04/05/2026
মোহাম্মদপুরের একটি পুরনো বাড়ির নাম ছিলো “স্বপ্নছায়া”। সেই বাড়ির চতুর্থ তলায় থাকতেন এক কবি, নাম রিপন। ছাত্রজীবনে তিনি ছাত্ররাজনীতির আলোচনায় ছিলেন এক সাহসী ব্যক্তিত্ব। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার প্রতিবাদ ছিল অনড়, নিঃশব্দ অথচ শক্তিশালী।
জীবন যাত্রায় প্রেমের বাঁধনে আবদ্ধ হয়ে গড়লেন নিজের সংসার, যেখানে আসলো তাদের প্রিয় সন্তান। তবে সময়ের ছন্দে বদলে গেলো তার রাজনৈতিক জীবন; বিদায় নিলেন জনজীবনের ঝড়-ঝাপটা থেকে। এরপর নিবেদিত প্রাণ হলেন আর্ত মানবাতার সেবায়। শহর থেকে গ্রাম, গ্রাম থেকে শহর—মানবতার কল্যানে ছুটে বেড়াতেন তিনি;
প্রতিষ্ঠা করলেন একটা মানবাধিকার সংগঠন।
কিন্তু সেই সংগ্রামে পরিবারের জন্য ভাগ্য ছিল কমদামি। সংসারে ছিল নিত্যনৈমিত্তিক অভাব। তার প্রিয় স্ত্রী হঠাৎ ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন। কথা বলতে পারতেন না আর ডান হাত-পা সম্পূর্ণ অবশ।
অবশেষে, রিপনের হাতে উঠে এলো সংসারের ভার। মানবাধিকার সংগঠনের সেবা থেমে গেলো অজান্তেই, তখন সংসারের দায় তাকে বাধ্য করল এসব কাজ সীমিত করতে।
রিপন একটি ল্যাপটপ নিয়ে সারারাত জেগে অনলাইন ভিত্তিক আয় শুরু করলেন—ফ্রিল্যান্সিং দিয়ে জীবন চালানোর স্বপ্নে বেঁধে ফেললেন নিজেকে। দিনের বেলা সংসারের কাজ—স্ত্রী, সন্তানকে খাওয়ানো, রান্না-বান্না, গৃহকর্মের সকল দায়িত্ব সামলানো। রাতের নিদ্রা নেই, দিনের বিশ্রাম মিলছে না, ক্লান্ত শরীরে ক্রমেই বাসা বাঁধতে লাগল বিভিন্ন রোগ।
নিজেই টের পেলেন, শরীর আর আগের মতো নেই। কিন্তু ভয় পেয়েই ডাক্তারের দ্বারস্থ হলেন না, ঠিক ভয় নয় অলসতাও নয়, বরং বাড়তি খরচের চিন্তা বাধা দিলো তাকে।
এদিকে হঠাৎ ফ্রিল্যান্সিং কাজও একেবারে কমে গেলো।
মুদি দোকান বাকি জমলো, ঘর ভাড়া বাকি কয়েক মাসের,
সব দেনা জড়িয়ে গেলো মাথায়, তবে কাওকে কিছু বুঝতে দিলো না বাসার।
এক রাতে, স্ত্রী-সন্তান গভীর নিদ্রায়, রিপন একা ল্যাপটপের সামনে বসে কাজ করছিলেন। আর আপন মনে আবৃত্তি করছিলেন তার লেখা একটি কবিতা—‘Silent Cries of a Poet’—নীরব কান্না বুকে নিয়ে আবৃত্তি করছিলেন:
ইন দা চেম্বারস অফ মাই উইয়ারি মাইন্ড,
ভার্সেস ব্লুম, বাট নান কান ফাইন্ড।
অ্যাট দা ডোর, দা ডেটস রিমেইন,
অ্যান্ড পোয়েট্রি ডিজলভস ইন পেইন।
ড্রিমস অফ রাইম ইন পেটালস ব্রাইট,
স্টাং বাই বিস দ্যাট ব্রিং নো লাইট।
দা পোয়েট উইপস, দা ফ্লাওয়ারস ফল,
নো পোয়েম লিভস টু স্ট্যান্ড অ্যাট অল।
হঠাৎ করেই রিপনের শরীর এবং মাথা অদ্ভুতভাবে ব্যথা করতে লাগল। গলা শুষ্ক হয়ে যাচ্ছিল, মাথা ভনভন করতে শুরু করল, আর হাত-পা ক্রমশ অবশ হয়ে আসছিল। তিনি জোরে জোরে স্ত্রী আর সন্তানদের ডাকতে চাইলেন, কিন্তু কোনো শব্দ বের হল না। পানি খাওয়ার জন্য চেয়ার ছেড়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেন, কিন্তু শরীর কাজ করল না। চোখ ঝাপসা হতে লাগল, বুঝতে পারলেন তার সময় শেষ হয়ে আসছে।
চোখ থেকে গরম অশ্রু ঝরে পড়তে লাগল, মাথায় ঘুরলো স্ত্রী ও সন্তানের কথা। তখন সামনে দেখা দিলো এক জমকালো পোশাক পরিহিত মৃত্যুদূত। রিপন বিড়বিড় করে উচ্চারণ করলেন —
"আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্দাহু লা শারীকালাহু, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু।"
তার এই বিশ্বাসের শব্দগুলো যেন তার আত্মার শান্তির আলো হয়ে ছড়িয়ে পড়ল। সেই মুহূর্তে রিপনের জীবন শেষ হলেও, সে অদ্ভুতভাবে ছিলো প্রশান্ত!
