17/08/2025
#প্রণয়ে_প্রেমের_আগুন
#লেখনিতে_ইশিতা_ইসলাম
#পর্বঃ ৮
আনহার ভেতরে আগে থেকেই এক নিশ্চিতি কাজ করছিল, বিকেলে আদ্রিয়ান বাসায় থাকবে না। ঠিক তাই হলো। চারপাশ নীরব, তার উপস্থিতির কোনো ছায়াও নেই। ফিরবে কবে,সেটারও নিশ্চয়তা নেই।
আনহা ধীর হাতে টুকিটাকি গুছিয়ে নিলো। নিজের প্রয়োজনের বাইরে কোনো কিছু লাগেজে রাখল না। এই ঘরে থাকা প্রতিটি জিনিস, প্রতিটি পোশাক,সবই তো আদ্রিয়ানের কিনে দেওয়া। আর তার নিজের জিনিসপত্র… সেগুলো পড়ে আছে রাদিফের বাসায়। সেগুলোর আর দরকার নেই,শুধু একটাই ব্যতিক্রম, দেশের বুক থেকে বয়ে আনা প্রিয় বইগুলো। সেগুলোও ওই বাসাতেই বন্দি। বুকের ভেতর কেমন এক টান মুচড়ে উঠলো,আদ্রিয়ান তো পাঁচ মিনিটের জন্যও সেই গেইট একবার খুলতে দেয়নি।
গভীর নিশ্বাস ফেললো আনহা। সব কিছু গুছিয়ে লাগেজ হাতে নিলো। দরজার দিকে পা বাড়াতেই থমকে দাঁড়ালো। শেষবারের মতো ঘরটার দিকে তাকালো,এক নিঃশ্বাসে পুরোটা চোখে বুলিয়ে নিলো। কত স্মৃতি, কত অদেখা ব্যথা এই চার দেয়ালে আটকে আছে।
অবশেষে দরজাটা চেপে বন্ধ করে বেরিয়ে এলো। গেইটের কাছে পৌঁছে দূরে নজর পড়লো,আকাশ দাঁড়িয়ে আছে, গাড়ির দরজা সামান্য খোলা, মুখে গাম্ভীর্য।
~" মিটিংয়ের টেবিলে বসে ফাইলের পাতায় চোখ বোলাচ্ছিল আদ্রিয়ান। হঠাৎ ফোনের পর্দায় ভেসে উঠলো এক নীরব কম্পন,একটি নোটিফিকেশন। অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই বুকের ভেতর এক ঠাণ্ডা শিরশিরানি ছড়িয়ে পড়লো।বাড়ির সিসি ক্যামেরা সরাসরি কানেক্টেড তার ফোনে। সেখানে স্পষ্ট দেখা গেল,আনহা, ধীরে ধীরে গেইটের দিকে হাঁটছে, হাতে লাগেজ। কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একটি গাড়ির দিকে এগিয়ে গিয়ে ভেতরে বসে পড়লো সে।
আদ্রিয়ানের চোখ সেই মুহূর্তেই গাঢ় হয়ে উঠলো,কিন্তু গাড়ির ভেতরে বসা ছেলেটার মুখ স্পষ্ট ধরা পড়লো না।
মিটিংয়ের মাঝপথে থাকা কাগজপত্র, মানুষের কণ্ঠস্বর, সবকিছু হঠাৎ অস্পষ্ট হয়ে গেল। এক মুহূর্তও দেরি না করে চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ালো সে। গলায় চাপা স্বর,
—"তুষার, গাড়ি বের করো। এখনই।"
দু’জন দ্রুত বেরিয়ে এলো। গাড়ি ছুটে চলতে শুরু করলো, কিন্তু আদ্রিয়ানের ভেতরে তখনো অদ্ভুত এক ঝড় বয়ে যাচ্ছে।
আনহা কার সাথে গেলো? কোথায় গেলো?
প্রশ্নগুলো মস্তিষ্কে কিল মেরে উঠছিল।
আদ্রিয়ান জানে, তার শত্রুর সংখ্যা কম নয়। ব্যবসা আর ক্ষমতার খেলায় অজস্র মানুষ তার পতন চায়। এতদিন পাত্তা দেয়নি,নিজেকে সামলাতে সে জানে। কিন্তু আনহা… তাকে নিয়ে সে এতটুকু ঝুঁকি নিতে পারবে না।
আর এই হঠাৎ বাসা থেকে বেরিয়ে অপরিচিত গাড়িতে ওঠা,এর মানে কী?
গাড়ির লাইসেন্স প্লেটের শেষ কিছু সংখ্যা স্ক্রিনে ধরা পড়েছিল,আদ্রিয়ান মনে গেঁথে নিলো। তবু ফোনে দ্রুত আনহার লোকেশন ট্র্যাক করলো সে।
ফলাফল দেখে ঠোঁট শক্ত হয়ে এলো,লোকেশন এখনো তার নিজের বাসাতেই দেখাচ্ছে।
তখনই বুঝে গেলো,আনহা ফোনটা ইচ্ছে করেই বাসায় ফেলে গেছে।
তারপরেও মনে একটাই প্রশ্ন—কোথায় গেলো সে? আর কেন…?
