05/09/2024
"বাবার শীতের কোট"
রাফি ছিল একজন সাধারণ ছেলে, ছোটবেলা থেকেই অনেক কষ্টে বড় হয়েছে। তার পরিবার ছিল খুব গরিব, কিন্তু তার বাবা সবসময় চেষ্টা করতেন ছেলের মুখে হাসি ধরে রাখতে। রাফির বাবা একজন মজুর ছিলেন, দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করতেন যাতে তার ছেলেকে পড়াশোনা করাতে পারেন। যদিও তার নিজের পড়াশোনা করার সুযোগ হয়নি, তিনি বিশ্বাস করতেন যে রাফি একদিন জীবনে বড় কিছু করবে।
বাবার বয়স বাড়ছিল, কিন্তু তার পরিশ্রম কমেনি। শীতকাল আসলে বাবার পরিশ্রম যেন আরও কঠিন হয়ে যেত, কারণ তাদের ছোট্ট কুঁড়েঘরে শীতের ঠাণ্ডা বাতাস ঢুকে যেতো। রাফি ছোটবেলায় দেখতো, তার বাবা শুধু একটা পুরনো কোট গায়ে দিয়ে কাজ করতেন। কোটটা ছিল বহু পুরোনো, জায়গায় জায়গায় ছিঁড়ে গিয়েছিল, কিন্তু বাবার কাছে ওটাই ছিল একমাত্র গরম পোশাক। রাফি বাবাকে বলতো, "বাবা, তুমি নতুন একটা কোট কেনো না?" বাবা শুধু হেসে বলতেন, "এই কোটই আমাকে ভালো রাখে, তুই চিন্তা করিস না।"
কিন্তু রাফি জানতো, বাবার শরীর প্রতিদিন ঠাণ্ডায় কষ্ট পায়। সে বাবার জন্য কিছু করতে পারতো না, কারণ তার নিজের পড়াশোনার খরচই বাবার সমস্ত রোজগার নিয়ে নিচ্ছিল। বাবার মুখে একটাও অভিযোগ কখনো শোনা যায়নি, কারণ তার সব স্বপ্ন ছিল রাফিকে ঘিরে। তিনি শুধু চাইতেন, ছেলে যেন ভালো মানুষ হয়।
সময় কেটে গেল, রাফি বড় হলো, পড়াশোনা শেষ করে একটি ভালো চাকরি পেল। সে তখন শহরে চলে গেল, বাবা-মাকে গ্রামের বাড়িতে রেখে। বাবা তখনও সেই পুরোনো কোট গায়ে দিয়ে কাজ করতেন, শীতের দিনগুলোয় ঠাণ্ডার সাথে লড়াই করতেন। রাফি বাবার সাথে মাঝে মাঝে কথা বলতো, কিন্তু জীবনের ব্যস্ততায় ফোনের সময়গুলো কমে আসছিল।
একদিন রাফি সিদ্ধান্ত নিল, সে এবার বাবার জন্য একটি সুন্দর, নতুন কোট কিনবে। শহরের বড় দোকান থেকে সবচেয়ে দামি এবং উষ্ণ কোটটা কিনলো সে, বাবার জন্য উপহার হিসেবে। সে ভাবলো, "এবার বাবা আর ঠাণ্ডায় কষ্ট পাবেন না।"
কয়েকদিন পর রাফি ছুটিতে বাড়ি গেল, বাবার জন্য কোটটা নিয়ে। বাড়িতে গিয়ে সে দেখলো, তার বাবা বিছানায় শুয়ে আছেন, শরীর খুব দুর্বল। ঠাণ্ডায় কাবু হয়ে গেছেন, কিন্তু মুখে কোনো অভিযোগ নেই। রাফি বাবার কাছে গিয়ে কোটটা তুলে দিলো, বললো, "বাবা, এটা তোমার জন্য। এবার আর তোমাকে শীতের কষ্ট করতে হবে না।"
বাবা কোটটা হাতে নিয়ে দেখলেন, চোখে অশ্রু ভরে উঠলো। তিনি কোটটা ছুঁয়ে বললেন, "তোর এই উপহারটা আমার জন্য অনেক বড়, কিন্তু হয়তো আমি আর এটা পরতে পারবো না। তুই সময়মতো এলি না বাবা, আমার শরীর আর সেই শক্তি নেই।"
রাফি বুঝতে পারলো, সে অনেক দেরি করে ফেলেছে। সে বাবার হাতে কোটটা তুলে দিলো, কিন্তু বাবা আর কখনো সেই কোটটা পরতে পারলেন না। সেদিন রাতে বাবা চলে গেলেন, আর রাফি বুঝতে পারলো, জীবনের সব ব্যস্ততা তার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটাকে তার থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে।
বাবার পুরনো কোটটা তখনও রাফির ঘরে ঝুলছিল, আর নতুন কোটটা বাবার পাশে পড়ে ছিল – কখনো না পরা।