01/06/2026
পাহাড় কেবল ভৌগোলিক উচ্চতার নাম নয়। এটি একটি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস,সংস্কৃতি,স্বপ্ন ও বেঁচে থাকার সংগ্রামের প্রতীক। যুগের পর যুগ ধরে পাহাড়ি জনপদে মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান করে নিজেদের জীবন, ভাষা ও সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রেখেছে। কিন্তু আধুনিক উন্নয়ন, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তার রাজনীতি এবং সামাজিক বৈষম্যের চাপে সেই স্বপ্নগুলো আজ ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে।পাহাড়ের বুকজুড়ে যতটা সবুজ দেখা যায়, মানুষের মনে ততটা নিরাপত্তা বা স্বাধীনতার অনুভূতি জন্মায় না। সেখানে প্রতিদিন বেড়ে ওঠে ভয়, অনিশ্চয়তা এবং অস্তিত্ব সংকট।
পাহাড়ি সমাজের নতুন প্রজন্ম প্রযুক্তি, জ্ঞান ও আধুনিক শিক্ষার মাধ্যমে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে চাইলেও বাস্তবতা তাদের জন্য সহজ নয়। যে তরুণ একসময় জুমঘরের মাচায় বসে আকাশের তারা গুনে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছিল, আজ সে আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য হয়। যে কিশোর প্রযুক্তিকে নিজের উন্নতির হাতিয়ার হিসেবে কল্পনা করেছিল, সে শিখে যায় কীভাবে নিজের চিন্তা ও প্রতিভাকে আড়াল করতে হয়। পাহাড়ে জ্ঞানচর্চা, প্রশ্ন তোলা কিংবা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলাও অনেক সময় সন্দেহের চোখে দেখা হয়। ফলে সৃজনশীলতা ও মুক্তচিন্তার জায়গাগুলো ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে পড়ে।
এই সংকট কেবল ব্যক্তিগত নয়। এটি সামষ্টিক অস্তিত্বের সংকট। পাহাড়ের বহু প্রজন্মের ইতিহাস, স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয় আজ উন্নয়নের নামে পরিচালিত প্রকল্পগুলোর নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে। নতুন রাস্তা, পর্যটন কেন্দ্র কিংবা অবকাঠামোগত উন্নয়নের পরিকল্পনা যখন বাস্তবায়িত হয়, তখন হারিয়ে যায় ঝর্ণার ধারা, জুমক্ষেতের গন্ধ, পূর্ব পুরুষের কবর এবং শতবর্ষী গ্রামের স্মৃতি।
উন্নয়নের হিসাব কষা হয় অর্থনৈতিক পরিমাপে, কিন্তু সেই উন্নয়নের ফলে যে মানুষের আত্মপরিচয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তার মূল্য নির্ধারণের কোনো পদ্ধতি নেই। পাহাড়ে নিরাপত্তার নামে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও মানুষের মানসিক জীবনে গভীর প্রভাব ফেলছে। নিরাপত্তা বেষ্টনী, নজরদারি ও অস্ত্রের উপস্থিতি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এক ধরনের অদৃশ্য আতঙ্ক তৈরি করে।
দীর্ঘদিন ধরে এই বাস্তবতার মধ্যে বসবাস করতে করতে অনেক মানুষ নিজের মত প্রকাশের সাহস হারিয়ে ফেলে। একদল মানুষ শিখে যায় কীভাবে আদেশ মানতে হয়, আরেকদল শিখে যায় কীভাবে নীরবে সব সহ্য করতে হয়। এই নীরব শিক্ষার কোনো বিদ্যালয় নেই, তবু প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পাহাড়ি সমাজ এই কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়েই বেড়ে উঠছে।
পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর আরেকটি বড় সংকট হলো পরিচয়ের প্রশ্ন। নিজেদের জন্মভূমিতে থেকেও তাদের বারবার প্রমাণ করতে হয় তারা এই ভূখণ্ডের মানুষ। নাগরিকত্ব, স্থানীয় পরিচয় কিংবা সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব নিয়ে প্রতিনিয়ত ব্যাখ্যা দিতে হওয়া একটি জাতিগোষ্ঠীর আত্মমর্যাদাকে গভীরভাবে আঘাত করে। এতে নতুন প্রজন্মের মধ্যে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা ও হতাশা তৈরি হয়। তারা অনুভব করতে শুরু করে যে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে থেকেও তারা সমান মর্যাদা পাচ্ছে না।
তবে এত সংকট ও দমনের মধ্যেও পাহাড়ের মানুষ সম্পূর্ণভাবে আশা হারায়নি। প্রতিটি নতুন শিশুর চোখে এখনও নতুন সকালের স্বপ্ন জন্ম নেয়। নতুন প্রজন্ম প্রযুক্তিকে আঁকড়ে ধরে নিজেদের সম্ভাবনা খুঁজতে চায়। তরুণ লেখক, শিল্পী ও শিক্ষিত যুবকেরা নতুন ভাষায় নিজেদের ইতিহাস ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা করছে। এই চেষ্টাই প্রমাণ করে যে পাহাড়ের মানুষের স্বপ্নকে পুরোপুরি দমন করা সম্ভব নয়।
ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা মানুষের সংস্কৃতি, পরিবেশ ও অস্তিত্বকে সম্মান করবে। পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কেবল অবকাঠামো নয়, প্রয়োজন বিশ্বাস, সমতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। নতুন প্রজন্ম যেন ভয় নয়, জ্ঞান ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারে সেই পরিবেশ নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
একদিন হয়তো এমন সময় আসবে, যখন পাহাড়ের মানুষকে নিজেদের পরিচয়ের জন্য আর ব্যাখ্যা দিতে হবে না। কোনো শিশুকে নিজের স্বপ্ন লুকিয়ে রাখতে হবে না, কোনো লেখককে সত্য বলার জন্য ভয় পেতে হবে না। তখন পাহাড়ে উন্নয়ন মানে হবে মানুষের জীবনমানের উন্নতি, প্রকৃতির ধ্বংস নয়। শান্তি মানে হবে মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদাপূর্ণ সহাবস্থান।