আদ্রিয়ানের চোখে তখন এক অদ্ভুত মিশ্র রাগ ,উত্তেজনা, দুশ্চিন্তা, আর হালকা এক ভয়, যা কেবলই আনহার জন্য।
~ " ফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা গাড়ির নাম্বারটা যেন মুহূর্তেই গোটা শহরের ভেতর এক অদৃশ্য কমান্ড ছড়িয়ে দিলো।আদ্রিয়ানের এক শব্দ "খুঁজে বের করো" আর তাতেই সক্রিয় হয়ে উঠলো তার ছায়া সাম্রাজ্য।
মুহূর্তের মধ্যে চারপাশে খোঁজ শুরু হলো।
শহরের প্রতিটি রাস্তা, গলিপথ, হাইওয়ে,তার মানুষজন ছড়িয়ে পড়লো।
বত্রিশটি কালো সেডান, চল্লিশটি সাদা SUV, আটাশটি হলুদ ট্যাক্সি, ত্রিশটি লাল স্পোর্টস কার,সবগুলোর চাকা একসাথে ঘুরে উঠলো।
আকাশে উঠলো দশটি হেলিকপ্টার, সার্চলাইটে রাতকে কেটে ফেলার মতো তীক্ষ্ণ আলো ঝরে পড়ছে নীচে।চারটি পুলিশ ইউনিট, ট্যাকটিক্যাল গিয়ার পরে, তার নির্দেশে কাজ শুরু করে দিলো।
এতেই শেষ নয়,ড্রোনের ঝাঁক আকাশে উঠলো, 4K ক্যামেরায় প্রতিটি গলিপথের ছবি আদ্রিয়ানের অপারেশন সেন্টারে পাঠাচ্ছে।
প্রাইভেট স্যাটেলাইট ফিড পর্যন্ত সক্রিয় হলো,এমন প্রযুক্তি খুব কম মানুষের হাতেই আছে।চারটি পুলিশ ইউনিট, ট্যাকটিক্যাল গিয়ার পরে, তার নির্দেশে কাজ শুরু করে দিলো।
আর এই বিশাল আয়োজনের কেন্দ্রে,আদ্রিয়ান নিজে, কালো Bugatti La Voiture Noire-এর স্টিয়ারিংয়ে।ব্ল্যাক শিরন নয়,আজ সে নামিয়েছে তার সবচেয়ে দুর্লভ গাড়িটা। হাইওয়েতে কালো তীরের মতো ছুটে চলেছে, ইঞ্জিনের গর্জন যেন পুরো শহরকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে।
হেডসেটে ক্রমাগত রিপোর্ট আসছে,
—"স্যার, গাড়িটা শেষবার এয়ারপোর্টের আশেপাশে দেখা গেছে।"
—"স্যার, আমরা টার্মিনাল থ্রির পার্কিং চেক করছি।"
—"স্যার, ড্রোন ফিডে লাল ছাদওয়ালা একটি গাড়ি পাওয়া গেছে, নাম্বার মিলছে আংশিক।"
আদ্রিয়ানের চোখে তখন কেবল একটিই লক্ষ্য,গাড়িটা খুঁজে বের করা, আর আনহাকে ফেরানো।
গতির সাথে লড়ছে তার ধৈর্য, কিন্তু মস্তিষ্ক শীতল,প্রতিটি পদক্ষেপ হিসাব কষে এগোচ্ছে।
~" আকাশ বা আনহা,কেউই জানে না, তাদের খোঁজে ইতিমধ্যেই পুরো কানাডা এক অদৃশ্য কম্পনে কেঁপে উঠেছে। আকাশের গাড়ি নীরবে হাইওয়ে পেরিয়ে এয়ারপোর্টের গেটের দিকে এগোচ্ছে, চারপাশের আলো ক্রমে সন্ধ্যার গভীরে মিশে যাচ্ছে।
সন্ধ্যা ছুঁইছুঁই সময়, এয়ারপোর্টের বিশাল কাচের দেয়ালে প্রতিফলিত হচ্ছে অস্তগামী সূর্যের শেষ রঙিন আভা। গাড়ির ইঞ্জিন থামতেই আনহার বুকের ভেতর কেমন এক অদ্ভুত হালকা শ্বাসের ঢেউ,“আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা… তারপর এই শহর, এই শ্বাসরুদ্ধ করা ঠিকানা থেকে আমার মুক্তি।”
কিন্তু আনহা বুঝতে ও পারলো না, আদ্রিয়ান আলভি কেলিসের হাত থেকে মুক্তি, সত্যিই কি এত সহজ?যে মানুষ এক মুহূর্তে আকাশ, মাটি আর সমুদ্রকে তার শিকারে পরিণত করতে পারে, যার নির্দেশে হেলিকপ্টার উঠে যায় আকাশে, রাস্তায় নামে সশস্ত্র দল, আর প্রতিটি গলিপথে ছড়িয়ে পড়ে তার চোখ,তার হাত থেকে পালানো কি কেবল ফ্লাইটের একটি টিকিটের দূরত্ব?