তারপর হঠাৎ রিপনের মাথা ঢলে পড়ল টেবিলের ওপর, চারপাশে নীরবতা চারদিকে একদম সুনসান।
রাতের শেষভাগে, রিপনের স্ত্রী ক্র্যাচে ভর করে আস্তে আস্তে রিপনের কাজের টেবিলের কাছে এসে যা দেখলো একপলকে তা সে সহ্য করতে পারলো না সে তার পুরোনো অভ্যাসে নাম ধরে চিৎকার করে উঠল—"রিপন!" এই চিৎকারে তার সন্তানেরাও ছুটে এলো।
উল্লেখ্য, ব্রেন স্ট্রোকের কারণে বাকশক্তি হারানো সত্ত্বেও, তার স্ত্রী রিপনের প্রতি এতটাই ভালোবাসা পোষণ করত যে, এই শেষবার "রিপন" বলে চিৎকারের পরই সে নিজেও চুপচাপ দুনিয়া থেকে বিদায় নিল।
রিপনের সন্তানরাও তাদের মা-বাবার এই অবস্থা দেখে তা আর সহ্য করতে পারল না, তাদেরও পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হলো।
এই করুণ সময়ে, কেউ রিপনের খোঁজ-খবর নেয়নি। ফলে এই মর্মান্তিক ঘটনা প্রায় সাত-আট দিন অজানা থেকে গেল।
অবশেষে, ‘স্বপ্নছায়া’ বাড়ির অন্য ভাড়াটিয়ারা তীব্র দুর্গন্ধ টের পেয়ে খোঁজ নিতে শুরু করল। দুর্গন্ধের উৎস খুঁজে তারা বুঝতে পারল, সেটা আসছে কবি রিপনের ফ্ল্যাট থেকে।
ভাড়াটিয়ারা একে অপরের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল, ‘অনেক দিন ধরে তো রিপন সাহেব আর তার সন্তানদের দেখা মেলে না।’
অবশেষে পুলিশ ডাকা হলো। পুলিশ এসে দরজার তালা ভেঙে ফ্ল্যাটে প্রবেশ করল। যা দেখল, তা দেখে সবাই স্তম্ভিত হয়ে পড়ল। সবাই মিলে দ্রুত ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে আসল।
তাদের বের হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আকস্মিকভাবে দরজাটি ঘনঘন শব্দে বন্ধ হয়ে গেলো।
রাত ১টা বাজে তখন। কেউই দরজা খুলতে পারছে না। কাঠের দরজাটি যেন ইস্পাতের চেয়েও শক্ত হয়ে গেছে। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের লোকজন এসে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো। অবশেষে সবাই হাল ছেড়ে চলে গেলো। ভয়ে কিছু ভাড়াটিয়া বাড়ি ছেড়ে দিলো।
বাড়িতে যারা রয়ে গেল, তারা প্রতিরাতে একটা অদ্ভুত শব্দ শুনে কৌতূহলী হয়ে বাইরের দিকে উঁকি দেয়। তারা দেখে কবি রিপন, তার প্রিয় সানগ্লাস চোখে চকোলেট রঙের সুট পড়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসছে, বুটজুতোর ঠকঠক আওয়াজ তুলছে, আর সিগারেট টানছে এবং আবৃত্তি করছে -
তার নিজের লেখা প্রিয় কবিতা "সাইলেন্ট ক্রাইস অফ আ পোয়েট" এর অংশ বিশেষ -
মর্নিং'স সান বিগিনস টু রাইজ,
বাট ডাস্ক হ্যাজ স্টোলেন অল দা স্কাইজ।
গোল্ডেন থটস আই ট্রাই টু রাইট,
বাট হাংগার স্ক্রিমস ইন ডেড অফ নাইট।
আ ভয়েস বিহাইন্ড মি স্টার্টস টু শাউট—
"ওয়ি'আর আউট অফ সল্ট ফর টু ডেইজ নাও!"
