26/08/2026
নার্সিসিস্ট মানুষকে বাইরে থেকে চেনা খুব কঠিন।
আমাদের সমাজে একটা অদ্ভুত প্রবণতা আছে—আমরা মানুষের বাহ্যিক আচরণ দেখে তার ভেতরের মানুষটাকে বিচার করি। কাউকে হাসতে দেখলে ভাবি সে সুখী, সুন্দর সংসার দেখলে ধরে নিই সেখানে শান্তি আছে। অথচ কিছু মানুষ খুব নিখুঁতভাবে নিজেদের আসল চেহারাটা আড়াল করে রাখতে পারে।
নার্সিসিস্ট মানুষদের ক্ষেত্রে বিষয়টা আরও জটিল।
তারা সবসময় রাগী, খারাপ বা নিষ্ঠুর চেহারার হয় না। বরং অনেক সময় সমাজের চোখে তারা খুব ভালো মানুষ—ভদ্র, দায়িত্বশীল, আত্মীয়-স্বজনের কাছে জনপ্রিয়, এমনকি নিজের কষ্টের গল্প বলে নিজেকে নির্যাতিত মানুষ হিসেবেও উপস্থাপন করতে পারে। কিন্তু কাছের মানুষটি জানে, সেই সুন্দর মুখোশের আড়ালে প্রতিদিন তাকে কী পরিমাণ মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
একজন নার্সিসিস্ট মানুষের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো—নিজের ভুল বা আচরণের দায় স্বীকার না করে সবসময় অন্য কাউকে দায়ী করা।
সংসারে অশান্তি হচ্ছে? দোষ সঙ্গীর।
সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয়েছে? দোষ সঙ্গীর।
নিজের সন্দেহ, নিয়ন্ত্রণ আর অযৌক্তিক আচরণে অন্য মানুষটি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে? তবুও দোষ সেই মানুষটিরই।
এরা অনেক সময় এতটাই সন্দেহপ্রবণ হয় যে, স্বামী বা স্ত্রী কারও সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে হাসিমুখে কথা বললেও তার মধ্যে অন্য সম্পর্কের ইঙ্গিত খুঁজে নেয়। একজন সহকর্মী, বন্ধু কিংবা আত্মীয়—কেউই তাদের সন্দেহের বাইরে থাকে না।
একজন স্ত্রী তার স্বামীর কোনো নারী সহকর্মীর সঙ্গে স্বাভাবিক কথাবার্তাকেও প্রেমের শুরু হিসেবে দেখতে পারেন। আবার একজন স্বামীও তার স্ত্রী কারও সঙ্গে একটু হাসিমুখে কথা বললেই ধরে নিতে পারেন, এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো সম্পর্ক রয়েছে।
কিন্তু এখানে আসল সমস্যা সেই নারী বা পুরুষটি নয়—সমস্যা হলো অসুস্থ সন্দেহ, নিয়ন্ত্রণ করার মানসিকতা এবং নিজের অনিরাপত্তার দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া।
আরও ভয়ংকর বিষয় হলো, নার্সিসিস্ট মানুষ অনেক সময় সম্পর্কের ভেতরে যে অশান্তি তৈরি করে, সেটাকেও খুব কৌশলে নিজের পক্ষে ব্যবহার করে। বাইরে গিয়ে নিজের গল্পটা এমনভাবে উপস্থাপন করে, যেন সে-ই সবচেয়ে নির্যাতিত মানুষ আর অপর পক্ষই সব সমস্যার মূল।
সে গল্প বলতে পারে, ঘটনা সাজিয়ে বলতে পারে, নিজের ভুলগুলো বাদ দিয়ে শুধু অন্যের প্রতিক্রিয়াগুলো তুলে ধরতে পারে। ফলে সমাজের অনেক মানুষ সত্যিটা না জেনেই তাকে বিশ্বাস করে ফেলে।
কিন্তু যে মানুষটি তার সঙ্গে থাকে, সে জানে আসল গল্পটা।
সে জানে—কতবার তাকে অকারণে সন্দেহ করা হয়েছে, কতবার ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে, কতবার নিজের স্বাভাবিক আচরণের জন্যও অপরাধীর মতো দাঁড়াতে হয়েছে। আর একটা সময় এসে সে হয়তো ক্লান্ত হয়ে চুপ করে যায় আবার কখনো এর পরিণতি হয় বিচ্ছেদ।
সেই নীরবতাকে আবার নার্সিসিস্ট মানুষটি নিজের পক্ষে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করে।
“দেখো, ওর বলার কিছু নেই।”
অথচ সে জানে না, কখনো কখনো একজন মানুষ চুপ করে যায় সত্যিটা বলার মতো শক্তি আর অবশিষ্ট না থাকায়।
আর সবচেয়ে মজার বিষয় হলো—যাদের কাছে গিয়ে একজন নার্সিসিস্ট অন্যের নামে গল্প বলে নিজেকে ভালো প্রমাণ করতে চায়, সেই মানুষগুলোর অনেকেই হয়তো তার আচরণটা বুঝতে পারে। সামনে কিছু না বললেও পেছনে তার কথাগুলো নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।
কারণ মানুষ সবসময় শুধু কথায় বিচার করে না।
সময় গেলে আচরণও কথা বলতে শুরু করে।
তাই কোনো সংসারকে বাইরে থেকে দেখে সুখী কিংবা অসুখী বলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একটু থামা দরকার। কারণ একটি সুন্দর ছবির পেছনে কী গল্প আছে, সেটা ছবি দেখে বোঝা যায় না।
আর একজন নার্সিসিস্ট মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়তো এটাই,
সে সারাজীবন সবাইকে বোঝাতে ব্যস্ত থাকে যে সমস্যাটা অন্য মানুষের মধ্যে। অথচ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একবারও নিজেকে প্রশ্ন করে না—“এই অশান্তির জন্য আমার নিজের আচরণের কতটুকু দায়ী??
📌 Post #69