~" এয়ারপোর্টের কাছাকাছি পৌঁছাতেই আদ্রিয়ানের গাড়ির গর্জন আরও তীব্র হলো। সামনে রাস্তায় হেলিকপ্টারের সার্চলাইট পড়ছে, পুলিশের সাইরেন ভেসে আসছে দূর থেকে। এয়ারপোর্টের গেটের সামনে ইতিমধ্যেই তার লোকেরা পজিশন নিয়ে দাঁড়িয়ে,কালো স্যুট, ইয়ারপিসে ক্রমাগত কোডওয়ার্ড বিনিময়।
হেলিকপ্টারের ককপিট থেকে খবর এলো,
—“টার্গেট কার টার্মিনাল থ্রি এর পার্কিং জোনে ঢুকেছে।”
আদ্রিয়ানের ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেলো। গাড়ির ব্রেক কষে থামিয়ে হেডসেটে বললো,
—“লকডাউন করো পুরো পার্কিং জোন। কেউ ঢুকবে না, কেউ বেরোবে না।”
সাথে সাথেই চারপাশে নড়ে উঠলো তার মেশিন,পুলিশ ভ্যান, কালো SUV আর আর্মড গার্ড চারদিক ঘিরে ফেললো । ড্রোনগুলো নিচে নেমে পার্কিংয়ের প্রতিটি কোণ স্ক্যান করতে লাগলো।
আদ্রিয়ান গাড়ি থেকে নেমে এক হাতে কোটের বোতাম খুলে ছুড়ে ফেলে দিয়ে এগিয়ে গেলো। তার পদক্ষেপে এক ধরনের ভয়ানক স্থিরতা,যেন পুরো জায়গাটা তার ব্যক্তিগত এলাকা।
এয়ারপোর্ট অথরিটির এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এগিয়ে এসে একটু ভীত গলায় বললো,
“মি. কেলিস… এটা ইন্টারন্যাশনাল জোন… এত সিকিউরিটি—”
আদ্রিয়ানের কণ্ঠে কেবল বরফ,
“আমার মানুষকে খুঁজে পেতে যতটা সময় লাগবে, ততক্ষণ এই জায়গা আমার। কোনো আপত্তি?”
কর্মকর্তা একটিও শব্দ উচ্চারণ করতে পারলো না।
এরই মাঝে তুষার রিপোর্ট দিলো,
“স্যার, গাড়িটা পাওয়া গেছে।
আদ্রিয়ানের ঠোঁটের কোণে এক ঠাণ্ডা হাসি ফুটলো।
~" আদ্রিয়ান দ্রুত এগিয়ে গেলো নিদিষ্ট গাড়িটির দিকে। চারপাশে পনেরোটা গাড়ি যেন এক অদৃশ্য বর্গাকারে ঘিরে ফেলেছে তাকে। এই গোলের মাঝখানে এসে দাঁড়াতেই গার্ডরা চুপচাপ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে গেল।
ব্যাকসিটের দরজা খুলতেই আদ্রিয়ানের চোখ পড়লো,আনহা, গুটিশুটি হয়ে বসে আছে। এত মানুষ, এত গাড়ি দেখে মনে হচ্ছিল ভয়ে কেঁপে উঠেছে সে। কিন্তু আদ্রিয়ানের তীক্ষ্ণ নজর একটুও শিথিল হলো না।
হাতের দিকে তাকাল,পাসপোর্ট আর টিকিট। মুহূর্তেই চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো, হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেল। বুঝতে পারলো,কিছু একটা ঠিক হয়নি। রাগে তার চোখ আগুনের মতো জ্বলে উঠলো।
মুহূর্তের মধ্যে হিংস্র বাঘের মতো গর্জন করে সে আনহার হাত ধরে টেনে বাইরে নিয়ে এলো। আনহার মুখ চেপে ধরে বললো,
“তোর এতো বড় সাহস, আমার সঙ্গে ছলনা করিস হ্যাঁ, ফাকি*ং জার্ক!”
আনহার বুক কাঁপছে, চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরে পড়ছে। মনে হলো, এবার সত্যিই গাল ফেটে রক্ত বের হবে। ব্যথা, ভয়, এবং অসহায়তা, সব মিলিয়ে সে মুহূর্ত যেন স্থির হয়ে গেছে।
ঠিক তখনই আকাশ গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালো। দৃঢ় গলার স্বরে বললো,
“ওকে ছেড়ে দিন বলছি।”
আদ্রিয়ানের চোখ আচমকাই আকাশের দিকে পড়লো। মুহূর্তে চিনে নিলো। সঙ্গে সঙ্গে আকাশের কলার ধরে ধরলো,
“বাস্টার্ড! তোর সাহস কি করে হলো আমার বাড়ির সামনে থেকে ওকে নিয়ে আসলি? তোর কি জানের মায়া নেই, কুত্ত****র বাচ্চা!”
