্যাদার সঙ্গে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার স্বার্থে
মানুষের বেঁচে থাকা শুধু শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের বেঁচে থাকার অর্থ হলো মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকা, নিরাপদ পরিবেশে বেঁচে থাকা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কাজ এবং সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকা। যখন এই মৌলিক শর্তগুলি বিপন্ন হয়, তখন মানুষের প্রতিবাদ, প্রতিরোধ এবং সংগ্রাম কোনো বিলাসিতা নয়; বরং অস্তিত্ব রক্ষার অপরিহার্য প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায়।
ভারতীয় সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২১ এই মানবিক দর্শনেরই সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিয়েছে। অনুচ্ছেদ ২১ ঘোষণা করে যে, “আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়া ব্যতীত কোনো ব্যক্তিকে তার জীবন বা ব্যক্তিগত স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।” প্রথম দর্শনে এই অনুচ্ছেদটি জীবন ও স্বাধীনতার একটি সাধারণ সুরক্ষা বলে মনে হলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এর ব্যাখ্যাকে বহুদূর বিস্তৃত করেছে।
সুপ্রিম কোর্ট একাধিক ঐতিহাসিক রায়ে স্পষ্ট করেছে যে, জীবন মানে শুধুমাত্র প্রাণধারণ নয়; জীবন মানে মানবিক মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার। সেই কারণে অনুচ্ছেদ ২১-এর আওতায় জীবিকার অধিকার, স্বাস্থ্যসেবার অধিকার, দূষণমুক্ত পরিবেশের অধিকার, শিক্ষা লাভের অধিকার, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার এবং নিরাপদ বাসস্থানের অধিকারের মতো বিষয়গুলিও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
এই কারণেই যখন কোনো শ্রমিক তার কাজের নিরাপত্তার জন্য আন্দোলন করেন, যখন কোনো কৃষক জমি ও জীবিকার রক্ষার জন্য রাস্তায় নামেন, যখন কোনো হকার উচ্ছেদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন, যখন কোনো বাসিন্দা দূষণ, জলসংকট বা নাগরিক পরিষেবার দাবিতে আন্দোলন করেন, তখন সেই লড়াই কেবল অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক লড়াই নয়; তা সংবিধান স্বীকৃত জীবন ও মর্যাদার অধিকারের লড়াই। কারণ মানুষের জীবনকে যদি অনিশ্চয়তা, ক্ষুধা, বেকারত্ব, অসুস্থতা কিংবা উচ্ছেদের ভয়ের মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়, তবে অনুচ্ছেদ ২১-এর মূল চেতনা ক্ষুণ্ণ হয়।
সংবিধান কেবল রাষ্ট্রকে ক্ষমতা দেয় না; রাষ্ট্রের উপর দায়িত্বও আরোপ করে। সেই দায়িত্ব হলো এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে প্রতিটি মানুষ ন্যূনতম মানবিক মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে পারে। তাই মানুষের ন্যায্য দাবি, সামাজিক ন্যায়বিচারের দাবি কিংবা জীবন-জীবিকার সুরক্ষার দাবিকে কেবল প্রশাসনিক সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না; এগুলিকে সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকারের প্রশ্ন হিসেবেও দেখতে হবে।
এই সাংবিধানিক দর্শনকে আরও শক্তিশালী করেছে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একাধিক যুগান্তকারী রায়।
Maneka Gandhi বনাম Union of India (১৯৭৮) মামলায় সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয় যে, রাষ্ট্রের কোনো আইন বা প্রশাসনিক পদক্ষেপ কেবল আইনসম্মত হলেই চলবে না; তা হতে হবে ন্যায়সঙ্গত, যুক্তিসঙ্গত এবং অযৌক্তিকতামুক্ত। এই রায়ের মাধ্যমে অনুচ্ছেদ ২১-এর পরিধি ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয় এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার ধারণা নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়।
