24/12/2025
#লন্ডনজীবন২২
লন্ডনে সেমিস্টার চলাকালীন সময়ে আমার একস্ট্রা উপার্জনের একমাত্র পথ ছিলো টেসকোতে রবিবারে ওভারটাইম করা। ওইদিন পাবলিক হলিডে থাকায় ডাবল পেমেন্ট করতো! তাই যখনই ওভারটাইম অফার করতো আমি লুফে নিতাম। অবশ্য শুধু আমি না, স্টোরে অন্য সবাই যাদের রবিবারে পারমানেন্ট শিফট ছিলো না, তারা সবাই ডাবল পেমেন্টের অফার পেলে লুফে নিতো! আট ঘন্টা কাজ করলে এক শিফটেই তখন আশি পাউন্ডের মতো চলে আসতো! আর নিজেকে তখন মনে হতো পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষ।
এছাড়াও এই এক্সট্রা টাকা হাতে আসা মানে আমি মন চাইলেই দশ, বিশ পাউন্ড ইচ্ছে হলেই এদিক ওদিক খরচ করতে পারি। অঞ্জন দত্তের একটা গান ছিলো- "চেপে চেপে রাখা, মান অভিমান, টিপে টিপে খরচা"! নিজের টাকা খরচের অবস্থা তখন অনেকটা এমনই ছিলো। সে সময় আমি প্রায়ই ভাবতাম, জীবনে অঢেল টাকা চাইনা, কিন্তু অন্তত এই পরিমান চাই যেন মনে যখন যা ইচ্ছা হবে, কোন চিন্তাভাবনা না করেই খরচ করে ফেলতে পারি। কখনো কারো কাছে যেন চাইতে না হয় বা কৈফিয়ত দিতে না হয়।
তো রবিবারে সন্ধ্যা ছয়টাতেই স্টোর বন্ধ হয়ে যেতো! কাজ শেষে উইকেন্ডের ট্রেইন ধরে যখন ইস্টহ্যাম স্টেশনে এসে পৌঁছাতাম, তখন দেখা যেতো সন্ধ্যা সাতটা বা সাড়ে সাতটা বেজে গেছে। স্টেশনে থেকে আবার একটা লোকাল বাস ধরে বাসায় পৌঁছানো লাগতো! বাসের জন্য অপেক্ষা করতে করতে প্রায়ই দেখতাম দুই/তিনজন ইস্টার্ন ইউরোপীয়ান, মোস্ট প্রোবাবলি রোমানিয়ান একটা গ্রুপ একটা বল আর তিনটা কাপ দিয়ে কি যেন একটা গেইম খেলতো। তাদের খেলা দেখতে আবার কিছু লোকজনও আশেপাশে জমা হয়ে যেতো। গেইমটা অনেকটা এমন ছিলো, লোকটা ছোট একটা বল একটা কাপ দিয়ে ঢেকে দিতো! পাশে আরও দুইটা খালি কাপও ঠিক সেরকম ভাবেই রাখতো। তারপর দ্রুততার সাথে তিনটা কাপ এদিক ওদিক করে যে গেইমটা খেলতে আগ্রহী তাকে বলতে বলবে বলটা কোন কাপের নিচে আছে। যদি ঠিকমতো বলতে পারে সে তখন বিশ পাউন্ড জিতে যায়। আর না পারলে বিশ পাউন্ড উল্টা ফেরত দিতে হয়! আমি প্রায়ই দেখতাম ইস্টার্ন ইউরোপীয়ান লোকজন খেলছে আবার টাকা জিতেও যাচ্ছে।