আকাশ ঠাণ্ডা, কিন্তু দৃঢ় হাসি দিয়ে বললো,
“তোর মতো মানুষকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। জন্মেছি, মরতে হবেই একদিন,এটাই জীবন।”
আদ্রিয়ানের আঙুলগুলো আরো শক্ত করে আঁকড়ে ধরল আকাশের কলার। ঠান্ডা, শীতল চোখে তাকিয়ে সে যেন বিষ ছুঁড়ে দিলো কথার আঘাতে,
“সিংহের গুহা থেকে শিকার ছিনিয়ে আনার পরিণতি কেমন হয়, আজ তোকে আমি বুঝিয়ে দেবো… জানো**য়ারের বাচ্চা!”
আকাশের ঠোঁটে কোনো ভয়ের ছাপ নেই। তার কণ্ঠ রইলো অস্বাভাবিকভাবে শান্ত, যেন ঝড়ের ভেতরেও অবিচল সমুদ্র,
“কুকুর যতই ঘেউ ঘেউ করুক, তাতে সিংহ হয়ে যায় না।”
কথাগুলো বাতাস কেটে বেরিয়ে এলো, ছুরির ধার মতো ঠান্ডা আর স্পষ্ট। মুহূর্তেই চারপাশের উত্তেজনা জমাট বাঁধা বরফের মতো ভারী হয়ে উঠলো।
~" মুহুর্তের মধ্যে আদ্রিয়ানের রাগ যেন আগুনের চাপে গলে যাওয়া ধাতুর মতো বেড়ে গেল। তার চোখ লালচে, ভীতিকর, আর বাতাসে যেন একটি স্থির শীতল চাপ পড়ে গেল। আনহা ভয়ে কম্পমান, শরীরটা অবশ। আকাশের দিকে আদ্রিয়ান হাত বার করে ঘুষি দিতে চলল, কিন্তু ঠিক তখনই আনহার অশ্রুসিক্ত চোখগুলো তার দিকে ভেসে উঠল।
—"প্লিজ… আকাশ ভাইকে মারবেন না," কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠল, যেন ভয়ে কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছে। "ওর কোনো দোষ নেই। সব দোষ আমার। আমি দেশে যেতে পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। আকাশ ভাই শুধু আমার সাহায্য করেছেন। আমি আর এমন টা করবো না, আপনার সব কথা শুনব, আপনি যা বলবেন তাই করব… কিন্তু ওকে ছেড়ে দিন। ও কিছু জানে না।"
আনহার কণ্ঠে ভীতির মধ্যে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা ছিল যেমন নিজের জীবন না হলেও আকাশের জীবন বাঁচানোর জন্য নিজের সমস্ত সাহস একসাথে জোগাড় করেছে।
আদ্রিয়ানের হাত ধীরে ধীরে নেমে এল। তার চোখ এখন কেবল কৌতূহল আর কঠোরতা।
—"আমার সব কথা শুনবে?"
আনহা মাথা হালকা নাড়াল, আর মনে মনে কাঁপছিল, কিন্তু মুখে কোনো দ্বিধা রাখল না।
—"আমি যা বলব, তাই করবে।" উপর নিচ মাথা নাড়ালো আনহা, আদ্রিয়ানের চোয়াল শক্ত, চোখে অদ্ভুত ঠাণ্ডা,রাগ এখন শুধু চোখের ঝলকানি, হাতে নয়।
~" হাত সরিয়ে নিলো আদ্রিয়ান, লোকজন চমকে গেল। কিন্তু আকাশ জানত,আনহার হৃদয় এখনও আতঙ্কে ভরা। সে ধীরে এগিয়ে গেল, কণ্ঠে কণ্ঠস্বরের গভীর, স্থির অনুরোধ,
"প্লিজ, আনহা… ওকে ভয় পেয়েও কিছু হবে না। তুমি ওর সাথে যেও না।"
~" আনহা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। কাঁধে যেন অদৃশ্য এক ভার চাপা, শরীরের ভেতর কাঁপুনি ছড়িয়ে পড়ছে। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু অস্পষ্ট করে দিচ্ছিল চারপাশ। তার ভেতরের স্বর জানত,আদ্রিয়ানের কথা অমান্য করা মানে আকাশের জীবনকে সরাসরি বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া। যেখানে আকাশের কোনো দোষই নেই… আজ যদি তার সঙ্গে আনহার পরিচয় না হতো, আকাশকে কখনো এমন বিপদের আঁধারে নামতে হতো না।
নিজেকেই দোষারোপ করছিল সে,নীরবে, গভীরে, এক অদৃশ্য যন্ত্রণার মধ্যে। তার প্রতিটি শ্বাসে অনুশোচনার তিক্ততা, প্রতিটি হৃদস্পন্দনে অপরাধবোধ। সে চায় না তার জন্য আকাশের বিপদ আর বাড়ুক।
আকাশ বারবার চেষ্টা করল,তার কণ্ঠে অনুনয়, কখনো রাগ, কখনো অসহায়তা,কিন্তু আনহা মাথা তোলে তাকালই না। যেন চোখ মেললেই তার সিদ্ধান্ত দুর্বল হয়ে যাবে।