Olga Tellis বনাম Bombay Municipal Corporation (১৯৮৫) মামলায় আদালত ঘোষণা করে যে, জীবিকার অধিকার জীবনাধিকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আদালত পর্যবেক্ষণ করে, জীবিকার সুযোগ কেড়ে নেওয়া মানে কার্যত মানুষের জীবনধারণের অধিকারকেই বিপন্ন করা। এই রায় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি শ্রমজীবী ও প্রান্তিক মানুষের অধিকারকে সাংবিধানিক মর্যাদা দেয়।
Francis Coralie Mullin বনাম Union Territory of Delhi (১৯৮১) মামলায় সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানায় যে, মানুষের জীবন বলতে কেবল শারীরিক অস্তিত্ব নয়, বরং মানবিক মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকারও বোঝায়। খাদ্য, বস্ত্র, আশ্রয় এবং মৌলিক মানবিক সুযোগ-সুবিধা জীবনাধিকারের অংশ।
Chameli Singh বনাম State of Uttar Pradesh (১৯৯৬) মামলায় আদালত রায় দেয় যে, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ বাসস্থানের অধিকারও অনুচ্ছেদ ২১-এর অন্তর্ভুক্ত। একটি ঘর কেবল চার দেওয়াল নয়; এটি মানুষের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানসিক নিরাপত্তার ভিত্তি।
Subhash Kumar বনাম State of Bihar (১৯৯১) মামলায় সুপ্রিম কোর্ট ঘোষণা করে যে, দূষণমুক্ত জল ও বায়ুতে বেঁচে থাকার অধিকার জীবনাধিকারের অংশ। পরিবেশ ধ্বংস বা দূষণ মানুষের মৌলিক অধিকারের ওপর সরাসরি আঘাত হানে।
Consumer Education and Research Centre বনাম Union of India (১৯৯৫) মামলায় আদালত শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে অনুচ্ছেদ ২১-এর অন্তর্ভুক্ত বলে স্বীকৃতি দেয়। স্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ ও চিকিৎসা পরিষেবা মানুষের মৌলিক অধিকারের অংশ বলে আদালত মত প্রকাশ করে।
পরবর্তীকালে Justice K.S. Puttaswamy বনাম Union of India (২০১৭) মামলায় নয় বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ সর্বসম্মতিক্রমে রায় দেয় যে, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকারও অনুচ্ছেদ ২১-এর অধীনে একটি মৌলিক অধিকার।
এই সমস্ত রায় একসঙ্গে আমাদের সামনে একটি স্পষ্ট সত্য তুলে ধরে—ভারতীয় সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২১ কেবল মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারকে সুরক্ষিত করে না; এটি মানুষের মর্যাদা, জীবিকা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, বাসস্থান, স্বাধীনতা ও গোপনীয়তার অধিকারকেও সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়।
আজ যখন উন্নয়নের নামে বহু ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে, যখন শহরকে ঝকঝকে দেখানোর জন্য প্রান্তিক মানুষের অস্তিত্বকে আড়াল করার চেষ্টা হয়, যখন কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য বা পরিবেশের প্রশ্নে সাধারণ মানুষের উদ্বেগকে উপেক্ষা করা হয়, তখন অনুচ্ছেদ ২১ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে উন্নয়নের প্রকৃত লক্ষ্য মানুষের জীবনকে আরও মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ করা। কোনো উন্নয়নই মানুষের অধিকারকে অস্বীকার করে টেকসই হতে পারে না।
অতএব, মানুষের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার স্বার্থে যে লড়াই, তা কোনো বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়; তা ভারতীয় সংবিধানের মৌলিক চেতনার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মানুষের জীবন, জীবিকা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও মর্যাদা রক্ষার এই সংগ্রামই প্রকৃত অর্থে গণতন্ত্রকে জীবন্ত রাখে এবং সংবিধানের আত্মাকে সম্মান জানায়। মানুষের অধিকার রক্ষার এই লড়াই তাই কেবল ন্যায়ের লড়াই নয়—এটি সংবিধান রক্ষারও লড়াই।