আহ, দিস লাইফ, আ ট্র্যাজিক সং,
হোয়্যার পোয়েট্রি মাস্ট স্টার্ভ সো লং।
আ পোয়েট'স চাইল্ড ডাইজ আনবোর্ন,
ইন হিজ মাদার'স উম্ব, হার্ট-টর্ন।
আই ক্ল্যাপ মাই হ্যান্ডস অ্যাজ জয় ড্রস নিয়্যার,
দেন সি দা ওয়াইফ ইন ওয়ার্ন-আউট গিয়ার।
আস্তে আস্তে, ভয়ে আর আতঙ্কে স্বপ্নছাঁয়া বাড়ির সব ভাড়াটিয়া একে একে বাড়ি ছেড়ে চলে গেলো। আর কেউ আর কখনো সেই বাড়ি ভাড়া নিতে আসলো না। ঢাকার মানুষজন আজও স্বপ্নছাঁয়াকে একটি ভুতুড়ে, রহস্যময় বাড়ি হিসেবে চেনে এবং ভয় পায়।
বিগত প্রায় ১০০ বছর ধরে সময়ের ধুলায় ঢাকা সেই বাড়ি ধীরে ধীরে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। দেয়ালগুলোতে শ্যাওলা ছড়িয়ে পড়ে, আর ছোট ছোট অশ্বত্থ গাছ গাঢ় ছায়া ফেলে বাড়ির কোণে কোণে আরও ভুতুড়ে অবস্থা সৃষ্টি করেছে।
কিন্তু এলাকার কিছু বয়জেষ্ঠ লোকজন, এখনো রিপনকে
দেখে মাঝেমধ্যে; বিশেষ করে অমাবস্যার গভীর রাতে, এমন এক মায়াময় দৃশ্য দেখার জন্য রিপনের কিছু ভক্ত
অপেক্ষা করে বাড়িটির আশেপাশে প্রতি অমাবস্যায়।
তবে বড়ই আশ্চর্যজনক বিষয় হলো ২০২৫ সালের
সেপ্টেম্বর মাসে একদিন বাংলাদেশের আকাশে রেডমুন
বা ব্লাডমুন 🔴 দেখা গিয়েছিল, ঐদিন নাকি প্রথম
অমাবস্যা বিহীন রাতে রিপন কবিতা আবৃত্তি করে
স্বপ্নছায়া বাড়ির জরাজীর্ণ ছাঁদে হেটে বেড়িয়েছে এবং সিড়ি
বেয়ে উঠানামা করছে, সেদিন কবি রিপনের গায়ে
আছড়ে পড়েছিলো ব্লাডমুনের রক্তিম আলো!
চকোলেট কালারের স্যুট পরা, বুটজুতোর ঠকঠক শব্দ তুলে, কবি রিপন বাড়ির ছাঁদে হেঁটে বেড়াচ্ছে আর সিগারেট টেনে সে আবৃত্তি করছে – তার নিজের লেখা প্রিয় কবিতা
𝗦𝗶𝗹𝗲𝗻𝘁 𝗖𝗿𝗶𝗲𝘀 𝗼𝗳 𝗮 𝗣𝗼𝗲𝘁 ||
In the chambers of my weary mind,
Verses bloom, but none can find.
At the door, the debts remain,
And poetry dissolves in pain.
Dreams of rhyme in petals bright,
Stung by bees that bring no light.
The poet weeps, the flowers fall,
No poem lives to stand at all.
Morning's sun begins to rise,
But dusk has stolen all the skies.
Golden thoughts I try to write,
But hunger screams in dead of night.
A voice behind me starts to shout—
"We're out of salt for two days now!"
Ah, this life, a tragic song,
Where poetry must starve so long.
A poet’s child dies unborn,
In his mother’s womb, heart-torn.
I clap my hands as joy draws near,
Then see the wife in worn-out gear.
The words that bloom like infant smiles
Are buried deep in duty’s piles.
The moon and stars reach out to hold,
But children cry for rice, not gold.
The doors collapse, the heart gives in,
While tides of verse rise deep within.
And though I write through smoke and straw,
My poems remain unseen in awe.
Who will share these words of fire,
Or spread them wide, take them higher?
When the poet has no bread or light,
His candle fades into the night.
In a world of labels, false and proud,
Truthful verses drown in crowd.
And so my torch of art dies slow,
As tears of silence start to flow.