আদ্রিয়ান ঠান্ডা দৃষ্টিতে সব দেখছিলেন। একসময় ধীর, ভারী কণ্ঠে আকাশের দিকে তাকিয়ে নিজের লোকজনকে হুকুম দিলেন,
"ওকে যেতে দাও… তবে ছেড়ে দিও না। নজরে রেখো। পরে কাজে লাগতে পারে।"
শব্দগুলো যেন ছুরি দিয়ে কেটে দেওয়া বাতাসের মতো নেমে এল। চারপাশের পরিবেশ হঠাৎ আরও নিস্তব্ধ, আরও ভারী হয়ে উঠল। আকাশের চোখে ক্ষোভের ঝলক, আর আনহার ভেতরে অদ্ভুত এক শীতল ভয় জমে গেল।
~" এগিয়ে এসে আদ্রিয়ান হঠাৎ ঝট করে আনহাকে কোলে তুলে নিল। এত দ্রুত, আর ঠিক এতটা দৃঢ়,যেন পৃথিবীর আর কিছুই তার হাত থেকে তাকে ছিনিয়ে নিতে পারবে না। আনহার শরীর কেঁপে উঠল, ঠোঁট কাঁপল, কিন্তু গলা থেকে কোনো শব্দ বের হলো না। চোখ শুধু বড় হয়ে রইল, ভেতরে জমাট বাঁধা ভয় আর অজানা অনুভূতির মিশ্রনে।
তুষার ইতিমধ্যেই দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছে। আদ্রিয়ান তাকে পাশ কাটিয়ে গাড়ির ভেতর আনহাকে বসিয়ে নিল। নিজেও উঠে বসলেন, মুহূর্তের মধ্যেই ইঞ্জিন গর্জে উঠল, তুষার ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়িকে দ্রুত এগিয়ে নিল।
আদ্রিয়ানের লোকজন একে একে সরে গেল, এয়ারপোর্টের চারপাশে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক চলাচল ফিরতে লাগল। কিন্তু সেই ভিড়ের মধ্যে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল আকাশ,চোখে অদ্ভুত কাতরতা, বুকের গভীরে এক অব্যক্ত জ্বালা। আনহার জন্য তার ভালোবাসা এত গভীর, এত প্রবল যে সে জানে,প্রয়োজনে মৃত্যুকেও আলিঙ্গন করবে, কিন্তু হারাবে না।
আকাশ ধপ করে বসে পড়ল নিকটবর্তী এক বেঞ্চে, যেন শরীরের সমস্ত শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেছে। দুই কনুই হাঁটুর ওপর রেখে মাথা নিচু করে ফিসফিস করে বলল,
—"আমি তোমাকে ভালোবাসি আনহা… খুব ভালোবাসি। এই একজীবনে তোমাকেই মনে ধরেছে তোমাকে চাই… যেভাবেই হোক তোমাকে চাই।"
~" তুষার ধীরে ব্রেক কষে গাড়ি থামালো রেজিস্ট্রার অফিসের সামনে। জায়গাটা যেন আগেই নির্ধারিত ছিল। সেখানেই অভ্র অপেক্ষা করছিলো, মুখে অস্বস্তির ছাপ। গাড়ির দরজা খোলার শব্দ হতেই আদ্রিয়ান নেমে দাঁড়ালো, ভারী পদক্ষেপে এগিয়ে এলো অভ্র।
অভ্র একবার আড়চোখে তাকালো গাড়ির ভেতর। ভিতরে গুটিসুটি মেরে বসে আছে আনহা। চোখ দুটো লালচে ও ফোলা, যেন বহুক্ষণ কান্নার ভার বইতে হয়েছে। এখনো কাঁদছে না, শুধু স্তব্ধ হয়ে বসে আছে,কোনো প্রতিরোধ নেই, শুধু এক গভীর নিস্তব্ধতা।
অভ্র দৃষ্টি ফিরিয়ে আনলো আদ্রিয়ানের দিকে। কণ্ঠে অস্বস্তি মিশে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো,
"আনহা রাজি…?"
আদ্রিয়ানের চোখে একরাশ গাম্ভীর্য, স্বর নিস্তেজ অথচ দৃঢ়,
"সব হবে। তোকে যা করতে বলেছিলাম, সব ব্যবস্থা হয়েছে?"
অভ্র ধীরে মাথা নাড়লো সম্মতির ইঙ্গিত দিয়ে। তারপর নিশ্বাস ফেলে থমথমে স্বরে বললো,
—"শোন আদ্রিয়ান, এতদিন তোকে চিনি। জীবনে কোনোদিন কোনো মেয়েকে নিয়ে তোকে এভাবে আগ্রহী হতে দেখিনি। আজ বন্ধুত্বের খাতিরে পাশে দাঁড়ালাম ঠিকই, কিন্তু... মেয়েটার সাথে অবিচার করিস না।"
কথাগুলো বাতাসে ঝুলে রইলো। এক মুহূর্তের জন্যও যেন আদ্রিয়ানের গম্ভীর মুখে কোনো রেখাচিত্র আঁকলো না বন্ধুর এই সতর্কতা। ঠাণ্ডা স্বরে শুধু বললো,
"কাজি রেডি?"