তো একদিন আমার নিজেরও শখ হলো খেলার। সেদিন রবিবার ওভারটাইম করে আসায় মন খুব ফুরফুরে হাতে এক্সট্রা টাকা আসবে ভেবে! আর অন্যদের জিততে দেখে আমি নিজেও বেশ কনফিডেন্ট ফিল করছিলাম। প্রথম দানে খেলতে গিয়ে বিশ পাউন্ড জিতেও গেলাম। আমি যতনা খুশী তারচেয়েও বেশি অবাক হয়েছিলাম নিজের উইনিং লাক দেখে। এর আগে দোকান থেকে স্ক্র্যাচ কার্ড কিনে একবার সর্বোচ্চ জিতেছিলাম দুই পাউন্ড। সেই ফাটা কপাল নিয়ে বিশ পাউন্ড জিতে যাওয়া আমার জন্য অবিশ্বাস্য! এরপর মনে হলো আচ্ছা আর একবার দেখি! দ্বিতীয় দান খেলতে গিয়ে বিশ পাউন্ড উল্টা হেরে গেলাম। তারপর গেলো জেদ চেপে, ভাবছি এটলিস্ট বিশ পাউন্ড জিততেই হবে! তৃতীয়বারও হারলাম! আশেপাশে বাসের জন্য অপেক্ষা করা লোকজন কৌতুহলি হয়ে হয়তো আমার পাগলামি দেখছিলো! ভাবলাম শেষ আর একবার ট্রাই করবো! কারন এরচেয়ে বেশি পাউন্ড হারা এফোর্ড করতে পারবো না! ফাইনালি চতুর্থবারও আরও বিশ পাউন্ড হেরে বাস ধরলাম। সেইদিন মোট আশি পাউন্ড হেরে গিয়েছিলাম। আমার মতো দিন আনি, দিন খাই স্টুডেন্টের জন্য সেটা যে কি বিশাল জেনেশুনে গচ্চা খাওয়া সেটা আমি নিজেও তখন রিয়েলাইজ করিনি!
পরে অবশ্য জেনেছিলাম এটা একটা গ্যাম্বলিং/স্ক্যাম গ্রুপ! জীবনে সেই প্রথম আর শেষ আমার গ্যাম্বলিং করা, তাও না বুঝে! যাইহোক এত্তোগুলো পয়সা নষ্ট করেও আমি যে আনন্দ পেয়েছি সেটার মুল্য ছিলো আমার কাছে আরও বেশি! আর তাছাড়া টাকাপয়সা, হিসাব নিকাশের বেলায় আমি বরাবরই উদাসীন, ভুলে ভরা! তার আরেকটা বড় উদাহরণ হচ্ছে, লন্ডনে যতদিন ছিলাম, প্রতিবছর ট্যাক্স রিফান্ডের সময় স্টুডেন্ট বা লো আর্নার হিসেবে ট্যাক্স রিফান্ডের যে অপশন ছিলো, সেটা আমি কোনদিনই ইউটিলাইজ করিনি। প্রথমত, আমি এই ব্যাপারটা জানতামই না! দ্বিতীয়ত, নিজের 'লোনার' স্বভাবের কারনে মানুষজনের সাথে মিশতামও কম, আর মিশলেও এই টাকাপয়সা সম্পর্কিত কথাবার্তা হতোই না! আর তৃতীয়তো, জগৎসংসার বা পার্থিব ব্যাপারে খুব বেশী মাথা ঘামাতে আমার বিরক্ত লাগতো! গরীব অবস্থায় ধনীদের প্রবলেম যাকে বলে! লন্ডন ছেড়ে আসার পর এই ট্যাক্স রিফান্ডের ব্যাপারটা যখন জেনেছিলাম, তখন কি যে আফসোস হয়েছিলো! ব্যাপারটা তখন জানা থাকলে অন্তত এক/দুই সেমিস্টারের টাকা জোগাড়ের জন্য এতো চিন্তা করা লাগতো না!
তবে সেই ঘটনার এতো বছর পার করেও টাকাপয়সার ব্যাপারে আমার চিন্তাভাবনার খুব যে পরিবর্তন হয়েছে, তাও না। আমি এখনো টাকাপয়সা উপার্জন করি আমার যা করতে ইচ্ছে হয়, সেটা চিন্তাভাবনা না করেই করে ফেলার জন্য! 'পরে করবো' এই ভাবনাটাই আমার ভালো লাগেনা। তো এই তাৎক্ষনিক শখ পূরণের স্বভাবের কারনে, জীবন কখনো আমাকে অসাধারণ অভিজ্ঞতা দিয়েছে, অথবা কখনো লেসন, কিন্তু শখ পুরন করতে না পারার আফসোস করতে দেয়নি!
© মুনলীন