অভ্রর নিঃশ্বাস আটকে এলো। তারপর মাথা নিচু করে মৃদু গলায় উত্তর দিলো,
"হ্যাঁ, রেডি।"
~' এই এরিয়াতে একজনই বাঙালি কাজি সে আবার অন্য জায়গায় বিয়ে পরাচ্ছিল সেখান থেকেই ছেলেরা তাকে তুলে এনেছে, অভ্রর কণ্ঠ থেমে যেতেই আদ্রিয়ানের চোখ স্থির হলো গাড়ির দিকে। একবার গভীরভাবে তাকাল, তারপর দরজা খানিকটা ঝুঁকে খুলে বললো,
"নেমে এসো।"
আনহার চোখে বিস্ময়ের ছায়া। এ জায়গা তো আদ্রিয়ানের বাসা নয়! কপাল কুঁচকে অস্বস্তির সুরে প্রশ্ন করলো,
"এটা কোন জায়গা? এখানে কেনো এসেছি আমরা?"
আদ্রিয়ান ধীর ভঙ্গিতে ঝুঁকে পড়লো তার দিকে। কণ্ঠে এক অচঞ্চল গাম্ভীর্য,
"বিয়ে করতে।"
মুহূর্তেই আনহার চোখ বিস্ফারিত হলো। এমন গুরুতর পরিস্থিতিতে আদ্রিয়ানের উত্তরটাকে সে প্রথমে নিছক ফাজলামি ভেবেই নিলো। বিরক্ত দৃষ্টি ছুঁড়ে দিলো তার দিকে, ঠোঁট চেপে বললো,
—"তো গিয়ে বিয়ে করে আসুন। আমি গাড়িতেই আছি, যেতে পারবো না।"
আদ্রিয়ান শান্ত, অটল স্বরে প্রতিউত্তর করলো,
—"তুমি না আসলে তো বিয়েই হবে না।"
আনহার বুক ধড়ফড় করে উঠলো। কী বলছে মানুষটা! তার বিরক্তি এবার কণ্ঠে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠলো,
"আমি কি আপনার বিয়ে পড়াবো নাকি? আমি না গেলে বিয়ে হবে না
" আনহা মনে মনে বিড়বিড় করে বললো , সব যত্তসব বাজে কথা!"
আদ্রিয়ান স্থির দৃষ্টিতে আনহার দিকে তাকিয়ে শান্ত অথচ অদ্ভুত দৃঢ় স্বরে বললো,
“তোমাকেই তো বিয়ে করবো। বিয়েতে বউ না থাকলে বিয়ে হবে কিভাবে?”
আনহার চোখ বিস্ফারিত হয়ে উঠলো। চিৎকার করে উঠলো সে,
“কি-হ্! দেখুন, ইয়ারকি আমার একদম ভালো লাগছে না। চলুন বাসায় ফিরি।”
আদ্রিয়ানের ঠোঁটের কোণে একরাশ হালকা হাসি ফুটে উঠলো। যেন সেই হাসিতে এক অদ্ভুত রহস্য লুকানো আছে। ধীর কণ্ঠে বললো,
—“আগে বিয়েটা সেড়ে নেই… তারপর বাসায় যাবো।”
আনহার বুক কেঁপে উঠলো। এক শীতল আতঙ্ক তার শরীর ভর করলো। মনে হলো,আদ্রিয়ান এমন মানুষ নয়, যে মজা করবে। তার প্রতিটি কথা হয়তো ভীষণ বাস্তব। ভয়ে গলা কেঁপে উঠলো আনহার,
—“না… আমি বিয়ে করবো না! এসব বাজে কথা বলছেন কেনো?”
আদ্রিয়ান হালকা ঝুঁকে এসে সরাসরি তার চোখের ভেতর তাকালো। কণ্ঠস্বর গাঢ় ও গম্ভীর,
—“বাজে কথা না, জান। বিয়ে করবো তোমায়… বউ বানাবো আমার।”
আনহার বুক ধকধক করতে লাগলো। ভ্রু কুঁচকে তীব্র বিরক্তি নিয়ে বললো,
“আমি কি আপনার হাতের পুতুল নাকি, যা খুশি করবেন আমাকে নিয়ে?”
আদ্রিয়ান ধীরে দুই আঙুল দিয়ে নিজের কপাল চেপে ধরলো, যেন সামান্য বিরক্তি সামলে নিচ্ছে। তারপর শান্ত অথচ হিমশীতল কণ্ঠে বললো,
“আনহা, একটু আগেই তো আমায় কথা দিয়েছিলে,যা বলবো তাই করবে। এখন কিন্তু সেই কথার বরখেলাফি করছো। নেমে এসো… বলছি।”
গাড়ির বাইরে তুষার দাঁড়িয়ে, অভ্র অস্থিরভাবে হাঁটাহাঁটি করছে। যেন পরিবেশের ভারে বাতাস জমাট বেঁধে আছে।
আনহার হাত দুটো মুঠো হয়ে গেলো, চোখের কোণে হালকা কাঁপুনি। সে অবিশ্বাসে তাকালো আদ্রিয়ানের দিকে,
"মানে… মানে কি বলছেন আপনি?"
আদ্রিয়ান ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে দিলো তার দিকে, কণ্ঠ আরও গম্ভীর
—"নেমে আসো। এ মুহূর্ত থেকে তুমি আমার স্ত্রী হতে যাচ্ছো।"
মুহূর্তেই আনহার শরীর কেঁপে উঠলো। মাথার ভেতর ঘূর্ণিঝড় বয়ে গেলো—স্ত্রী!
সে তীব্র স্বরে বললো,
—"না! এটা সম্ভব না… আপনি এমন করে আমাকে বাধ্য করতে পারেন না!"
আদ্রিয়ানের ঠোঁট সামান্য নড়ে উঠলো, কিন্তু তার শান্ত কণ্ঠ যেন মৃত্যুদণ্ডের রায়,
"মিস আনহা আয়াত তালুকদার , আমার জগতে ‘না’ শব্দটার কোনো অস্তিত্ব নেই। " নেমে এসো।
আনহা দৃঢ়ভাবে হাত ক্রস করে বসে আছে গাড়ির ভেতর। তার চোখে ভয়ের সাথে মিশে আছে অবিশ্বাস, কণ্ঠে হালকা কাঁপুনি,
“আমি নামবো না… আপনি যতই জোর করেন না কেন। আমাকে টেনেও নামাতে পারবেন না।”
আদ্রিয়ান একবার গভীরভাবে তাকালো তার দিকে, ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত শান্তির ছাপ। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা অভ্র আর তুষার দুজনেই নিঃশব্দ। ঠিক সেই মুহূর্তে দূরে থেকে একজন লোককে নিয়ে এগিয়ে এলো আদ্রিয়ানের লোকজন, হাতে কাগজপত্র, পরনে ফকিরা রঙের পাঞ্জাবি। সেই লোকটিই কাজি।
অভ্রর গলা শুকিয়ে এলো। ফিসফিস করে বললো,
“আদ্রিয়ান … ভাই, গাড়ির ভেতরেই? এভাবে…?”
আদ্রিয়ান শীতল কণ্ঠে উত্তর দিলো,
“সে নামবে না। তাই এখানে। যেখানে সে আছে, সেখানেই বিয়ে হবে।”
কাজি খানিকটা দ্বিধায় গাড়ির দরজার কাছে দাঁড়াল। আদ্রিয়ান নিজে দরজা খুলে দিলো। অভ্র অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাকে ভেতরে ঢুকতে ইশারা করলো।
আনহার বুক ধড়ফড় করতে লাগলো, চোখ ভিজে উঠলো জলে। সে প্রায় কেঁদে ফেলবার মতো কণ্ঠে বললো,
—“না… আমি চাই না! এটা অন্যায়… আপনি এভাবে আমায় জোর করতে পারেন না !”
আনহার বুকের ভেতর দমচাপা কান্না জমে উঠলো। হঠাৎ করেই সে ঘুরে তাকালো অভ্রর দিকে। চোখে অশ্রুর ধোঁয়াশা, কণ্ঠ কাঁপছে আতঙ্কে,
—“ভাইয়া… আপনি কিছু বলুন। বোঝান ওনাকে… উনি পাগল হয়ে গেছেন!”
অভ্রর দৃষ্টি মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠলো, ঠোঁট নড়লো যেন কিছু বলতে চাইছে। কিন্তু পরক্ষণেই সে মাথা নিচু করে নিলো। স্পষ্ট বোঝা গেলো
তারও কিছু করার নেই। এই মুহূর্তে আদ্রিয়ানের সিদ্ধান্তের সামনে তার কথাও হবে নিছক বাতাসের শব্দ।
অভ্র নীরব হয়ে থাকায় আনহার বুকের ভেতর শূন্যতা জমে গেলো। চারপাশে এত মানুষ, তবু সে ভীষণ একা। আর সেই নিস্তব্ধতার ভেতর আদ্রিয়ানের চোখ দুটি আরও ভারী লাগছে।
আদ্রিয়ান ধীর অথচ ভয়ংকরভাবে শান্ত স্বরে বললো,
“তুমি যতই না বলো, আনহা… আমার সিদ্ধান্তই শেষ কথা। তুমি আমার স্ত্রী হবে। এই মুহূর্তেই।”
কাজি কাগজ বের করে নিতে নিতে ইতস্তত করলো। তবু আদ্রিয়ানের চোখের শীতল দৃঢ়তায় থমকে গিয়ে আনুষ্ঠানিকতা শুরু করলো। গাড়ির ভেতরটায় যেন বাতাস জমাট বেঁধে আছে।
কাজির কণ্ঠ কেঁপে উঠলো,
—“কনে… নাম… আনহা আয়াত তালুকদার ।" মা "তুমি কি রাজি?” রাজি থাকলে বলো মা " কবুল"।
আনহার চোখে পানি গড়িয়ে পড়লো। সে মুখ ঘুরিয়ে নিলো, একেবারেই কিছু বললো না। অভ্রর গলা রুদ্ধ হয়ে আসছিল, কিন্তু আদ্রিয়ান ঠাণ্ডা কণ্ঠে ধীরে ধীরে উত্তর দিলো,
—“হ্যাঁ। সে রাজি।”
ভয়ে ভয়ে কাজি ভীত কন্ঠে বললো, বাবা এটা কনের মুখ থেকে বলতে হবে।
আনহার চোখে জল চিকচিক করে উঠলো। ঠোঁট ফাঁক হলো বটে, কিন্তু কোনো শব্দ বের হলো না। মাথা একপাশে কাত করে ফিসফিস করে বললো,
—“না… আমি রাজি নই। আমি বলবো না।”
" কপাল কুচকে ঠাণ্ডা, ভয়ংকর স্থির কণ্ঠে আদ্রিয়ান ঝুঁকে এল আনহার কাছে,
—“ভেবে নাও, আনহা। আমার লোকেরা আকাশ কে ছেড়ে দিয়েছে ঠিকই কিন্তু নজর ছাড়া করেনি, তুমি যদি কবুল না বলো… আমি আকাশকে বাঁচতে দেবো না।” ওর জন্য তোমার এতো সাহস বেড়েছে তাই না ওকেই সরিয়ে দেবো আমি।
আনহার বুক ধড়ফড় করতে লাগলো। কণ্ঠ শুকিয়ে এলো ,
—“না… না! তাকে কিছু করবেন না… দয়া করে!”
আদ্রিয়ানের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ, অচঞ্চল,
“তাহলে বলো, কবুল।”
আনহার শরীর কেঁপে উঠলো। চোখ বেয়ে ঝরঝর করে নামলো অশ্রু। সে মাথা নাড়িয়ে চিৎকার করে বললো,
“না! আমি বলবো না… এটা জোর করে… আমি চাই না…”
~" আদ্রিয়ান ধীরে ধীরে আনহার দিকে ঝুঁকে এলো। তার কণ্ঠ যেন বরফ কেটে আসা হিমশীতল হাওয়া, প্রতিটি শব্দে ভয়ঙ্কর শীতলতা,
“একটা কথাই বলবো শেষবারের মতো… তুমি যদি এখনই কবুল না বলো, তবে আকাশকে আজ রাতেই আমার লোকেরা শেষ করে ফেলবে। তোমার জন্য একটি নিরিহ পাঠা বলি হবে… এটাই কি চাইছো?”তাহলে তোমার ইচ্ছা পূরণ করছি।
শব্দগুলো আনহার বুক ভেদ করে বিদ্ধ হলো। তার চোখে আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠলো, ঠোঁট কেঁপে উঠলো অশ্রুসিক্ত প্রতিবাদে।
কিন্তু আদ্রিয়ানের দৃষ্টি অচঞ্চল। সে সোজা তুষারের দিকে ঘুরে তাকালো। ঠাণ্ডা, নির্মম কণ্ঠে আদেশ করলো,
—“তুষার… ওদের বলে দাও, " কিল হিম রাইট নাও "
এই নির্দেশ যেন মুহূর্তেই বাতাসকে আরও ভারী করে তুললো। তুষার মাথা সামান্য ঝুঁকিয়ে সে সাড়া দিলো।
আনহার বুক হু-হু করে উঠলো। তার জন্য একটি নিরিহ প্রাণ চলে যাবে এই দ্বায় কাধে নেওয়ার থেকে তো মরে যাওয়া ভালো। কান্নায় ভেঙে পড়তে পড়তে সে হঠাৎ হাত বাড়িয়ে চিৎকার করে উঠলো,
—“না! না… থামুন! প্লিজ… কিছু করবেন না ওকে… আমি… আমি কবুল বলবো… শুধু ওকে ছেড়ে দিন…”
কাজির কণ্ঠ আবার ভেসে এলো কাঁপা কাঁপা শব্দ,
“আপনি কি বর আদ্রিয়ান আলভি কেলিসকে স্বামী হিসেবে কবুল করছেন?”
আনহার গলা ভেঙে গেলো কান্নায়, বুক কাঁপতে লাগলো। অবশেষে কেঁদে কেঁদে শব্দগুলো বেরিয়ে এলো,
“ক… ক-বুল।”
আদ্রিয়ান হাত বাড়িয়ে শক্ত করে ধরে ফেললো তার কাঁপা আঙুলগুলো। কাজির কণ্ঠ আবার ভেসে এলো,
“বর… আদ্রিয়ান আলভি কেলিস। আপনি কি কনে আনহা আয়াতকে স্ত্রী হিসেবে কবুল করছেন?”
আদ্রিয়ান চোখ সরাল না আনহার থেকে। কণ্ঠে গাঢ়, শীতল দৃঢ়তা,
“কবুল।”
চলবে........,
[ এই পর্বে মন মতো রিয়েক্ট না আসলে পরের পর্ব আসবে না। লেখালেখি থেকে মন উঠে যাচ্ছে। চল্লিশ হাজার মানুষ পড়তে পারে অথচ 1k রিয়েক্ট উঠে না। বিদ্র : প্রিয় পাঠক মহল এই পর্বে কিছু স্থানে বাস্তবতার খাতিরে অশালীন/গালি জাতীয় শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। সামনের পর্বগুলোতেও এরকম কিছু থাকতে পারে। যাঁরা এমন শব্দ পছন্দ করেন না, তাঁরা চাইলে সেই অংশগুলো এড়িয়ে যেতে পারেন। ]